ঢাকা, বৃহস্পতিবার 29 March 2018, ১৫ চৈত্র ১৪২৪, ১০ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বেকারের সংখ্যা ভীতিকর

দেশে বেকারের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে আবারও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে একদিকে রয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং অন্যদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শ্রমশক্তির ওপর সম্প্রতি প্রকাশিত জরিপের পোর্টে বিবিএস জানিয়েছে, বেকার তথা প্রকৃত কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার। এদের মধ্যে কর্মক্ষম কিন্তু দেশের শ্রমশক্তিতে যোগ হয়নি এমন মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৫৬ লাখ। অন্যদিকে আইএলওর হিসাবে বেকারের সংখ্যা অনেক কম- মাত্র ২৬ লাখ ৮০ হাজার!
গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে দুটি সংস্থার পরিসংখ্যানের মধ্যে এত বিরাট পার্থক্যের কারণ জানাতে গিয়ে বলা হয়েছে, বেকার ও বেকারত্ব সম্পর্কে আইএলওর নিজস্ব সংজ্ঞা ও কিছু মানদন্ড রয়েছে। যেমন চাকরি বা আয় করার মতো কাজ যাদের নেই তাদের সকলকেই আইএলও বেকার বলে মনে করে না। আইএলওর সংজ্ঞা অনুযায়ী তারা শ্রমশক্তির বাইরে রয়েছে। এমন সংজ্ঞার ভিত্তিতেই আইএলও তার পরিসংখ্যান হাজির করেছে। অন্যদিকে বিবিএস-এর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় আইএলওর এই সংজ্ঞা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের অভিমত, শিক্ষিত  এবং প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতাসহ কর্মক্ষম হওয়া সত্ত্বেও যারা অর্থ উপার্জন করার মতো কাজ পাচ্ছে না তাদেরকেই বেকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই মানদন্ডের ভিত্তিতেই বিবিএস তার জরিপে বেকার বা কর্মহীন মানুষের সংখ্যা তুলে ধরেছে।
বিবিএস-এর পরিসংখ্যানে জানা গেছে, দেশে মোট কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ। এদের মধ্যে উপার্জনমুখী কাজে নিয়োজিত রয়েছে ৬ কোটি ৮ লাখ- কৃষিক্ষেত্রে ২ কোটি ৪৭ লাখ, শিল্পে ১ কোটি ২৪ লাখ এবং বিভিন্ন সেবাখাতে রয়েছে ২ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ। অন্যদিকে শ্রমশক্তির বাইরে থাকা তথা বেকার ও কর্মহীন ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজারের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ৩ কোটি ৬৩ লাখ ৩৩ হাজার। ১ কোটি ১৯ লাখ ৪৭ হাজার পুরুষও রয়েছে বেকার অবস্থায়। উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেকার তথা শ্রমশক্তির বাইরে থাকা নারী-পুরুষের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৬৬ লাখ। সে তুলনায় মাত্র এক বছরের মধ্যেই বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১২ লাখ। প্রকাশিত রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, দেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২২ লাখ কর্মক্ষম মানুষ প্রবেশ করে। কিন্তু ৭ লাখের বেশি মানুষ কোনো চাকরি বা কাজ পায় না। ফলে প্রতি বছর ১৫ লাখ করে বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, একদিকে সরকারি বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার হচ্ছে না, অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণে বিনিয়োগ বাড়ছে না বেসরকারি খাতে। তাছাড়া যে হারে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির কথা শোনানো হচ্ছে সে বিষয়ে প্রশ্ন ও সংশয় তো রয়েছেই, পাশাপাশি এ সত্যও প্রমাণিত হয়েছে যে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে চাকরির তথা কর্মসংস্থানের সমন্বয় করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। অর্থাৎ জিডিপির কথিত প্রবৃদ্ধি চাকরির সুযোগ সৃষ্টির ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে পারছে না। একই কারণে কথিত প্রবৃদ্ধিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
ওদিকে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাওয়ার নামে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও স্থায়ী কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগই সৃষ্টি হচ্ছে না। তথ্যাভিজ্ঞরা প্রসঙ্গক্রমে ফ্লাইওভার এবং পদ্মাসেতুর মতো বিভিন্ন প্রকল্পের উদাহরণ উল্লেখ করে বলেছেন, এসবের জন্য ব্যয়িত বিপুল অর্থের কিছু অংশও যদি শিল্প-কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করা হতো তাহলে একদিকে অসংখ্য মানুষ চাকরি পেতো, অন্যদিকে শিল্পায়ন ও উৎপাদনসহ রফতানি আয়ের দিক থেকে দেশও অনেক এগিয়ে যেতে পারতো।
আমরা মনে করি, সব মিলিয়েই দেশে বেকার সমস্যা অত্যন্ত আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর মূল কারণ আসলে বিনিয়োগ না হওয়া। বিনিয়োগ যদি বেড়ে থাকে তাহলে বলা যাবে সংখ্যা যতো কম আর বেশিই হোক না কেন, চাকরির সুযোগ তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে বাস্তব অবস্থা মোটেও আশান্বিত হওয়ার মতো নয়। কারণ, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশে মারাত্মক স্থবিরতা বিরাজ করছে। দেশি পুঁজিপতি বা শিল্প মালিকরা কোনো কারখানায় বিনিয়োগ করার পরিবর্তে বিদেশে টাকা পাচার করে দিচ্ছেন। ওদিকে দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না বলে বিদেশিরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসছেন না। জমি কেনা ও জমি রেজিস্ট্রেশন করার এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার মতো প্রতিটি বিষয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের। সে কারণে অনেক বিদেশি এমনকি বিনিয়োগের নিবন্ধন করিয়েও ফিরে গেছেন। তারা বাংলাদেশের জন্য নিয়ে আসা অর্থ দিয়ে প্রতিবেশি ভারতে বা এশিয়ার অন্য কোনো দেশে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেছেন। একই কারণে চাকরিও পেয়েছে ভারতসহ ওইসব দেশের লোকজন। অন্যদিকে দেশে বেকারের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে।
আমরা মনে করি, লোক দেখানো উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পরিবর্তে সরকারের উচিত এমন সব খাতে তৎপর হওয়া, যেগুলো দেশে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। পাশাপাশি সৃষ্টি করবে চাকরির সুযোগও।  দেশের ভেতরে বিনিয়োগ বাড়লে এবং উৎপাদনসহ বাধাহীন কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে নিশ্চয়তা পেলেই বিনিয়োগের জন্য বিদেশিরা এগিয়ে আসেন। এ ব্যাপারে সরকারকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমরা চাই দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ুক, নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠুক এবং সেগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম হোক বাধাহীন। সব মিলিয়ে তেমন অবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই দেশে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। বেকারের সংখ্যা নিয়েও তখন আর অসত্য যেমন বলতে হবে না তেমনি হতে হবে না ভীত ও উদ্বিগ্নও।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ