ঢাকা, বৃহস্পতিবার 29 March 2018, ১৫ চৈত্র ১৪২৪, ১০ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঘুরেফিরে সুশাসনের বিষয়টিই উঠে আসছে

ক্ষমতার দাপট নিয়ে বেশকিছু প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে প্রথম আলো পত্রিকায়। অষ্টম প্রতিবেদনটির শিরোনাম ‘অসম্ভবকে সম্ভব করে তার সুপারিশ’। ২৪ মার্চ মুদ্রিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বাস্তবে যে শ্মশানের অস্তিত্ব নেই, সেই শ্মশানের সংস্কারে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে একজন সংসদ সদস্যের সুপারিশে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর সুপারিশে এমন কিছু সংগঠন সরকারি টাকা বরাদ্দ  পেয়েছে যেসব সংগঠনের নাম শুধু কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। অবশ্য শুধু অস্তিত্বহীন সংগঠনের জন্যই তিনি সুপারিশ করেন না, বাস্তবে আছে এমন সংগঠনের জন্যও তিনি সুপারিশ করে থাকেন। তবে সমস্যা হলো, ওই সংগঠনের লোকেরা তা জানতে পারেন না। ফলে বরাদ্দ হওয়া টাকা সংগঠনগুলো পায় না। কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) এবং গ্রামীণ রক্ষণাবেক্ষণ  (টেস্ট রিলিফ বা টিআর) প্রকল্পের আওতায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাঁশখালীর ৩৬৫ প্রকল্পের জন্য সুপারিশ করেন উক্ত সংসদ সদস্য। এতে বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম আলো উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার তিনটি ওয়ার্ডের আটটি প্রকল্পের বিষয়ে অনুসন্ধান চালায়। এর মধ্যে ছয়টি প্রকল্পের জন্য জমা দেওয়া স্থাপনা বা সংগঠনের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য যে, মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন। তবে তিনি আলোচনায় আসেন ২০১৬ সালে। ওই বছরের ২ জুন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে প্রহার করে খবরের শিরোনাম হন। আলোচ্য এমপির বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে গত বছরের নভেম্বরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছিল বাঁশখালী আওয়ামী লীগের একটি অংশ। এতে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান এবং ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়। এই দুর্নীতির জন্য এমপি ও তার লোকজনদের দায়ী করেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আবদুল্লাহ কবির। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বাঁশখালী আসনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রথমে মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। পরে মনোনয়ন দেয়া হয় মোস্তাফিজুর রহমানকে।
বাঁশখালী উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রোজিয়া সুলতানা বলেন, ‘বরাদ্দের খুব সামান্য অংশই বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে। অনেক প্রকল্পের অস্তিত্ব নেই। এই সত্য কথাগুলো আমাদের বলতে হবে।’ সত্য প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন, দুর্নীতির বিচার হওয়াও প্রয়োজন। কারণ দুর্নীতির মাত্রা যতটা বাড়বে, জনগণের বঞ্চনার মাত্রাও ততটা বাড়বে। আর জনপ্রতিনিধিরা দুর্নীতি করলে দুঃখের মাত্রাটা আরও বেড়ে যায়।
দুর্নীতির সাথে, অপরাধের সাথে জড়িয়ে থাকে গডফাদাররা। ঢাকা নাকি এখন গডফাদারদের শহর। এমন শিরোনামের একটি খবর মুদ্রিত হয়েছে প্রথম আলো পত্রিকায়। ২৫ মার্চে মুদ্রিত খবরে বলা হয়, মসজিদের শহর, রিকশার শহর ঢাকাকে এখন নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন- এটা গডফাদারদেরও শহর। এই শহরের রিকশা থেকে গণপরিবহন, ফুটপাত থেকে টার্মিনাল কোন কিছুই চাঁদা ছাড়া চলে না। এসব চাঁদার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি রাজনীতিক, সরকার সমর্থক সংগঠন ও ব্যক্তিদের হাতে। অবশ্য সরকার বদল হলে নিয়ন্ত্রকও বদলায়। গত শনিবার ‘ঢাকা মহানগরীর যানজট : আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা’ শিরোনামে একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। উক্ত বৈঠকের আয়োজক ছিল বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গষেণা ইনস্টিটিউট এবং রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। উক্ত বৈঠকে আলোচকরা বলেন, ঢাকা বর্তমানে নাগরিকদের শহর নয়, গডফাদারদের শহর। ঢাকার কয়েক লাখ অনিবন্ধিত রিকশা এবং ফুটপাতের কয়েক হাজার অবৈধ হকারের কাছ থেকে চাঁদা আদায়কারীদের গডফাদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আলোচকরা বলেন, বাস ও লঞ্চ টার্মিনালগুলোতেও চলছে গডফাদারদের দৌরাত্ম্য। ফলে যাত্রী সেবার বদলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় নাগরিকদের।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসেবে ঢাকা ও এর আশপাশে বাস-মিনিবাস চলাচল করে প্রায় সাত হাজার। অন্তত এক ডজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনীতিক সরাসরি এই পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এদের অনেকে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতা হয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন। আবার কেউ কেউ সরাসরি নিজেই বাস নামিয়ে ব্যবসা করছেন। পরিবহন সূত্রগুলো বলছে, ওয়েবিল (যাতায়াতের হিসাব), জিপি (গেট পাস), পার্কিং চার্জ, মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের চাঁদা- এসব নামে প্রতিদিন প্রতিটি বাস-মিনিবাস থেকে ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। এই চাঁদার টাকা পরিবহন নেতা, মালিক, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পকেটেও যায়। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আসছে না। এই খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করা গেলে যাত্রী ভাড়া কমে যেত, ভোগান্তিও থাকতো না। এদিকে হকার সমিতিগুলোর হিসাব মতে, ঢাকার ফুটপাতে প্রায় ৬০ হাজার হকার আছেন। রাস্তায় থাকা হকারদের ধরলে সংখ্যাটা ১ লাখে দাঁড়ায়। প্রত্যেক হকারের কাছ থেকে গড়ে দিনে ১৫০ টাকা আদায় করা হয়। সে হিসেবে হকারদের কাছ থেকেই দৈনিক চাঁদা আদায় হয় প্রায় দেড় কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদার এই টাকা ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মী, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর, পুলিশ ও চাঁদা তোলার কাজে নিয়োজিত লাইনম্যান এবং তাদের সহযোগিরা ভাগ করে নেন।
বাংলাদেশ হকার ফেডারেশনের সভাপতি আবুল কাসেম বলেন, চাঁদাবাজরা হকারদের থেকে যে পরিমাণ চাঁদা আদায় করে, এটা সরকার নিজে তুললে হকারদের পুনর্বাসন হয়ে যেত। অথচ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও হকারদের পুনর্বাসন হচ্ছে না। চাঁদাবাজরা পকেট ভারী করছেন। এদিকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, তাদের এলাকায় নিবন্ধিত বৈধ রিকশা আছে ৮০ হাজার ৪শ’ ৭৩টি। ১৯৮৬ সালের পর আর কোন রিকশা নিবন্ধন দেয়া হয়নি। কিন্তু রাজধানীতে চলছে পৌনে ৭ লাখ রিকশা। উৎসব-পার্বনে রিকশার সংখ্যা বেড়ে ১০ লাখে দাঁড়ায়।
সরকার সমর্থক বিভিন্ন সংগঠন মুক্তিযোদ্ধাদের নামে রিকশার নিবন্ধন দিয়ে বেড়াচ্ছে। মাঝেমধ্যে পুলিশ ও সিটি করপোরেশন অভিযান চালিয়ে কিছু রিকশা জব্দ করে। এরপর সেগুলো সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে গ্রামের দরিদ্রদের মাঝে বিতরণের নামে পুনরায় নিজ দলের লোকজনের মধ্যে বিলি-বন্টন করা হয় বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিষয়গুলো বিবেচনায় আনলে উপলব্ধি করা যায় ঢাকা আসলেই এখন গডফাদারদের শহরে পরিণত হয়েছে। ২৪ মার্চের গোলটেবিল বৈঠকে সড়ক দুর্ঘটনা ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ঢাকা শহরকে নাগরিকদের বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। সরকারি সংস্থাগুলোকেও নাগরিক সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। নিবন্ধিত নির্দিষ্টসংখ্যক রিকশা, ফুটপাত হকারমুক্ত করা, বাস ও লঞ্চ টার্মিনালগুলো সরকারি সংস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, কায়েমি স্বার্থের ধ্বজাধারী গডফাদাররা কি এই ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে না? সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও প্রশাসন যথাযথ ভূমিকা পালন করে কিনা সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। ঘুরেফিরে আবার সেই সুশাসনের বিষয়টিই চলে আসছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ