ঢাকা, বৃহস্পতিবার 29 March 2018, ১৫ চৈত্র ১৪২৪, ১০ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্বৈরাচারী তকমা যে কারণে

জিবলু রহমান : [দুই]
সুচতুরভাবে আওয়ামী লীগ যাকে যেভাবে পারছে কাজে লাগাচ্ছে, ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের মামলা ও গুমের উপর রেখেই সরকার তার কৌশলে সামনের তিকে এগিয়ে চলছে। তবে জুলুম নির্যাতন এবং জনগণের ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন।
৫ জানুয়ারির দেড় বছরের মাথায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম করে ভারতে পাচার করা হয়েছে। শেখ হাসিনার লাগাতার দুই আমলে বিএনপির অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক এমপি ইলিয়াস আলী, ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক কমিশনার চৌধুরী আলম, সাবেক এমপি ও লাকসাম বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম হিরু ও হুমায়ুন কবির পারভেজ এবং ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন ও সিলেটের ছাত্রনেতা ইফতেখার আহমদ দিনারসহ বিরোধী দলের বহু নেতাকর্মীকে গায়েব করে ফেলা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন তাদেরকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে দীর্ঘদিনেও তাদের আর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। জানা যায়নি তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে। (সূত্র : দৈনিক দিনকাল ১১ মে ২০১৫)
গুম করে ফেলা এসব নেতাকর্মী ও নাগরিকদের স্বজনেরা তাদের প্রিয়জনের ফিরে আসার প্রত্যাশায় উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছেন। তারা জানেন না তাদের নিখোঁজ স্বজনেরা আটক অবস্থায় বিনা বিচারে হত্যার শিকার হয়েছেন কি না। খুনের শিকার হয়ে থাকলে সেই খুনের বিচার দূরে থাক, লাশটি পর্যন্ত তারা পাননি। জানতে পারেননি মৃত্যুর তারিখটিও। সুযোগ পাননি প্রিয়জনের লাশ দাফন, কবর জিয়ারত কিংবা মৃত্যু দিবসে দোয়া খায়ের ও মাগফিরাত কামনা করার।
বিরোধী দলই নয়, আওয়ামী লীগ নেতারাও হারিয়ে যাচ্ছেন। ২৬ মে ২০১৭। নরসিংদীর রায়পুরা থানার পুলিশ বাঁশগাড়ি ইউনিয়নে গিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের চার নেতাকে ধরে নিয়ে যেতে চায়। এলাকাবাসী জমায়েত হয়ে গতি রোধ করলে গুলি চালায় পুলিশ। নিহত হয় এক গ্রামবাসী। এলাকাবাসী আরো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে নরসিংদীর পুলিশ লাইনস থেকে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রাজনগরের সীমানে খাল এলাকা থেকে সেদিন চার নেতাকে পুলিশ শত শত মানুষের সামনে দিয়ে শেষ পর্যন্ত তুলেই নিয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে ১০ মাস ধরে নিখোঁজ হাবিবুর রহমান, রূপ মিয়া, আজিজুল হক ও জাকির হোসেন। সেদিন তাঁদের স্বজনরা থানায় গিয়েছিল, কিন্তু দেখা করতে দেওয়া হয়নি। চার নেতাকে আদালতেও পাঠানো হয়নি। এমনকি তাঁদের অনুসন্ধানে নেমে দুই স্বজনসহ চারজন গুলিতে পঙ্গু হয়েছেন। এখানেও অভিযোগ পুলিশেরই বিরুদ্ধে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের অভিযোগ, বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে আসা ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল হকের ইন্ধনে রায়পুরা থানার তৎকালীন ওসি আজাহারুল ইসলাম ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের গুম-খুন করে গেছেন এবং বর্তমান ওসি দেলোয়ার হোসেন পঙ্গু করাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু সব জেনেও নির্বিকার রয়েছেন। উল্টো এমপি সম্প্রতি এক জনসভায় বলেছেন, সহিংসতায় জড়ালে অন্যদেরও পুুলিশের পেটে যেতে হবে।
নিখোঁজ রূপ মিয়া বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি এবং বাঁশগাড়ির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দুবারের নির্বাচিত ইউপি সদস্য, মো. হাবিবুর রহমান হাবি দলের ইউনিয়ন কমিটির কার্যকরী সদস্য (দুই বারের ইউপি সদস্য), আজিজুল হক ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জাকির হোসেন বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। পরবর্তী সময়ে আরো দুই নেতা-নিলক্ষা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সদস্য, গোপীনাথপুর গ্রামের মো. সোহেল ও নিলক্ষা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মো. বজলুর রহমান নিখোঁজ হন। পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাঁদেরও আর পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন নিখোঁজ রূপ মিয়ার ভাতিজা মাইনউদ্দিন মিয়া। তিনি নরসিংদীতে সংবাদ সম্মেলনও করেন। ব্যর্থ হয়ে হতাশ মনে সৌদি আরব ফিরে যাচ্ছিলেন মাইনউদ্দিন, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায়ও পৌঁছেছিলেন তিনি। পরে তাঁকে পাওয়া যায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে।
নিখোঁজ চার ব্যক্তির পরিবারের ভাষ্য, গুমের অভিযোগ ওঠায় রায়পুরার ওসি আজাহারুল ইসলামকে বদলি করা হয়। নতুন আসা ওসি দেলোয়ার হোসেনও এমপির ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস ছাদেক ও বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজুল হকের সঙ্গে আঁতাত করে ওই ইউনিয়নের গুম হওয়ার চার নেতার পরিবার ও স্বজনদের হয়রানি এবং ভয়ভীতি দেখানো শুরু করে। রূপ মিয়ার পরিবারসহ অনেকের অভিযোগ, সিরাজুল হক ৪০ লাখ টাকা দিয়ে পুলিশকে দিয়ে এসব করিয়েছে। (সূত্র : দৈনিক কালের কন্ঠ ১৭ মার্চ ২০১৮)
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, বাংলাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নির্বিচারে আটক করা হচ্ছে। গুমের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। চলছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও। বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সংগঠনটির প্রকাশ করা বার্ষিক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ প্রকাশ করা প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নির্বিচারে আটক করা হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার অধিকার সংকুচিত হয়েছে। গুমের ঘটনা এখনো ঘটছে। গত বছর ৮০ জনের বেশি মানুষ গুমের শিকার হয়েছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকা-ও অব্যাহত রয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে।
 পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীকে সহিংসতা থেকে রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। সরকারের প্রস্তাবিত ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আরো সংকুচিত হতে পারে। তবে এসবের মধ্যে ইতিবাচক দিক হলো এক দশকের স্থির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চরম দারিদ্র্যের সংখ্যা কমাতে সহায়তা করছে। এছাড়া ৬ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নাগরিককে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছে। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন জনগণ মানেনি; আন্তর্জাতিক মহল মানতে পারে না। এখন আওয়ামী লীগের আক্রমণাত্মক কথাবার্তা এবং বাহাস নিছক বক্তৃতাবাজী বা মাঠ গরম করার কথা হিসেবে মনে করার অবকাশ নেই। তাদের কারো কথায়ই অস্পষ্টতা নেই। আওয়ামী লীগ বিরোধীপক্ষকে যে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন তা তাদের রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই দেয়া হচ্ছে। এ অবস্থান অটল থাকলে সংঘাত-সংঘর্ষ যে অনিবার্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবস্থা কবির ভাষায় বলি, ‘বর্তমান মুক্তকচ্ছ, ভবিষ্যৎ হোঁচটে ভরা’। কেউ বলছেন আমরা নব্য বাকশাল জমানায় প্রবেশ করেছি, কেউ বলছে সরকারের গায়ে গণতন্ত্রের খোলস যেটুকু আছে এটুকু উবে যেতে খুব বেশি দেরি হবে না। ঠাণ্ডা মাথায় বিরুদ্ধ মত সহ্য করা গণতান্ত্রিক রীতি। বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক রীতিনীতির খুব একটা তোয়াক্কা করছে না। সরকারের কোনো সাফল্য জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারলে বিরুদ্ধমত সহ্য করার সামান্য যা সক্ষমতা সরকারের আছে সেটি হারিয়ে ফেলতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন সংবিধান রক্ষার অজুহাতে করা হলেও সংবিধানের ৬৫ (২) ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে। নির্বাচনের পর বিগত সাড়ে ৪ বছর সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে টিকে থাকতে। তারা এতে সফল হচ্ছে। কিন্তু বিএনপি আগামী নির্বাচন কিভাবে হবে তার আলোচনায় সংলাপের দাবিতে জোড়ালো চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। মনে হচ্ছে সে সাংগঠনিক সমর্থনও তাদের নেই। বিএনপি কিছু করতে না পারলে আগামী নির্বাচনের বিদেশী প্রেসার আসবে এটা নিশ্চিত। প্রধান নির্বাচন কশিনারও এমন আভাস দিয়েছেন। ১৬ মার্চ ২০১৮ রাজশাহীর দুর্গাপুরে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে বলে মনে করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে. এম. নুরুল হুদা। তিনি বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো দলই বলেনি তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না। তাই বলাই যায়, নির্বাচনে বিএনপিসহ সব দল থাকবে।’
তিনি বলেন, সব দলের অংশগ্রহণেই নির্বাচন হবে। এ লক্ষ্যে কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় সে ক্ষেত্রেও প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। নির্বাচনে যেন কোনো প্রকার বিতর্ক না হয়, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকবে। কেউ চাইলেও আগামী নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে পারবে না। একটা সুন্দর নির্বাচন দেশবাসীকে উপহার দেওয়াটাই কমিশনের লক্ষ্য। (সূত্র : দৈনিক সমকাল ১৭ মার্চ ২০১৮)
এর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সুলতান আহমেদ মিলনায়তনে সুজনের বিভাগীয় পরিকল্পনা সভায় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ফের যদি কোনো বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন হয় তাহলে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। চরম অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে। যেটা কারো কাম্য নয়।
এমন কোনো পরিস্থিতি এড়াতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা দূরীভূত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। এর মূলে হলো নির্বাচনকালীন সরকার কী রকম হবে সেটা। এক দল বলছে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে, আরেক দল বলছে সাংবিধানিক কাঠামো সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুকূল নয়।
তিনি বলেন, এ বিতর্ক আজকের নয়, ১৯৯৬ সাল থেকে চলে আসছে। খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন হয়েছিল। তখন খালেদা জিয়ার বক্তব্য ছিল, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই, অতএব সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছিল। ২০০৬ সালে বিএনপি নিজেদের স্বার্থে সংবিধান পরিবর্তন করেছিল। যাতে তাদের পছন্দের ব্যক্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন। ২০০৭ সালে এক-এগারো আসলো। ২০১৩ সালে আবারও সংবিধান সংশোধন করা হলো। ২০১৪ সালে আরেকটা বিতর্কিত নির্বাচন হলো। ’৯৬ সালে ঐকমত্য ছিল না। ২০০৬-০৭ সালে ছিল না। ২০১৩ সালে ছিল না। এখনো নেই। এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পরিণতি অস্বাভাবিক ও অনাকাক্সিক্ষত ছিল।
তিনি বলেন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যদি আবার ঘটে তাহলে এই অস্থিতিশীলতার পরিণতিও হবে অস্বাভাবিক। নাগরিক অবস্থান থেকে করণীয় হচ্ছে যাতে আবারও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় সে লক্ষ্যে কাজ করা। অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে। অতীতে এ রকম সহিংসতা হয়নি।
তিনি বলেন, আবারো যদি কোনো বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন হয় আর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যদি অস্থিতিশীলতা দূরীভূত না হয় তাহলে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। (সূত্র : দৈনিক মানব জমিন ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ