ঢাকা, বৃহস্পতিবার 29 March 2018, ১৫ চৈত্র ১৪২৪, ১০ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অস্ট্রেলিয়ার বল টেম্পারিং লজ্জা

অরণ্য আলভী তন্ময় : বিশ্ব ক্রিকেটে এখন সবচেয়ে বেশি সমালোচিত দলের নাম অস্ট্রেলিয়া। বল টেম্পারিং কান্ডে রীতিমতো লজ্জায় পড়ে গেছে ক্রিকেট বিশ্বের মোড়ল দেশটি। দক্ষিন আফ্রিকার কেপটাউনে বল টেম্পারিংয়ের ঘটনায় বইয়ে গেছে ঝড়। যে ঝড়ের কবলে পড়ে এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা এবং শতভাগ ম্যাচ ফি জরিমানার সাজা শুনেছেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ। আর ঘটনার মূল হোতা ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে ম্যাচ ফির শতকরা ৭৫ ভাগ জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি পেয়েছেন তিনটি ডিমেরিট পয়েন্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তৃতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলার সময় টিভিতে দেখা যায়, হলুদ রঙের একটা কিছু ব্যানক্রফটের হাতে। সেটা দিয়ে বল বিকৃতি করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তিনি। এটা যে তিনি গোপনে করছেন, সেটা আরো পরিষ্কার হয় যখন তিনি ওই হলুদ জিনিসটি ট্রাউজারের ভেতর লুকিয়ে ফেলেন। অবশ্য এমন ঘটনার পর বল পাল্টাননি আম্পায়াররা। এমনকি ৫ রান জরিমানাও করেননি। তবে ওই লজ্জাকর ঘটনার সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করে রোববার অধিনায়কত্ব ছাড়েন স্মিথ, দায়িত্ব ছাড়েন সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারও। এতে টেস্টের বাকি সময় দলের নেতৃত্ব দেয়ার ভার পড়েছে টিম পেইনের ওপর। তবে পদত্যাগ করেও রক্ষা পেলেন না স্মিথ। অজি দলপতিকে এক টেস্টে নিষিদ্ধ হতে হলো তাকে। জরিমানার বিষয়টি নিশ্চিত করে আইসিসি তাদের বিবৃতিতে জানায়, ‘ক্রিকেটের স্পিরিটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আচরণ করেছে অস্ট্রেলিয়ান দল এবং ম্যাচের শুদ্ধতায় বড় আঘাত এটা। অধিনায়ক হিসেবে স্টিভ স্মিথকে অবশ্যই তার খেলোয়াড়ের এই কর্মকান্ডের দায় নিতে হবে এবং তাকে নিষিদ্ধ করাই শ্রেয়।’ যদিও এখন কি আছে স্মিথের ভাগ্যে সেটা বলা যাচ্ছেনা।
কি আছে স্টিভেন স্মিথের ভাগ্যে : এক ম্যাচ নিষিদ্ধ হওয়ার পরও নিষ্কৃতি মিলছে না অজি অধিনায় স্টিভেন স্মিথের। তার সাথে পদ ছাড়তে হয়েছে সহ অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারের। কোচ হিসেবে ডারেন লেহম্যানকেও খুব দ্রুত পদত্যাগ করতে হচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কি আছে স্মিথের ভাগ্যে সেটাই পরিস্কার হচ্ছেনা। কারণ আইসিসি’র বর্তমান সভাপতি পাকিস্তানের জহির আব্বাস এক ম্যাচ নিষেধজ্ঞার শাস্তিতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। বল টেম্পারিংয়ের দায়টা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন স্টিভেন স্মিথ। সুতরাং তাকে ‘খলনায়ক’ বলাতে বাড়াবাড়ি কিছু নেই। ক্রিকেটে ইতোপূর্বে যত কলঙ্কিত ঘটনা ঘটেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণত অপরাধী অপরাধ অস্বীকার করেছেন। পরে হয়ত অনেক কিছু বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু কেপটাউন টেস্টে সতীর্থ ক্যামেরন ব্যানক্রফটের সিরীষ কাগজ দিয়ে বল টেম্পারিংয়ের বিষয়টি অধিনায়ক প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, বলেছেন ড্রেসিং রুমের অনেকেই তা জানতেন! ক্ষমা চেয়ে অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে তাই সময় নেননি। আইসিসি তাকে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছে। তবে এতেই রক্ষা হচ্ছে না। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে (সিএ) উদ্ধৃত করে সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, আজীবন নিষিদ্ধ হতে পারেন সময়ের তুখোড় এই ব্যাটসম্যান! ওদিকে অসিদের মান বাঁচাতে অবসর ভেঙ্গে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক! অস্ট্রেলিয়ার মতো কুলীন ও আভিজাত্যপূর্ণ ক্রিকেট পরাশক্তির কপালে কলঙ্কের কালি লেপে দিয়েছেন স্টিভেন স্মিথ-ডেভিড ওয়ার্নাররা। বল টেম্পারিংয়ের মতো ঘৃণ্য কাজ করেও সংবাদ সম্মেলনে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক স্মিথ নির্লিপ্ত কণ্ঠেই বলেন, এটা তারা দলীয়ভাবে পরিকল্পনা করেই করেছেন! পুরো ক্রিকেট দুনিয়া অস্ট্রেলিয়ার এমন কাে হতবাক। নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে অসিদের ওপর দিয়ে। সাবেক তারকাদের সমালোচনার তীর ছুটে যাচ্ছে বর্তমান দলটার দিকে। ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসি অবশ্য তেমন কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করেনি। স্মিথকে এক টেস্টের জন্য নিষিদ্ধ করেই তারা ক্ষান্ত দিয়েছে। তবে এবার আসল দায়িত্ব পালন করতে হবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে (সিএ)। সেই আসল দায়িত্বটা পালন করতে গিয়ে কিন্তু বেশ কঠোরই হতে যাচ্ছে সিএ। খবরটা দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গেছে। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ ভেঙ্গে সর্বোচ্চ শাস্তি আজীবন নিষেধাজ্ঞায়ও পড়তে হতে পারে স্মিথ-ওয়ার্নারকে। সদ্য সমাপ্ত কেপটাউন টেস্টের তৃতীয় দিনে বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটায় অস্ট্রেলিয়া। এখন সবকিছু দেখার জন্য সময়ের অপেক্ষাই করতে হচ্ছে।
টেস্টে আলোচিত যত বল টেম্পারিং : বল টেম্পারিং ক্রিকেটে মোটেও নতুন কোন বিষয় নয়। ছোট করে বললে টেস্ট ক্রিকেটে এই ঘটনা বেশি ঘটতে দেখা যায়। তবে ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটে এটিকে দেখা হয় বড় অপরাধ হিসেবে। কেপটাউন টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান ক্যামেরন ব্যানক্রফটের বল টেম্পারিংয়ের ঘটনা নিয়ে ক্রিকেট বিশ্ব তোলপাড়। মাঠে আম্পায়ারদের কাছে বিষয়টা অস্বীকার করলেও ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছেন। ক্যামেরন যে এমনটি করবেন সেটা আগে থেকেই জানতেন অধিনায়ক সিটেভেন স্মিথ। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটা আগেই নেওয়া হয়েছিল। শুধু অস্ট্রেলিয়ায়ই নয়, এমন ঘটনায় নিন্দার ঝড় বইছে বিশ্বময়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্বনুল বলেছেন, ‘এটা প্রচ- হতাশাজনক’। তার সুপারিশেই সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারকে নিয়ে পদত্যাগ করেছেন অধিনায়ক স্মিথ। আর বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি এরই মধ্যে স্মিথকে এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞাসহ ম্যাচ ফি’র শতভাগ এবং চারটি ডিমিরিট পয়েন্ট জরিমানা করেছে। আর ব্যানক্রফটকে করা হয়েছে ম্যাচের ২৫ শতাংশ জরিমানা। টেস্টে ফল নিজেদের দিকে ধাবিত করতে টেম্পারিংয়ের সহায়তা নিয়েছে অনেকেই। তবে এটিই কি হতে যাচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে জঘন্য বল টেম্পারিংয়ের ঘটনা? চলুন ঘেঁটে দেখে নেয়া যাক ইতিহাস কি বলে-
মাইক আথারটন (ইংল্যান্ড-দ.আফ্রিকা) ১৯৯৪, লর্ডস
১৯৯৪ সালে সংবাদ পত্রের শিরোনাম হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক মাইক আথারটন। তবে অসাধারণ কিছু করে নয়, বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে। সেবার লর্ডসে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড। আথারটনের বিরুদ্ধে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়। সেই অভিযোগের বিষয়ে আথারটন বলেছিলেন যে তিনি তার পকেটে ধুলো রেখেছিলেন যাতে সেটা দিয়ে তার হাত শুকনো রাখা যায়। তারপরও ২ হাজার পাউন্ড জরিমানা হয়েছিল তার।
শচীন টেন্ডুলকার (ভারত-দ.আফ্রিকা) পোর্ট এলিজাবেথ, ২০০১
বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে সেবার শচীন টেন্ডুলকারকে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পোর্ট এলিজাবেথে সেবার মুখোমুখি হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারত। দ্বিতীয় টেস্টের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় শচীন বল টেম্পারিং করার চেষ্টা করছেন। পরে শচীন বলেছিলেন যে তিনি বলের গায়ে লেগে থাকা ঘাস পরিস্কার করেছেন। কিন্তু আইসিসি তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এই বলে যে আম্পায়ারের অনুমতি না নিয়ে তিনি কেন বল পরিস্কার করেছেন। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাকে ইংলিশ ম্যাচ রেফারি মাইক ডেনিস এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেন। শচীনকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় তৃতীয় টেস্টে মাইক ডেনিসকে আর ম্যাচ রেফারি হিসেবে না রাখার আর্জি জানাায় ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (বিসিসিআই)। সে অনুসারে আইসিসি পরের টেস্টে তাকে ম্যাচ রেফারি হিসেবে রাখেনি।
পাকিস্তান (পাকিস্তান-ইংল্যান্ড) ওভাল, ২০০৬
সেবার ওভালে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও পাকিস্তান। ম্যাচের এক পর্যায়ে আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার ও বিলি ডক্ট্রোভ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ আনেন। পাশাপাশি সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ইংল্যান্ডকে  ৫টি পেনাল্টি রান উপহার দেন। এই ঘটনায় মধ্যাহ্ন বিরতির পর পাকিস্তান মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানায়। তাতে ম্যাচটি বাজেয়াপ্ত হয়। যা ছিল ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাজেয়াপ্ত হওয়া ম্যাচ। পরে অধিনায়ক ইনজামাম-উল-হক বল টেম্পারিং করার বিষয়টি আইসিসি’র ট্রাইব্যুনালে পরিস্কার করেন। তারপরও তাকে চার ম্যাচ নিষিদ্ধ করা হয়। কারণ, তিনি খেলতে কেন অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে ওই ম্যাচটি প্রথমে ড্র ঘোষণা করা হলেও পরবর্তীতে ইংল্যান্ডকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
ফাফ ডু প্লেসিস (দ.আফ্রিকা-পাকিস্তান) দুবাই, ২০১৩
২০১৩ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে দুবাই টেস্টে একটি বিদেশি বস্তু দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ফাফ ডু পেসিসকে বল ঘষতে দেখা যায়। সেই বস্তুটি তিনি ট্রাউজারের পকেটের জিপের সঙ্গে রেখেছিলেন। বল টেম্পারিং করার অভিযোগে তাকে ম্যাচ ফির ৫০ শতাংশ জরিমানা করা হয়। ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার ভারনন ফিলান্ডার আঙ্গুল দিয়ে বল টেম্পারিং করে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন।
ফাফ ডু প্লেসিস (দ.আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া) হোবার্ট, ২০১৬
২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বল টেম্পারিংয়ের চেষ্টা করেন ফাফ ডু পেসিস। অবশ্য অস্ট্রেলিয়া তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেনি। কিন্তু ভিডিও ফুজেট বিশেষণ করার পর তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। তার ম্যাচ ফি এর শতভাগ জরিমানা করা হয়। অবশ্য ঐ ম্যাচে সেঞ্চুরির কারণে জরিমানা দিয়েই সেবারের মত নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে রেহাই পান ডু পেসিস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ