ঢাকা, শুক্রবার 30 March 2018, ১৬ চৈত্র ১৪২৪, ১১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্বাধীনতার কবিতা কবিতায় স্বাধীনতা

মোহাম্মদ সফিউল হক : আসমানের তারা সাক্ষী/সাক্ষী এই জমিনের ফুল,এই/ নিশিরাইত বাঁশবাগান বিস্তর জোনাকি সাক্ষী/সাক্ষী এই জারুল, জামরুল/ সাক্ষী পুবের পুকুর আর ঝাঁকড়া ডুমুরের ডালে স্থির দৃষ্টি/মাছরাঙা আমাকে চেনে/আমি কোনো অভ্যাগত নই/খোদার কসম আমি ভিনদেশী পথিক নই/আমি কোনো আগন্তুক নই।”- [আমি কোনো আগন্তুক নই /আহসান হাবীব] কিংবা যেখানে মানুষ থাকে, থাকবেই জঞ্জাল, দুর্গন্ধ,/কিছু বিশৃংখলা, হই হুল্লোড়, কী এমন হল তাতে?/অনেক গোয়াল, আস্তাবল, এমনকি শুয়োরের খোয়াড়ও এর চেয়ে ভালো।” [মানুষ যায় না ঘর ছেড়ে/ আবুল হোসেন] । কবি আহসান হাবীব ও কবি আবুল হোসেনের এই অবস্থান ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে প্রত্যয়, তা আমাদের নিজস্ব শক্তি। এ শক্তিই শিল্প-সাহিত্যকে বারবার স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। স্বাধীনতার স্পৃহা বাঙালির মনে বহুকাল থেকে লালিত হয়ে আসছে। মোঘল-পাঠান থেকে ইংরেজ এবং তারপর পাকিস্থানী পরশক্তির হাতে বাঙালির ভৌগোলিক স্বাধীনতা নানাভাবে অবরুদ্ধ ছিলো। বাঙালি কবির সৃষ্টিতে তাই এই স্বাধীনতার স্পৃহা বিভিন্ন মাত্রায় উঠে আসে। উনিশ শতকে আধুনিক কাব্যধারার প্রথম থেকেই ভৌগোলিক স্বাধীনতার কথা কবিতায় এসেছে। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ইংরেজ উপনিবেশে বসবাস করেও লিখেছেন মাতৃভূমির স্তুতিমূলক কবিতা- ুজান না কি জীব তুমি, জননী জন্মভূমি/যে তোমারে হৃদয়ে রেখেছে।/থাকিয়া মায়ের কোলে, সন্তানে জননী ভোলে/কে কোথায় এমন দেখেছে।” [স্বদেশ/ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত] কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতাতেই সম্ভবত স্বাধীনতার জন্যে স্পষ্ট, তীব্র ও আবেগমথিত আকুতি প্রথম প্রকাশিত হয়। তাঁর রচিত ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়’- পংক্তি আজও উদ্ধৃতিযোগ্য। বাঙালির ইতিহাসে হাজার বছরের একটি টার্নিং পয়েন্ট হল ১৯৭১ সাল। বাঙ্গালী জাতির কিংবদন্তীতুল্য দেশপ্রেম, অবিরাম সংগ্রাম এবং সংহত শক্তির প্রতীক এই একাত্তর । অগণিত মানুষের প্রাণের বিনিময়ে পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত হয় এদেশ। পৃথিবীর মানচিত্রে গ্রোথিত হয় লাল সবুজের বাংলাদেশ। আমরা পাই একটি পতাকা, একটি জাতি এবং একটি ভূখন্ড যার অবস্থান এশিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান জুড়ে। আমাদের একাত্তরের বিষয়টি প্রবলভাবে রাজনৈতিক হলেও এর সাংস্কৃতিক চরিত্র আছে। বাঙালির সব সংগ্রামে ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উপাদান প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা ও স্তরের মতো কবিতাও সর্বদা সতর্ক থেকেছে প্রহরীর ভূমিকায়। সেজন্যই আমরা দেখতে ২৬ মার্চ সকাল থেকেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সব্যসাচীর কণ্ঠে নজরুলের কবিতার আবৃত্তি প্রচারিত হচ্ছিল, *আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে, মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে, মোর টগবগিয়ে খুন হাসে।” যা মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছিলো। সে সময়কার কবিদের কাছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাই দেখা যায়, কবিতায় রাজনৈতিক চেতনার মধ্যে মুক্তিকামী মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন রূপায়িত করার প্রয়াস ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে কবি শামসুর রাহমান 'তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ কবিতায় স্বাধীনতার জন্য পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলেছেন। তাই তিনি উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন-তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা/তোমাকে পাওয়ার জন্য/আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?/নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক,/এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা”। স্বাধীনতার জন্য আকুল অপেক্ষা, প্রজন্মপ্রহর আর অর্থনৈতিক স্থিতি-অস্থিতির কালযাপনের ক্লান্তি শামসুর রাহমান অনুভব করেন ‘শূন্য থালা হাতে’ ‘পথের ধারে’ বসে-থাকা ‘হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী’র উপলব্ধির গাঢ়তায়। কবি বাঙালি জাতির মনন-চেতনকে আঁকছেন এভাবে : ুতোমার জন্যে,/সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ন কৃষক,/কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,/মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,/গাজী গাজী বলে যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে/ রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস/এখন পোকার দখলে/আর রাইফেল কাঁধে বনে-জঙ্গলে ঘুরে-বেড়ানো/সেই তেজী তরুণ যার পদভারে/একটি নতুন পৃথিবী জন্ম হ’তে চলেছে-/ সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।” এ ছাড়াও কবি ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় স্বাধীনতাকে নানা রূপে রূপায়িত করার প্রয়াস ঘটিয়েছেন। যেখানে রবীন্দ্র, নজরুল থেকে শুরু করে কৃষক, গ্রাম্য মেয়ে, তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থী, মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন, বোনের হাতের মেহেদির রং, গৃহিণীর কালো চুল, বন্ধুর হাতের রাঙা পোস্টার, খোকার রঙিন কোর্তা এবং খুকির তুলতুলে গালে রৌদ্রের খেলা প্রভৃতির মাধ্যমে স্বাধীনতাকে অনুভব করেছেন। তিনি লেখেন- স্বাধীনতা তুমি/বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর/শানিত কথার ঝলসানি-লাগা সতেজ ভাষণ।/স্বাধীনতা তুমি/চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ। ... স্বাধীনতা তুমি/গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,/হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।/স্বাধীনতা তুমি/ খোকার গায়ে রঙিন কোর্তা,/ খুকীর অমন তুলতুলে গালে/রৌদ্রের খেলা।” কবি হাসান হাফিজুর রহমান একজন রাজনীতিসচেতন মানুষ ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম একুশের কবিতার সংকলন তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় যা এখনো মাইলস্টোন হিসেবে খ্যাত। কবি হাসান হাফিজুর রহমান তার ‘এখন সকল শব্দই’ কবিতায় স্বাধীনতাকে নিঃশ্বাসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। স্বাধীনতা কোনো বাজারের পণ্য নয় যে যখন খুশি বেচা-কেনা করা যা। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তার ‘মানুষের স্বাধীনতা’ কবিতায় মানুষের সেই স্বাধীনতা ব্যক্ত করেছেন এভাবে- মানুষের স্বাধীনতা/পশুপাখি জলাশয়/শস্যের চারা কিশলয়/পণ্যদ্রব্য নয়/যা কিনা আত্মস্বার্থে/অনায়াসে বেচা-কিনা যায়”। স্বাধীনতার অমিততেজা ও শক্তিটানে মানুষ মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করতে দ্বিধাবোধ করেনি। কবি দিলওয়ার স্বাধীনতার কাছে সমর্পিত হয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন এভাবে- *সেই স্বাধীনতা তুমি, আকাশ পাতাল যার নামে/প্রচন্ড আনন্দে দোলে, আমাকে দোলাও প্রিয় সাথী/তোমার সম্মান রাখো নয়তো কামনা আত্মঘাতী/আঁধারে হানবে ছুরি যে বুক তোমারি পরিণামে”। এ ছাড়াও স্বাধীনতা নামক যে সূর্য বাঙালির প্রাণে সবার আলো হয়ে ফুটে উঠবার প্রত্যয় সূচিত করেছিল তাকে সহস্র অন্ধকার রাতের গাঢ়তায় পথরোধ করতে পারেনি। কবি দিলওয়ার তাই স্বাধীনতার সোনালি সম্ভাবনাকে উচ্চারণ করেছিলেন- *ঐ দেখো স্বাধীনতা জ্বলছে/স্বাধীনতা চৈতালী সূর্য/বিরুদ্ধ আকাশে রয়েছে/জনগণ! কই রণতূর্য/আর নয় মৌখিক উক্তি/আমি তোমারি যে প্রাণ সূর্য/শেষেবার চাই আজ মুক্তি”। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের পর সত্তরের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বাঙালির মানবিক মূল্যবোধের বিপর্যয় ঘটে। নিজ ভূমিতে থেকে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার অনেকটা প্রকট হয়ে দেখা দেয়। এত কিছুর মাঝে থেকেও কবি নির্মলেন্দু গুণ মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও স্বদেশের স্বাধীনতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন এবং প্রতিটি মানুষের জীবনে তার নিজের যে অধিকার তা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আহ্বান করেছেন সুন্দর কিছু প্রতীকের বর্ণনায়থ ুআমি দৃশ্যে-গন্ধে-রক্তে-স্পর্শে-গানে/সুন্দরের অবয়ব পেতে চাই/মধ্যরাত্রির স্বপ্নের মতো মাধবী কে চাঁদ দেবো, নীলিমাকে দেবো নীল আকাশ/আমাকে ফিরিয়ে দাও জীবনের সামান্য অধিকার”।এ ছাড়াও নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতাকে জননীর নাভিমূল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা উলঙ্গ শিশুরূপে দেখেছেন। একটি দেশের স্বাধীনতা যখন বস্ত্রহীন তখন কে না চায় ওই বস্ত্রহীন শিশুটি তার শরীরে পোশাক পরুক। কবির এই যে স্বাধীনতাকে উলঙ্গ সন্তানের মতো পোশাক পরিয়ে দেয়ার মতো সুন্দর উপমায় রূপায়িত করা তা অতুলনীয়। তা ছাড়া উলঙ্গতা কোনো স্বাধীনতা নয় এজন্য বাঙালির স্বাধীনতা যেন দীর্ঘজীবী হয় সেই স্বপ্নে বেঁচে থেকে নিজের তথা স্বদেশের অস্তিত্বের সন্ধান করেছেন- ুজননীর নাভীমূল ক্ষতচিহ্ন রেখে/যে তুমি উলঙ্গ শিশু রাজপথে বেরিয়ে এসেছো/হে আমার দুঃখ স্বাধীনতা তুমি পোষাক পরো/স্বাধীনতা তুমি দীর্ঘজীবী হও, বেঁচে থাকো/আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে”। বিশ্বে ছড়িয়ে যাওয়া স্বাধীনতার পটভূমি সেই সময়ে বিশ্বে মানবিক বোধকে যথেষ্ট পরিমাণে নাড়া দেয়। যদিও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিবেক মানবিক মূল্যবোধ সে সময় ছিল অনেকটা অন্ধ। তখন ইয়াহিয়ার জল্লাদপনা বাঙালির মুক্তির স্বপ্নকে ব্যর্থ করার অপচেষ্টায় এক নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। কবি আসাদ চৌধুরী এজন্য বেদনাহত হৃদয়ে বিশ্ব মানবিক চেতনাকে জাগ্রত করার জন্য তার 'বারবারা বিডলারকে' কবিতায় সেই চিত্র অঙ্কিত করার প্রয়াস ঘটিয়েছেন- আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে বারবারা/তোমাদের কাগজে নিশ্চয় ইয়াহিয়া খাঁর ছবি ছাপা হয়/বিবেকের বোতামগুলো খুলে হৃদয় দিয়ে দেখো/ওটা একটা জল্লাদের ছবি/সাত কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের ফুলকে সে/বুট জুতোয় থেঁতলে দেয়”। স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্য আর কত দাম দিতে হবে সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য উদ্বিগ্ন ছিল হাজারো বাঙালি। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে করতে মানুষ যখন ক্লান্ত এই ক্লান্তের মাঝে যে ক্ষোভ স্বাধীনতার প্রতি এবং শত্রুরা যে গুলিতে গুলিতে ঝাঁজরা করেছে মুখ, উৎপাটিত করেছে চোখ এসব কর্মকান্ড অতিষ্ঠ হয়ে কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ তার ‘স্বাধীনতা ওগো স্বাধীনতা’ কবিতায় সে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন- *ক্লান্ত, দারুণ ক্লান্ত আমি/আরো কতবার মরব স্বাধীনতা/ওগো স্বাধীনতা, তোমার জন্য গুলিতে গুলিতে জর্জরিত/আমার মুখ/উৎপাটিত আমার চোখ এবং একটি একটি করে/তূর্যে নিয়েছে/আর কতদাম দিতে হবে বল? বল বল/দাও দাও/দাও তোমার উত্তর”। কবি সিকদার আমিনুল হক তার 'কোন এক দগ্ধ দিনে' কবিতায় স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য গেরিলার অবয়ব ধারণ করে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেঁচে ছিলেন এবং দুঃসময়ে স্বাধীনতাকে পাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন সেই অভিব্যক্তিও প্রকাশ পায়- “স্বাধীনতা আমি তোমার জন্য/গেরিলা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছি/স্বাধীনতার দুঃসময়ে তোমাকে চাই”। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সময় অস্থিরতা আর সংকটে কেটেছে বাঙালির জনজীবন। বীভৎস সেই বর্বরতা আর পৈশাচিক মৃত্যুলীলা যেন বাস্তব অভিজ্ঞতায় অঙ্কিত করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার সুগন্ধ খুঁজে পেয়েছিলেন কবি জাহিদ হায়দার। সে প্রেক্ষাপট নির্মাণ করেছিলেন এভাবে- “বাংলাদেশ তুমি হেঁটে যাচ্ছো নগ্ন পায়ে/তোমার ভায়ের-বোনের রক্তের ছাপ বিক্ষত মাটির মতো/সমস্ত জন্মের সমর্পিত উৎসব”। স্বাধীনতার আলোকোজ্জ্বল দ্যুতি এতই প্রখর যে, অন্ধকার তাকে ফাঁকি দিয়ে দ্যুতির প্রভাকে সামান্যতম ম্লান করতে পারে না। স্বাধীনতা যেন সকালের সূর্যের মতোন রক্তিম লাল যার দীপ্তি অপ্রতিরোধ্য। মুক্তিকামী মানুষের সে দৃঢ়তা ও মনোবল স্বাধীনতার জন্য তা ব্যক্ত হয় কবি কাজী রোজীর ‘১৯৭১’ কবিতায়- “কাগজের বিছানায় আরো কত সংগ্রামী মানুষ/ওদের হৃদয় জুড়ে শুধু স্বাধীনতা/পাঁচিল টপকে বুঝি ছিনিয়ে আনছে ওরা/সূর্য সিঁদুর রং, স্বাধীন বাংলাদেশ”। স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ,মুক্তিযুদ্ধের সময়কে কেন্দ্র করে বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ও শান্তি-সুখের ভবিষ্যৎ নিয়েও কবিতা লিখেছেন অনেক কবি।স্বদেশের এই স্বাধীনতা মানুষের সার্বিক মুক্তির সঙ্গে একাকার হয়ে আছে কবিতায়। এদের মধ্যে অন্যতম সত্তর দশকের কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নষ্টামি, আর যাবতীয় প্রতারণা-প্রবণতার বিরুদ্ধে তার কবিতা ছিল সক্রিয়। কবি একাত্তরের স্বাধীনতার স্বাদ ও মর্যাদাকে বিপর্যস্ত হতে দেখেছেন। সেই পুরনো শুকুনেরা পুনরায় জাতিসত্তাকে খামছে ছিড়ে ফেলতে শুরু করেছে- তা তিনি অনুভব করেন নিজস্ব বোধে। তাই রুদ্র লেখেন- *আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই। আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি/ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে।... ‘রক্তের কাফনে মোড়া কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে,/ সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা/স্বাধীনতা সে আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন/স্বাধীনতা সে আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল/ ধর্ষিতা বোনের শাড়ি এ আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।” (রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ/বাতাসে লাশের গন্ধ) । কবি রফিক আজাদের ‘নেবে স্বাধীনতা’, কবি খালেদা এদিব চৌধুরীর ‘চিরকাল স্বাধীনতা, স্বাধীনতা কোমল পাথর’, কবি হায়াৎ সাইফের ‘স্বাধীনতা’, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘প্রিয় স্বাধীনতা’, কবি মাহবুব হাসানের ‘বিজয় আমার স্বাধীনতা’, কবি আনওয়ার আহমেদের 'স্বাধীনতা নিরেট গদ্য', কবি কামাল চৌধুরীর ‘সেই মুখখানি স্বাধীনতাপ্রিয় ছিল', কবি মিনার মনসুরের ‘প্রিয় স্বাধীনতা', কবি আলী জহিরের ‘স্বাধীনতার অমর জ্যোতি’, কবি জাহিদ মোস্তফার ‘স্বাধীনতা প্রাণের অধিক’, কবি গোলাম কিবরিয়া পিনুর ‘এই স্বাধীনতা’ ইত্যাদি কবিতাগুলো মূলত স্বাধীনতা ও দেশ নিয়ে লেখা কবিতা। বর্তমান সময়ের অনেক নবীন ও প্রবীণ কবিরও অনেক কবিতা রয়েছে স্বাধীনতা নিয়ে। প্রার্থিত স্বাধীনতাকে একেকজন কবি একেক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন কিন্তু এখানে সর্বত্রই স্বদেশপ্রেমের তপ্ত আবেগ পরিস্ফুটিত। একাত্তরের স্বাধীনতা অর্জনের মতো এ ভূখ-ের মানুষকে আর কোনো ঘটনায় এতবেশি রক্ত দিতে হয়নি। এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার জন্য কবিতায় যে উদাত্ত আহ্বান তা চিরকালীন। *মর্মে মর্মে মানুষের স্বাধীনতা একটি বোধের উন্মোচন;/চেতনা বিকাশে সত্তার নব জাগরণ, চির শাশ্বত অম্লান” । কবি বেলাল চৌধুরীর 'কবিতার পংক্তির মতোই স্বাধীনতা মানুষের একটি বোধের উন্মোচন। এ বোধ মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে জাগরিত করে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে অবদান রাখতে সাহায্য করে। এ বোধ, এ চেতনাকে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের কাঙ্খিত সোনার বাংলা গড়ে তুলবো। তৃতীয় বিশ্বে কবিতাই সাহসের সঙ্গে সংগ্রাম করে যাক মারণাস্ত্র নিয়ে স্বাধীনতার জন্য এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ