ঢাকা, শুক্রবার 30 March 2018, ১৬ চৈত্র ১৪২৪, ১১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পাগল 

মোহাম্মদ লিয়াকত আলী : আবুলের ছোট মামা আব্দুল হাই, ঢের টাকা আছে তার শিক্ষাটা নাই। নৈতিকভাবে দেওলিয়া লোকের হাতে বেশি টাকা থাকলে যা হয়, আব্দুল হাই তাই। 

আব্দুল হাই চড়ে দামি গাড়ি। বাড়ি ভরা ফার্নিচার, ক্রোকারিজ, রুমে রুমে এয়ার কুলার, ফ্রিজ-টিভি, ওয়াশিং মেশিন। ফ্রিজ ভরা মাছ- গোস্ত, ফল-ফ্রুট, ড্রিংস। তবু মনে শান্তি নাই, আরো চাই, আরো চাই। 

আবুলের বড় ভাই, আব্দুল জব্বার, টাকাকড়ি বেশি নাই, মন খুব উদার। ঘরে কিছু নাই, তবু আফসোস নাই। নড়বড়ে খাটে হোগলা-চাটাই। তাতে শোয়েই রাত কাটায়। গালভরা হাসি মুখে চাল-ভাজা মুড়ি। হাসি-খুশি-কৌতুকে নেই তার জুরি। নুনভাতে দিন যায়, তবু মনে ক্ষোভ নাই। 

লোকে বলে অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়। অভাগার গরু মরে, ভাগ্যবানের বউ মরে। কঠিন বাক্যের সহজ অর্থ, গরীবের সংসারে বউ এর চেয়ে গরুর দাম বেশি। পুরান বউ মরলে নতুন বউ ঘরে আনা কোন কঠিন কাজ নয়। গরু মরলে আবার গরু কেনা অত সোজা নয়। গরুর দাম লাখ টাকা। গোস্তের কেজি পাঁচশ’ টাকা, দুধ আশি টাকা লিটার। 

একজন বুড়ি সংসারে যে কত দরকারী, বুড়ি মরলে সবাই টের পায়। আব্দুল জব্বারের স্ত্রী বয়সে বুড়ি হলেও এখনো গায়ে জোর আছে। ঘর মোছা, কাপড় কাচা, বাসন মাজা, রান্না-বান্না সব করে নিজ হাতে। নিন্দুকেরা বলে, চাল নাই চুলা নাই, পোলাপানের অভাব নাই। বছর না যেতেই নতুন মুখের আগমন। বাড়িতো নয়, যেন  পোলট্রি ফার্ম অব হিউম্যান রিসোর্স। 

বউটা যেন মাশাআল্লাহ্ ডেইরি ফার্ম অব অস্ট্রেলিয়ান কাউ। বাচ্চাদের এক্সট্রা বেবী ফুড লাগেই না। সবাই কাজ করে খায়। শহরে চাকরির অভাব থাকলে ও কাজের অভাব নাই। রিক্সা ভ্যানে তরকারী আর অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি ভরে মাছ ফেরী করে সংসার চালানো যায় অল্প পুঁজিতে। জুতা জোড়া পলিশ করলেই দশ টাকা। বিল্ডিং কন্সট্রাকশনের ইট বালু রড সিমেন্ট টানলেও দিনে পাঁচশ’ টাকা। 

গরু ছাগল হাস মুরগীর খামারে অনেক পুঁজির দরকার। পোলট্রি ফার্ম অব হিউম্যান রিসোর্সের জন্য পুঁজি লাগে না। উর্বর জমির অভাব থাকলেও দেশে ফারটাইল লেডির অভাব নাই। শরীয়তে চার বিবি হালাল। গ্রো মোর চাইল্ড স্লোগান  বাস্তবায়নে কোন সমস্যা নাই। বীজ পড়লেই চাড়া, সার ছাড়াই মোটা তাজা। 

সমস্যা শুধু শিক্ষিত লোকদের। শিক্ষিতরাই বেকার হয়। যেহেতু এ সব কাজ করতে তারা লজ্জা পায়। ক্ষুধা দারিদ্র নিবারনের জন্য শিক্ষার হার না বাড়িয়ে অশিক্ষিতের হার বাড়ানো জরুরী । চাকরির জন্য না ঘুরে, খেটে খেতে পারবে যারা, তাদের সংখ্যা বাড়লে ক্ষতি নেই। অশিক্ষিতরাই জাতির মেরুদ-। আব্দুল জব্বার তা প্রমান করেছে।   

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- ‘আল কাছিবু হাবিবুল্লাহ’ খেটে খাওয়া মানুষ আল্লাহ্র বন্ধু। অশিক্ষিতরাই খাটতে পারে। 

আব্দুল হাই এর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা, পকেটে এটিএম ও ক্রেডিট কার্ড। নো চিন্তা ডু ফূর্তি। বারে যেয়ে পান করে, ক্লাবে যেয়ে ফান করে। আতুর-লুলা হাত পাতলে, দু’-একটাকা দান করে। 

হুজুরের মুখে দানের ফজিলত শুনেছে, এক পয়সা দান করলে সত্তুর নেকি। একটি নেকির ওজন ওহুদ পাহাড়ের সমান। সারা জীবন যত টাকা দান করেছে, তাকে একশ’ দিয়ে গুণ করলে পয়সার হিসাব পাওয়া যায়। ওহুদ পাহাড়ের ওজন কত কোটি টন, তার হিসাব কোন বই-পুস্তকে নেই। থাকলে ও দান করা পয়সার সাথে গুণ করার মত ক্যালকুলেটর এখনো তৈরী হয়নি। 

 

আল্লাহ্ নাকি মাপবে দাঁড়ি পাল্লায়। আল্লাহ্র পাল্লার সাইজ নিয়া চিন্তা করার মতো অত বড় মাথাও নেই। দুনিয়াতে কখন ও ঠেকে থাকে নাই, আব্দুল হাই পরকালেও ঠেকবে না।  

ছোটকালে শোনা প্রবাদ “হাতি মরলেও লাখ টাকা”। তখনকার লাখ টাকা এখনকার কোটি টাকা। মরা হাতি বেচে কেউ টাকা পেয়েছে,  এমন কথা কেউ কখনো শোনেনি। হাতি, ঘোড়া, গরু, ছাগল, হাস-মুরগী মরে গেলে সবার পরিণতি একই। 

মানুষের ব্যাপারটা একটু আলাদা। মরার পরও শেষবারের  মতো মুখ দেখতে চায় আত্মীয়-স্বজন বন্ধু বান্দব। তাই বিদেশে মারা গেলে লাখ লাখ টাকা খরচ করে ডেডবডি দেশে আনে ।  

আব্দুল জব্বার অল্প শিক্ষিত হলেও একজন চিন্তাশীল মানুষ। চিন্তা করার জন্য চিন্তাবিদ হওয়ার দরকার  নেই। 

আব্দুল জব্বার চিন্তা করে কোন কুল কিনারা পাচ্ছেন না। আল-কোরানে আছে যাদের চোখ আছে কিন্তু দেখেনা, কান আছে অথচ শোনে না, অন্তর আছে, তবু ভাবে না তারা পশুর চেয়ে অধম, এরা কারা ? এরা কি আব্দুল হাই এর  মতো গন্য-মান্য মানুষ ? নাকি তার  মতো ছাপোষা গো- বেচারা? যারা অন্ধ  তারাই নাকি এখন বেশী দেখে। তবে কি অন্ধের বেশী  দেখার  মতো পাগলরাও বেশী ভাবে? 

বাড়ির পাশে বাস করে হামিদুল্লাহ। সে এলাকায় পাগলা বলে পরিচিত। ভদ্র ভাষায় বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। আসলে লোকটা এলকায় কিছু ঘটলেই পাগলের  মতো ছুটে যায়। না পারলেও কিছু করার চেষ্টা করে। 

পাগলরাও মানুষ। মানুষকে আল্লাহপাক সম্মানিত করেছেন। 

কানা, লুলা, বোবা, বয়রা, পাগলÑ কথাগুলো মোটেই সম্মানজনক নয়। তাই বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্রতিবন্ধী নামে সম্মানিত করার চেষ্টা মন্দ না।  কিন্তু পশুর চেয়ে ও নিকৃষ্ট মানুষদের চিনতে পারেনা সে। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতেই পাগলা বাজারে যায় আব্দুল জব্বার। ইট-বালু-সুরকির সবচেয়ে বড় বাজার নারায়ণগঞ্জের পাগলা। পাগলা মানুষরা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নামে সম্মানিত হলেও পাগলা বাজার প্রতিবন্ধী বাজার হতে পারেনি।  

পাগলা বাজারে এক ল্যাংটা পাগলের আগমন হয়েছে। ঘিরে রয়েছে আরো কিছু অর্ধ ল্যাংটা ভক্ত। কেউ খাবার দেয়, কেউ টাকা দেয়, কেউ আবার গা টিপে দেয়। অদ্ভুত আওয়াজে মাঝে মাঝে  আল্লাহু বলে চিৎকার দেয়। অতিভক্তরা পরিচয় দেয় ল্যাংটা বাবা বলে। 

ঢাকা শহরে এ জাতীয় বাবার অভাব নেই। মোহাম্মদপুরের হাটা বাবা মারা গেছে। জটা বাবা, ফু বাবা,

ছালা বাবা, তালি বাবা, থুতু বাবা, শিকল বাবা, শালু বাবা। রমরমা  এইসব বাবাদের দরগা আর খানকা। হিন্দুদের দুর্গা আর মুসলমানদের দরগা সমান সম্মানিত। বাবারা আচার আচরণে পাগল হলেও প্রতিবন্দী নয়। ভক্তরা অতিরিক্ত সম্মান দেয়ার জন্য মজ্জুক বলে পরিচয় দেয়। 

আব্দুল জব্বার মজ্জুক শব্দের অর্থ খুঁজে পায়না। ভক্তরা বলে খোদার প্রেমে পাগল। ল্যাংটা হলেও এদের কাছে জিনিস আছে। পাগল হলেও এলেম আছে। তার নাম নাকি এলমে লাদুনি। আল্লাহর হুকুম না মানলে ও প্রেমে পাগল। খোদার প্রেমে গাঁজা খেয়ে বেহুঁশ হয়ে রই পড়ে। 

সবায় জানে শিব মানে হাতি। হিন্দুরা শিব লিংগ বানিয়ে পূজা করে। ফুল দেয়, দুধ ঢালে। অতিভক্তের কাছে ল্যাংটা বাবার খোলা জিনিস শিব লিংগের  মতোই পুজনীয়।

 হামিদুল্লাহ পাগলা তেড়ে  এসেছে ল্যাংটা বাবার দরগায়। 

- ল্যাংটা, বাইর অ, দেহি তুই কেমন বাবা? তোর কাছে নাকি জিনিস আছে ?

- আমি ঠিক করবার আইছি। বলেই পকেট থেকে ছুড়ি বের করে হামিদুল্লাহ পাগলা। হুংকার দেয় ল্যাংটা বাবা।

- বেয়াদবের বাচ্চা বেয়াদব। ছুড়ি ফালা কইতাছি। নইলে খবর আছে।

- রাখ তোর খবর। খবর শোনবি আমার কাছে।

ল্যাংটা পাগলা পড়ি মরি করে দৌড়ে পালায়। ভক্তরা ও মানে মানে কেটে পড়ে তলাপি-তলপা ঘুটিয়ে। বাজারের লোকেরা এবার বুজতে পারে, দু’জনের কেই পাগল না। পাগল বেশে পাক্কা সেয়ানা। 

দরগার ভিতর থেকে অসহায়ের  মতো বেড় হয়ে আসে আব্দুল হাই। সামনে যেয়ে দাঁড়ায় আব্দুল জব্বার। 

- ল্যাংটা পাগলের কাছে আইছেন কোন নিয়তে  ? আপনার সমস্যাডা কি?

- দুনিয়ায় সমস্যার কি আর শেষ আছে ? শোনছিলাম ল্যাংটা বাবার কাছে জিনিস আছে। হামিদুল্লাহ পাগলায়তো সব ফিনিস কইরা দিছে। 

- থামেন, থামেন। কারে পাগল কইতাছেন ? ছোট কালে গল্প শোনেছিলাম, অবিভক্ত ভারতের প্রধান মন্ত্রি নেহেরু একবার পাবনার পাগলা গারদ পরিদর্শনে গিয়েছিল। জাকজমক পোষাক পড়া লোকটাকে দেখার জন্য পাগলরা সব ছুটে এসেছিল। একজন জিজ্ঞেস করল “তুমি কে বাবা ? প্রধান মন্ত্রি, মন্ত্রি সুলভ ভাষায় জবাব দিয়েছিলেন” আমি ভারতের প্রধান মন্ত্রি পন্ডিত জওহারলাল নেহেরু। পাগলটা তাচ্ছিল্যের সাথে জবাব দিয়েছিল “নতুন নতুন আমরা ও এই রহমই কইছি। কয়েকদিন আমাগো লগে থাহ। মাথা ঠিক অইয়া যাইব। 

- কি বুঝাইবার চান এই গল্প শোনায়া ?

- বুঝাইতাছি, যাদের পাগল বলতেছেন, তারা কেউ পাগল না। আপনার  মতোন পাগল-ছাগলেই দেশ ভর্ত্তি। সারাদেশই পাগলা গারদ।  খামাখাই বদনাম করেন, পাগলে কি না কয়, ছাগলে কি না খায় ? আসলে পাগলে ফালতু কথা বেশী কইলেও মিছা কতা কয় না। ছাগলে সব খাইলেও ঘুষ খায়না। আপনার  মতো ভাল মানুষরাই এইসব করে। 

- জব্বর একখান কতা কইছেন জব্বার সাহেব। আমারে কইছেন, বাঁইচা গেছেন। অন্য লোক শোনলে ধইরা এখানই পাবনা পাঠাইবো। আপনাদের  মতোন ভালা মানুষের ঐটাই ঠিকানা। গলা ফাটায়া স্লোগান দেন

তোমার আমার ঠিকানা

পালগা গারদ, পাবনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ