ঢাকা, শুক্রবার 30 March 2018, ১৬ চৈত্র ১৪২৪, ১১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অবহেলা পেয়েও যারা বিশ্ব সাহিত্যের সেরা লেখক

সাকী মাহবুব : বিশ্ব সাহিত্যের এমন কিছু বরেণ্য তারকা লেখক, কবি,সাহিত্যিকগণ ছিলেন, প্রথম দিকে যাদের লেখা বই কোনো প্রকাশক বই আকারে প্রকাশ করতে চাইনি,কোন কোন পত্রিকায় তাদের লেখা ছাপাতে চাইনি কিন্তু পরবর্তীতে ঠিকই পৃথিবীবাসী তাদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছে।

বিশ্ব সাহিত্যে আজ ও যিনি সর্বাধিক জনপ্রিয় এবং নাট্যকার  ও কবি,সাহিত্যের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্ব, তিনি উইলিয়াম শেকসপিয়র। উইলিয়াম শেকসপিয়ার সমপর্কে ইংল্যান্ডের মনীষী টমাস কার্লাইলকে জিঞেস করা হয়েছিল, তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধপূর্ণ উপনিবেশ ভারত বর্ষ এবং শেক্সপিয়ার এই দুটোর মধ্যে কোনটি নিতে চান? তিনি বিন্দু মাত্র দ্বিধা না করেই বলেছিলেন —ভারত সাম্রাজ্য না থাকে না থাক, শেক্সপিয়ার ছেড়ে আমার কিছুতেই চলবে না। শেক্সপিয়ার সম্পর্কে আজ ও বিশ্বজনের অপূর্ব মূল্যায়ন এবং শ্রদ্ধা। কিন্তু মজার বিষয় হলো, সেক্সপিয়ার যতদিন জীবিত ছিলেন,ততদিন তার প্রতি এবং তার সাহিত্য কর্মের প্রতি কেউই মনোযোগ দেয়নি।এমনকি তার মৃত্যুর একশো বছর পরেও তার নাম ছিল প্রায় অজ্ঞাত। তারপর তার সম্পর্কে লাখো লাখো শব্দ রচিত হয়েছে। সেকালেও সেক্সপিয়ার সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানত।এমনকি তার সাহিত্য যখন প্রচুর জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে, তখন তার সম্পর্কে ছিল নানা ধরনের গুজব।আসলে হয়তো সেক্সপিয়ার বলে কোনো লোকই নেই। হয়তো অনেক লোক মিলে রচনা করেছেন এই চমৎকার নাটকগুলো।আবার কেউ কেউ বলেছেন, হয়তো প্রখ্যাত কবি ফ্রান্সিস বেকনই ছদ্মনামে লিখেছেন এই নাটকগুলো,নইলে অমন সুুন্দর কথা সেক্সপিয়ার পাবেন কোথা থেকে? কিন্তু একদিন  এই সন্দেহের কুয়াশা কেটে গেল,বিশ্ববাসী সত্যের রেটিনায় দেখলেন —সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।এ সব অবিস্মরণীয় সাহিত্যকর্মেরর জন্মদাতা একজনই তিনি হলেন বিশ্ব সাহিত্যের তারকা পুরুষ উইলিয়াম সেক্সপিয়ার।

বিশ্বের সেরা কবিদের মধ্যে  একজন ওয়াল্ট হুইটম্যান। লেখক হিসেবে তখন তিনি একেবারেই নবীন। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘লীভস অব গ্রাস’ প্রকাশিত হয় ১৮৫৫ সালে। প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের সময় একজন লেখকের যা হয় ওয়াল্ট হুইটম্যানের বেলায় ও তাই হয়েছিল। কী হয় কে জানে? যদি কেউ পড়তে না চায়? যদি সমালোচোকেরা ভালো চোখে না দেখেন? যদি বিক্রি না হয়? বিশ্ব সাহিত্যের অহংকার হুইটম্যানের আলোড়ন সৃষ্টিকারী বই ‘লীভস অব গ্রাস’ এর প্রথম প্রকাশের বেলাতেও ঘটল এমন ঘটনা।বইটির মোটেও কাটতি হল না।এক কপিও বিক্রি হল না।অবশেষে দুঃখে ভারাক্রান্ত, মর্মাহত, হুইটম্যান বইগুলো সমালোচক ও লেখকদের কাছে সৌজন্য কপি হিসেবে পাঠিয়ে দিলেন।গ্রাহকেরা নিল না।বিস্ময়কর ব্যাপার হলো পাঠক নিন্দিত বইটিই এক সময় হয়ে উঠলো নন্দিত। বইটির বৈশিষ্ট্য ছিল মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কিত। কিছুদিনেরর মধ্যেই বইটির প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে দ্বিতীয় সংস্করণ বের করতে হয়।

জার্মান ভাষার খ্যাতিমান কবি ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পের জনপ্রিয় লেখক ফ্রানজ কাফকা বেচেঁ  থাকা অবস্থায় তেমন মূল্যায়ন পাননি। তার বৈচিত্র্যময় সাহিত্যকর্ম ও তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি,পায়নি প্রশংসার খ্যাতি। বরং উল্টো তাকে নিয়ে হয়েছে তুখোর সমালোচনা, তার বিরুদ্ধে বয়ে গেছে মিথ্যার মিছিল। কাফকা একজন আইনজীবী হিসেবে দীক্ষা নিলেও লেখক হিসেবেই সময় ব্যয় করেছেন বেশী।কিন্তু দুঃখের কথা হলো তার ঘামঝরা লেখন শিল্প জন মানুষের সামনে আসেনি।নানা প্রতিকূলতা তাকে বাধা গ্রস্থ করেছে  প্রতিটি পদে পদে।যক্ষ্ণা রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবনের শেষবেলা কাটিয়েছেন বিছানায়। কাফকা তার বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে অনুরোধ করেছিলেন তার মৃত্যুর পর তার সাহিত্য কর্ম যেন আগুনে পুড়িয়ে  ফেলানো হয়।কিন্তু ম্যাক্স ব্রড তা করেন নি। কিন্তু সুখের কথা হলো কাফকার মৃত্যুর পর পাঠক এবং সমালোচকরা তার ছোট গল্পের ভূয়শী প্রশংসা করেন।আজ তার সাহিত্যের মূল্যায়ন হয়,প্রশংসা হয়।বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে তার আকাশ ছোঁয়া খ্যাতির ঢেউ।

কল্পবিজ্ঞানের রাজপুত্র জুলভার্ন। বাবা ছিলেন আইনজীবী।তাই তার ইচ্ছে ছিল, তার ছেলেও খ্যাতিমান আইন ব্যবসায়ী হোক, দুপয়সা আয় করতে শিখুক, সুখে থাকবে।কিন্তু জুলভার্নের আইন পড়ার দিকে তেমন আগ্রহ ছিলনা। আইন পড়ার চেয়ে তিনি মনোযোগী ছিলেন সাহিত্য চর্চায়। দিন রজনী সাহিত্য চর্চায় নিমগ্ন থাকলেও ভাগ্য সহজে, সুপ্রসন্ন হয়নি তার। তার প্রথম গ্রন্থ “ বেলুনে পাচঁ সপ্তাহ “ এর পান্ডুলিপি নিয়ে শুরু হল প্রকাশকের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরাঘুরি। কিন্তু কেউ তার এই উদ্ভট কাহিনী ছাপতে চাইলেন না।একে একে পনের জন প্রকাশকই ফিরিয়ে দিলেন তার পান্ডুলিপি। অত:পর প্রচন্ড অভিমানে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পান্ডুলিপিটি পুড়িয়ে ফেলতে ছুড়ে দিলেন জলন্ত আগুনে।কিন্তু রক্ষা করলেন তার প্রিয় স্ত্রী। স্ত্রী শান্ত¡নার অভয় বাণী দিয়ে বললেন —- অন্তত আরেকজন প্রকাশককে দেখাও।অবশেষে স্ত্রীর কথাই সত্যি হলো।বইটি ষোলতম প্রকাশক ছাপতে রাজি হলেন।কিন্তু বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো অবিশ্বাস্য রকমের কাটতি। বইটি পেল বছরের বেস্ট সেলারের মর্যাদা। শুরু হলো অন্য ভাষায় অনুবাদ। আর জুলভার্নের সাহিত্যখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে,চারিদিকে।

ইংরেজী সাহিত্যের ঝড়তোলা লেখক, সবচেয়ে বেশী আলোচিত লেখক, সর্বাধিক গ্রন্থ প্রণেতা বলে খ্যাত চালর্স ডিকেন্স।চালর্স ডিকেন্স যখন প্রথম লেখা শুরু করলেন,তখন তার মনে ছিল হাজারো সংকোচ আর পাহাড় সম ভয়।তার ভয়ের কারণ, লোকে তাকেঁ ঠাট্টা, মশকরা করতে পারে।তাই প্রথম গল্পটা লেখার পর তিনি সবার অগোচরে, রাতের আঁধারে চুপিচুপি ডাকবাক্সে নিয়ে ফেলে দিয়ে এসেছিলেন। তারপর গল্পটা যখন ছাপা হল,কি বাধঁভাঙা খুশি তার। আনন্দের বেদনায় একবারে কেদেঁ ফেলেছিলেন তিনি। শুরু করেছিলেন রাস্তায় নেমে পাগলের মতো ছুটাছুটি। অবশ্য এই লেখার জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক পাননি।এর পরের গল্পের জন্যও তিনি কিছু পাননি।প্রথম পারিশ্রমিক পান পাচঁ ডলার, একটি গল্প লিখে।পরের ঘটনাতো শুধুই ইতিহাস।ডিকেন্সের পান্ডুলিপি প্রতিটি  শব্দের জন্য পারিশ্রমিক ধার্য হয়েছিল পনের ডলার করে।সর্বকালের সকল লেখকদের মধ্যে এটাই ছিল সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক।

আমেরিকার মহিলা কবি এমিলি ডিকসন।নীরবে, একাধারে, দুহাতে লিখে গেছেন একের পর এক কবিতা। কিন্তু পত্রিকার জ্বলজ্বলে পাতায়, তার কবিতা ছাপা হোক এটা তিনি চেতেন না।বেচেঁ থাকা অবস্থায় এ গুণী  মহিলার গুনে গুনে মাত্র সাতটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। প্রকাশকরা এ নারীর কাছ থেকে “মেয়েলিপনা” কবিতা প্রত্যাশা করেছিলেন কিন্তু এমিলি ডিকসন ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ।যার কারণে অপ্রকাশিতই থেকে যায় তার কবিতার ধূসর পান্ডুলিপি। তার লেখা কবিতার সংখ্যা ছিল একহাজার সাতশত-র মতো। লিখে গেছেন একাধারে কিন্তু সাহিত্য সমাজে তার  কোন স্বীকৃতি মেলেনি।এমনকি বিয়েও করেন নি। ব্যক্তিগত জীবন ও তেমন একটা সুখের ছিল না। অবশেষে অজ্ঞা, আর অবহেলায় ভারী পাথর গলায় বেধেঁ জলে ডুবে আত্মহত্যা করেন।কবি মারা গেলেও তার প্রতিভা মারা যায়নি। চাপা থাকেনি তার ক্যারিয়ার। এমিলির মৃত্যুর পর তার বোন এমিলির লেখা অপ্রকাশিত কবিতার পান্ডুলিপির খোজঁ দেন।চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তার কবি খ্যাতি।এখন আমেরিকার নারী কবি হিসেবে এমিলিকে সেরাদের মধ্যে অন্যতম বলেই মানা হয়।

# বিশ্ব সাহিত্যের বিরাট আরেক বিস্ময়কর প্রতিভার নাম জর্জ বার্নার্ডশ।দীর্ঘ নয় বছর সাহিত্য সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি।এই নয় বছরে লিখেছিলেন পাচঁ পাচঁটি বড় বড় উপন্যাস।তারপর তিনি তার এই লেখা পান্ডুলিপিগুলো পাঠিয়ে দিলেন ইংল্যান্ড আর আমেরিকায় বড় বড় খ্যাতিমান প্রকাশকদের কাছে।কিন্তু সবখান থেকেই সে গুলো ফেরত এলো।কেউ তার বই প্রকাশ করে টাকা নষ্ট করত চেল না।কিন্তু পরবর্তী কালে তিনিই হয়ে ছিলেন সর্বাধিক জনপ্রিয় সাহিত্যিক।১৯২৬ সালে পেয়ছিলেন সাহিত্যের বিশ্ব জোড়া স্বীকৃতি নোবেল পুরস্কার।

# বাংলা সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র কাজী নজরুল ইসলাম।বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী  এই কবির কবিতাও কোনো কোনো  পত্রিকা তার লেখা প্রকাশ করতে অনীহা দেখিয়েছে, অবজ্ঞা আর অবহেলায় দূরে ঠেলে দিয়েছে এমন নির্মম বেদনাদায়ক ইতিহাস ও আছে।রোগে শোকে সুচিকিৎসাও হয়নি তার। অর্থের অভাবে, চিকিৎসার অভাবে আলঝেইমার নামক স্মৃতি ভোলা রোগে আক্রান্ত হয়ে থেমে যায় তার আগুনঝরা লেখনী। বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে মর্যাদা  পাওয়ার পর আর বেশীদিন বেচেঁ ছিলেন না। কিন্তু তার সাহিত্যকর্মই বলে দেয় 

 

আমি চিরতরে দূরে চলে যাব

তবু আমারে দেব না ভুলিতে

সুতরাং ভালো লেখার বা ভালো লেখকের মৃত্যু নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ