ঢাকা, শুক্রবার 30 March 2018, ১৬ চৈত্র ১৪২৪, ১১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ :  মাহফুজুর রহমান আখন্দের সাহসী উদ্যোগ

 

খুরশীদ আলম বাবু : সত্যি বলতে কি এই প্রথমবারের  মত রোহিঙ্গা সমস্যার উৎপত্তির অনুপুংখ ইতিহাস পাওয়া গেল ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ-এর সমপ্রতি প্রকাশিত গবেষণা গ্রন্থ ‘রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ’Ñএ। বইটি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল জনাব আখন্দ তাঁর সমস্ত মেধারস ঢেলে বুঝাবার চেষ্টা করেছেন রোহিঙ্গা সমস্যার পেছনে কোন কোন সা¤্রাজ্যবাদী দেশের চক্রান্ত জড়িয়ে গেছে। সা¤্রাজ্যবাদীদের  এই অশুভ ঘটনাপ্রবাহ পড়তে খুব একটা ভালো লাগে না, ক্রমান্বয়ে ক্রোধ এসে বুকের ভেতর দেশে জমা হতে থাকে। প্রশ্ন উঠতে থাকে আদৌ এই সমস্যা সমাধানে মানবতাবাদী দেশ হিসেবে বিশ্বে যারা পরিচিত তারা আন্তরিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কিনা? অনেক নাটকীয় ঘটনার পর বোঝা গেল রোহিঙ্গারা মুসলমান বলেই এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। রোহিঙ্গাদের এখন বলা  হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় Stateless  জাতি। জজ অরওয়েল তার বিখ্যাত গল্প “Shooting and Elephant” এর এক জায়গায় ক্ষোভে বলেছিলেন 

The young Buddhist priests  Were the worst of all. There were several thousands of them in the town and none of them seemed to  have  anything to do except Stand on street corners and jeer at Europeans. 

বলা বাহুল্য: জজ অরওয়েল বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) থাকার সময়ে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেছে সা¤্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে বৌদ্ধদের কোন সংগ্রাম ছিলো না। বৃটিশ শাসনের আগে মায়ানমারে রোহিঙ্গা সমস্যা ছিলো না। ইংরেজরাই এই বিভেদের বীজ তৈরি করে দ্যায়। জনাব আখন্দ বলেছেন :

“রোহিঙ্গা সমস্যা; কাশ্মীর, ফিলিস্তিন কিংবা ফিলিপাইনের মরো মুসলমানদের মতোই একটি আন্তর্জাতিক সংকট। ক্রমশ বাড়তে বাড়তে এটি এখন জাতিস্বত্তা নির্মূলের সর্বশেষ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।” (উপক্রমণিকা, ১ম অধ্যায়, পৃ. ১৫)

একটি জনপদ আধুনিক কালেও কিভাবে বিলীয়মান হয়ে যাচ্ছে তার জ্বলন্ত উদাহরণ- আমাদের চোখের সামনে থেকে গ্যালো। তবে এই বর্বর নির্মম জাতি উচ্ছেদের অভিযান এতটা ত্বরানি¦ত হতো না; যদি না রাশিয়া, চীন ও ভারত তাদের সহায়তা করতো। আমাদের প্রত্যাশা ছিলো চীন ও ভারত এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবে। শেষাবধি বোঝা গ্যালো মানবতা নয়, অর্থনীতিই তাদের কাছে প্রধান বিষয়বস্তু। এই তিন দেশের সমর্থনের উপর ভর করেই মায়ানমার এখন অবধি সমান তালে নির্য়াতন চালিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থার মধ্যেই প্রকাশিত হলো- এই বইটি। জনাব আখন্দ অনেক দিন ধরেই এই সমস্যা বোঝার চেষ্টা করেছেন, বলতে গেলে ছাত্রজীবন থেকে। ইসলামের ইতিহাসের মেধাবী ছাত্র হিসেবে আরাকানে রোহিঙ্গাদের উত্থান, তাদের সংগ্রামী জীবনধারা ও বিদ্রোহের ইতিহাস ক্রমান্বয়ে তুলে ধরেছেন। এর জন্য তাকে বিস্তর পরিশ্রম করতে হয়েছে। গবেষণার রীতিনীতি (Method) চমৎকারভাবে অনুসরণ করেছেন। যেমন ধরা যাক রোহিঙ্গা শব্দটি ক্যামন করে আসলো তার অনেক ব্যাখ্যা জোগাড় করতে হয়েছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে তিনি  অনেক পরিশ্রমী গবেষক। প্রায় তিনশ বারো পৃষ্ঠাকে ঘিরে এই সমস্যার স্বরূপকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। যেহেতু তিনি একজন গবেষক, গবেষণার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি তাকে অনুসরণ করতে হয়েছে। এই কারণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে আরম্ভ করে- রোহিঙ্গা বিষয়ে জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি পর্যন্ত বিস্তার ঘটিয়েছেন। মোটামুটি ধারাবাহিক সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে আলোচনা সাজিয়েছেন। আখন্দ দেখাবার চেষ্টা করেছেন যে, হাজার বছর ধরে আরাকানে তাদের বসবাস। তারা মায়ানমারের উন্নয়নে অনান্য  সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অবদান রেখেছেন। এই অবদানের ইতিহাস তুলতে গিয়ে জনাব আখন্দ কেবল ইংরেজী বাংলাগ্রন্থ ঘেঁটেই ক্ষান্ত হননি। এমনকি উর্দুগ্রন্থের সাহায্য নিয়েছেন। 

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, মায়ানমার সরকার কেন রোহিঙ্গাদের ভূমি থেকে বিতাড়ন করতে চাচ্ছে? এর উত্তরে জনাব আখন্দ নানা দিক থেকে তথ্য জোগাড় করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, সে গুলো হলোÑ 

মুসলাম জাতিসত্তার বিনাশ ঘটানো।

বিতাড়িত ভূমিতে সংখ্যালঘু মগ, মুরম ও চাককে পুনর্বাসন করা।

রাখাইন ল্যান্ডে বিদেশি বিনিয়োগর মাধ্যমে শিল্পায়ন করা। এই শিল্পায়নের পথে একমাত্র বাধা হলো মুসলিম রোহিঙ্গারা। অতএব তাদের বিতাড়ন কর। এই মনোভাব মায়ানমার সরকারকে দুঃসাহসী করে তুলেছে। ফলে, তারা কোন বাধাই মানছেন না, দুর্দমনীয় গতিতে বিতাড়ন অব্যাহত রেখেছে।

জনাব মাহফুজুর রহমান আখন্দের এই বই পড়তে বারবার মনে প্রশ্ন জাগছিল কেন মুসলিম বিশ্ব একযোগে  এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসলোনা? সেই রকম দীপ্র আলোচনা দেখলাম না। তবে একবারে স্পর্শ করেননি, তা নয়। যেমন পাওয়া যাচ্ছে ২৫৫ পৃষ্ঠায়-

“জাতিসংঘ, ইসি, এপেকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দেখেও না দেখার ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে মুসলমান রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক মুসলিম সংস্থাগুলো নানা শ্রেণি মতে বিভেদে লিপ্ত হয়ে নিজেদের সামাল দিতে ব্যস্ত। ফলে এক ভয়াবহ আগ্রাসনের মুখে মুসলমানদের অস্তিত্ব বিলিন হতে চলেছে; তারই এক উজ্জ্বল নজির আরাকান।”

অত্যন্ত খাটি কথাই বলেছেন গবেষক মাহফুজুর রহমান আখন্দ। আগেই বলেছি  জনাব আখন্দ অনেক বছর ধরেই পরিশ্রমী সাধনার মধ্য দিয়ে এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। তার কাছ থেকে এই ধরনের আকর গ্রন্থ প্রত্যাশিত ছিলো। “রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ” সেই প্রত্যাশা কিছুটা হলেও পূরণ করেছে। তবে এই বইয়ের একটি মূল্যবান দিক হলো যে প্রাচীন আরাকান রাজ্যের একটি মানচিত্র পাওয়া যাচ্ছে। যা প্রকাশ করেছিল রাখাইন স্টেট জার্নাল। পাশাপাশি বর্তমানের আরাকানেরও একটি মানচিত্র গ্রন্থিত করেছেন লেখক। এছাড়াও ১৯৭৮ ( ৭-৯ জুলাই) ও ১৯৯২ (২৩-২৮এপ্রিল) সালে বার্মা ও বাংলাদেশের সাথে রোহিঙ্গা ফেরত বিষয়ে যে চুক্তি হয়েছিল তা অনুপুংখ বিবরণ আমরা এ গ্রন্থে পাচ্ছি। চমৎকার প্রচ্ছদ-পরিচ্ছদে ঋদ্ধ এই গ্রন্থের আকর্ষণ আরো বৃদ্ধি করেছে। বইটি প্রকাশ করেছে রাজশাহীর পরিলেখ প্রকাশনী, মূল্য রেখেছেন চারশত পঞ্চাশ টাকা। বইটির বহুল প্রচার কামনা করছি। দেশ এবং জাতির স্বার্থে প্রত্যেকের উচিত বইটি সংগ্রহে রাখা।

রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ

লেখক : ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

প্রকাশক : পরিলেখ প্রকাশনী

প্রচ্ছদ: হামিদুল ইসলাম

মূল্য : ৪৫০ টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ