ঢাকা, শুক্রবার 30 March 2018, ১৬ চৈত্র ১৪২৪, ১১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাতুল ও তার বন্ধু হাঁস

শাহীন রায়হান : আকাশের মুখ খুব অন্ধকার। চারদিকে কালো মেঘের ঘনঘটা। আকাশ কাঁদছে গুড়–ম গুড়–ম শব্দে। সেদিন ছিল শুক্রবার। স্কুল বন্ধ। রাতুল বারান্দায় বসে খেলছিল। এমন সময় মা ডাকল-“রাতুল শুনে যা বাবা”। ডাক শুনে রাতুল মায়ের কাছে গিয়ে বসল। মা রাতুলকে বড্ড ভালোবাসে। একটুও চোখের আড়াল হতে দিতে চায় না। মা রাতুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-“বাবা তুমি বর্ষার পানিতে নামবে না। বর্ষার পানিতে সাপ ও বিষাক্ত পোকা মাকড় ঘুরে বেড়ায়। তাছাড়া তুমিতো সাঁতার জানো না। রাতুল পোকা মাকড় দেখলে খুব ভয় পায়। সাপকে তো ভয় পায় আরও। তাই, মায়ের কথায় ভয় পেয়ে রাতুল আর বাইরে যায় না। শুধু জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে বৃষ্টির দিকে।

বাবা রাতুলের সব পছন্দের খুব মূল্য দেয়। বাবাকে রাতুল তাই একটু বেশিই ভালোবাসে। রাতুলও বাবার খুব আদরের। বাবা রাতুলকে ছাড়া কোথাও যায় না। রাতুল বাবার গল্প খুব ভালোবাসে। তার ভালোবাসার আরও একটা বিশেষ দিক আছে। তাহল পাখি। পাখির ওড়াউড়ি কিচিরমিচির শব্দ রাতুলকে উদাস করে দেয়। এর মধ্যে সে বেশি ভালোবাসে সাদা রঙের পাঁতিহাসকে।

মা একদিন বলল-“এখন বর্ষাকাল। চারদিকে পানি আর পানি। রাতুলকে একটা হাঁস কিনে দাও না, রাতুলের বাবা।” এ কথা শুনে রাতুলের মন খুশিতে নেচে ওঠে। সেদিন হাঁসের চিন্তায় রাতুলের যেন সময় কাটতে চাইল না। সে বাবার কাছে দ্রুত হাঁস কেনার প্রতিশ্রুতি চাইল। বাবাও প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলল-“ঠিক আছে তোমাকে একটি সুন্দর হাঁস কিনে দেব। বাবার কথায় রাতুল একটু স্বস্তি পায়।

দুই দিন পর গ্রামের হাঁট। বাবা রাতুলকে নিয়ে গ্রামের হাঁটে রওনা দেয়। রাতুল যেতে যেতে বাবাকে হাঁসের সম্পর্কে হাজারো প্রশ্ন করে। বাবাও তার কৌতুহল দেখে সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে হেঁটে হেঁটে তারা হাঁটে গিয়ে পৌঁছায়। বাজারে পৌঁছে রাতুল হরেক রঙের অনেক হাঁস ও হাঁসের বাচ্চা দেখতে পায়। এর মধ্যে তার সাদা রঙের একটি হাঁসের বাচ্চাকে তার খুব ভালো লেগে যায়। তার মনে হয় এই বাচ্চাটাকে সে কোথায় যেন দেখেছে। বাচ্চাটা তার দীর্ঘ দিনের চেনা। রাতুল অদ্ভুত ভাবে আরও লক্ষ্য করল যে, বাচ্চাটাও যেন তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

কিছুক্ষণ পরে বাবা বলল-কিরে রাতুল, তোর কি কোন বাচ্চা পছন্দ হলো। বাবার কথায় রাতুলের ভাবনাটা কেটে গেল। সে বলল-হ্যাঁ, বাবা। আমাকে সাদা রঙের এই বাচ্চাটা কিনে দাও। বাবা রাতুলের কথা  মতো  হাঁসের বাচ্চাটা কিনে দিতেই সে আনন্দে নেচে উঠল। তারপর বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বাবার হাত ধরে ধীরে ধীরে বাড়িতে ফিরে আসল।

হাঁসের বাচ্চাটকে রাতুলের মাও খুব পছন্দ করল। সে রাতুলের বিছানার পাশেই বাচ্চাটার একটা থাকার ঘর করে দিল। রাতুলও বাচ্চাটার খুব যতœ নেয়। বাচ্চাটাকে রেখে সে কিছুই খায় না। বাচ্চাটাও রাতুলকে খুব পছন্দ করে ফেলল।

হাঁসের বাচ্চাটা রাতুলের যতেœ ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল। এখন সে প্রতিদিন ঘরের পাশের পানিতে ভেসে বেড়ায়। রাতুলও জানালা দিয়ে ওর ঘুরে বেড়ানো দেখে,আনন্দে হাততালি দেয়।

একদিন বিকেলে রাতুল জানালা দিয়ে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে ওর ভেসে বেড়ানো দেখছিল। এমন সময় হাঁসের বাচ্চাটা বলল-“রাতুল, তুমি কি আমার বন্ধু হবে? আমার কোন বন্ধু নেই। সারাদিন একা একা পানিতে ভেসে বেড়াতে কার বল ভালো লাগে। তুমি আমার বন্ধু হলে দু,জনে সারাদিন পানিতে ভেসে বেড়াব। দিন কাটাব আনন্দে ঘুরে ঘুরে।”

রাতুল হাঁসের বাচ্চার কথায় অবাক হয়ে হেসে বলে-“তুমি তো আমার বন্ধুই। দেখছ না তোমাকে আমি বড্ড ভালোবাসি। রাতুলের কথায় হাঁসের বাচ্চার আনন্দ যেন আর ধরে না। এরপর রাতুল ও হাঁসের বাচ্চার মধ্যে বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়। একজন অন্য জনকে ছাড়া কিছু বোঝে না। দু,জনের মধ্যে সারাদিন খুব কথা হয়।

সেদিন ছিল শনিবার। চারদিকে বৃষ্টির খুব ঘনঘটা। উঠান পুকুর সব বৃষ্টির পানিতে থৈ থৈ করছে। রাতুলের বাবা-মা বিশেষ কাজে ঘরের বাইরে ছিলেন। এমন সময় হাঁসের বাচ্চাটা রাতুলকে বলে উঠল-চল না বন্ধু, আজ আমরা দু,জন বৃষ্টির পানিতে খুব ভিজব। আজ তোমাকে ছাড়া কিছুতেই একা বাইরে যাব না। তুমি বাইরে না গেলে আমি খুব কাঁদব। রাতুল হাঁসের বাচ্চাটাকে মায়ের নিষেধের কথা বলতেই বাচ্চাটা বলল-দুর, বোকা! আমি তো সারাদিন পানিতে থাকি। আমার তো কিছু হয় না। তাছাড়া সাপ তো আমাকে দেখে উল্টো ভয় পায়। আমি তো আছি তোমার কিচ্ছু হবে না।

হাঁস বন্ধুর কথায় রাতুল প্রথমে উঠোনের পানিতে নামে। উঠোনের পানিতে নেমেই তার খুব ভালো লেগে যায় দেখে হাঁস বন্ধু বলল-“কি বলেছিলাম না তোমার কিচ্ছু হবে না। এখন বিশ্বাস হলো তো।”

হাঁস বন্ধুর কথায় রাতুল মায়ের কথা ভুলে গেল। সে হাঁসবন্ধুর সাথে নাচতে নাচতে পুকুরের দিকে চলে গেল।

চারদিক পানিতে ভরা থাকায় কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। হাঁসবন্ধু বলল- “এসো বন্ধু, এদিকে এসো। আজ আমরা বেশি পানিতে দু,বন্ধু খুব সাঁতার কাটব।”

রাতুল আসছি বন্ধু বলে একটু সামনে এগুতেই পা পিছলে পুকুরের পানিতে পরে তলিয়ে যেতে লাগলো। সে চিৎকার করে বলতে লাগলÑ“বাঁচাও, বন্ধু বাঁচাও।” রাতুলের চিৎকার শুনে হাঁসবন্ধু দ্রুত কাছে এগিয়ে এল। কিন্তু কি দুর্ভাগ্য সে রাতুলকে বাঁচাতে পারল না। সেদিন থেকে পুকুরের পানিতে হাঁসের বাচ্চাটা কেঁদে কেঁদে শুধু রাতুলকে খোঁজে। কেঁদে কেঁদে খুঁজে ফিরে তার বাবা-মা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ