ঢাকা, শুক্রবার 30 March 2018, ১৬ চৈত্র ১৪২৪, ১১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গোরক্ষায় বিপন্ন ভারতের অর্থনীতি

গোরক্ষার নামে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মারমুখী কর্মকা-ে মুসলিমসহ সংখ্যালঘুদের বিপদই কেবল বাড়ছে না, ভারতের অর্থনীতিও তীব্র মন্দা ও সংকটের মুখে পড়েছে। দেশটির পিপ্লস ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেটিক রাইটস (পিইউডিআর) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গোরুর জীবন বাঁচানোর অজুহাতে হিন্দুত্ববাদীরা মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করায় ভারতে ‘অপরাধ অর্থনীতির’ বিকাশ ঘটতে শুরু করেছে। 

বিভিন্ন রাজ্যে জরিপ ও অনুসন্ধান চালিয়ে তৈরি করা রিপোর্টটিতে ‘গোরু রক্ষা বাহিনী’ নামের নতুন এক ভয়ংকর বাহিনীর কর্মকান্ড এবং ওই বাহিনীর প্রতি রাজ্য সরকারগুলোর সমর্থন-সহযোগিতার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে জানা গেছে, বিভিন্ন রাজ্য সরকার গোরু রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের পরিচয়পত্র দিয়েছে। আর সেসব পরিচয়পত্র দেখিয়ে ওই বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়েছে। তারা এমনকি বৈধ এবং লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীদের গোরুও আটক করে গোশালায় নিয়ে ঢোকাচ্ছে। আটক করা হচ্ছে গোরু বহনকারী ট্রাক ও অন্যান্য বাহনও। গোরু রক্ষা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ অর্থ দেয়া ছাড়া কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষেই তাদের গোরু ও বাহন ছাড়িয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। 

বাহিনীর সদস্যরা শুধু গোরু ও বাহনই ছিনতাই করছে না, একই সঙ্গে গোরু ব্যবসায় জড়িতদের ওপরও হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলা চালানো হচ্ছে ব্যবসায়ীদের পাড়া-মহল্লা এবং বাসাবাড়িতে গিয়েও। পিইউডিআর-এর রিপোর্টে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত সংঘটিত ১৩৭টি বড় ঘটনার উল্লেখ করতে গিয়ে জানানো হয়েছে, এসব ঘটনায় অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু ঘটেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই ছিল মুসলিম। পাশাপাশি ১২ শতাংশ দলিতসহ রয়েছে নি¤œবর্ণের হিন্দুরা। গোরু-মহিষের চামড়া ছাড়ানো দলিত ও নি¤œবর্ণের হিন্দুদের জীবিকার একটি প্রধান মাধ্যম। কিন্তু গোরু রক্ষা বাহিনী তাদের আয়-রোজগারের পথও বন্ধ করে দিয়েছে। বাহিনীর সদস্যরা বিশেষ করে মুসলিম মেয়েদের ওপর যৌন নির্যাতনও চালাচ্ছে। তাদের হাত থেকে মুসলিম শিশু ও কিশোরীরাও রেহাই পাচ্ছে না। 

কিন্তু হত্যা ও শারীরিক নির্যাতন থেকে ধর্ষণ পর্যন্ত কোনো অপরাধেরই বিচার পায়নি আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্তরা। পিইউডিআর-এর রিপোর্টে জানানো হয়েছে, প্রথমত জীবনের ভয়ে কেউই ওই বাহিনীর বিরুদ্ধে থানায় নালিশ করার সাহস পায় না। দ্বিতীয়ত, নালিশ জানাতে বা মামলা করতে থানায় গেলে পুলিশ তাদের উল্টো হুমকি দিয়ে ফিরিয়ে দেয়। অভিযোগকারীরা শিক্ষিত ও সমাজে কিছুটা পরিচিত হলে হুকুমের সুরে তাদের ঝামেলা মিটিয়ে ফেলতে বলা হয়। পুলিশ আরো বলে, এটা নাকি ভুল বোঝাবুঝির কারণে ঘটেছে! অন্যদিকে গোরু রক্ষা বাহিনীর কোনো সদস্য মৌখিকভাবে নালিশ দিলেও মুসলিম নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা হয়Ñ এমনকি তার বা তাদের কাছে কোনো গোরু না থাকলেও রেহাই দেয়া হয় না। 

এভাবেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গোরু রক্ষা বাহিনীর অঘোষিত রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পিইউডিআর তার রিপোর্টে জানিয়েছে, দরকার যখন ছিল বাহিনীটিকে নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেয়া রাজস্থানের মতো কোনো কোনো রাজ্যের সরকার তখন উল্টো নতুন কিছু আইন করার মাধ্যমে বাহিনীর হাতে বাড়তি অনেক ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। এসব আইনের ভিত্তিতে ওই বাহিনীর সদস্যরা যে কারো গোরু ও বাহনই শুধু আটক করার অধিকার পায়নি, যে কোনোসংখ্যক ব্যবসায়ীকেও গ্রেফতার করার ক্ষমতা পেয়েছে। বলা বাহুল্য, প্রায় সকল ক্ষেত্রেই শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা। 

পিইউডিআর-এর রিপোর্টে ঘটনাপ্রবাহের নেতিবাচক দিক সম্পর্কে জানাতে গিয়ে বলা হয়েছে, গোরক্ষার নামে চলমান এই আন্দোলন ও অভিযানের কারণে দু’বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি প্রচন্ড আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গোরু ও মহিষসহ গবাদি পশুর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শিল্প, বিশেষ করে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ ও মাংস রফতানি শিল্প ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নাগরিকদের বেঁচে থাকার অধিকার এবং খাদ্য গ্রহণ ও পেশা বেছে নেয়ার স্বাধীনতার ওপরও চরম আঘাত হেনে চলেছে গোরু রক্ষা বাহিনী। এসব বিষয়ে রাজ্য সরকারগুলোর প্রশ্রয়ও অপ্রকাশিত থাকছে না। তারা ছিনতাই ও চাঁদাবাজিকে আইনসম্মত করায় ভারতে জন্ম নিয়েছে নতুন ধরনের এক অর্থনীতিÑ যাকে ‘অপরাধ অর্থনীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পিইউডিআর। সংস্থাটি তার রিপোর্টে বলেছে, ভারতের জাতীয় অর্থনীতির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থাও চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই গোরু রক্ষা বাহিনীকে নিষিদ্ধ করা এবং এর দৌরাত্ম্যের অবসান ঘটানো দরকার। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, গোরুকে রক্ষার নামে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চলমান হত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণ-গ্রেফতার ও চাঁদবাজিসহ অপরাধ এরই মধ্যে অত্যন্ত আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। উল্লেখ্য, দৃশ্যমান কোনো কারণ না থাকা সত্ত্বেও গত বছর ২০১৭ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয় কৃষি কাজ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে গরু ও মহিষসহ গবাদি পশু কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এক নির্দেশনা জারি করেছিল। নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছিল, সীমান্তের ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো এলাকায় পশুর হাটও বসানো যাবে না। সীমান্ত বলতে শুধু বাংলাদেশ সীমান্তের কথা বলা হয়নি। আসাম, পশ্চিম বঙ্গ এবং ত্রিপুরাসহ ভারতের সকল রাজ্যের সীমান্তের কথাই ছিল নিষেধাজ্ঞায়। 

বিজেপি সরকারের গরু বিষয়ক এই নির্দেশনা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। কলকাতার মতো অনেক বড় বড় শহরে গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে যখন-তখন সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে মানুষ। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, তার সরকার কেন্দ্রের গরু বিষয়ক নির্দেশনা মানবে না। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের কেন্দ্রীয় সংগঠন এফআইসিসিআই জানিয়েছিল, এই নির্দেশনার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে চামড়া, পশুর ওষুধ, বোতাম, রঙের ব্রাশ ও টুথপেস্টসহ অনেক শিল্পÑ যেগুলোর মূল উপাদান হিসেবে পশুর হাড়ের ব্যবহার করা হয়। চাকরির বাজারেও এর অশুভ প্রভাব পড়বে।

লক্ষণীয় যে, সে পরিস্থিতির এখনো পরিবর্তন ঘটেনি বরং ভারতে বিস্তার ঘটেছে ‘অপরাধ অর্থনীতি’র। আমরা অবশ্য ভারতের অর্থনীতির বিষয়ে আগ্রহী নই। আমাদের উদ্বেগ সেদেশের মুসলিম নাগরিকদের নিয়ে। আমরা আশা করতে চাই, বিজেপি সরকার অনতিবিলম্বে গোরু বিষয়ক নির্দেশনা প্রত্যাহার করে নেবে এবং মুসলিম ও দলিতসহ সকল নাগরিকের জীবন-জীবিকা ও মানসম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ