ঢাকা, শুক্রবার 30 March 2018, ১৬ চৈত্র ১৪২৪, ১১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নির্মাণ সামগ্রীর দাম না কমালে  ক্ষতিগ্রস্ত হবে ৭০ লাখ মানুষ 

 

কামাল উদ্দিন সুমন: আবাসন খাতের অন্যতম উপকরণ রড সিমেন্টসহ অন্যন্য সামগ্রীর দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়ায়  এখাতের সাথে জড়িত প্রায় ৭০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দাম বৃদ্ধির ফলে আবাসন খাতে যেমন অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে  তেমনি এখাতের বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মহীন হওয়ার আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। রড সিমেন্টসহ অন্যন্য সামগ্রীর দাম বৃদ্ধির ফলে শুধু গ্রাহক নয় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে ব্যবসায়ীরা। 

নির্মাণখাতের উদ্যোক্তাদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বিএসিআই) নেতারা বলছেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি চক্র পরস্পর  যোগসাজশ করে রডের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে 

বিএসিআইয়ের সভাপতি মুনীর উদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, ২৭ মার্চ সকালে টন প্রতি এম এস রডের দাম ছিল ৬৩ হাজার টাকা আর ওই দিন বিকালে টন প্রতি রডের দাম দাঁড়ায় ৭২ হাজার টাকা। এতেই প্রমাণ হয়, একটি চক্র সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রডের দাম বাড়াচ্ছে।”

রডের দর বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে এই প্রকৌশলী বলেন, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে টনপ্রতি রডের দর ছিল ৪৮ হাজার থেকে ৫০ হাজার। কিন্তু এই কয় মাসে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে রডের মূল্য। আমরা সাধারণত ৫ শতাংশ লাভ করে থাকি। কিন্তু রডের মূল্য বৃদ্ধিতে ২৫ শতাংশ লোকসান হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা টিসিবির হিসাবে, বৃহস্পতিবার ঢাকায় ৬০ গ্রেডের এমএস রড টনপ্রতি ৭১ হাজার টাকা থেকে ৭২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, যার এক সপ্তাহ আগের দর ছিল ৬২ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে ৪০ গ্রেডের এমএস রডের টনপ্রতি দর হচ্ছে ৫৮ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা, যা একসপ্তাহ আগে ছিল ৫২ হাজার থেকে ৫৩ হাজার টাকা।

 বিএসিআইয়ের নির্বাহী সদস্য ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল হক তালুকদার বলেন, বাংলাদেশের এমএস রড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এককভাবে কোনো নিয়মনীতি না মেনে অস্বাভাবিক এবং অব্যাহতভাবে রডের দর বাড়িয়ে চলছে।

“তারা (রড প্রস্তুতকারী কোম্পানি) বলে থাকেন, কাঁচামালের দাম, পরিবহণ খরচ, ডলারের দাম, ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি ও চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস বিলম্বের কারণে রডের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব কারণে রডের দাম সর্বোচ্চ ৭ থেকে ৮ শতাংশ বাড়তে পারে; কোনো অবস্থাতেই ৫০ শতাংশ বাড়তে পারে না। এই পেশার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ জড়িত জানিয়ে শফিকুল বলেন, নির্মাণসামগ্রীর দর বাড়ার ফলে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে প্রচুর জনবল কর্মহীন হবে। এছাড়া পরোক্ষভাবে আরো ৩০লাখ এশিল্পের সাথে জড়িত বলে তিনি জানান। 

তার অভিযাগ, রডের সিন্ডিকেটের দেখাদেখি সিমেন্ট কোম্পানিগুলো গত ২৫ দিনে ব্যাগপ্রতি ৬০ টাকা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া টাইলস, ইলেকট্রিক ক্যাবল, স্যানিটারি মালামাল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।

তিনি বলেন, আমরা আশা করছি, সরকার অতি দ্রুত পিপিআর অনুযায়ী আমাদের প্রাইস এডজাস্ট ক্লজ-২৭.৯ কার্যকর করবেন। না হলে আমরা ১৫ এপ্রিল থেকে সমস্ত নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবো। 

এদিকে রড ও সিমেন্টের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে আগামী মাসে সব পক্ষের সঙ্গে বসা হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।

 তোফায়েল বলেন, বাজারে রড-সিমেন্টের দাম বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি আগে প্রতি ট্রাকে ২০ টন রড সিমেন্ট পরিবহন করা হতো। রাস্তা ঠিক রাখার জন্য এখন ১০ টন পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। এছাড়া ডলারের দাম বেড়েছে। তবে কেউ যেন কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করতে না পারে সেদিকে নজর রাখা হবে। বিষয়টি নিয়ে আগামী মাসে সব পক্ষের সঙ্গে বসা হবে।

এদিকে দেশের চার প্রতিষ্ঠানের কাছে রড ব্যবসা জিম্মি বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি রডের যে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, এর পেছনেও ওই চার প্রতিষ্ঠানের হাত রয়েছে। এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- বিএসআরএম স্টিল লিমিটেড, রহিম স্টিল, বন্দর স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং আবুল খায়ের স্টিল মিলস লিমিটেড। এ চার প্রতিষ্ঠানের ওপর রডের মূল্য ওঠা-নামা নির্ভর করে।

রড ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে রডের বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশই বিএসআরএম’র দখলে। রহিম স্টিল (আরএসএম), বন্দর স্টিল এবং আবুল খায়ের স্টিল লি. এর দখলে রয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ বাজার। এছাড়া রডের যে কেমিক্যাল আমদানি হয় তার প্রায় ৮০ শতাংশই আনে রহিম স্টিল।

ব্যবসায়ীরা জানান, ওই চার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কবির স্টিল ( কেএসআরএম), রতনপুর রি-রোলিং মিলস (আরএসআরএম), আনোয়ার ইস্পাত, শফিউল আলম স্টিল, শাহরিয়ার স্টিল মিলসও রডের বড় একটি অংশ জোগান দেয়। তবে রডের মূল্য ওঠা-নামার পেছনে এসব প্রতিষ্ঠানের খুব একটা ভূমিকা থাকে না। মূলত রডের মূল্য বাড়বে, নাকি কমবে তা নির্ভর করে বিএসআরএম’র ওপর।

পুরান ঢাকার ইংলিশ রোডের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, কাঁচামাল আমদানি, পরিবহন খরচ ও ডলারের মূল্য বেড়েছে। কিন্তু এসব কারণে রডের মূল্য যে হারে বাড়ার কথা, বেড়েছে তার থেকে অনেক বেশি। রডের মূল্য কেজিতে বেড়েছে প্রায় ১৫ টাকা। এটা কিছুতেই স্বাভাবিক নয়। এর পেছনে সিন্ডিকেট আছে।

তারা বলেন, এ সিন্ডিকেটের মূলহোতা বিএসআরএম। এ প্রতিষ্ঠানটিকে ধরলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বিএসআরএম যদি রডের মূল্য কমায় দেখবেন সব রডের মূল্য কমে গেছে। এখন যে মূল্য বেড়েছে এর পেছনেও বিএসআরএম জড়িত। এখন নির্মাণকাজের মৌসুম। ফলে রডের চাহিদ এ সময় বেশি। এ সুযোগটা কাজে লাগাতে মূল্য বাড়ানো হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, পরিবহন খরচ তো অনেক আগেই বেড়েছে। কাঁচামালের মূল্য বেড়েছে সম্প্রতি। কিন্তু এখন যেসব কাঁচামাল আসছে তার এলসি তো আরও আগে করা। তাহলে কাঁচামালের মূল্য বাড়ার কারণ দেখিয়ে রডের মূল্য বাড়ানো কতটা যুক্তিসংগত, সেটা সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখা উচিত।

ইংলিশ রোড আয়রন অ্যান্ড স্টিল মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সচিব মো. আবু তাহের বলেন, এখন নির্মাণকাজের প্রধান মৌসুম। এ সময় রডের চাহিদা বেশি। এটা টার্গেট করে সিন্ডিকেট চক্র রডের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। এ সিন্ডিকেটের পেছনে বিএসআরএম, রহিম স্টিল এবং বন্দর স্টিল জড়িত থাকতে পারে। এরাই তো রডের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

তবে সিন্ডিকেট করে মূল্য বাড়ানোর বিষয়টি অস্বীকার করেছে বিএসআরএম কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির কোম্পানি সচিব শেখর রঞ্জন কর  গণমাধ্যমকে বলেন, স্ক্র্যাপ ও ডলারের মূল্যের সঙ্গে পরিবহন খরচ, বন্দরের খরচ ও সুদের হার বেড়েছে। এসব কারণেই রডের মূল্য বাড়তি। এখানে কোনো কারসাজি বা সিন্ডিকেটও নেই। যদি সিন্ডিকেট করে রডের ম্ল্যূ বাড়ানো হতো তাহলে সবার রডের মূল্য সমান হতো।

চাহিদা বেশি থাকায় রডের মূল্য বাড়ছে, খুচরা ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্মাণকাজের মৌসুম হওয়ায় মূল্য বাড়ছে এটা সঠিক নয়। তবে বর্ষা আসলে মূল্য কমেও যেতে পারে। তার মানে এ নয় যে, সিজনাল কারণে রডের মূল্য বাড়ানো হয়েছে। তবে ‘বিএসআরএমর ওপর রডের মূল্য ওঠা-নামা নির্ভর করে’- বিষয়টি স্বীকার করেন এ কর্মকর্তা।

এদিকে কয়েক মাসের ব্যবধানে টনপ্রতি রডের মূল্য বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এই অস্বাভাবিক দাম কেন বেড়েছে রড ব্যবসায়ীদের কাছে তা জানতে চেয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন ভবনে এক মতবিনিময় সভায় এ বিষয়ে জানতে চান এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন।

তিনি বলেন, আপনাদের কত টাকা উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আর বাজারে দাম বাড়িয়েছেন কত। দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা কতটুকু বলেন। এটার সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ভাবমূর্তি জড়িত।

এ সময় রড ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি মেট্রোসেম সিমেন্ট কোম্পানির এমডি মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ বলেন, দাম বাড়ার পেছনে তিন-চারটি কারণ রয়েছে এর মধ্যে অন্যতম রডের কাঁচামাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এ কাঁচামালের উপর কর বাড়িয়েছে। আগে যেখানে আমদানি খরচ ৩০০ ডলার লাগতো। এখন সেখানে লাগে ৪৩০ ডলার। এ ছাড়া বন্দর ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি রড ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ার যৌক্তিক কারণ লিখিত আকারে জানাতে বলেন।

শেলটেক’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. তৌফিক এম সেরাজ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আবাসন ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। সেখান থেকে উত্তরণে ২০১৭ সাল ছিল রাইজিং পিরিয়ড। বছরটিতে মোটামুটি ভালো ব্যবসা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেও ব্যবসা ভালো। কিন্তু ব্যাংক সুদের হার আবার বাড়ছে। রড-সিমেন্টের মূল্য হঠাৎ করে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এটি ভালো লক্ষণ নয়।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আবাসন খাত যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, ঠিক তখনই নির্মাণ উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্মাণকাজ গতিহীন হয়ে পড়বে।

নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকেই ইতোমধ্যে নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে যথাসময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্ত অনিশ্চয়তায় মধ্যে পড়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট বুঝে না পাওয়ায় দুর্ভোগে পড়বেন চুক্তিবদ্ধ ক্রেতারা।

রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিনের মতে, সিমেন্টের ওপর কোনো ধরনের চার্জ বা কর আরোপ করা হয়নি, বাড়েনি কাঁচামালের মূল্য। তাহলে মূল্য বৃদ্ধি কেন? রড, সিমেন্ট, ইট ছাড়াও গত ছয় মাসে পাথরসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর মূল্যও বেড়েছে। আমরা মনে করি এ মূল্য বৃদ্ধি আবাসন শিল্প তথা নির্মাণ খাতের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কারণে ফ্ল্যাট হস্তান্তর অনিশ্চয়তায় পড়বে। এতে দুর্ভোগে পড়বেন চুক্তিবদ্ধ ক্রেতারা। ফলে সংকট উত্তরণের পথে থাকা আবাসন খাত আবারও বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ