ঢাকা, শুক্রবার 30 March 2018, ১৬ চৈত্র ১৪২৪, ১১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ব্যালট ছিনতাই কেন্দ্র দখল সংঘর্ষ পুলিশের গুলীতে নিহত ১

 

সংগ্রাম ডেস্ক : ইউপি ও পৌরসভা নির্বাচনে সংঘর্ষ, ব্যালট ছিনতাই ও কেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী ইউপ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগেই ব্যালট ছিনতাইকালে দু’পক্ষে সংঘর্স শুরু হয়। এ সময় পুলিশের গুলীতে যুবদল নেতা আবদুল মালেক নিহত হন।

এদিকে সুনামগঞ্জ পৌরসভা মেযর পদে উপ-নির্বাচনে ব্যালট পেপার ছিনতাই, কেন্দ্র দখল, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে পুলিশসহ ২০ জন আহত হয়।

সখীপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা : টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগে ব্যালট পেপার ছিনতাইকালে দু’পক্ষের সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুলিশের গুলীতে আবদুল  মালেক মিয়া (৪৫) নিহত হয়েছেন । বুধবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে উপজেলার সাগরদিঘী গুপ্তবৃন্দাবন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মালেক মিয়া (৪৫) ওই ইউনিয়ন যুবদল নেতা এবং গুপ্তবৃন্দাবন এলাকার নেছার আলীর ছেলে।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার সকালে ওই কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অন্যান্য কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলছে বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় জানান, রাত ৩টার দিকে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ লোক ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের জন্য ওই কেন্দ্রে হামলা চালায়। এ সময় প্রিজাইডিং অফিসারের নির্দেশে পুলিশ গুলী চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় পুলিশের গুলীতে মালেক মিয়া নিহত হন। 

জানা যায়, গুপ্তবৃন্দাবন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বুধবার দিবাগত রাত ৩টা দিকে সাগরদিঘী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হেকমত সিকদারের লোকজন ব্যালট পেপার ছিনতাই করে সিল দিচ্ছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুল্লাহ বাহারের সমর্থকরা সেখানে হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলী চালায়। এ সময় গুলীবিদ্ধ হয়ে আব্দুল মালেক (৪৫) নিহত হন। 

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ওই ভোটকেন্দ্র স্থগিত করা হয়েছে।

কেন্দ্র দখল ব্যালট ছিনতাই সংঘর্ষ

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা ও সিলেট ব্যুরো : সুনামগঞ্জ পৌরসভা মেয়র পদে উপ-নির্বাচনে ব্যালট পেপার ছিনতাই, কেন্দ্র দখল ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অভিযোগ এনে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। সেই সাথে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন তারা। দুপুর আড়াইটায় নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান গনিউল সালাদীন শহরের তেঘরিয়াস্থ নিজ বাসভবনে সাংবাদিক সম্মেলন করে নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের এই ঘোষণা দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সালাদীনের সহোদর ও সাবেক সংসদ সদস্য দেওয়ান শাসসুল আবেদীন, দেওয়ান সামারীনসহ অসংখ্য কর্মী সমর্থক।  

একই দাবিতে দুপুর ৩টায় জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দেওয়ান সাজাউর রাজা সুমন এর পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এর দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সাংবাদিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের  উপদেষ্টা ও সাবেক হুইফ ফজলুল হক আসফিয়া, জেলা বিএনপি’র সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম নুরুল, সাংগঠনিক সম্পাদক ও তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল, জেলা বিএনপি নেতা নাদের, সেলিম উদ্দিন ভোট্টো, মোনাজ্জির হোসেন  সুজন প্রমুখ।

জেলা বিএনপির সভাপতি প্রেস বিফিংকালে সুনামগঞ্জ পৌর উপ-নির্বাচনকে তামাশার নির্বাচন উল্লেখ করে বলেন ফলাফল যদি আগেই নির্ধারিত থাকে তাহলে ঘটা করে নির্বাচনের আয়োজন করার কি দরকার ছিল? তিনি বলেন দুপুর ১২টার আগেই প্রত্যেকটি কেন্দ্র সরকার দলীয় লোকজন দখল করে আমাদের এজেন্টদের বের করে দিয়েছে। ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে দেখেন তাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে দলীয় ক্যাডাররা ব্যালট পেপারে সিল মেরেছে। তিনি প্রহসনের এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান। 

স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান গনিউল সালাদীন বলেন, পৌরসভার ২৩টি কেন্দ্রের মধ্যে অধিকাংশ কেন্দ্র সরকার দলীয় লোকজন সকাল থেকে নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। সেখান থেকে আমার লোকজনকে জোরপূর্বক বের করে দিয়ে সাধারণ ভোটারগণের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করে। এ সময় দলীয় লোকজন ব্যালট পেপারে সিল মারতে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বারবার অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি। সকাল সাড়ে ১০টায় উত্তর আরপিননগর কেন্দ্র থেকে ব্যালট পেপার ছিনতাই করে নিয়ে যায় এবং দুপুর দেড়টার দিকে একই কেন্দ্রে সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে গেলে বাধা দেয়া হয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই নৌকা সমর্থকরা আমার বাড়িতে হামলা চালায়, আমার লোকদের ওপর আক্রমণ করে তাদের আহত করে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ  ভোটারগণের তথা শহরবাসীর জানমালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নির্বাচন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি। সেই সাথে কারচুপির নির্বাচন বাতিল করে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পুনরায় নির্বচন দেয়ার দাবি জানান এই স্বতন্ত্র প্রার্থী। 

এদিকে কেন্দ্র দখল ও পাল্টা দখলের ঘটনায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় শান্তির শহর সুনামগঞ্জ। সকালে নৌকা সমর্থক লোকজন উত্তর আরপিননগর কেন্দ্র থেকে ব্যালট পেপার ছিনতাই করলে নির্বাচন কমিশন থেকে ছিনতাই হওয়া ব্যালট পেপারগুলো বাতিল ঘোষণা করা হয়। এ সময় কিছু সময়ের জন্য ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকলেও প্রশাসনের সহযোগিতায় পুনরায় ভোট গ্রহণ চলে। দুপুর ১টার দিকে আবার সরকার দলীয় লোকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোটারদের ভোট প্রদানে বাধা প্রদান করলে উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে পুলিশ কনস্টেবলন সাইফুরসহ উভয় পক্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ শতাধিক রাইন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ভোট কেন্দ্র পুরোপুরি দখলে নিয়ে নেয় নৌকা সমর্থকরা। একই সময়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান গনিউল সালাদিনের বাসাভবনেও হামলা চালানো হয়  এবং তার বাড়ির সামনে থেকে ২ জনকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। এ ঘটনায় পুরো শহরজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোন সময় আবারো বড় ধরনের সংঘর্ষের আশংকা করছেন শহরবাসী। 

এদিকে বেলা ১১টার দিকে পিটিআই কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে সরকার দলীয় সমর্থকদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একই সময় মল্লিকপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কালিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, কেন্দ্রের ভিতরে নৌকা সমর্থক লোকজন মহড়া প্রদর্শন পূর্বক সাধারণ ভোটারগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ধানেরশীষের কর্মী সমর্থকরা কেন্দ্র ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। মুহাম্মদপুর ব্লুস্কাই কেন্দ্রে ভোট দিতে গেলে ঐ কেন্দ্রের ভোটারকে বাধা প্রদান করেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সেক্রেটারি রফিক চৌধুরী। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে বাদানুবাদ সৃষ্টি হলে কিছুক্ষণের জন্য কেন্দ্রে আতঙ্ক বিরাজ করে।  বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটার এডভোকেট শাহাবুদ্দিন জানান দুপুর ২টার দিকে ভোট দেয়ার জন্য কেন্দ্রে গেলে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা জানান তার ভোট দেয়া হয়ে গেছে। হাছননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটার নাদের বলেন, কেন্দ্রে গিয়ে দেখি আমার ভোট দেয়া হয়ে গেছে। ভোটের একটি বড় সংখ্যা ভোট গ্রহণের পূর্বেই কাস্ট করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। একই অবস্থা প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রেই। 

অপরদিকে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে গিয়ে জানাযায়, ডিজিটাল আইডি কার্ডের সাথে নির্বাচন কমিশনের দেয়া ভোটার তালিকার নম্বরের মিল না থাকায় প্রতি কেন্দ্রেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার তাদের ভোট প্রদান থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এটিকে অনেক ভোটাররা নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল জালিয়াতি বলে অভিহিত করছেন।

বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর বর্জন

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট প্রদানের অভিযোগ এনে সুনামগঞ্জ পৌরসভার উপ-নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী দেয়ান সাজাউর রাজা সুমন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী গণিউল সালাদীন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে তারা ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। 

শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডস্থ বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রশাসনের সহযোগিতায় আগে থেকে জাল ভোট দিয়ে বাক্স ভরে রেখেছে। এটা নির্বাচনের নামে তামাশা করেছে।’ তাদের দাবি, ‘রাতভর সরকার দলীয় নেতা কর্মীরা কেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট পেপারে সিল মেরেছে। সাধারণ ভোটারা ভোট দেয়ার আগেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে গেছে। এমন প্রহসনের নির্বাচন বর্জন করেছে পৌরবাসী।’

সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি, সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন মিলন সাধারণ ভোটারা যাতে নির্বিঘেœ সুষ্ঠভাবে ভোট দিতে পারে সে লক্ষ্যে সেনাবাহীনির অধীনে পুনরায় নির্বাচন দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় বিএনপি চেয়ারাপর্সনের উপদেষ্টা ফজলুল হক আসপিয়া, বিএনপি নেতা ওয়াকিফুর গিলমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী গণিউল সালাদীন তার নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সরকার দলীয় প্রার্থীর লোকজন প্রতিটা কেন্দ্র থেকে আমার নির্বাচনী এজেন্টদেরকে বের করে দিয়েছে। বিশেষ করে কেবি মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উত্তর আরপিন নগর পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকার দলীয় নেতা কর্মীরা জোরপূর্বক ভোট কেন্দ্রে ঢুকে নৌকা মার্কায় সিল মারে। এইভাবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। আমি এই নির্বাচন বর্জন করছি।’

আওয়ামী লীগের প্রার্থী নাদের বখত বিজয়ী

আয়ূব বখত জগলুলের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া সুনামগঞ্জ পৌরসভার উপ-নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন তাঁরই ছোট ভাই আওয়ামী লীগের প্রার্থী নাদের বখত। গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেসরকারিভাবে তিনি নির্বাচিত হন। এদিকে, বেসরকারিভাবে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নাদের বখত বিজয়ী হওয়ায় পৌরশহরে আনন্দ-উল্লাস করছেন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ