ঢাকা, শুক্রবার 30 March 2018, ১৬ চৈত্র ১৪২৪, ১১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনার এফ আর জুটের গোডাউনে  বার বার অগ্নিকান্ড রহস্যজনক

 

খুলনা অফিস ঃ খুলনার আটরা বাইপাস সড়কের এফ আর জুট মিলস লিমিটেড-এর গোডাউনের আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপনের জন্য গতকাল বৃহস্পতিবারও ড্যাম্পিং ডাউনের কাজ করেছে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় আগুন নিয়ন্ত্রনের দাবি জানানো হলেও গতকাল দুপুর পর্যন্ত থেকে থেকে জ্বলতে দেখা গেছে। এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ঢাকা থেকে আগত সার্ভে টিমের সদস্যরা। একই সাথে খুলনার এফ আর জুটের গোডাউনে বার বার আগুন লাগাকে রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন বীমা কোম্পানির কর্মকর্তারা। 

অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত এখনও রহস্যাবৃত রয়েছে। অগ্নিকান্ড সংঘটিত গুদামগুলোতে কোন ধরণের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকলেও মিল কর্তৃপক্ষ বৈদ্যুতিক সর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করছেন। এছাড়া মালিক পক্ষ আগুনে ক্ষতির পরিমাণ ৭৫ কোটি টাকা দাবি করে থানায় জিডি করেছেন। তবে, ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ এখনও আগুন লাগার কারণ এবং ক্ষতির পরিমান নিরূপণ করতে পারেননি।

অপরদিকে, মিলে অগ্নিকান্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, ব্যাংক ঋণ এবং ইন্স্যুরেন্স দাবিসহ সার্বিক বিষয় অনুসন্ধানে তিনটি সংস্থার পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি ইতিমধ্যেই সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।

এর আগে ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর শনিবার বিকেল ৩টার দিকে নগরীর দৌলতপুর খান ব্রাদার্সের কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে অবস্থিত এফ আর জুট ট্রেডিংয়ের পাট গুদামে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। 

গত মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ৩টার দিকে শরীফ ফজলুর রহমানের মালিকানাধীন এফআর জুট মিলের ইউনিট-২ (নবনির্মিত), বর্তমানে ব্যবহৃত গোডাউনের পাটের গর্দা (বাতিল সুতার অংশ) থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পার্শ্ববর্তী অন্যান্য গোডাউনে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ৭টি এবং নৌবাহিনীর দুটিসহ ৯টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ করে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স খুলনার উপ-সহকারী পরিচালক ইকবাল বাহার বুলবুল বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পাটের ভিতরে কোথাও কোথাও থেমে থেমে আগুন জ্বলছে। পুরোপুরি নেভাতে আরও সময় লাগবে। তবে, আগুন যাতে আর ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য ডাম্পিং’র কাজ করছেন তারা। তিনি আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে বলেন, যেহেতু গোডাউন এলাকায় কোন ধরণের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই। সেহেতু শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার কোন সম্ভাবনা নেই। অন্যকোন ভাবে আগুন লাগতে পারে। তবে, আগুন পুরোপুরি না নেভানো পর্যন্ত ক্ষতির পরিমান এবং কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস থেকে ২/১ দিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।’

সোনালী ব্যাংক করপোরেট শাখার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার গোপাল চন্দ্র গোলদার জানান, আগুনে ক্ষতিসহ সার্বিক বিষয়ে জানার জন্য করপোরেট শাখার এসিসটেন্ট জেনারেল ম্যানেজার মো. শহীদুল আলমকে প্রধান করে ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সদস্যরা হলেন-করপোরেট শাখার এসিসটেন্ট জেনারেল ম্যানেজার মো. গাজী আল বেরুনী, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার বিশ্বনাথ সোম, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার শেখ মঞ্জুর হোসেন, প্রিন্সিপাল অফিসার মো. হাবিবুর রহমান ও প্রিন্সিপাল অফিসার মো. মিজানুর রহমান। এছাড়া মিলের দায়িত্বে থাকা ব্যাংকের প্রতিনিধি (গোডাউন কিপার) মো. শহীদুল্লাহকেও সার্বিক বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (ক্লেমস) মো. কবির আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স এবং তিনটি কো-ইন্স্যুরেন্স মিলে এফ আর জুট মিলে ১৫৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বীমা রয়েছে। সার্ভে প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট এবং তাদের পক্ষ থেকে সরেজমিন তদন্ত কার্যক্রম শেষেই ক্ষতি ও আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে জানা যাবে।

গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক শাহ জাহাঙ্গীর আবেদ বলেন, ‘একই প্রতিষ্ঠানে দুই বছর আগে আগুন লেগেছিল। সে সময় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ১৬ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছিল। তবে, পরে ৮ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ নিতে সম্মতি জানায় তারা। এখনও ওই আগুনের ক্ষতিপূরণ নিস্পত্তি হয়নি।’ অনুসন্ধানে জানা গেছে, এফ আর জুট মিলস লিমিটেডের নামে রাস্ট্রায়ত্ব সোনালী ব্যাংক করপোরেট শাখায় মোট ১০০ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে প্লেজ লোন ৭০ কোটি টাকা এবং হাইপো লোন রয়েছে ৩০ কোটি টাকা। এছাড়াও মিল প্রজেক্টে ব্যাংকের মোটা অংকের ঋণ বিনিয়োগ রয়েছে।

সোনালী ব্যাংক করপোরেট শাখার সূত্র জানান, ব্যাংকের রেকর্ড অনুযায়ী মিলটিতে আগুন লাগার আগ পর্যন্ত‘র’ পাট ছিল ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫০১ মণ এবং পাটপণ্য-সূতা (সিআরটি) ছিল এক হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন। যার ব্যাংক মূল্য (অগ্রীম) ৬৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং বর্তমান বাজার মূল্য ৮৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অপরদিকে, এফআর জুট মিলিটেডের নামে মিলটির নামে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ভবন, মেশিনারিজ এবং পাটসহ ১৫৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বীমা রয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র পাটের বিপরীতেই রয়েছে ৮৬ কোটি ৫২ লাখ টাকার বীমা। তবে, মোট ১৫৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বীমার মধ্যে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ৭০ শতাংশ এবং কো- ইন্স্যুরেন্স হিসেবে প্রগতি, ইস্টার্ন ও পাইওনিয়ারেরও ১০ শতাংশ করে শেয়ার রয়েছে।

এ ব্যাপারে খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লিয়াকত আলী জানান, আগুন লাগার কারণ উদঘাটনে পুলিশের তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যার প্রধান তিনি নিজেই। বাকি দুই সদস্য হলেন-এসআই মো. শওকত আলী ও এসআই বিধান চন্দ্র সানা। তিনি জানান, বুধবার থানায় এফ আর জুট মিলের জেনারেল ম্যানেজার তাজুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি জিডি করেছেন (জিডি নং-১০৯৩)। জিডিতে মোট ৮টি গুদামে অগ্নিকান্ডে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৭৫ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছে। একই সাথে জিডিতে আগুনের সূত্রপাত শর্ট সার্কিট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ৮টি গুদামের নাম উল্লেখ করে সব পাট পুড়ে বিনষ্ট হয়েছে বলে দাবি করা হয়।  জুট মিলের জেনারেল ম্যানেজার মো. তাজুল ইসলাম বলেন, মিলের বাউন্ডারীর সংলগ্ন বিদ্যুতের ক্যাবল থেকে শর্ট সার্কিটে এ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। একই সাথে আগুনে আনুমানিক ৭৫ কোটি টাকার পাট ও পণ্যের ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে খানজাহান আলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করা হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ