ঢাকা, শুক্রবার 30 March 2018, ১৬ চৈত্র ১৪২৪, ১১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চট্টগ্রামে পিডিবির বিরুদ্ধে গ্রাহকের ৩৮ অভিযোগ

 

নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রামে দুদকের গণশুনানিতে পিডিবির বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ বিল ও মিটার রিডিংয়ে গরমিল, মিটার পেতে দীর্ঘসূত্রতা, ট্রান্সফরমার সংস্কার ও গাড়ি সংকটসহ ৩৮টি অভিযোগ উঠেছে। বুধবার চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদের পিডিবি প্রধান কার্যালয়ে দুদকের গণশুনানিতে এসব শুনেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ। 

গণশুনানিতে পিডিবির গ্রাহক মো. আবু বকর অভিযোগ করে বলেন, আমার মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে বিলের ৩৪৫ ইউনিটের গরমিল জানতে হালিশহরের নিউমুরিং অফিসের মিটার রিডার ওমর সাহেবের কাছে গেলাম। ওনাকে জিজ্ঞাস করলাম ইউনিটের গরমিল কেন এবং এর সমাধান কি? ওমর সাহেব জবাবে আমাকে বলল চারতলা থেকে লাফ দেন, সব সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, এর আগে বেশ কয়েকবার অফিসে গিয়েও মিটার রিডার ওমর সাহেবকে পাইনি। পরে অফিস থেকে মোবাইল নাম্বার নিয়ে বেশ কয়েকবার কল দিলেও তিনি ধরেননি। পরদিন আবার ফোন দিলে তিনি আমাকে অফিসে যেতে বলেন। অফিসে যাওয়ার পর বিষয়টি সমাধান না করে বরং তিনি আমাকে আত্মহত্যা করতে বললেন। এর সুষ্ঠু বিচার প্রার্থনা করছি দুদক কমিশনারের কাছে। 

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে চেকের মাধ্যমে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে এখনোও বিদ্যুৎ সংযোগ, মিটার পাইনি। এর বছরখানেক পর আরও ৫০ হাজার টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় উল্টো আমার বৃদ্ধ বাবাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বিদ্যুৎ অফিস থেকে বের করে দিয়েছে পিডিবির চকরিয়া উপজেলার আবাসিক ফয়জুল আলীম আলো। এমন অভিযোগ করেন পিডিবি গ্রাহক চকরিয়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের শমসের পাড়ার ছৈয়দ আলমের ছেলে মনসুর আলম মিন্টু।

এসময় অভিযোগকারী বিদুৎ সংযোগ পেতে ছৈয়দ আলমের মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে পিডিবি কর্মকর্তাকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেওয়া ও উত্তোলনে ব্যাংকের হিসাব বিবরণী কপি এবং সংশ্লিষ্ট কাজগপত্রও দুদক কমিশনারের হাতে দেন।

মনসুর আলম মিন্টু বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি বাবার অ্যাকাউন্ট থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দিই। টাকা নিয়ে এক বছর ধরে বিদ্যুৎ সংযোগ দিবে দিবে বলে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। পরবর্তীতে চলতি বছরের ৭ মার্চ আমার বাবা চকরিয়া বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে প্রকৌশলী ফয়জুল আলীমের কাছে সংযোগ দিতে দেরি হওয়ার কারণ জানতে চান। এসময় তাড়াতাড়ি সংযোগ পেতে হলে তিনি আরও ৫০ হাজার টাকা দাবি করলে বাবা রাজি হননি। তখন বাবা আগের টাকাগুলো ফেরত চান। তখন প্রকৌশলী ফয়জুল উল্টো বিদ্যুৎ অফিস থেকে আমার ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাবাকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। যা অত্যন্ত অপমানকর। 

তিনি আরও বলেন, টাকা দেয়ার বিষয়, বাবাকে গলা ধাক্কা দিয়ে অপমানের বিষয়গুলো স্থানীয় চেয়ারম্যানকে জানানো হলেও কোন সুরাহা পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ২২ মার্চ চকরিয়ার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে পিডিবির প্রকৌশলী ফয়জুল আলীম, দেবানন্দ দত্তসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে আমার বাবা একটি ফৌজদারী মামলা দায়ের করেন। মামলার খবর পেয়ে পরদিন বিকেলের দিকে ফয়জুল সাহেবসহ আরও বেশ কয়েকজন আমাদের বাড়িতে গিয়ে বাবাকে অপমান করেন। এমনকি মামলা তুলে নিতে নানা ধরনের হুমকি দেন। তখন বাবা রাজি হননি। পরে বাড়ি থেকে ফিরে গিয়ে সরকারি কাজে বাঁধা দিয়েছে বলে বাবার বিরুদ্ধে মামলা করেছে পিডিবির প্রকৌশলী। এ মামলায় আমার বাবাকে থানায় ধরে নিয়ে যায়।

কান্না জড়িত কণ্ঠে মনসুর আলম মিন্টু আরও বলেন, ‘আমার বৃদ্ধ বাবা এখনো জেলহাজতে। ওরা মিথ্যে মামলা দিয়ে বাবাকে জেল খাটাচ্ছে। সংযোগ পেতে টাকা দিয়ে হয়রানি কিনে নিয়েছি। আমি এর সু-বিচার চাই। মনসুর আলম মিন্টু কেঁদে কেঁদে বিচার চেয়ে এক পর্যায়ে দুদক কমিশনারের পায়ে ধরে ফেলেন। এসময় বাবাকে ছাড়ানোর এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও অনুরোধ জানান তিনি।

এসব অভিযোগ শুনে দুদক কমিশনার দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পিডিবি চট্টগ্রামের চীফ ইঞ্জিনিয়ার প্রবীর কুমার সেনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চান। তখন প্রবীর কুমার সেন বলেন, চকরিয়ার বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

দুদকের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. আকতার হোসেন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত বিব্রতকর। ওই আবাসিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুদকে একটি আবেদন করেন। অভিযুক্ত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও আশ্বাস দেন তিনি।

নগরীর আগ্রাবাদের আবুল বাশারের মিটার রিডিংয়ের সাথে বিদ্যুৎ বিলের ৫ হাজার ইউনিটের গরমিল নিয়েও অভিযোগ করেন এই গ্রাহক। কালুরঘাটের সিরাজুল ইসলামের মিটারের সাথেও বিলের গরমিলের অভিযোগ শুনানিতে উত্থাপিত হয়।

শুনানি শেষে দুর্নীতি না করতে পিডিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুঁশিয়ার করেছেন দুদক কমিশনার নাসির উদ্দীন আহমেদ। তিনি বলেছেন, অতীতে যাই ভুল করে থাকেন, এখন থেকে সংশোধন হয়ে যান, নতুবা কিন্তু আমরা কাউকে ছাড়ব না। আপনারা বিপদে পড়ে যাবেন, জেলখানায় যেতে হবে। চাকরি থেকে আপনাদের তাড়াতাড়ি বিদায় নিতে হবে। যদি আপনাদের হয়রানি করে, অর্থের ব্যাপার থাকে সে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করেছে এবং সেই সম্পদের যদি তথ্য দিতে পারেন, সে যেই হোক, ব্যবস্থা নেব।

প্রতি শনিবার চট্টগ্রাম পিডিবির ১২টি বিভাগে গণশুনানি করার নির্দেশ দেন নাসির উদ্দীন। দুদকের বিভাগীয় পরিচালক মো. আক্তার হোসেনের পরিচালনায় গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ