ঢাকা, শনিবার 31 March 2018, ১৭ চৈত্র ১৪২৪, ১২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ও বর্জ্য নিষ্কাশন শিক্ষার গুরুত্ব

আবুল হাসান ও খনরঞ্জন রায় : একুশ শতকের জীবন প্রযুক্তিনির্ভর। দৈনন্দিন জীবনের আরাম-আয়েশ থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে সর্বত্র আমরা যন্ত্রনির্ভর। যন্ত্র চালাতে প্রয়োজন শক্তির। তাই শক্তির চাহিদা বিশ্বজুড়ে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা মেটানো এ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। শক্তির চাহিদা মেটাতে ব্যবহার হচ্ছে প্রচলিত এবং অপ্রচলিত বিভিন্ন শক্তির উৎস। প্রচলিত শক্তির উৎসগুলো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর (তেল, গ্যাস, কয়লা)। এছাড়াও রয়েছে পারমাণবিক শক্তি। অপ্রচলিত ধারাটি সৌরশক্তিনির্ভর বায়ুশক্তি ও জলবিদ্যুৎ। গত ১৫ বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়- শক্তির প্রধান উৎস হচ্ছে তেল, তার পর যথাক্রমে কয়লা ও গ্যাস। তেল, কয়লা ও গ্যাসের ব্যবহার ভবিষ্যতেও কয়েক দশক ধরে বাড়তে থাকবে। উন্নত বিশ্ব কয়লা নির্ভরতা কমাতে চাইলেও ভারত ও চীনের মতে রাষ্ট্রগুলো ভীষণভাবে কয়লানির্ভর। এই দুই জনবহুল রাষ্ট্র তাদের শক্তির চাহিদার বড় অংশ কয়লা থেকেই মেটাতে পরিকল্পনা করে থাকে। কয়লার বড় মজুদও দেশ দুটির আছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বিশ্বজুড়ে শক্তি চাহিদায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এর পর রয়েছে পারমাণবিক শক্তি।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অপশন হিসেবে পরমাণু বিদ্যুৎ বেছে নেয়ার পেছনে রয়েছে বর্তমান বিশ্বে ক্রমবর্ধমান চুল্লি নির্মাণের চাহিদা, উন্নত দেশগুলোর পরমাণু বিদ্যুতের উপর আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎ পাওয়ার নিশ্চয়তা। বর্তমান বিশ্বের ৩১টি দেশে ৪৪২টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু আছে, যা বর্তমান বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১১ শতাংশের জোগান দিচ্ছে। এছাড়াও ১৬টি দেশে আরও ৬৬ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকায় চালু আছে ৯৯টি, নির্মাণাধীন ৫টি, রাশিয়ায় চালু আছে ৩৫টি, নির্মাণাধীন ৮টি, চীনে চালু আছে ৩১টি, নির্মাণাধীন ২৪টি, ভারতে চালু আছে ২১টি, নির্মাণাধীন ৬টি।
এসব পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে লক্ষাধিক ডিপ্লোমা ইন এটামিক ইঞ্জিনিয়ার রাত-দিন কর্মরত থেকে উৎপাদনের সাথে সাথে নিরাপত্তাবলয় সৃষ্টি করে রেখেছে। তাদের বেতন ভাতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় উচ্চ হারের।
চলমান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একেকটি একেক জেনারেশনের এবং তাদের রয়েছে একেক মডেল। পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনার জন্য নির্বাচিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি জেনারেশন ৩+ এবং রাশিয়ার উন্নত প্রযুক্তি মডেলের ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট এবং পরবর্তী বছর দ্বিতীয় ইউনিট চালুর মধ্যদিয়ে বিশ্বের ৩২তম পরমাণু চুল্লি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে পরমাণু বিশ্বের খাতায় নাম লেখাবে বাংলাদেশ। আমাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬০ সালে পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগে নেয়ার পর ১৯৬৩ সালে প্রস্তাবিত ১২টি এলাকার মধ্যে থেকে বেছে নেয়া হয় রূপপুরকে। পরে রূপপুর নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও কার্যক্রম আর এগোয়নি। ১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় থাকার সময় ছোট পরিসরে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তখন এটি ছিল ২০০ মেগাওয়াটের। সে সময় বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য জামাতা পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়াকে প্রকল্প পরিচালক করেছিলেন। রাশিয়ার সঙ্গে তিনি যোগাযোগও করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পর প্রকল্পটি থমকে যায়। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবার উদ্যোগ নেয়া হলেও আর্থিক অসঙ্গতির কারণে সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রায় ৫০ বছর আগের নেয়া উদ্যোগটি সক্রিয় করে তোলা হয়। দ্রুত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ২০১০ সালে সংসদে প্রস্তাব পাস করে গঠন করা হয় একটি জাতীয় কমিটি। ৬ ডিসেম্বর ২০১৬ শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি সরকারের ১০টি অগ্রাধিকার প্রকল্পের একটি। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের মেয়াদকাল হলো ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। এই প্রকল্পে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে রাশিয়া। বাকি টাকা দেবে সরকার। পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এই প্রকল্প থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রায় ৬০ বছর ধরে পাওয়া যাবে।
একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ননির্ভর করে সে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কতটা উন্নত তার ওপর। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার জ্বালানি নীতিমালা ও পিএসএমপি-২০১০ গ্রহণ করে, যেখানে ২০২১ সালের মধ্যে ২৪০০০ মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৯০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা গৃহীত হয়। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অংশ হিসেবে ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ বাংলাদেশ ও রুশ ফেডারেশনের মধ্যে পাবনার রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য চুক্তি সই হয়।
ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা বিভাগে ৩টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঐতিহাসিক ঘোষণাকে ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ স্বাগত জানাচ্ছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলার আধুনিক রূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে বাংলাদেশের ৯৬ হাজার ৪২০টি গ্রামে রাত-দিন চব্বিশ ঘন্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে। এই শতাব্দীর মধ্য ভাগে ১ লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই উচ্চাভিলাষী ভিশন বাস্তবায়ন করতে হলে প্রতি বিভাগে দশ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলো একটি হাই টেকনোলজি কর্মকা-। এর বিপরীতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হয়, কিন্তু বিদ্যুৎ উন্নয়ন ব্যয় সর্বনিম্ন। দুর্ঘটনা না হলে পরিবেশ বিপর্যয়ের কোন কারণ নেই। চলমান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে সাড়ে তিন ঘন্টায় একটি এটম বোমা তৈরি করা যায়।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার রি-অ্যাক্টর বা পারমাণবিক চুল্লিতে পরমাণু বিভাজন থেকে নিঃসৃত শক্তি নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হয়। বোমায় এ শক্তি নির্গত হয় অনিয়ন্ত্রিত ও তাৎক্ষণিকভাবে। পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হয় ২৩৫ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। এই পদ্ধতিতে অল্প জ্বালানির সাহায্যে দীর্ঘকাল ধরে বেশি পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। নিউক্লিয়ার পাওয়ার রি-অ্যাক্টরে উৎপন্ন তাপকে ব্যবহার করে জলীয়বাষ্প উৎপাদন করা হয়। সেই বাষ্প বিদ্যুৎ জেনারেটরের টারবাইনকে ঘোরায়।
রি-অ্যাক্টর থেকে কোন কার্বনডাইঅক্স্াইড গ্যাস নির্গত হয় না। অথচ, কয়লা, তেল, গ্যাস দ্বারা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কার্বনডাইঅক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়ে পরিবেশকে দূষিত করে। গ্রিন হাউজ অ্যাফেক্ট তৈরি করে আবহাওয়ার উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপন্নের বড় বাধা এর প্রারম্ভিক খরচ, আর উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনবল। ভূপাল, চেরনোবিল, ফুকুশিমার মত দুর্ঘটনা ঘটে হাজার-হাজার লোকের মৃত্যুর কারণ হতে পারে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের। রূপপুরে নির্মাণাধীন এত বড় ও উচ্চতম বৈজ্ঞানিক জ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা বুঝে নেয়ার মতো অভিজ্ঞ জনবল দেশে নেই। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। এমনকি সরকার কোনো বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ করেনি, এমন একটি সংবেদনশীল প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে এটমিক এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং ও এটমিক ওয়াস্ট ডিসপোজাল, পারমাণবিক বর্জ্য নিষ্কাশনের মতো গুরুত্বের শিক্ষায় অন্তত ডিপ্লোমা কোর্স চালু করার প্রয়োজন ছিল।
সময় বেশিদূর গড়ায়নি। এখনো দ্রুততার সাথে এ বিষয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা শিক্ষা চালু এবং সকল ডিপ্লোমা শিক্ষাকে একই ছাতার নীচে আনার জন্য ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা যায়।
এ কাজ যত দ্রুত হবে দেশের পারমাণবিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আশঙ্কা ততই বিদূরিত হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে না?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ