ঢাকা, শনিবার 31 March 2018, ১৭ চৈত্র ১৪২৪, ১২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে নরসিংদীর ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট

অধ্যাপক ড. এএমএএম জুনায়েদ ছিদ্দিকী : কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার সন্নিকটে অবস্থিত নরসিংদী একটি অন্যতম অগ্রসরমান জেলা। যেখানে আধুনিক শিল্প ও কল-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য মানুষের জীবন ও জীবিকার উৎস। ঐতিহ্যগতভাবে তাঁত শিল্পের জন্যে সুপরিচিত এই জেলার উৎপাদিত তাঁত পণ্য সমগ্র বাংলাদেশের চাহিদা সিংহভাগ পূরণ করে চলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় শেখেরচর (বাবুরহাট) এলাকাটি প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। বর্তমানে নরসিংদীর এই বস্ত্রশিল্প ক্রমবিকাশমান এবং লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থানের উপলক্ষ। যদিও দীর্ঘদিন যাবত নরসিংদীতে এই শিল্পের বিস্তার ও প্রসার দৃশ্যমান তথাপি লক্ষণীয় যে সংশ্লিষ্ট বস্ত্র প্রযুক্তি (Textile Engineering) এবং সমসাময়িক বিষয়সমূহে শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্যে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। বস্ত্রশিল্পের প্রয়োজনে কেবলমাত্র বিদেশি যান্ত্রিক প্রযুক্তি আমদানিপূর্বক পুরনো প্রযুক্তি আধুনিকায়ন হয়েছে। যার ফলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ভার সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের বহন করতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বস্ত্রশিল্পে নতুন যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার অবশ্যম্ভাবী, দেশীয় প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ের প্রয়োজনে এই জেলায় বস্ত্র ও তাঁত শিল্প-সংশ্লিষ্ট শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা অতীব প্রয়োজন।
ঐতিহাসিকভাবে নরসিংদী জেলা প্রাচীন সভ্যতার বহু নিদর্শন ধারণ করে আছে। ইতিমধ্যে প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ বেলাবো উপজেলার ‘ওয়ারী বটেশ্বর’ গ্রামে অবিষ্কৃত হয়েছে যা এই অঞ্চলের এক সময়ের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ও উন্নত মানসম্পন্ন সভ্যতার পরিচায়ক। এছাড়া শিবপুর উপজেলার ‘জয় মঙ্গল’ গ্রাম এবং পলাশ উপজেলার ‘পারুলিয়া’ গ্রামে প্রাচীন গুপ্তযুগ ও পরবর্তী মুঘল আমলের নানা নিদর্শনসমূহ আজো বহুবিধ গবেষণার বিষয়বস্তু। পূরাকীর্তির এই বিপুল ভা-ারে সমৃদ্ধ এই জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রকৃতস্বরূপ উদঘাটনের নিমিত্তে এতদসংশ্লিষ্ট শিক্ষা ও গবেষণার যথাযথ উদ্যোগ অদ্যাবধি গ্রহণ করা হয়নি। এর ফলে এতদাঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিম-ল আশানুরূপভাবে বিকশিত হয়নি এবং অদ্যাবধি সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বা কর্মকা- দৃশ্যমান নয়। পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহে প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্বর্পূণ অঞ্চলসমূহকে সুরক্ষাপূর্বক যথাযথ গবেষণা ও প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী সকল সভ্যদেশসমূহে নিজ নিজ ঐতিহাসিক স্থানসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ একান্ত কর্তব্য। একইভাবে নরসিংদীর ঐতিহাসিক সভ্যতার নিদর্শনসমূহকে সংরক্ষণ ও সীমিত আকারে পর্যটন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হতে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ভূমিকা পালনের দাবি রাখে। এর ফলে এ অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস উদঘাটন সম্ভবপর হবে।
আধ্যাত্মিক বহু সাধক এবং সমসাময়িক অনেক মুক্তিযোদ্ধা, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প-িত ব্যক্তিত্ব নরসিংদীতে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং এখনো নরসিংদীর মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। এদের মধ্যে উল্লেখ্য হলেন উপহমহাদেশের প্রথম বাঙালি আইসিএস স্যার কে.জি. গুপ্ত, পবিত্র কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, বিখ্যাত কবিয়াল হরিচরণ আচার্য, মৌলভী সেকান্দর আলী, কবি দ্বিজদাস, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল-আজাদ, আব্দুল মোমেন খান (প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী) আহমদুল কবির মনু মিয়া (সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ) প্রমুখ। লক্ষণীয় যে, এসব আলোকিত ব্যক্তিদের জীবনাচার, দর্শন ও নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বহুল প্রচার ও স্বীকৃতির যথাযথ উদ্যোগ অদ্যাবধি নেয়া হয়নি। তাই অনতিবিলম্বে এই গুণীদের জীবন ও কর্মের বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধানের প্রতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে একটি শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি অর্থানুকূল্যে এই জেলায় স্থাপন করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে নরসিংদী জেলার মানুষের কালজয়ী ভূমিকা অনস্বীকার্য। উনসত্তরের শহীদ আসাদ এবং একাত্তরের শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান আমাদের গর্ব ও আদর্শ এবং চিরকাল এই জেলাবাসীর হৃদয়ের মণিকোঠায় আরাধ্য। জাতির এই সূর্যসন্তানদের মনে যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন প্রোথিত ছিল, শোষণমুক্ত সমাজ ও দেশ গঠনের যে প্রত্যয় দীপ্যমান ছিল, প্রকৃত শিক্ষা, গবেষণা ও উৎকর্ষের অভাবে তা আজও আমাদের হাতের নাগালের বাইরে। কেবলমাত্র প্রকৃত জ্ঞানের চর্চা, সঠিক ইতিহাসের প্রচার ও প্রসার এবং আধুনিক মেধা ও মানসম্পন্ন জাতি গঠনের মাধ্যমে বীর শহীদদের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব।
তাই নরসিংদীর এবং এতদাঞ্চলের জনগণের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ের দাবি, এর ফলে এই জেলার সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সন্তানরা জ্ঞানের আলোতে আলোকিত হয়ে এই জেলাসহ সারা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী নরসিংদীবাসীর দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তবায়নে সদয় দৃষ্টি দেবেন এই প্রত্যাশা রইল।
লেখক : ভেটেরিনারি মেডিসিন অনষদ, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ