ঢাকা, রোববার 1 April 2018, ১৮ চৈত্র ১৪২৪, ১৩ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আন্দোলনের মাধ্যমেই বেগম জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করা হবে

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : দলের চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করতে ‘আন্দোলন’ ছাড়া এখন অন্য কিছু চিন্তা করছে না বিএনপি। গতকাল শনিবার বিকেলে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় দলের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই দেশে গণতন্ত্রের যতটুকু অর্জন হয়েছিলো, যিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করেছিলেন, তাদের বিদায় করেছিলেন, সেই গৃহবধূ থেকে দেশের পথে প্রান্তরে গণতন্ত্রের গান গেয়ে বেড়িয়েছেন আজকে সেই গণতন্ত্রের মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সরকার অন্যায়ভাবে বন্দী করে রেখেছে। আমরা স্পষ্টভাষায় বলতে চাই, আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই, বেগম জিয়াকে মুক্ত করার একটাই পথ। সেটি হচ্ছে আন্দোলন, আন্দোলন এবং আন্দোলন। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা দেশনেত্রীকে কারামুক্ত করবো। তার আগে অন্য কোনো কিছু আমরা চিন্তা করছি না, করব না।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি‘র পরিচালনায় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। অন্যদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, মির্জা আব্বাস, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালাম, ফজলুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
অঙ্গসংগঠনের মধ্যে মহানগর উত্তরের আহসানউল্লাহ হাসান, দক্ষিণের হাবিবুর রশীদ হাবিব, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাদেক আহমেদ খান, শ্রমিক দলের আনোয়ার হোসেইন, যুবদলের মোরতাজুল করীম বাদরু, স্বেচ্ছাসেবক দলের মোস্তফিজুর রহমান, ছাত্র দলের আসাদুজ্জামান আসাদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভায় দলের ভাইস চেয়ারম্যান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, আহমেদ আজম খান, এজেডেএম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক, হাবিবুর রহমান হাবিব, আতাউর রহমান ঢালী, সিরাজউদ্দিন আহমেদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, এই সরকার বিরোধী দলের সভা-সমাবেশকে ভয় পায়। আমরা যেখানেই সমাবেশ করতে চেয়েছি সেখানেই অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। অথবা বাধা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ঢাকায় একাধিকবার আবেদন করেও আমরা সমাবেশের অনুমতি পাইনি। অথচ অন্যরা সমাবেশ করছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে লালদীঘির ময়দানে বিএনপি সমাবেশ করতে চেয়েছিল, সেখানে সবাই সমাবেশে করছে। কিন্তু বিএনপিকে বলা হলো লালদীঘির ময়দান দেয়া যাবে না। শেষ মুহূর্তে যেদিন মিটিং হবে, সেদিন সকালবেলা বলা হলো করতে পারেন, তবে পার্টি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে। তারপরও সরকার মানুষের ¯্রােত বন্ধ করতে পারেনি। সেদিন চট্টগ্রামের রাস্তায় লাখো মানুষের ¯্রােত হয়েছিল। খুলনায় মাত্র এক ঘণ্টা আগে মিটিং করার অনুমতি দিয়েছে। সেখানেও এক ঘণ্টার মধ্যে তিন-চারটা রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি জায়গায়, প্রতিটি মানুষ এখন শুধু অপেক্ষা করে আছে, কবে তারা একটা সুযোগ পাবে। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এ সরকারকে চিরতরে উৎখাত করে দেবে তিনি আরও বলেন, সবাই ফেটে পড়ুন, উঠে দাঁড়ান, সবাই জাগ্রত হন। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সবাইকে রাজপথে নেমে আসতে হবে।
নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান রেখে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের সংগঠন শক্তিশালী করতে হবে।  ঘরে ঘরে গিয়ে এই বানী পৌঁছিয়ে দিতে হবে যে, এখন ঘরে বসে থাকার সময় নেই। নিজের অধিকার আদায়ের জন্যে, আমার ভোট আমি দেবো- এই অধিকার আদায়ের জন্যে, বেঁচে থাকার অধিকারের নিশ্চয়তা পাবার জন্যে, সকলকে এই ভয়াবহ যে দানব আমাদের বুকের ওপর চেপে বসে আছে, সেই দানবকে সরাতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ফেটে পড়ুন সবাই, উঠে দাঁড়ান, সবাই জাগ্রত হোন এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে সকলকে রাজপথে নেমে আসতে হবে।
সকল গণতান্ত্রিক দল ও সংগঠনকে ‘সরকার হটাতে’ জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রতিটি জায়গায় প্রতিটি মানুষ এখন শুধু অপেক্ষা করে আছে কখন একটা সুযোগ পাবে, সেই সুযোগের সৎব্যবহার করে এই সরকারকে একেবারে চিরতরে উৎখাত করে দেবে। তিনি বলেন, আমরা এখন একেবারেই শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করছি। এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আমরা সরকারের পতন ঘটাবো। বাধ্য করবো দেশনেত্রীসহ আমাদের সকল রাজবন্দীদের মুক্ত করবার জন্য।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, আজিজুল বারী হেলাল, শফিউল বারী বাবু, ইয়াসিন আলী, রাজিব আহসান, আকরামুল হাসান, কাজী আবুল বাশারসহ সকল নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিও জানান ফখরুল।
খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে এবার স্বাধীনতা দিবসে আলোচনা অনুষ্ঠান করার বেদনার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, অত্যন্ত ভরাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে আমাদেরকে আজ আলোচনা সভায় আয়োজন করতে হয়েছে চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী। আমাদের নেত্রীকে কারাগারে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। মানুষের সকল অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। আমাদেরকে জনসভা করতে দেয়া হয় না।
মির্জা ফখরুল সারাদিন মিথ্যা কথা বলেন- সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দেয়া এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, আমাদের অবৈধ সরকারের, অবৈধ প্রধানমন্ত্রী মনে করেন- তিনি নিজে যেটা করেন, সেটা অন্যরাও করছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাকে অনেকে বলেন এ কথার উত্তর দেন না কেন? আমি বলেছি- এগুলোর উত্তর দেয়া আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বাঁধে, আমাদের রুচিতে বাঁধে। এসময় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের চেতনাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে গায়ের জোরে, পিস্তল দিয়ে গোটা দেশকে বন্দী করে রেখেছে। এদের চরিত্রটাই এমন। তারা ৭৪ সালে বাকশাল কায়েম করে গণতন্ত্র ধ্বংস করেছিল। সেখান থেকে দেশেকে গণতন্ত্রের পথে ফিরে নিয়ে এসেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরে সেটির বিকাশ ঘটিয়েছেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, একাদশ নির্বাচন নিয়ে সরকার ষড়যন্ত্র করছে। দেশনেত্রীকে নির্বাচন থেকে বাইরে রেখে, বিএনপিকে নির্বাচন থেকে বাইরে রেখে আবারো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো প্রহসনের ভোটছাড়া নির্বাচন করতে চায়। আমরা বলতে চাই, একাদশ নির্বাচন ২০১৪ সালের মতো নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি দেশে হবে না, হতে দেয়া হবে না। দেশনেত্রীকে ছাড়া এদেশে নির্বাচন হতে দেবে না জনগন।
বিএনপির সিনিয়র এ নেতা বলেন, আমরা নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও আইনের লড়াইয়ের মাধ্যমে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবো। তার নেতৃত্বে আগামীদিনে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করে সংসদ ভেঙে দেয়ার দাবি আদায় করেই ইনশাল্লাহ আমরা আগামী নির্বাচনে যাবো। সেই নির্বাচনে দেশনেত্রীর নেতৃত্বে আমরা জনগনের সরকার প্রতিষ্ঠা করব, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করব।
স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, দেশনেত্রীকে মুক্তি করতে আইনি লড়াই যথেষ্ট নয়। জনমত সৃষ্টি করতে হবে, বেগম জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন করতে হবে। তাহলে ইনশাল্লাহ তিনি আমাদের মাঝে খুব শিগগিরিই ফিরে আসবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
নির্বাচনের প্রস্তুতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। বিএনপি গণতান্ত্রিক দল, গণতান্ত্রিক পন্থায় দেশের আমরা দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। সেটা করতে গেলে আমাদেরকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে এবং প্রত্যেকটি জায়গায় আপনাদেরকে নিয়োজিত করতে হবে। আওয়ামী লীগ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বসে থাকলে চলবে না। এদিকে আমাদের পিছিয়ে থাকলে চলবে না। আমাদেরকে সব সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। রাজনীতির ব্যাপার, যেকোনো সময় নির্বাচন হতে পারে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, দেশে একদলীয় বাকশালের শাসন চলছে, কোনো স্বাধীনতা নাই, কথা বলতে পারবেন না, মুখও খুলতে পারবেন না। বেশি কথা বলবেন সব জেলে ঢুকাইয়া দিবো, আপনাদের নেত্রীকে জেলে ঢুকাইয়া দিছি। এই অবস্থা চলতে দেয়া যাবে না। আমরা চাই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র, কথা বলার অধিকার। যদি না আসে ইনশাল্লাহ আমরা আদায় নেবো। মনে রাখবেন দেশনেত্রীর মুক্তির আন্দোলন একটি সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হবে ইনশাল্লাহ।
জমির উদ্দিন সরকার বলেন, এই সরকার আবারো ক্ষমতায় থাকার ষড়যন্ত্র করছে। তাদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ক্ষমতা। তাই তারা মিথ্যা নথিপত্র তৈরি করে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী করে রেখেছে। তিনি বলেন, এই সরকার বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে যাই বলুক না কেন দেশের জনগণ সেগুলো বিশ্বাস করবে না। তিনি বেগম জিয়াকে মুক্ত করতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রস্তুতি নেযার আহ্বান জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ