ঢাকা, রোববার 1 April 2018, ১৮ চৈত্র ১৪২৪, ১৩ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বেগম জিয়াকে বিদেশ পাঠানোর অশুভ পাঁয়তারা

বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে আসলে হচ্ছেটা কি? তার জামিন নিয়ে গত ১ মাস ২২ দিন ধরে যে খেলা চলছে সেটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তার অসুখ নিয়েও সরকার এক ধরনের কানামাছি খেলা খেলছে। এই দেশের তিন বারের প্রধান মন্ত্রী এবং বৃহত্তম বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া যে অসুস্থ সে খবরটি সাধারণ মানুষ জানতে পারতো না, যদি না গত বুধবার ২৮ মার্চ জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলায় তার হাজিরা দেয়ার কথা না থাকতো। উল্লেখ করা যেতে পারে যে এই মামলাটিও হচ্ছে আলিয়া মাদরাসা কোর্টে এবং স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল নামক এই কোর্টের বিচারকও সেই আক্তারুজ্জামান যিনি অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিচারক ছিলেন এবং বেগম জিয়াকে ৫ বছরের সাজা দিয়েছেন। সেই মামলায় তারেক রহমানসহ অন্যান্য অভিযুক্তকে ১০ বছরের সাজা এবং অর্থ দণ্ড দেয়া হয়েছে। গত ২৮ মার্চ বুধবার বিচারক আকতারুজ্জামান, পত্রপত্রিকার রিপোর্ট মোতাবেক বেলা সাড়ে ১০ টায় আদালতে যান। কিন্তু তিনি দেখেন যে সেখানে মাত্র ২ জন অভিযুক্তকে হাজির করা হয়েছে। কিন্তু প্রধান অভিযুক্ত বেগম খালেদা জিয়া আসেননি। অন্যদিকে দুদক এবং বিএনপির আইনজীবীরা যথারীতি যথাসময়ে হাজির হয়েছেন। তারাও উৎসুক হয়ে একে অপরের কাছে জানতে চান যে বেগম জিয়া আসেননি কেন? আসলে ঘটনা কি? এভাবে কিছু সময় পার হয়ে যায়। তারপর জেল কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে বিচারক আকতারুজ্জামানকে লিখিতভাবে জানানো হয় যে বেগম জিয়া ‘আনফিট’। আনফিট মানে কি? কেন তিনি আনফিট? এ নিয়ে আদালতে গুঞ্জন শুরু হয়। কানে কানে কথা ভেসে আসে যে বেগম জিয়া অসুস্থ। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ সেটি জানায়নি। অসুস্থ না বলে তারা বলেছে আনফিট। আরো জানা গেছে যে, ২৮ তারিখের আগে ৩ দিন ধরে বেগম জিয়া অসুস্থ। যে দেশে জাফর ইকবালের হেলথ বুলেটিন নিয়ে সামরিক বাহিনীর গণসংযোগ দপ্তর অর্থাৎ আইএসপিআর বুলেটিন ইস্যু করে, সেখানে বেগম জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে কি সরকার, কি কারা কর্তৃপক্ষ, অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ।
এমন একটি গুঞ্জনের মাঝে পর দিন অর্থাৎ গত ২৯ মার্চ বৃহস্পতিবার বেলা ৩ টার সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কারাভ্যন্তরে যাওয়ার কথা ছিল। তিনি জেলের ভেতরে গিয়ে বেগম জিয়ার সাথে দেখা করবেন। কিন্তু ২৯ তারিখ বেলা ৪ টা সাড়ে ৪ টার দিকে জানা গেল যে মির্জা ফখরুল জেলখানার ভেতরে যেতে পারছেন না এবং তিনি যাননি। এ ব্যাপারে একটি বাংলা দৈনিক গত ২৯ মার্চ বৃহস্পতিবার একটি এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট দিয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, কারাগারে থাকা খালেদা জিয়ার অসুস্থতা গোপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে তার আইনজীবীরা। খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেছেন, বুধবার মামলার তারিখ ধার্য ছিল। খালেদা জিয়াকে আদালতে আনা হয়নি। কিন্তু তিনি অসুস্থ থাকায় কারা কর্তৃপক্ষ হাজির করেননি।
তিনি বলেন, আমরা দেখেছি কাস্টডিতে লেখা আছে তিনি অসুস্থ হওয়ায় তাকে আদালতে আনা হচ্ছে না। আদালতের পরোয়ানার ফিরতি কাগজ (কাস্টডি পরোয়ানা) দেখেছেন উল্লেখ করে সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আমরা দেখেছি খালেদা জিয়া অসুস্থ। সেখানে বলা হয়েছে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে আদালতে আনা হয়নি। যেহেতু তিনি অসুস্থ, আমরা খুবই চিন্তিত। কারণ, আমরা জানতে পারছি না। উনারাও পরিষ্কার করে কিছুই বলেননি।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়া কী রোগে ভুগছেন,  কেন তাকে আদালতে আনা হলো না- সরকারের পক্ষ থেকে, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। শুধু লেখা আছে, খালেদা জিয়া জেলে অসুস্থ। এই মামলার আগামী তারিখ ধার্য করেছে ৫ এপ্রিল। খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের আরেক সদস্য আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা সাড়ে নয়টায় আদালতে এসেছি। দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গায় ফোনালাপ করতে আমরা দেখলাম। তাদের মধ্যে আমরা বিভিন্ন দৌড়ঝাঁপ দেখেছি। বার বার মিটিং করতে দেখেছি। আমরা বুঝতে পারছিলাম না কী কারণে খালেদা জিয়াকে হাজির করা হচ্ছে না। অবশেষে আমরা যেটা দখলাম, কাস্টডি পরোয়ানা জেলখানা থেকে এসেছে। সেখানে আমরা জানলাম, তিনি অসুস্থ। তিনি বলেন, আমরা চিন্তিত। আমরা শঙ্কিত। খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার প্রয়োজন। আমরা আগের জামিনে যে কথাগুলো বলেছিলম যে খালেদা জিয়া অসুস্থ এবং বয়োবৃদ্ধ। এটিই আজকে কারা কর্তৃপক্ষের পাঠানো পত্রে প্রমাণিত হয়েছে।
৭৩ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধা মহিলার অসুস্থতা নিয়ে এই লুকোচুরি অত্যন্ত রহস্যময়। এই খবরে দেশবাসী অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। দেশবাসী জানতে চায়, বেগম জিয়ার কি হয়েছে? যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও তার সাথে দেখা করতে পারলেন না?
॥দুই॥
অন্যদিকে একই দিন অর্থাৎ ২৮ মার্চ বেগম জিয়ার কারাদ-ের মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছরে উন্নীত করার জন্য হাইকোর্টে আপিল করেছে দুদক। এ ব্যাপারে অনেক আইনজীবী এবং বুদ্ধিজীবী বলেন দুদক এ পর্যন্ত অন্যকারো সাজার মেয়াদ বৃদ্ধি করল না। অথচ বেগম জিয়ার ব্যাপারে তারা অসম্ভব তৎপর। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং টেলিভিশন টক শোতে প্রতিদিন বলা হচ্ছে যে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে খেয়েছে, যারা অন্তত ৯ টি ব্যাংক্কে নিঃশেষ করেছে, তাদের ব্যাপারে জোরদার তদন্ত চালাতেও দুদক গড়িমসি করছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার ২ কোটি টাকার মামলায় তাকে ৫ বছরের যায়গায় ১০ বছরের শাস্তি দেয়ার জন্য তারা তৎপর। সুতরাং মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় পেতে টালবাহানা, নথি পৌঁছাতে ১৫ দিন সময় ক্ষেপণ, তারপর শুনানির জন্য ৮ মে ধার্য করা- ইত্যাদির মধ্যে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল একটি অশুভ যোগসূত্র রয়েছে বলে সন্দেহ করছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল দাবি তুলেছেন যে ঢাক ঢাক গুড় গুড় না করে সরকার তথা জেল কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার করে বলুন, খালেদা জিয়ার কি অসুখ?
॥তিন॥
বিগত বছরগুলোতে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্র শিবিরকে যেভাবে ফিনিশ করার চেষ্টা করা হয়েছে সেই একই পথে বিএনপিকেও নিঃশেষ করার দিকে ধাবিত হয়েছে সরকার। তার সবচেয়ে বড় নমুনা হলো ২৯ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপিকে জনসভা অনুষ্ঠানের অনুমতি না দেয়া। এই জনসভার অনুমতি নিয়ে জবর খেলা দেখিয়েছে সরকার। বিএনপি তো সময় মতই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদন প্রার্থনা করে দরখাস্ত করেছিল। কিন্তু সরকার নিরুত্তর থাকে। পুলিশের বিভিন্ন মহলে দেন দরবার করেও যখন কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না তখন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে বিএনপির একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে দেখা করে এবং অনুমতি চায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, তাদের কোনো আপত্তি নাই, তবে পুলিশ তাদের নিজস্ব রিপোর্ট অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। খেলাটি তখন পরিষ্কার হয়ে যায়। বিএনপিকে পারমিশন দেয়া হলো না।
গতকাল শনিবার পর্যন্ত টেলিভিশন এবং অনলাইনে যেসব খবর দেখা গেলো সেগুলো দেখে মনে হচ্ছে যে বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে সরকার একটি গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। এই ষড়যন্ত্রের সর্বশেষ অধ্যায় হলো তাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া এবং তাকে ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে আগামী নির্বাচনের বাইরে রাখা। ষড়যন্ত্রের এই অংক মঞ্চস্থ করার জন্যই হঠাৎ করে প্রচারিত হয় তার অসুস্থতার খবর। সেই সাথে আগ বাড়িয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলে বসেন যে তার চিকিৎসার জন্য ডাক্তাররা রেকমেন্ড করলে তাকে বিদেশে পাঠানো হবে। এসব খেলার আসল উদ্দেশ্য হলো মাইনাস ওয়ান। অর্থাৎ বেগম জিয়াকে আগামী নির্বাচন এবং তারপর রাজনীতি থেকে আউট করা। ভোটার বিহীন নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের প্রত্যক্ষ মদদে ২০১৪ সালে ক্ষমতা দখল করার পর শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের মাইনাস ওয়ান খেলা। মাইনাস ওয়ান মানে খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে আউট করে দেয়া। এই পর্যায়ে তারা বেগম জিয়াকে কারাগারে ঢুকাতে সক্ষম হয়েছে। এখন তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে পারলেই পথের রাজনৈতিক কাঁটা দূর হয়।
যাই হোক, তার অসুখের খবর প্রচারিত হলে মির্জা ফখরুল সাংবাদিক সম্মেলন করে পরিষ্কার জানতে চাইলেন যে বেগম জিয়ার কি হয়েছে সেটি দেশবাসীকে জানানো হোক। এ ব্যাপারে সরকার মুখ খুলছে না কেন?
॥চার॥
মির্জা ফখরুল যে দাবি করেছেন সেটি অত্যন্ত ন্যায্য। তিনি চেয়েছেন প্রকৃত খবর এবং দেশ নেত্রীর আশুমুক্তি। তিনি তো ঠিকই বলেছেন যে তার তো জামিন হয়েই আছে। অর্থাৎ হাইকোর্ট তো তাকে জামিন দিয়েছেই। সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজও সেই জামিন আটকাননি। তারপরেও হঠাৎ করে তার জামিনের শুনানি দেড় মাস পিছিয়ে ৮ মে করা হলো কেন? উদ্দেশ্য তো খুবই পরিষ্কার। যত লম্বা সময় ধরে তাকে জেলে আটকে রাখা যায় ততই তাদের জন্য ভাল। আর এই ফাঁকে তাকে নিয়ে নতুন প্ল্যান প্রোগ্রাম করা যাবে। মির্জা ফখরুলের কথা লুফে নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন যে ডাক্তাররা বললে সরকার চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠাতে রাজি।
সরকারের মনের কথা ধরতে পেরেছেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেছেন বেগম জিয়াকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। প্যারোলে ছাড়লে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। প্যারোল প্রসঙ্গটি উত্থাপনের সাথে সাথেই সরকার পক্ষ খামোশ মেরে গেছে। এখন বলা হচ্ছে যে সিভিল সার্জন তাকে দেখতে গিয়েছিলেন এবং তার কোনো নতুন অসুখ দেখা যায়নি। তার যে হাঁটুর ব্যথা সেটা অনেক পুরানা। এদিকে মির্জা ফখরুল এবং রুহুল কবির রিজভি ঠিক মতই বলেছেন যে আগে তাকে নিঃশর্তভাবে  মুক্তি দেয়া হোক। এরপর নেত্রী নিজেই ঠিক করবেন যে তিনি দেশে চিকিৎসা নেবেন, নাকি বিদেশে চিকিৎসা নেবেন।
গত ৩১ মার্চ শনিবার অনেককে বলতে শোনা গেছে যে বেগম জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর সরকারি পরিকল্পনা মাঠে মারা গেছে। বেগম জিয়ার অতীত রেকর্ড বলে যে গুরুতর অসুস্থ না হলে দেশ ছাড়ার বান্দা তিনি নন। মিলিটারি কন্ট্রোলড জরুরী সরকারের আমলে তার জন্য ঘরের বাইরে গাড়ি এবং বিমান বন্দরে বিমান রেডি রাখার পরেও তাকে বিদেশ নেয়া যায়নি। আজও তাকে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে সরানোর যতই চেষ্টা করা হোক সেটি এত সহজেই ফলবতী হবে না।
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ