ঢাকা, রোববার 1 April 2018, ১৮ চৈত্র ১৪২৪, ১৩ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইসরাইলী দখলদার বাহিনীর গুলীতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৭॥ নিন্দার ঝড়

ইসরাইলী সেনাদের হামলার শিকার এক ফিলিস্তিনী

৩১ মার্চ, আল জাজিরা, আল আকসা টিভি, গার্ডিয়ান, রয়টার্স : অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ভূমি দিবস উপলক্ষে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভে ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর গুলিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৭-তে দাঁড়িয়েছে। গত শুক্রবার গাজার ইসরাইল সীমান্তের ছয়টি স্থানে এই বিক্ষোভ হয়। ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’ নামের এই বিক্ষোভ চলাকালে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় আরও কমপক্ষে ১৪০০ মানুষ আহত হয়েছেন। আর নিহতদের স্মরণে গতকাল শনিবার একদিনের শোক ঘোষণা করে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে।

১৯৭৬ সাল থেকে প্রতিবছর ৩০ মার্চ ফিলিস্তিনীরা ইসরাইলের দখলদারিত্বের প্রতিবাদে ‘ভূমি দিবস’ পালন করছে। ওইদিন নিজেদের মাতৃভূমির দখল ঠেকাতে বিক্ষোভে নামলে ইসরাইলি সেনাদের হাতে ৬ ফিলিস্তিনি নিহত হন। তাদের স্মরণে ওই বছর থেকেই ভূমি দিবস পালন করে আসছেন ফিলিস্তিনিরা। ২০০৭ সাল থেকে গাজা অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইসরাইল। সেখানকার ৭০ শতাংশ মানুষই ফিলিস্তিনের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিতাড়িত হয়ে সেখানে এসে বাস করছেন। এবছর ওই দিনটি স্মরণে বিশাল বিক্ষোভের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ মে পর্যন্ত এই বিক্ষোভ চলবে। দ্য গ্রেট রিটার্ন মার্চ’ নামে এই বিক্ষোভটি প্রতি বছর আয়োজিত হলেও এবার এতে ভিন্নতা রয়েছে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, গাজা নিয়ন্ত্রণকারী হামাস আন্দোলনসহ ফিলিস্তিনিদের বেশ কয়েকটি উপদল এ প্রতিবাদে সমর্থন জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরাইলি বাহিনীর মারণাস্ত্র ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এতে ১৬ জন নিহত হন আর ১৪শ’র বেশি মানুষ আহত হন।

এদিকে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে ফিলিস্তিনি নিহতের ঘটনায় গতকাল শনিবার ফিলিস্তিনজুড়ে একদিনের শোক ঘোষণা করেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। এক বিবৃতিতে কর্তৃপক্ষ বলেছে, শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস একদিনে শোক ঘোষণা করেছেন। এজন্য গতকাল শনিবার সারাদেশে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, এবার গাজা-ইসরাইল সীমান্তের অন্তত ছয়টি স্থানকে বিক্ষোভের জন্য নির্ধারণ করা হয়। এবারের বিক্ষোভে গাজা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হামাসসহ বেশ কয়েকটি দল অংশ অংশ নেবে। বিক্ষোভ দমনে বড় ধরনের প্রস্তুতি নেয় ইসরাইলও। গাজা সীমান্তে শতাধিক শার্প শুটার (লক্ষ্যভেদ করতে দক্ষ সেনা) মোতায়েন করেছে দেশটির সরকার।

বিক্ষোভের শুরুর দিন গত শুক্রবার সকালেই খান ইউনিস শহরে এক ফিলিস্তিনি কৃষককে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। আরকে ব্যক্তি ইসরাইলি ট্যাংকের গোলায় আহত হয়েছেন, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিক্ষোভের সময় আরেক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার সংবাদমাধ্যম।

হামাস পরিচালিত আল-আকসা টিভি জানিয়েছে, ইসরাইলি ট্যাংকের গোলায় ওমর ওয়াহিদ সামুর (২৭) নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন জাবিয়া এলাকায়। নিহতের নাম মোহাম্মদ কামাল (২৫) বলে জানিয়েছে গাজার হাসপাতাল সূত্র। তৃতীয় নিহত ফিলিস্তিনির নাম আমিন মাহমুদ মুয়ামার। মান বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, রাফায় সংঘর্ষে মুয়ামার মৃত্যু হয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহত চতুর্থ ফিলিস্তিনির নাম মোহাম্মদ আবু ওমর।

গাজা উপত্যকার পূর্বাঞ্চলে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়েহ ভাষণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের জনগণ দিনের পর দিন দেখিয়ে দিয়েছেন তারা বড় ধরনের কিছু করার জন্য উদ্যোগ নিতে পারেন। পুরো ফিলিস্তিনকে ফিরে পাওয়ার পদক্ষেপের সূচনা এই মিছিল।

হামাসের প্রায় এক লাখ সক্রিয় সমর্থক এবারের বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করতে পারেন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।  এরই মধ্যে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে হামাস নেতাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্বাচারে গুলি চালিয়ে ১৭ জনকে হত্যার ঘটনায় শুক্রবারই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে আহ্বান জানিয়েছেন। কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থায় এ খবর জানানো হয়। জর্ডানের সরকারও বিষয়টিকে ইসরাইলকে দায়ী করে বিবৃতি দিয়েছে। জর্ডান সরকারের মুখপাত্র মোহাম্মদ আর মোমানি বলেন, ‘গাজায় আজ যা হয়েছে তার জন্য দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরাইলই দায়ী। ফিলিস্তিনিদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নষ্ট করে তাদের বিরুদ্ধে মারণাস্ত্র ব্যবহার করার কারণেই এমনটা হয়েছে।

তুরস্ক ও কাতারের সরকারও ইসরাইলের নিন্দা জানিয়ে একই ধরনের বিবৃতি দিয়েছে।

সহিসংতার স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জাতিসংঘ মহাসচিবের

গাজায় ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি সেনাদের মধ্যে মারাত্মক সংঘর্ষের একটি স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরস। অন্যদিকে, সংযম প্রদর্শনের জন্য উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নিরাপত্তা পরিষদ সদস্যরা। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক শেষে সংস্থাটি কোনো পদক্ষেপ বা যৌথ বিবৃতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি। ২০১৪ সালে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে সীমান্ত যুদ্ধের পর গাজার রক্তাক্ত দিনটির কয়েক ঘণ্টা পর কুয়েতের আহ্বানে নিরাপত্তা পরিষদের এই জরুরি বৈঠক হয়।

গুতেরসের এর মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব এই সহিংসতার একটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ তদন্ত চেয়েছেন।

এদিকে, নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সমঝোতায় আসতে না পারায় নিজের হতাশা ব্যক্ত করে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মনসুর বলেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর ইসরাইলি গণহত্যার ঘটনায় নিন্দা জানাতে নিরাপত্তা পরিষদের একমত না হওয়াটা দুঃখজনক।

তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের প্রত্যাশা নিরাপত্তা পরিষদ যথাযথভাবে তার দায়িত্ব পালন করুক এবং এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে প্রশমিত করতে প্রদক্ষেপ নিক। ইসরাইলের এই কর্মকা- পরিষ্কারভাবে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।’

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরাইলি সেনাদের হাতে নিহতদের মধ্যে অল্প বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু ও কিশোরও রয়েছে।

ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস এই সহিংসতার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করেছে। হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়েহ বলেছেন, তারা এক ইঞ্চি ফিলিস্তিনি জমিও ইসরাইলের কাছে ছাড়বেন না।

তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনের কোনো বিকল্প নেই এবং আমাদের ফিরে যাওয়ার অধিকার ছাড়া এই সংকটের কোনো সমাধান নেই।’

গাজা-ইসরাইল সীমান্তে সব সময় ইসরাইলের কড়া সামরিক পাহারা থাকে। সেখানে ইসরাইল তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়িয়েছে।

ফিলিস্তিনিরা বহু দশক ধরে ইসরাইলে তাদের ফেলে আসা বসত বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবি করছে। কিন্তু ইসরাইল এই অধিকারের স্বীকৃতি দেয়নি। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা 

আগামী দিনগুলোতে গাজা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির এক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। শুক্রবার গাজায় ভূমি দিবসের বিক্ষোভে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে ১৭ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে এ আশঙ্কার কথা জানান জাতিসংঘ কর্মকর্তা। বেসামরিক নাগরিক ও শিশুদের সহিংসতার লক্ষ্য না করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।

জাতিসংঘের রাজনৈতিক বিষয়ক উপপ্রধান তায়ে-ব্রুক জেরিহৌন বলেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিকতার আইনে ইসরাইলের এই সহিংসতায় দায় নেওয়া উচিত।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, মারণাস্ত্র একেবারে শেষ পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। মারণাস্ত্র যে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে তা কর্তৃপক্ষের যথাযথভাবে তদন্ত করা উচিত।

শুক্রবারের সহিংসতার পর ওইদিন রাতেই নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের ডাক দেয় কুয়েত। কিন্তু ১৫ সদস্য রাষ্ট্র ইসরাইলি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতিতে একমত না হলে কুয়েতের অনুরোধেই প্রকাশ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ