ঢাকা, সোমবার 2 April 2018, ১৯ চৈত্র ১৪২৪, ১৪ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘ভোটের দৌড়’ নিয়ে কিছু কথা

আশিকুল হামিদ : জনগণের চিন্তা-ভাবনা ও আশা-আকাক্সক্ষাকে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে কিনা সেটা বড় কথা নয়, সত্য হলো একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটের দৌড় শুরু হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে যথারীতি উদ্যোগী ও অগ্রবর্তী অবস্থানে রয়েছেন আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীনরা। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ কথা জানিয়ে দিয়েছেন। ওদিকে ভোটের দৌড়ে অংশ নিতে লাফিয়ে নেমে পড়েছেন সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও। নেত্রী শেখ হাসিনাকে অনুসরণ করে  সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেই তিনি থেমে পড়েননি, গত ২৪ মার্চ মহাসমাবেশের আড়ালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিজের ক্ষমতা দখলের তিন যুগ পূর্তির উৎসবও করেছেন ঢাকঢোল বাজিয়ে। তিনশ’ আসনে প্রার্থী দেয়ার ঘোষণা তো দিয়েছেনই, জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় যাবে বলে দৃঢ় আশাও ব্যক্ত করেছেন। বুকে আঙুল ঠেকিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা জনগণের নাকি তাকে ছাড়া আর কোনো উপায় নেই! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে নাকি জনগণ আর চায় না!
২৪ মার্চের মহাসমাবেশে এরশাদ দেখিয়েছেনও যথেষ্টই। ১৯৮০-র দশকে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে নিহত শহীদ ডা. মিলন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রওফুন বসুনিয়ার স্মৃতিস্তম্ভের সামনে জাতীয় পার্টির লোকজন গাড়ির ভিড় জমিয়ে নৃত্য করেছে। এসবের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এরশাদ তথা সামরিক শাসনবিরোধী গণতন্ত্রের আন্দোলন মোটেও সাফল্যের মুখ দেখেনি। বিএনপি-জামায়াত এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই আন্দোলন এবং সবশেষে ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান আসলে ব্যর্থ হয়ে গেছে। সব দেখে-শুনে সেদিন সচেতন মানুষ মাত্রেরই ইতিহাসের কিছু বিশেষ অধ্যায়ের কথা মনে পড়েছে। এসব অধ্যায় জুড়ে রয়েছে এরশাদ ও আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক। বস্তুত ১৯৭৫ পরবর্তী যুগে আওয়ামী লীগের বিকাশ ও উত্থান ঘটানোর ব্যাপারে রীতিমতো ‘সেভিয়ার’-এর ভূমিকা পালন করেছিলেন জেনারেল এরশাদ। এখনো তার সে ভূমিকা দেখতে হচ্ছে জনগণকে। এর পেছনে অবশ্য লেনদেনের হিসাব ছিল, এখনো রয়েছে। এজন্যই ঠিক ৩৬ বছর পর জেনারেল (অব,) এরশাদ ২৪ মার্চ তার ক্ষমতা দখলের তিন যুগ পূর্তির উৎসব করতে পেরেছেন।
অমন ‘সৌভাগ্য’ কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার হয়নি। তিনিও সিলেট থেকেই অঘোষিতভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিলেন। কিন্তু এর দু’দিনের মধ্যে দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের জন্য দন্ডিত হয়ে কারাগারে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া। এই সময়ে, গত কয়েকদিন ধরে তাকে চিকিৎসার নামে বিদেশে পাঠানো হতে পারে বলে জোর আলোচনা চলছে। বলা হচ্ছে, এভাবে তাকে আসলে দেশের রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস’ করা হবে। তিনি এবং তার ছেলে তারেক রহমান যাতে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন সেটাই নিশ্চিত করতে চাচ্ছে সরকার।
ক্ষমতাসীনরা এ উদ্দেশ্যে বেগম খালেদা জিয়ার পাশাপাশি তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘এতিমের অর্থ চুরি’ করার অভিযোগ এনে মা ও ছেলেকে ভোটের দৌড় থেকে দূরে রাখার জন্য রীতিমতো অভিযান চালাচ্ছেন তারা। বলে বেড়াচ্ছেন, ‘এতিমের অর্থ চুরি’সহ দুর্নীতির অভিযোগ নাকি ‘প্রমাণিত’ হয়ে গেছে! বিষয়টি নিয়ে যেমন, আইনের ব্যাখ্যা নিয়েও তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হয়ে উঠেছে। অর্থ চুরি ও দুর্নীতির দায়ে ‘দন্ডিত’ খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কিনা- সে প্রশ্নে আসছে নানা রকমের ব্যাখ্যা। সাধারণভাবে সমর্থিত একটি ব্যাখ্যায় অবশ্য বলা হচ্ছে, মা ও ছেলের জন্য উচ্চ আদালত ‘সেভিয়ার’ হয়ে উঠতে পারেন। হাই কোর্ট যদি নিম্ন আদালতের রায়কে বাতিল না করে অন্তত স্থগিতও করেন তাহলেও বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। তাছাড়া হাই কোর্টের পর রয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সেখানে আপিল বিভাগেও খালেদা জিয়ার জন্য সুযোগের সৃষ্টি হতে পারে।
এভাবে সব মিলিয়েই বিএনপিকে নিয়ে আলোচনা জমে উঠেছে। বলা হচ্ছে, মামলার পর মামলা চাপিয়ে এবং নি¤œ আদালতকে দিয়ে দন্ড দিয়েও সরকার বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে সক্ষম হবে না। ক্ষমতাসীনরা অবশ্য প্রকাশ্য বক্তব্যে বিএনপির ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছেন। তাদের আপত্তি শুধু মা ও ছেলের বিরুদ্ধে। গণমাধ্যমের খবরেও বলা হয়েছে, সরকার তথা আওয়ামী লীগ বিএনপিকে নির্বাচনে চায়, তবে ‘খালেদাকে ছাড়া’। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে সর্বশেষ উপলক্ষেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে, দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। বিএনপি একই সঙ্গে আইনি পদক্ষেপও নিতে শুরু করেছে। বিষয়টি সহজ না হলেও এখন চলছে অপেক্ষার পালা।
খালেদা জিয়ার ভাগ্যে ঠিক কি ঘটবে সে বাপারে অবশ্য এখনো বলার সময় আসেনি। কারণ, আরো কয়েকটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বলা হচ্ছে, রায়, দন্ডাদেশ এবং আপিলের চক্রে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হবে বিএনপির নেত্রীকে। বলা যায় না, তিনি হয়তো শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে প্রার্থীই হতে পারবেন না। তেমন অবস্থায় সরকারের ইচ্ছাই পূরণ হতে পারে। বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে হবে, তবে ‘খালেদাকে ছাড়া’! রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাও সেটাই মনে করেন। কারণ, একাদশ সংসদের নির্বাচনে অংশ না নিলে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। দলটিতে এমনকি ভাঙনও ঘটতে পারে। অমন অশুভ পরিণতি এড়ানোর স্বার্থে হলেও বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বিএনপি নেতাদের অনেকেও তেমন মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছেন।
ওই নেতারা চাইলেও বিএনপির পক্ষে অবশ্য নির্বাচনে অংশ নেয়া এবং ভালো ফল অর্জন করার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ, বেগম খালেদা জিয়াকে দন্ড দিয়ে কারাগারে ঢোকানোর পাশাপাশি দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চালানো হচ্ছে গ্রেফতারের ভয়ংকর অভিযান। দেশের আরেক প্রধান জনসমর্থিত দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নির্মূল করার অভিযানও চলছে একযোগে। তারও আগে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর নেতৃত্বে এমনভাবেই সংবিধান সংশোধন করে রাখা হয়েছে, যাতে জামায়াতে ইসলামী দলগতভাবে নির্বাচনে অংশ না নিতে পারে। জামায়াতের প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকেও নিষিদ্ধ করিয়েছেন ক্ষমতাসীনরা। এভাবে সব মিলিয়েই এমন আয়োজন আগেই সম্পন্ন হয়েছে, যাতে আওয়ামী লীগ এবং তার পার্টনার জাতীয় পার্টি ও ইনু-মেননদের খান কয়েক খুচরা দল ছাড়া আর কারো পক্ষে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব না হয়। 
প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, বিএনপির অংশ নেয়াটাই শেষ কথা নয়। একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন কেমন হবে সে ব্যাপারেও জল্পনা-কল্পনা যথেষ্টই হচ্ছে। উদ্বেগ-আশংকাও কম প্রকাশ করা হচ্ছ না। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ‘ডিজিটাল’ নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সর্বশেষ একতরফা নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত লক্ষ্য করলেই এর কারণ পরিষ্কার হয়ে যাবে। সেবার লগি-বৈঠার হত্যা-সন্ত্রাসের মাধ্যমে ‘রোডম্যাপ’-এর পটভূমি রচনা করা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় কারো কারো ‘আন্দোলনের ফসল’ হিসেবে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল মইন উ আহমেদ এবং ফখরুদ্দিন আহমদরা এমন এক নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন, যে নির্বাচনে মিনিটে ১৭ জন পর্যন্ত ভোটার ভোট দিয়েছে বলে দেখানো হয়েছিল। অথচ নিজের ঠিকানা জানিয়ে ও মুরি বইতে স্বাক্ষর দিয়ে ব্যালট পেপার সংগ্রহ করা, আঙুলে অমোচনীয় কালি লাগানো, পোলিং বুথের ভেতরে যাওয়া, পছন্দের প্রার্থীর ঘরে সিল মারা এবং ব্যালট পেপার ভাঁজ করে স্বচ্ছ বাক্সে ফেলা পর্যন্ত কাজগুলো সারতে হলে কম করে হলেও পাঁচ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগার কথা। সুতরাং প্রতি মিনিটে ১৭ জন করে ভোটারের পক্ষে ভোট দেয়া একেবারেই সম্ভব নয়। কিন্তু সে অসম্ভবকেই সম্ভব করানো হয়েছিল।
প্রধান দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যকার ভোটের ব্যবধানও চৌর্যবৃত্তির বিষয়টিকে পরিষ্কার করেছিল।  ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এক কোটি ৫৮ লাখ এবং বিএনপি এক কোটি ৪২ লাখ ভোট পেয়েছিল। ব্যবধান ছিল ১৬ লাখ ভোটের। এর পর ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই কোটি ২৩ লাখ এবং বিএনপি দুই কোটি ২৮ লাখ ভোট পেয়েছিল। ব্যবধান ছিল পাঁচ লাখ ভোটের। এটাও স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু ২০০৮-এর নির্বাচনে দুই প্রধান দলের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান দেখানো হয়েছিল এক কোটি ১১ লাখ! দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের ভোট যেখানে বেড়েছে এক কোটি ১৯ লাখ, বিএনপির সেখানে বেড়েছিল মাত্র তিন লাখ! এত বিরাট ব্যবধান শুধু অস্বাভাবিক নয়, অগ্রহণযোগ্যও। কিন্তু সেটাই ঘটানো হয়েছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় আয়োজিত হয়েছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। এজন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছিল অনেক আগে থেকে। মোটামুটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগের ভরাডুবি ঘটবে বলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করেছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকসহ সর্বোচ্চ আদালতের একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী। মূলত ওই গোষ্ঠীকে সেবাদাসের মতো ব্যবহার করেই আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে ইচ্ছামতো কাঁচি চালাতে পেরেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পাশাপাশি সংবিধানে এমনভাবেই নানা সংশোধনী আনা হয়েছিল যার ফলে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার বাইরে কারো পক্ষেই নির্বাচনে জিতে আসা এবং সরকার গঠন করা সম্ভব হবে না। এতকিছুর পরও নিশ্চিন্ত হতে পারেননি ক্ষমতাসীনরা। সরকার তাই র‌্যাব পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের গুন্ডা-সন্ত্রাসীদেরও মাঠে নামিয়েছিল। গ্রেফতার ও দমন-নির্যাতনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চালানো হয়েছিল গুম ও হত্যার অভিযান।
একযোগে প্রতারণার কৌশলও নিয়েছিলেন ক্ষমতাসীনরা। সংলাপ ও সমঝোতার আড়ালে একদিকে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করেছেন, অন্যদিকে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোকে ঠেলে দিয়েছেন নির্বাচনের বাইরে। ১৫৪ জন এমপিকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ করার রেকর্ড গড়েই থেমে যাননি তারা, একই সঙ্গে ভোট জালিয়াতিও করেছিলেন যথেচ্ছভাবে। পাঁচ থেকে সাত শতাংশের বেশি ভোট না পড়লেও দাবি করেছেন, ভোট নাকি পড়েছে ৪০ শতাংশ! ক্ষমতাসীনরা কথাটা এমনভাবে বলেছিলেন, যেন ওটা ৪০ নয়, ৮০ শতাংশ! অনন্দে উচ্ছ্বসিত ক্ষমতাসীনরা লক্ষ্যই করেননি যে, প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়ার মধ্যে আর যা-ই হোক, গর্বের কিছু থাকতে পারে না। কারণ, ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়ার অর্থ হলো, বাকি ৬০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোট দেননি!
ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপনায় ও প্রচারণায় ঘাটতি না থাকলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দেশে-বিদেশে কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এর একটি প্রমাণ পর্যবেক্ষকদের সংখ্যাস্বল্পতা। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনের সময় বিদেশি ৫৮৫ জনসহ পর্যবেক্ষক ছিলেন এক লাখ ৬০ হাজার। সেখানে ২০১৪ সালে বিদেশি পর্যবেক্ষক এসেছিলেন মাত্র চারজন, অন্যদিকে দেশি পর্যবেক্ষকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১০ হাজার। একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরে আসাসহ বিভিন্ন নেতিবাচক সম্ভাবনার কারণেই বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট এ নির্বাচন বর্জন করেছিল এবং ভোট না দেয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল।
স্মরণ করা দরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান যুক্ত করে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী আনার মাধ্যমে সংকটের শুরু করেছিলেন ক্ষমতাসীনরা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলো প্রথম থেকেই এর বিরোধিতা করেছে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ছাড় দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, নির্বাচনকালীন সরকারকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হতে হবে এবং শেখ হাসিনা ওই সরকারের প্রধান হতে পারবেন না। জাতিসংঘের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ এবং গণচীনও সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়েছিল। এজন্য প্রধান দুটি দলকে সংলাপে বসার পরামর্শ দিয়েছিল। অন্যদিকে সংলাপের নামে একের পর এক নাটক সাজিয়েছিলেন ক্ষমতাসীনরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করলেও তার পেছনের ক’টিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল। সর্বশেষ উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর প্রচেষ্টাকেও ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন ক্ষমতাসীনরা।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আয়োজিত নির্বাচন নামের কর্মকান্ডের কারণেই ভোটের জন্য দৌড় শুরু হয়ে গেলেও একাদশ সংসদের নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশপ্রেমিকদের মধ্যে উদ্বেগ-আশংকা ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীনদের মিথ্যাচারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলসহ বিভিন্ন ঘটনা। সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় ন্যক্কারজনকভাবে বিদায় করা হয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে। তিনি এমনকি দেশেই থাকতে পারেননি। সিনিয়রিটির প্রচলিত নিয়ম লংঘন করার লক্ষ্য নিয়ে এস কে সিনহার পর প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বিচারপতি আবদুল ওয়াহাবকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন ক্ষমতাসীনরা। নতুন প্রধান বিচারপতি নাকি ক্ষমতাসীনদের সুনজরে থাকার ছুটে গেছেন টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত। কথাগুলো অবশ্যই মনে রাখতে হবে।
বর্তমান পর্যায়ে আশংকার কারণ হলো, এ শুধু বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ নয়, ঘটনাপ্রবাহেও প্রমাণিত হয়েছে, ক্ষমতাসীনরা এগোচ্ছেন দেশকে একদলীয় শাসনের অন্ধকারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে। একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংসদে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার। সংবিধানের আড়াল নিয়ে ক্ষমতাসীনরা আসলে সেটাই নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। একই কারণে দেশে গণতন্ত্র ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছুই করার নেই জনগণের। কারণ, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর থেকে শুধু সরকারের ‘পতন’ ঘটানোর হুংকার শোনানো হয়েছে। জনগণের কোনো সমস্যা নিয়েই কাউকে আন্দোলন করতে দেখা যায়নি। একই কারণে একদিকে জাতির ওপর অনির্বাচিত একটি সরকার চেপে বসার সুযোগ পেয়েছে, অন্যদিকে সে সরকারের উদ্যোগেই বর্তমানে চলছে আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য নতুন নির্বাচন আয়োজনের তৎপরতা।
এই কর্মকান্ডে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যথারীতি রয়েছে এরশাদের জাতীয় পার্টিও। স্মরণ করা দরকার, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাক্কালে বর্জনের ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও এরশাদ তার দলের লোকজনকে নির্বাচন থেকে ফিরিয়ে আনেননি। জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য তিনি নিজে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। ভোটার বিহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত দশম সংসদকে বৈধতা দেয়ার ব্যাপারেও বিশেষ ভ’মিকা পালন করেছিলেন এরশাদ। তার ‘ফার্স্ট লেডি’ রওশন এরশাদকে সংসদে বিরোধী দলের নেতা বানিয়েছেন। জাতীয় পার্টির জনা কয়েককে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বানিয়েছেন। তিনি নিজেও পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর ‘বিশেষ দূত’ বনে গেছেন!  
ঘটনাগুলো মাত্র সেদিনের বলেই সরকারবিরোধী বক্তব্য রাখলেও এবং তিনশ আসনে দলীয় প্রার্থী দেয়ার ঘোষণা শোনালেও জনগণ এরশাদকে মোটেই বিশ্বাস করতে পারছে না। তারা বরং মনে করছে, সাবেক এই স্বৈরশাসক আসলে আবারও নাটক শুরু করেছেন। তিনি শুধু আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশই নেবেন না, বিএনপিকে তাড়িয়ে বেড়ানোর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের পক্ষে আরো একবার ‘সেভিয়ার’-এর ভূমিকাও পালন করবেন। এ ধরনের প্রায় নিশ্চিত বিভিন্ন সম্ভাবনার কারণেই ধরে নেয়া যায়, ভোটের যে দৌড় শুরু হয়েছে যথাসময়ে তার পরিসমাপ্তিও ঘটবে। পার্থক্য শুধু এটুকুই থাকবে যে, ওই কর্মকান্ডে এবং পরিসমাপ্তিতে জনগণের কোনো ভূমিকা পালনের সুযোগ থাকবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ