ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 April 2018, ২২ চৈত্র ১৪২৪, ১৭ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মোহাম্মদ আশরাফুলের  পাঁচ সেঞ্চুরির রেকর্ড

 

অরণ্য আলভী তন্ময় : বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেক অর্জনের সাথে নিজের নাম লিখিয়েছেন তিনি। কিন্তু একটা ঝড় যেন সবকিছু পাল্টে দিয়েছে। তাতে নিজেকে অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছেন তিনি। চার সেঞ্চুরি করে আগেই ইতিহাসে নিজের নাম লিখে ফেলেছিলেন। এবার পাঁচ নম্বর শতকটি ও পূর্ণ করলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। ‘লিস্ট এ’ তে এক লিগে বাংলাদেশের কোন ব্যাটসম্যানের তিন সেঞ্চুরির রেকর্ডই ছিল না। এবার প্রথম পর্বে দশ খেলায় অংশ নিয়ে তিন শতক হাকিয়ে সেই দুর্লভ রেকর্ড বা কৃতিত্বের অংশীদার হয়েছিলেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। আর রেলিগেশন লীগের প্রথম ম্যাচে অগ্রণী ব্যাংকের বিপক্ষে চার নম্বর সেঞ্চুরিও পূর্ণ করেছিলেন। বিকেএসপিতে ব্রাদার্সের ইউনিয়নের বিপক্ষে রেলিগেশন লীগে কলাবাগানের শেষ ম্যাচে আবার হাসলও আশরাফুলের ব্যাট। পঞ্চম শতরান করলেন এ নন্দিত-নিন্দিত ব্যাটসম্যান। প্রতিভার দ্যুতি ছড়িয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নিজের অবস্থান পাকা করেছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। বয়সভিত্তিক দলের গন্ডি পেরিয়ে জাতীয় লিগে আলো ছড়িয়ে ২০০১ সালে গায়ে জড়িয়েছিলেন জাতীয় দলের জার্সি। শ্রীলংকার বিপক্ষে তাদের মাটিতে অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করে চারদিকে রীতিমতো হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। এরপর ২০০৫ সালে কার্ডিফে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া বধের নায়কও হয়েছিলেন লিট্ল মাস্টার। সেঞ্চুরি করে সেই ম্যাচের আলোটা নিজের করে নিয়েছিলেন তিনি। জাতীয় দলের অধিনায়কও হয়েছিলেন একসময়। সে সময় তার ডেপুটি ছিলেন মাশরাফি বিন মূর্তজা। কিন্তু ২০১৩ সালে যেন এক ঝড়েই সবকিছু এলোমেলো হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। ঘড়োয়া ক্রিকেটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে চলে গিয়েছিলেন অ্যাশ। ২০১৬ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ধীরে ধীরে ফিরেছেন ঘড়োয়া ক্রিকেটে। এবারের ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে নিজের ব্যাট হাতে আলো ছড়িয়েছেন। নিজ ক্লাব কলাবাগান ক্রীড়া চক্রকে সুপার সিক্সে উঠাতে না পারলেও ব্যাট হাতে ভাল করেছেন।

প্রথম পর্বে গড়পড়তা পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন অ্যাশ। প্রথম পর্ব শেষে নামের পাশে তিন তিনটা সেঞ্চুরিও জমা করেছেন। দু’টি সেঞ্চুরির পর তিন নাম্বার সেঞ্চুরিটা এসেছে মোহামেডানের বিপক্ষে। এর আগে প্রাইম দোলেশ্বর এবং অগ্রণী ব্যাংকের বিপক্ষেও সেঞ্চুরি করেছিলেন আশরাফুল। এরপর করলেন তৃতীয় সেঞ্চুরি। দোলেশ্বরের বিপক্ষে করেছিলেন ১০৪ রান করার পর অগ্রণী ব্যাংকের বিপক্ষেও অপরাজিত ১০২ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। আগের ম্যাচে ৬৪ রানের ইনিংসও খেলেছিলেন। যদি বলা হয় দারুণ কাটিয়েছেন ব্যাট হাতে তাহলেও কোন অংশ ভুল বলা হবেনা। ৫ বছর আগে স্পট ফিক্সিংয়ের কারণে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার পর এই প্রথম যেন ছন্দে ফিরেছেন। প্রিমিয়ার লিগে ১১ ম্যাচে ৪৬.০০ গড়ে করেছেন ৪৬০ রান। যদিও তার দল খেলছে রেলিগেশন লিগে। নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ আছে আরো দুটি ম্যাচে। এখন খুব দ্রুতই উঠে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিষেধাজ্ঞা। তাই এখনই আলোচনা শুরু হয়েছে আশরাফুলের জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে। যদিও এসব নিয়ে আর ভাবছেন না আশরাফুল। যেহেতু একটা সময় জাতীয় দলে খেলেছেন, অধিনায়কত্বও করেছেন সে কারণে আবারো জাতীয় দলে ফেরার বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। আর ব্যাট হাতে আশরাফুল ভাল করার কারণেই তার জাতীয় দলে ফেরা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। ক্যারিয়ারে প্রথম এই এক মৌসুমে তিনটি সেঞ্চুরি করলেন আশরাফুল। 

আশরাফুলের এই অবস্থানের পেছনে আরো একজনের অবদানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ দলের সাবেক এই অধিনায়ক দারুণ একটা মৌসুম কাটানোর জন্য বড় ধন্যবাদ দিলেন ছোটবেলার বন্ধু মাশরাফিকে। তবে অত্যন্ত বাস্তববাদী আশরাফুল মনে করেন না যে, এই তিন সেঞ্চুরিতেই তার জাতীয় দলের দুয়ার খুলে যাবে। দারণ খেলার পর তার মনে সেভাবে স্বপ্ন উকি দিচ্ছেনা, ’সত্যি কথা বলতে কি আমি যেভাবে চেয়েছিলাম সেভাবে খেলতে পারিনি। তবে তিনটি সেঞ্চুরিও কম নয়। আমি এখনো নিজেকে আবার জাতীয় দলের জন্য তৈরি বলেই মনে করি না। আমার স্কিল লেভেল হয়ত ঠিক আছে। কিন্তু ফিটনেস নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে। জাতীয় দলে গিয়ে যাতে পারফরম করতে পারি, সেই কাজটা করতে হবে’। ফিটনেসটা ভালো থাকলে এবারের লিগেই আরও রান করতে পারতেন বলে মনে করেন বাংলাদেশের এক সময়ের সবচেয়ে উজ্বল এই তারকা। এখন আশরাফুলের সামনে চ্যালেঞ্জ আবার নিজেকে জাতীয় দলের জন্য উপযুক্ত করে তোলা। প্রায় চৌত্রিশ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও আশরাফুল মনে করছেন, নিজে ঠিকঠাক পারফরম করতে পারলে জাতীয় দলের দুয়ার তার জন্য খুলবেই। কিন্তু সেটা এখনো বেশ দুরেই। বিপিএলের জন্যই আজকে বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিতর্কিত, আলোচিত এক ক্রিকেটারের নাম মোহাম্মদ আশরাফুল। তিন বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আবারো ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটে পাখিঁর চোঁখ রাখছেন তিনি। ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন পাঁচ বছরের জন্য। এর মধ্যে ৩ বছর শাস্তি কাটিয়ে ঘড়োয়া ক্রিকেটে ফিরেছেন। আর মাত্র চার মাসের অপেক্ষার পর আগামী ১৩ আগস্ট শেষ হবে তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও বিপিএলের ওপর আরোপিত শাস্তির মেয়াদও। তাই আশায় বুক বেঁধেছেন আবারো জাতীয় দল তাকে সুযোগ দেবে। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুই বছরে নিজেকে ফিরে পেতে শুরু করেছেন একটু ধীরে ধীরে। ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে গেল বছর খুবই বাজে সময় কেটেছে তার। বিশেষ করে তার ফিটনেস নিয়ে সমালোচনা হয়েছে সবেচেয়ে বেশি। মুটিয়ে যাওয়ার কারণে নানাদিক থেকে শুনতে হয়েছে অনেক কথা। সেটা কাটিয়েও উঠেছেন তিনি। এবার লিগে দল পেতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তাকে। একটা সময় আশরাফুলকে পেতে বড় দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে যেত। কিন্তু এখন তার দল পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরে খেলেছেন লিগের নিচু সারির দল কলাবাগানে।

 তাই বাড়তি কোনো চাপ ছিল না। তবে নিজে কলাবাগানকে ছোট দল নয় ভারসাম্যপূর্ণ দল বলতে চান তিনি। সঠিক সময়ে খেলোয়াড়রা পারফর্ম না করায় এতটা খারাপ অবস্থা হয়েছিল। আশরাফুলকে নজরে রাখলেও এখনো তাকে নিয়ে চিন্তা করছেন না বলেই জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নু। ক্রিকেটার হিসেবে যেমন তেমন মানুষ হিসেবে মাশরাফি বিন মর্তুজার নামডাক সারাদেশেই। বন্ধু থেকে শুরু করে নানা শ্রেণী পেশার মানুষকে সহায়তা করে থাকেন। এই যেমন কিছুদিন পূর্বে জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার বন্ধু সৈয়দ রাসেলের অপারেশনের জন্য দিয়েছেন ৪ লাখ টাকা। শর্ত ছিল এই টাকা কখনো ফেরত দিতে পারবেন না রাসেল। এর বাইরে নিজের জেলার নামে করা ফাউন্ডেশনে মানুষকে সহায়তা করে যাচ্ছেন। ২০০৭ সালে সাালে অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া মানজারুল ইসলাম রানা ও আবদুর রাজ্জাক রাজও তার প্রাণের প্রিয় বন্ধু। আর খুলনার বাইরে জাতীয় দলে খেলতে আসার আগেই বন্ধুত্ব হয়ে যায় মোহাম্মদ আশরাফুলের সঙ্গে। কাউকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও এসব সংবাদমাধ্যমে লিখতে বারণ করেন। এবার অ্যাশকে সঠিক রাস্থায় এনেছেন এই মাশরাফি। আশরাফুলের এবারের লিগে দারুণ খেলে তিনটি সেঞ্চুরি করে হৈ চৈ ফেলে দেয়ার পিছনেও এই মাশরাফি! তার অনুপ্রেরণা আর চাপাচাপির কারণেই এত ভালো খেলেছেন আশরাফুল। ভিন্ন দলে খেললেই যে বন্ধুকে অনুপ্রাণিত করা যায় সেটাও প্রমাণ করেছেন ম্যাশ। যা আশরাফুলের কলাবাগানের কোচ জালাল আহমেদ চৌধুরীসহ আরও অনেকেই দিয়েছেন। কিন্তু আসল কাজটি মাশরাফি করেছেন আশরাফুলকে ফিটনেস সচেতন করে তুলে। অনেকটা কড়া হেড মাস্টারের মতো ফিটনেসে মনোযোগী হওয়া, ওজন কমানো এবং শরীরটাকে চাঙ্গা রাখার সব পরামর্শ দিয়ে ব্যাট হাতে পুরনোতে ফিরে যেতে সহায়তা করেছিলেন। এবার দেখা যাক জাতীয় দলের জার্সি আর কতদূর রয়েছে লিটল মাস্টারের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ