ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 April 2018, ২২ চৈত্র ১৪২৪, ১৭ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বল টেম্পারিংয়ের অতীত ও বর্তমান

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ক্রিকেটে বল টেম্পারিং নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড়রাই বল টেম্পারিং করে আলোচনায় স্থান করে নিয়েছেন। কেউ শাস্তি পেয়েছেন। আবার কেউ ক্ষমা পেয়েছেন। তবে এবার অস্ট্রেলিয়ায় বল টেম্পারিং নিয়ে পুরো ক্রিকেট বিশ্বে তোলপাড় দেখা দিয়েছে। 

মাইক আথারটন (ইংল্যান্ড-দ.আফ্রিকা) ১৯৯৪, লর্ডস: ১৯৯৪ সালে সংবাদ পত্রের শিরোনাম হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক মাইক আথারটন। তবে অসাধারণ কিছু করে নয়, বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে। সেবার লর্ডসে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড। আথারটনের বিরুদ্ধে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়। সেই অভিযোগের বিষয়ে আথারটন বলেছিলেন যে তিনি তার পকেটে ধুলো রেখেছিলেন যাতে সেটা দিয়ে তার হাত শুকনো রাখা যায়। তারপরও ২ হাজার পাউন্ড জরিমানা হয়েছিল তার।

শচীন টেন্ডুলকার (ভারত-দ.আফ্রিকা) পোর্ট এলিজাবেথ, ২০০১: বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে সেবার শচীন টেন্ডুলকারকে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পোর্ট এলিজাবেথে সেবার মুখোমুখি হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারত। দ্বিতীয় টেস্টের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় শচীন বল টেম্পারিং করার চেষ্টা করছেন। পরে শচীন বলেছিলেন যে তিনি বলের গায়ে লেগে থাকা ঘাস পরিষ্কার করেছেন। কিন্তু আইসিসি তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এই বলে যে, আম্পায়ারের অনুমতি না নিয়ে তিনি কেন বল পরিষ্কার করেছেন। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাকে ইংলিশ ম্যাচ রেফারি মাইক ডেনিস এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেন। শচীনকে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় তৃতীয় টেস্টে মাইক ডেনিসকে আর ম্যাচ রেফারি হিসেবে না রাখার আর্জি জানাায় ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (বিসিসিআই)। সে অনুসারে আইসিসি পরের টেস্টে তাকে ম্যাচ রেফারি হিসেবে রাখেনি।

পাকিস্তান (পাকিস্তান-ইংল্যান্ড) ওভাল, ২০০৬: সেবার ওভালে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও পাকিস্তান। ম্যাচের একপর্যায়ে আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার ও বিলি ডক্ট্রোভ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ আনেন। পাশাপাশি সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ইংল্যান্ডকে ৫টি পেনাল্টি রান উপহার দেন। এই ঘটনায় মধ্যাহ্ন বিরতির পর পাকিস্তান মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানায়। তাতে ম্যাচটি বাজেয়াপ্ত হয়। যা ছিল ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাজেয়াপ্ত হওয়া ম্যাচ। পরে অধিনায়ক ইনজামাম-উল-হক বল টেম্পারিং করার বিষয়টি আইসিসি’র ট্রাইব্যুনালে পরিষ্কার করেন। তারপরও তাকে চার ম্যাচ নিষিদ্ধ করা হয়। কারণ, তিনি খেলতে কেন অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে ওই ম্যাচটি প্রথমে ড্র ঘোষণা করা হলেও পরবর্তীতে ইংল্যান্ডকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

ফ্যাফ ডুপ্লেসিস (দ. আফ্রিকা-পাকিস্তান) দুবাই, ২০১৩ : ২০১৩ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে দুবাই টেস্টে একটি বিদেশী বস্তু দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্যাফ ডুপ্লেসিসকে বল ঘষতে দেখা যায়। সেই বস্তুটি তিনি ট্রাউজারের পকেটের জিপের সঙ্গে রেখেছিলেন। বল টেম্পারিং করার অভিযোগে তাকে ম্যাচ ফি’র ৫০ শতাংশ জরিমানা করা হয়। ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার ভারনন ফিল্যান্ডার আঙ্গুল দিয়ে বল টেম্পারিং করে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন।

ফ্যাফ ডুপ্লেসিস (দ. আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া) হোবার্ট, ২০১৬: ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বল টেম্পারিংয়ের চেষ্টা করেন ফ্যাফ ডুপ্লেসিস। অবশ্য অস্ট্রেলিয়া তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনেনি। কিন্তু ভিডিও ফুজেট বিশ্লেষণ করার পর তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। তার ম্যাচ ফি এর শতভাগ জরিমানা করা হয়। অবশ্য ওই ম্যাচে সেঞ্চুরির কারণে জরিমানা দিয়েই সেবারের মতো নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে রেহাই পান ডুপ্লেসিস।

টেম্পারিংয়ের ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া: স্মিথকে এক সময় অস্ট্রেলীয়দের ক্রিকেট দেবতা স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সঙ্গে তুলনা করা হতো। বর্তমান সময়ে দেশটির পতাকাবাহক হিসেবেও সবার আগে ছিল তার নাম। কিন্তু একটা ঘটনাতেই চূর্ণ হয়ে গেল তাকে ঘিরে থাকা সম্মানের বলয়। এক মুহূর্তে বিশ্বনন্দিত থেকে বিশ্বনিন্দিত স্মিথ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপটাউন টেস্টে সতীর্থ ক্যামেরন ব্যানক্রফটের বল টেম্পারিংয়ের দায় স্বীকার করে নিজে ডুবেছেন, ডুবিয়েছেন কুলিন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটকেও। খোদ অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী এটিকে ক্রিকেট, দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাজনক বলে উল্লেখ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন স্মিথ। সহ-অধিনায়কত্ব হারান ডেভিড ওয়ার্নারও। এত বড় ঘটনা, অথচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি স্মিথকে মাত্র এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ ও ম্যাচ ফির শতভাগ, আর ব্যানক্রফটকে ৭৫ শতাংশ জরিমানা করে! তবে কঠোর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, তদন্ত সাপেক্ষে আজীবনের জন্য ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হতে পারেন স্মিথ।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ার তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান ক্যামেরন ব্যানক্রফট বল পেয়ে পকেটে হাত দেন। সেখান থেকে হলুদ রঙের একটি টেপ জাতীয় বস্তু (শিরিষ কাগজ) বের করেন। আঙ্গুলের ভাঁজে গুজে নেন সেটি। এরপর বলটিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে যে পাশটাতে একটু ক্ষত হয়েছে সে দিকটায় ঘষতে থাকেন। এরপর সেই হলুদ রঙের বস্তুটি আবার পকেটে পুড়ে রাখেন। ঘটনাটি কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু ক্যামেরার চোখ এড়ায়নি। এরপর জায়ান্ট স্ক্রিনে বার বার ব্যানক্রফটকে দেখাতে থাকে। ব্যানক্রফট বিষয়টি লক্ষ্য করে পকেট থেকে হলুদ বস্তুটি বের করে ট্রাউজারের গিট খুলে ভেতর ঢুকিয়ে আড়াল করেন! ফুটেজ দেখেই টেলিভিশন আম্পায়ার ইয়ান গোল্ড মাঠের দুই আম্পায়ার নাইজল লং ও রিচার্ড ইলিংওয়ার্থকে সতর্ক করেন। আম্পায়াররা অবশ্য মাঠে কিছুই খুঁজে পাননি। ব্যানক্রফটকে চ্যালেঞ্জ করলে পকেট থেকে একটি সানগ্লাস কভার বের করে দেখান। পরে অবশ্য আম্পায়াররা ব্যানক্রফটের বিরুদ্ধে বল বিকৃতির অভিযোগ আনেন। সংবাদ সম্মেলনে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার নিজেই পকেটে শিরিষ কাগজ থাকার কথা স্বীকার করেন।

সাবেক তারকা উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান এ্যাডাম গিলক্রিস্টের মন্তব্য, ‘দুনিয়ার কাছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া এখন হাস্যকর।’ কিংবদন্তি লেগস্পিনার শেন ওয়ার্ন যেমন বলেছেন, ‘ব্যানক্রফটের জন্যই আমার বেশি খারাপ লাগছে। জুনিয়র সদস্য হিসেবে ও এত কিছু বুঝতে পারেনি। ওকে দিয়ে আসলে কাজটা করানো হয়েছে।’ আর টেম্পারিংয়ের পরিকল্পনাটা যে অধিনায়ক ও শীর্ষ ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকেই এসেছিল, স্মিথ তো সেটি স্বীকারই করে নিয়েছেন। সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল ভনের টুইট, ‘স্মিথদের এখন একটা বিষয় মেনে নিতেই হবে, যতদিন বেঁচে থাকবে, মানুষ বলবে ওরা ক্রিকেটের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।’ তবে এই বল টেম্পারিং-ই স্মিথের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে প্রথম কোন বির্তক নয়। এর আগে বেশ কিছু বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তিনি। ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্ব পাবার পর উল্লেখযোগ্য চারটি বিতর্ক বেশ আলোড়ন ফেলেছিল ক্রিকেট জগতে।

ডিআরএস ব্রেইন ফেড: প্রায় একবছর আগে ভারতের বিপক্ষে চার টেস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ডিআরএস নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেন তিনি। ওই টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে লেগ বিফোর ফাঁদে পড়েন স্মিথ। এরপর ডিআরএস নেয়ার জন্য প্যাভিলিয়নের সহায়তা চান। এমন ঘটনা দেখে আম্পায়ার আর ডিআরএস নিতে দেননি স্মিথকে।

এন্ডারসনের সঙ্গে বির্তক: সর্বশেষ এ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়া দলকে উদ্দেশ্য করে ইংল্যান্ড পেসার বলেছিলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া হতাশায় ভুগছে’। এন্ডারসনের এমন কথার পরিপ্রেক্ষিতে মুখ বন্ধ করে থাকতে পারেননি স্মিথ। তিনি বলেন, ‘ক্রিকেট জগতে অন্যতম বড় স্লেজার এন্ডারসন।’ এ্যাডিলেড টেস্টের আগে যা ছিল অপমানজনক।

আম্পায়ারের সঙ্গে বিতর্ক: ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ডিআরএস-এ আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে অসম্মান করেন স্মিথ। যে কারণে ম্যাচ ফি’র ৩০ শতাংশ জরিমানাও গুনতে হয় তাকে।

রাবাদার শুনানির ফলাফলে নিজের মতামত দিয়ে বিতর্ক তৈরি করেন স্মিথ: চলতি মাসে পোর্ট এলিজাবেথে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক স্মিথকে ধাক্কা ও সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারকে আউটের পর মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার কাগিসো রাবাদা। ফলে ডিমেরিট পেয়ে আইসিসি কর্তৃক, নিষিদ্ধ হন রাবাদা। এরপর নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে আপিল করেন রাবাদা। সেই আপিলে জয় পেয়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে রেহাই পান রাবাদা। এমন ঘটনায় চটে যান স্মিথ। তিনি বলেন, ‘যার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটল, তাকেই শুনানিতে রাখেনি আইসিসি। আমি মনে করি আইসিসির এমন কাজ সত্যিই হাস্যকর।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ