ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 April 2018, ২২ চৈত্র ১৪২৪, ১৭ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গত তের বছরে খুলনার ২২৭টি পাট গুদামে অগ্নিকান্ড

 

খুলনা অফিস: প্রতি বছরই খুলনার বিভিন্ন পাট কলের গুদামে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এমনকি একই মালিকের প্রতিষ্ঠানেও একাধিকবার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে, এসব অগ্নিকান্ডের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকে নানা ‘রহস্য’। পাটের গোডাউনে এসব রহস্যজনক অগ্নিকান্ড যেন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য, অগ্নিকা-ের সঙ্গে গুদাম মালিকদের ‘অগ্নিবীমা’ বাণিজ্য নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।

কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, একদিকে পাট গুদামে আগুন লাগে, অন্যদিকে অপেক্ষা করে ‘অগ্নিবীমা’র বিশাল অঙ্কের অর্থের হাতছানি। আগুন লাগার কারণ বা সূত্র উদঘাটন না হলেও শত শত কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ মওকুফ এবং বীমার অর্থ ঠিকই চলে যায় পাট ব্যবসায়ীদের পকেটে। এদিকে, গত ১৩ বছরে খুলনাঞ্চলে এমন ২২৭টি অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। আর সেসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২২১ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২৭ মার্চ নগরীর আফিল গেটস্থ খুলনা বাইপাস সড়কের এফ আর জুট মিলস লিমিটেডের গোডাউনে আগুন লেগে ৭৫ কোটি টাকার পাট পুড়ে গেছে বলে মালিক পক্ষ দাবি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাটের গোডাউনে মজুদ করার আগে ফায়ার সার্ভিসের কিছু বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানছে না ব্যবসায়ী, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ও খোদ ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষও। ফলে অসাধু কতিপয় ব্যবসায়ী প্রতিবছর পাটের গোডাউনে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্সের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা লোপাট করছে। এমনকি পাট গুদামে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের ওয়্যার হাউস ও ওয়ার্কশপ লাইসেন্স গ্রহণ ও নিয়মাবলী মেনে নেয়ার নির্দেশ থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না।

ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, খুলনা জেলায় ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পাটের গুদামে ১৩টি অগ্নিকা-ের ঘটনায় ক্ষতি দেখানো হয় ২১ কোটি টাকা। এছাড়া ২০১২ সালে ৭৭টি অগ্নিকান্ডে আট কোটি ৬০ লাখ ৯৬ হাজার, ২০১৩ সালে ৪৯টি অগ্নিকা-ে ১২ কোটি ২৮ লাখ ৭৬ হাজার ৭০০, ২০১৪ সালে ৪৭টি অগ্নিকা-ে এক কোটি ৬৬ লাখ ৪৯ হাজার ৫৩০, ২০১৫ সালে ১২টি ঘটনায় ক্ষতি দেখানো হয়েছে ৯৮ লাখ ৮ হাজার ৮শ’ টাকা, ২০১৬ সালে ১০টি ঘটনায় ক্ষতি দেখানো হয়েছে সাত লাখ ৫০ হাজার টাকা, ২০১৭ সালে ১৬টি ঘটনায় ক্ষতি দেখানো হয়েছে ৭৩ লাখ ৩২ হাজার এবং ২০১৮ সালের চলতি মার্চ পর্যন্ত তিনটি অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ হিসেবে মালিকপক্ষ দাবি করেছে ১৭৭ কোটি টাকা।

সূত্র জানান, ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর শরীফ ফজলুর রহমানের মালিকানাধীন নগরীর দৌলতপুরস্থ এফআর জুট ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের ১০ নম্বর গোডাউনে আগুন লেগে প্রায় ২৫ কোটি টাকার পাট পুড়ে গেছে বলে দাবি করা হয়। এর আগেও ওই প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি পাটের গুদামে আগুন লাগার ইতিহাস রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৬ সালে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার নগরঘাটস্থ শরীফ ফজলুর রহমানের ছোট ভাই শরীফ সোবাহানের মালিকানাধীন শরীফ জুটের গোডাউনে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দেখানো হয় এক কোটি ১৯ লাখ টাকা, ২০০৭ সালে দৌলতপুরস্থ উত্তরা পাট সংস্থা, ইস্টার্ন ট্রেডার্স, গোল্ডেন জুট সাপ্লাইয়ে পৃথক অগ্নিকান্ডে ক্ষতি হয় তিন কোটি ৫৯ লাখ ৩৫ হাজার ৩৯০ টাকা, ২০০৮ সালে সবুজ বাংলা গোডাউনে তিন কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার ৮শ’ টাকা, ২০০৯ সালে পিপলস জুট মিল গোডাউনে ২০ লাখ, ২০১০ সালের ক্রিসেন্ট জুট মিল গোডাউনে ৯ লাখ ২০ হাজার ও দুই লাখ ৫২ হাজার ৬৬৯ টাকা, ২০১১ সালে ক্রিসেন্ট জুট মিল গোডাউনে ১৩ লাখ ৯ হাজার ৫শ’ টাকা, জিয়া ও মোল্লা জুটে ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা, অগ্রণী জুট সংস্থায় তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং সৌরভ টেডার্সে দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর আগে ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর খুলনার ফুলতলা উপজেলায় ফেরদাউস ভূইয়ার মালিকানাধীন আইয়ান জুট মিলে অগ্নিকান্ডে ক্ষতি দাবি করা হয় একশ’ কোটি টাকা। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি রূপসা উপজেলার গ্লোরী জুট মিলে অগ্নিকা-ে এক লাখ টাকা এবং দিঘলিয়াস্থ সাগর জুট মিলে ১২ই ফেব্রুয়ারি অগ্নিকা-ে ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি দেখানো হয়।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ অগ্নিকান্ডই সাজানো। স্বল্প পণ্য পুঁজি করে ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগসাজসে প্রতিবছরই কিছু ব্যবসায়ী এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। ফলে সরকার ও বীমা কোম্পানির কোটি কোটি টাকা গুণতে হলেও কিছু ব্যক্তি লাভবান হয়। গোডাউনগুলোতে ফায়ার লাইসেন্স থাকার কথা বলা হলেও একাধিক গোডাউন সরেজমিন পরিদর্শনে অগ্নিনির্বাপণের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। এছাড়া অগ্নিকান্ডের কারণ হিসেবে পাট ব্যবসায়ীরা বৈদ্যুতিক সর্টসার্কিট দাবি করলেও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ বলছেন, পাট গোডাউনে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকার কোনো নিয়ম নেই।

শরীফ জুট’র মালিক সোবাহান শরীফ বলেন, তার পাট গুদামে প্রচুর বৃষ্টির মধ্যে বজ্রপাত থেকে আগুন লাগে। তবে, ওই আগুন নিয়ে সার্ভে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির কাছে অনেকেই নানা মন্তব্য করেন। কিন্তু তা মিথ্যা প্রমাণ হয়। তার বড় ভাই’র এফআর জুট মিলেও সর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা তার। তবে, বৈদ্যুতিক লাইন ছিল কি-না সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি তিনি।

খুলনার শীর্ষ স্থানীয় পাট ব্যবসায়ীরা বলেন, সহজে পাটে আগুন লাগার কথা না। এ ধরনের অগ্নিকা-ে মূলত পাইকার ও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রতিটি আগুন লাগার ঘটনার সঠিক তদন্ত হলে এসব ঘটনা কমে যেত। এতে সরকার এবং বীমা কোম্পানিগুলোও লাভবান হতো। আর এখন লাভবান হয় কিছু ব্যক্তি, সেটি বন্ধ হতো।

সোনালী ব্যাংক খুলনা কর্পোরেট শাখার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার গোপাল চন্দ্র গোলদার জানান, পাট ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয়ার আগে পাট সংরক্ষণসহ আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়। তবে, তিনি খুলনায় নতুন যোগদান করায় এ অঞ্চলের পাট সেক্টরে কি পরিমাণ বিনিয়োগ এবং ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারেননি।

গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর শাহ জাহাঙ্গীর আবেদ বলেন, পাট গুদামে পণ্য মজুদকরণে বীমা করার ক্ষেত্রে আমরা প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত ব্যবসায়ী, ব্যাংক ঋণ গ্রহীতা কি না এ বিষয়টি দেখি। আর ব্যাংক দেখে থাকে তাদের ফায়ার লাইসেন্সসহ আনুষঙ্গিক বিষয়। দুর্ঘটনা ঘটলে বীমা কোম্পানির নিজস্ব তদন্ত টিম, ব্যাংক, ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনসহ নানা বিষয় পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা শেষে ক্ষতিগ্রস্তদের ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। তবে কেউ ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা সৃষ্টি করলে ও তদন্তে তা প্রমাণিত হলে তারা ক্ষতিপূরণ পাবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ