ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 April 2018, ২২ চৈত্র ১৪২৪, ১৭ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মর্মান্তিক!

এটা আর মোটেও নতুন খবর নয় যে, সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক আগেই বাংলাদেশ বিশ্বের এক নম্বর দেশের অবস্থান অর্জন করেছে। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন দেশের কোথাও না কোথাও কয়েকটি পর্যন্ত দুর্ঘটনা না ঘটছে। এসব দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু তো ঘটছেই, সেই সাথে আহত হয়ে বিকলাঙ্গও হয়ে পড়ছে অনেকে। 

গত মঙ্গলবার রাজধানীর কাওরানবাজারে এরকম একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিজের একটি হাত হারিয়েছে কলেজ ছাত্র রাজিব। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় এবং প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সেদিন দুপুরে বিআরটিসির একটি দ্বিতল বাসের পেছন দিকের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রাজিব তার গন্তব্যে যাচ্ছিল। আরো যাত্রী ওঠানোর জন্য বাসটি দাঁড়ানো অবস্থায় ছিল সার্ক ফোয়ারার পাশে। ওই স্থানটি বাস স্টপেজ হিসেবে পরিচিত। হঠাতই ‘স্বজন’ কোম্পানির একটি বাস দাঁড়ানো দ্বিতল বাসের বাম পাশ দিয়ে ওভারটেক করেছে। কিন্তু যথেষ্ট জায়গা না থাকায় ওভারটেককারী বাসটির চাপে কলেজ ছাত্র রাজিবের একটি হাত শুধু থেতলেই যায়নি, বিচ্ছিন্নও হয়েছে। হাতটি রাস্তায় পড়ে গেছে।

সেখানে উপস্থিত লোকজন রাজিবকে পান্থপথের একটি হাসপাতালে নিয়ে  গেছে। চিকিৎসকরা চেষ্টা করেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হাতটিকে আর শরীরের সঙ্গে জোড়া লাগাতে পারেননি। সেটা সম্ভব ছিলও না। তাছাড়া আহত রাজিবের শরীর থেকে এত বেশি পরিমাণ রক্ত ঝরেছে যে, তাকে বাঁচিয়ে রাখাটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকদের চেষ্টায় বেঁচে গেলেও সারা জীবন তাকে একটি হাত ছাড়াই থাকতে হবে। অর্থাৎ কলেজ ছাত্র রাজিবকে বিকলাঙ্গ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। খবরে জানা গেছে, পিতৃমাতৃহীন রাজিব পরিবারের বড় ছেলে। সে মহাখালি সরকারি তিতুমীর কলেজের ¯œাতকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্র পড়িয়ে এবং আত্মীয়দের সাহায্যে অনেক কষ্টে মেসে বাস করে জীবন কাটাচ্ছিল সে। অমন একজনের জীবনকেই ধ্বংস করে দিয়েছে এক বেপরোয়া বাসচালক। তাকে বা তার হেল্পার-কন্ডাক্টরকে কিন্তু পুলিশ আটক করতে পারেনি। বাসটিকে ফুটপাতের ওপর উঠিয়ে দিয়ে তারা পালিয়ে গেছে। পুলিশ আটক করেছে বিআরটিসি বাসের ড্রাইভারকে, যার কোনো দোষ ছিল না। 

ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারপতিরা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কলেজ ছাত্রকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ কেন দেয়া হবে না সে বিষয়ে জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। তারা সাথে দোষী চালক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও আদেশ দিয়েছেন। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, কলেজ ছাত্র রাজিবের হাত হারানোর এই ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। পর্যালোচনায় দেখা যাবে, এ ধরনের দুর্ঘটনার জন্য দায়ী আসলে বাস চালকরা। যাত্রী পাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিযোগিতা চালাতে গিয়ে তারা ট্রাফিক আইনকে তো তোয়াক্কা করেই না, মানুষের জীবনের ব্যাপারেও তাদের কোনো মায়া বা দায়দায়িত্ব থাকে না। এজন্যই যখন-তখন এবং যেখানে-সেখানে দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুষ মারা যাচ্ছে এবং পঙ্গুত্ব বরণ করছে। মঙ্গলবারের মর্মান্তিক ঘটনার পেছনেও রয়েছে প্রতিযোগিতার তথা পাল্লা দেয়ার একই কারণ। স্বজন কোম্পানির বাসটি যে রং সাইড দিয়ে ওভারটেক করেছে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে ঘটনাস্থলেই। 

বিষয়টিকে অবশ্যই হাল্কাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ, দেশে গাড়ির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। সুতরাং দুর্ঘটনা কমানোর জন্য বেশি জোর দিতে হবে যানবাহন ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে। এর শুরু হতে হবে বিআরটিএ থেকে, যেখানে ঘুষের বিনিময়ে ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল করার অনুমতি এবং গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আসে চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি। গাড়ি শুধু চালাতে পারলে চলবে না, অতিরিক্ত গতিতে চালানো, ওভারটেকিং করা, পেছনের গাড়িকে সাইড না দেয়া, ট্রাফিক সিগনাল না মানা, চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা এবং ধারণক্ষমতার চাইতে বেশি যাত্রী ও মালামাল ওঠানোর মতো বিভিন্ন কারণ রয়েছে, যেগুলোর জন্য দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এসব বিষয়ে চালকদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এবং যথেষ্ট সময় নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে তো বটেই এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিসিও মাত্র এক মাসের মধ্যে সব মিলিয়ে মাত্র ১০-১২ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দিয়েই লাইসেন্সের জন্য চালকদের বিআরটিএর কাছে পাঠাচ্ছে। বিআরটিএ-ও যাকে-তাকে লাইসেন্স দিচ্ছে। লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে দালালের মাধ্যমে এবং ঘুষের বিনিময়েও। এভাবে কোনোরকমে গাড়ি চালানো শিখে যারা দেশের সড়কপথে নেমে আসছে তাদের কারণেই ঘটছে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা। 

এমন অবস্থা কোনোক্রমেই চলতে পারে না। চালকদের বোঝানো দরকার, শুধু চালাতে পারাটাই যোগ্যতা প্রমাণ করে না। বড়কথা হচ্ছে আইন মেনে এবং কারো যেন কোনো রকম ক্ষতি না হয় সেসব দিকে লক্ষ্য রেখে অতি সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালানো। ‘সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি’ কথাটা প্রায় সব গাড়িতেই কেন লেখা থাকে তার কারণও চালকদের বুঝিয়ে দেয়া দরকার। দ্রুত না চালালে কিংবা সামনের গাড়িকে ওভারটেক না করলে যে দুনিয়া উল্টে যাবে না সে কথাটাও তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হবে। একথাও বোঝানো দরকার যে, তার নিজের এবং স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের মতো অন্যদের জীবনেরও সমান মূল্য রয়েছে। তাকে মানুষ হত্যার লাইসেন্স দেয়া হয়নি। 

ট্রেড ইউনিয়নের নামে চালকদের যারা প্রশ্রয় দিয়ে ঘাড়ে উঠিয়ে চলেছেন তাদেরও উচিত মানুষের জীবনের মূল্য নিয়ে চিন্তা করা এবং জীবন বাঁচানোর জন্য সচেষ্ট হওয়া। প্রসঙ্গক্রমে পুলিশের দায়িত্ব সম্পর্কেও বলা দরকার। ঘুষ খেয়ে ছেড়ে দেয়া ধরনের পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ স্মরণ করিয়ে দেয়ার পরিবর্তে বলতে হয়, কর্তব্যের প্রতি পুলিশ যদি একটু আন্তরিক হয় তাহলেই দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সেটাই এখন সময়ের দাবি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ