ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 April 2018, ২২ চৈত্র ১৪২৪, ১৭ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে ব্যর্থতায়  যুগের চাহিদা পূরণ হবে না

 

খুলনা অফিস ঃ রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষা ও  কেবল সনদ প্রদানই মূল উদেশ্য নয়, বরং মেধাবিকাশ, উন্মুক্ত চিন্তা- চেতনার উন্মেষ, বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা প্রয়োগের শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হলো বিশ্ববিদ্যালয়। নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা ও সৃজনশীল কর্মকান্ডে যাতে শিক্ষার্থীরা সম্পৃক্ত হতে পারে তার দ্বার উন্মোচন করাই হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন ও ব্যবহার এবং আবিষ্কার সম্পর্কে নিজস্ব কর্মসূচি থাকতে হবে। পাশাপাশি বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নিজেদের জন্য যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম এবং উন্নত পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে ব্যর্থ হলে তা যুগের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হবে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক, ইউসিজিসহ সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে মনে করেন রাষ্ট্রপতি। 

গতকাল বুধবার বিকেলে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) তৃতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। 

রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতি গঠনে প্রকৌশল শিক্ষার গুরুত্ব অত্যধিক। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষা একটি জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করে। প্রকৌশলীদের চিন্তা- চেতনায় থাকবে দূরদৃষ্টির সুস্পষ্ট প্রতিফলন। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিনিয়তই প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধিত হচ্ছে এবং নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তাই আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করে নতুন নতুন উদ্ভাবনে উদ্যোগী হয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। 

তিনি আরো বলেন, এখন মোবাইল ফোন নিয়ে সবাই ব্যস্ত। এ কারণে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’ 

রাষ্ট্রপতি মনে করেন, প্রযুক্তি উন্নয়নের সহায়ক। তবে এই প্রযুক্তি যেন সর্বনাশের কারণ না হয় সেদিকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘একটা কথা পরিষ্কারভাবে মনে রাখতে হবে, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়ার জন্য প্রযুক্তি বা মোবাইল ফোন কোনোভাবেই দায়ী নয়। বরং এর দায়দায়িত্ব ব্যবহারকারীর। আমাদের ইতিবাচক পরিবর্তন ও মানবতার কল্যাণে কাজে লাগানোর মধ্যেই প্রযুক্তির সার্থকতা নিহিত।

অনুষ্ঠান শুরুর আগে ময়মনসিংহের ভালুকায় বিস্ফোরণে নিহত কুয়েটের চার শিক্ষার্থীর স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। 

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আলমগীর। এতে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আসগর। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান।

সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মো. আবদুল হামিদ স্নাতক পর্যায়ে ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে ৩৮ জন কৃতী গ্রাজুয়েটকে ‘বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক’ দেন। এছাড়া যে সব শিক্ষার্থী ২০১০-২০১১ থেকে ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিইউআরপি এবং ২য় সমাবর্তনের পর থেকে এ সময়কাল পর্যন্ত পিএইচডি, এমফিল, এমএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ও এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেছেন তাদের ডিগ্রি দেয়া হয়। সর্বমোট ২৭৯৫ জনকে স্নাতক ও ২২৮ জনকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেয়া হয় সমাবর্তনে। এর মধ্যে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ২৬৫৭, বিইউআরপি ১৩৮, এমএস-সি ৬৯, এমএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ১০৩, এমফিল ৪৮ এবং ০৮ জনকে পিএইচডি ডিগ্রির সনদ দেয়া হয়েছে।

এদিকে খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গর্বিত গ্রাজুয়েটরা তৃতীয় সমাবর্তন উৎসবে মেতে ওঠেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় একটি দিন অতিবাহিত করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সময়ের গ্রাজুয়েটরা। আনন্দ-উল্লাস আর ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক আওয়াজে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা ক্যাম্পাস। সমাবর্তনের সেই চিরচেনা পোশাক, কালো গাউন আর কালো হ্যাট পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের প্রিয় স্থানগুলো তাদের ক্যামেরার ফ্রেমেবন্দী করে রাখেন। দলবদ্ধ হয়ে তুলছেন সেলফিও। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এ মিলন মেলার উৎসবের ঢেউয়ে সামিল হন বর্তমান শিক্ষার্থীরাও। গোটা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে সাজানো হয়েছে নান্দনিক সাজে। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া এক এক শিক্ষার্থীর আবেগ অনুভূতি এক এক রকমের।

১২ ব্যাচের প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, ‘কুয়েটে এসে মনে হচ্ছে কেমন যেন নিজেকে আবার ফিরে পেয়েছি। যেখানে চারটা বছর কেটেছে বন্ধুদের নিয়ে অনেক স্মৃতির মধ্যদিয়ে। আবার সেই প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরে এসে পুরানো দিনগুলো যেন খুঁজে পাচ্ছি। খানজাহান আলী হল, খাজার পুকুর, তড়িৎ কৌশল বিল্ডিং, দুর্বার বাংলা, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি আর রাত জেগে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়ার মুহূর্তগুলো আবার ফিরে পেয়েছি।’

প্রকৌশলী রাইয়ান জাহিন বলেন, কুয়েটে এসে অনেক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। যদিও খানজাহান আলী হলের ২১১ নম্বরটা ঠিক আগের মতই আছে। নতুন শহীদ মিনার, স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার সেন্টার, নতুন একাডেমিক ভবন, ফ্যাব ল্যাব ইত্যাদি কুয়েটে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। সবুজ এই ক্যাম্পাসে ঢুকেই কেমন যেন প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছি। আর পুরানো স্মৃতির মুহূর্তগুলো আবার সব সত্যি হয়ে ধরা দিচ্ছে।

আরেক তড়িৎকৌশল প্রকৌশলী মুবাশ্বির হোসেন জানান, আবার কুয়েটে এসে নিজের ভেতর একটা আবেগ কাজ করছে। স্মৃতি কাতর হয়ে পড়ছি। যদিও কিছুদিন সময় নিয়ে আসতে পারলে এসময়টাকে আরো বেশি স্মরণীয় করে রাখতে পারতাম, তবুও আমি আসতে পেরে উচ্ছ্বসিত। তাছাড়া এখানে আসার পর থেকেই চার বছরের স্মৃতির কিছুটা হলেও পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারছি।

আবেগ আপ্লুত হয়ে প্রকৌশলী ফরহাদ হোসেন বলেন, সময়ের প্রয়োজনে হয়তো আজ আমরা বিভিন্ন শহরে। কিন্তু জীবনের চারটা বছর কাটিয়ে আসা কুয়েটের স্মৃতি ভুলে যাওয়ার নয়। খানজাহান আলী হলে থাকতাম আমরা পাঁচবন্ধু। একই বিভাগে পড়তাম। আমাদের প্রতিদিনের শুরুটা একইভাবেই হতো। দিনের রুটিন ওয়ার্ক শেষে যখন রাত নামতো তখনি শুরু হতো আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তিতর্কের পর্ব। এটা বিশেষ করে পড়তে বসার সময় পরীক্ষার দিনগুলোতে এবং রাতের খাবার পর। মাঝে মাঝে একসঙ্গে ঘুরতে যেতাম, খেতে যেতাম। আমরা ৫ রুমমেট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ