ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 April 2018, ২২ চৈত্র ১৪২৪, ১৭ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাশিয়া বনাম পাশ্চাত্যের কূটনীতিক লড়াই

৪ এপ্রিল, আরটি : কূটনৈতিক রাজনীতিকোষে ‘টিট ফর ট্যাট ডিপ্লোম্যাসি’ নামে একটি প্রবচন যুক্ত হলো। ইংরেজি এই প্রবচনটিকে খেলার মাঠ থেকে সরাসরি বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চে তুলে আনলেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই ল্যাভরভ। তবে খেলার মাঠে এই প্রবচনটি প্রথম ব্যবহার হয় ১৯৮০ সালে। রবার্ট এক্সেলরডের দুটি খেলাকে কেন্দ্র করে এই প্রবচনটি ব্যবহার করেন অ্যানাটল র‌্যাপোর্ট। বাংলা প্রবচন ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’ কথাটির ইংরেজি সংস্করণ বলা যায় ‘টিট ফর ট্যাট’ কথাটিকে।

গত মার্চ মাসে ব্রিটেন অভিযোগ করে, রাশিয়ার পক্ষত্যাগী গোয়েন্দা সার্গেই স্ক্রিপাল এবং তার মেয়েকে বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাস নার্ভ এজেন্ট হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। কিন্তু রাশিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করে তদন্ত করার জন্য ব্রিটেনের সহযোগিতা চায়। সেই সহযোগিতা না পেয়ে এখন রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ব্রিটেনই এই হামলা চালিয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে কোনো দিকে কর্ণপাত না করে নিজ দেশ থেকেতো রাশিয়ান কূটনীতিকদের বহিষ্কারই করেছেন না, ব্রাসেলসে ইইউ সদর দপ্তরে ইইউর নেতৃবৃন্দকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন। আর তাতে সাড়া দিয়ে ইইউ, ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ২৭টি দেশ থেকে ১৫০ জন কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ মিশনেই আছে রাশিয়ার তিনটি কনস্যুলেট এবং আরও ৫০ জন কর্মকর্তা।

বিশ্বব্যাপী অন্তত ২৪২টি স্থানে রাশিয়ার কূটনীতিকরা কাজ করেন। এরমধ্যে দূতাবাস রয়েছে ১৪৩টি আর কনস্যুলেট আছে আরও ৮৭টি জায়গায়। এর বাইরেও রয়েছে ১২টি কূটনৈতিক মিশন। সব মিলিয়ে ১৪৫টি দেশে রাশিয়ার কূটনৈতিক উপস্থিতি রয়েছে। তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসবে রাশিয়াও ২৩ দেশের ১৭৯ জন কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে। এটাকেই ল্যাভরভ ‘টিট ফর ট্যাট’ ডিপ্লোম্যাসি বলেছেন।

উল্লেখ্য, ক্রিমিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ২০১৭ সালের মাঝামাঝিতে রাশিয়া নিজেই যুক্তরাষ্ট্রে থাকা রাশিয়ান মিশনগুলো থেকে ৭৫৫ জনকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ৭৪ হাজার ৪০০ কর্মীর মধ্যে ১৩ হাজার ৭শ আছেন ফরেন সার্ভিসে এবং এর মধ্যে ৯ হাজার ৪শ বিদেশে কর্মরত। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের বিদেশে কর্মরত কূটনীতিকের পদ আছে ১ হাজার ছয়শ’।

থেরেসা মের আহবানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে সাড়া দেওয়া হলেও অস্ট্রিয়া বলেছে, তারা রাশিয়ার কোনো কূটনীতিককে বহিষ্কার করবে না। অথচ ১৭৪৮ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের শেষ প্রান্তে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছিল কূটনৈতিক বিপ্লব। আর এই বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল ১৭৫৬ সালে। বলতে গেলে মাঝের মাত্র আট বছরে প্রায় সারাবিশ্বেই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায়। কিন্তু তার প্রায় ২৬২ বছর পর টিট ফর ট্যাট ডিপ্লোম্যাসিতে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। কূটনীতির ক্ষেত্রে এই বিপর্যয়কে স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ের কথা কেউ কেউ স্মরণ করছেন। স্নায়ুযুদ্ধ এমন একটি বিষয় যা ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়।’ এই স্নায়ুযুদ্ধের প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনসটন চার্চিলের ওয়েস্ট মিনিস্টার কলেজের একটি ভাষণ থেকে। সেই ভাষণকে মার্কিন ভাষ্যকার ওয়াল্টার লিপম্যান কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধ বলে উল্লেখ করেন। এই স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয় ১৯৯১ সালে রুশ ফেডারেশনের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে। এবারের কূটনৈতিক বিপর্যয়ও শুরু হয়েছে সেই রাশিয়াকে কেন্দ্র করেই। এবারের বিপর্যয়ের পরিসমাপ্তি কিভাবে ঘটে এখন সেটিই দেখার বিষয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ