ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 April 2018, ২২ চৈত্র ১৪২৪, ১৭ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ডুমুরিয়ায় বিশুদ্ধ পানি সংকটে ভুগছে তিন গ্রামের মানুষ

খুলনা অফিস : খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বাদুরগাছা, বাগআঁচড়া ও জিয়েলতলা গ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে। আর কতদিন পানির হাহাকার চলবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউ। আস্তে আস্তে প্রায় সব গভীর নলকূপগুলো অকেজো হয়ে পড়ছে। সেই সাথে পুকুরের পানিও ফুরিয়ে আসছে। পানি সংকট মোকাবেলায় জনস্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে এখনো নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। ফলে ওই এলাকার মানুষের দুশ্চিন্তা ক্রমন্বয় বেড়েই চলেছে।   

সরেজমিনে ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, চলতি খরা মওসুমে উপজেলার শোভনা ইউনিয়নের বাগআঁচড়া, বাদুরগাছা ও জিলেয়তলা গ্রামের দেড় শতাধিক গভীর ও অগভীর নলকূপে ভয়াবহ পানি সংকট দেখা দিয়েছে। প্রায় দুই মাস যাবৎ তাদের এ সমস্যা চলে আসছে। আস্তে আস্তে প্রায় সব নলকূপগুলো অকেজে হয়ে পড়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছে তিন গ্রামের প্রায় ৫ হাজার মানুষ। 

অধিকাংশ পরিবারে দেখা গেছে, তাদের বাড়িতে এক কলসী পানি নেই। গ্রামে ২/৩টি গভীর নলকূপে যা একটু আধটু পানি উঠছে তাতে এক কলসী পানি ভরতে আধা ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে। এক গ্লাস পানি ভরতে ৪/৫ চাপ দিতে হচ্ছে। তাও আবার সব সময় ওঠে না। সকালে-বিকেলে এবং রাতে বিশেষ করে যখন ডিপ বোরিং হতে বোরো ধানে পানি দেয়া হচ্ছে তখন টিউবওয়েলগুলোতে একটুও পানি ওঠে না। ওই সময় টিউবওয়েল চাপলে প্রচ- প্রেসার পড়ে। এ নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয়  দৈনিক পত্র-পত্রিকায় একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হলেও টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাদের। প্রায় দু’মাস যাবৎ পানির জন্য হাহাকার চলছে। তেলিগাতি নদী পার হয়ে বালুইঝাকি বিলের ডিপ বোরিংয়ের পানি পান করে জীবন বাঁচিয়ে রাখছে তারা। প্রতিদিন জোয়ারের সময় এলাকার লোকজন কসকেট সোলের ভেলায় করে ২০ লিটার পানির টপে পানি আনছে। আবার কেউ ডোঙ্গায় করে কলসী ভরে পানি আনছে। ডোঙ্গায় কলসী সাজিয়ে বড় নদী পার হয়ে ১০ম শ্রেণির রূপা মন্ডল নামে এক ছাত্রীকেও পানি আনতে দেখা গেছে।  বাদুরগাছা গ্রামের দক্ষিণপাড়া ঢালীবাড়ির একটি টিউবওয়েলে পানি নিতে আসা মান্দারতলা গ্রামের গৃহবধূ শ্যামলী মিস্ত্রি বলেন, এক কলসী জল ভরতে আধা ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। এক গ্লাস ভরতে কমপক্ষে ৪/৫ চাপ দিতে হচ্ছে। জল নিতে আসলে বাড়ির অন্য কাজ পড়ে থাকছে।  

বাদুরগাছা পূর্বপাড়ার গৃহবধূ অনিতা মন্ডল বলেন, আমরা জলের অভাবে আগে কোনোদিন পড়েনি। ফাল্গুন মাস থেকেই রান্না ও ধোয়াপালা করছি নদীর জল দিয়ে। আমাদের টিউবওয়েলে জল নেই। পাশের বাড়ি পিনাক বাবুর টিউবওয়েলে অল্প অল্প জল উঠছে। একজন মানুষ সারাদিন ৪ থেকে ৫ গ্লাস জলও পান করতে পারি না। বাড়ির গরু-বাছুরগুলো নদীর লবণ জল খাচ্ছে না। 

ওই গ্রামের সুকুমার সরদার বলেন, আমরা প্রতিদিন জোয়ারের সময় প্রায় একশ’ পরিবার কসকেট ভেলায় করে তেলিগাতি নদী পার হয়ে বালুইঝাকি গ্রামে ইন্দ্রজিতের ডিপ বোরিংয়ের সাব মার্সেবল পাম্পের মাধ্যমে বিশুদ্ধ জল তুলে আনছি। তাতেও চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া অনেকে ডিপ বোরিংয়ের জল আমাদেরকে দিচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।         

স্থানীয় ইউপি সদস্য দেবব্রত সরদার বলেন, আমরা সীমাহীন পানি সংকটে ভুগছি। বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেকে খাল-বিলের পানি দিয়ে ধোঁয়াপালা করছেন, ভাত রান্নাও করছে। এতে অনেক পরিবারে বিশেষ করে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। প্রায় দু’মাস যাবৎ মানবসৃষ্ট এমন সমস্যার বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা। অচিরেই সাবমার্সিবল পাম্পযুক্ত ডিপ বোরিংগুলো বন্ধ না হলে আগামীতে খাওয়ার পানির সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করবে বলে তিনি জানান।  

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, বিষয়টি আমরা জরুরি ভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ইতোমধ্যে পাবলিক হেল্থ দফতরে জানিয়েছি। 

এদিকে জনস্বাস্থ্য অধিদফতরের উপ-প্রকৌশলী পৃথ্বীশ কুমার মন্ডল বলেন, এই মুহূর্তে বাদুরগাছা-বাগআঁচড়া এলাকায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করা জরুরি। কিন্তু ওই এলাকায় রাস্তা সরু হওয়ার কারণে ট্রাক ঢুকবে না। এছাড়া এ প্রকল্প চালু করতে হলে খরচের একটা ব্যাপার রয়েছে। তাছাড়া এলাকাটি দুর্যোগপূর্ণ ঘোষণা হয়নি। দুর্যোগপূর্ণ এলাকা ঘোষণা হলে ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ত্রাণ হিসেবে ব্যবস্থা করা হতো। তবে চিন্তিত হওয়ার কোনো দরকার নেই। বৃষ্টি মওসুম হলে ঠিক হয়ে যাবে।      

উল্লেখ্য, বোরো চাষের জন্য উপজেলায় মোট ১৩টি ডিপ বোরিং রয়েছে। এর মধ্যে শোভনা ইউনিয়নে রয়েছে ১০টি। এর মধ্যে অধিকাংশ রয়েছে সাবমার্সিবল পাম্পযুক্ত বোরিং। ফলে শিবপুর, বালইঝাকি, জিয়েলতলা, কুলতলা বিল সংলগ্ন দুই কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা জুড়ে ভূগর্ভস্থ পানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ