ঢাকা, শুক্রবার 6 April 2018, ২৩ চৈত্র ১৪২৪, ১৮ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পরকীয়া এবং রংপুরের হত্যাকান্ড

রংপুরে ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়া অ্যাডভোকেট রথীশ চন্দ্র্র ভৌমিকের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে তাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গত মঙ্গলবার র‌্যাব ও পুলিশ তার অর্ধগলিত মৃতদেহ খুঁজে পেয়েছে। নিজের বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরের একটি নির্মাণাধীন বাড়ির মাটি খুঁড়ে তাকে পুঁতে রাখা হয়েছিল। তারও পাঁচদিন আগে ২৯ মার্চ, বৃহস্পতিবার রাতে অ্যাডভোকেট ভৌমিককে হত্যা করেছিলেন তার স্ত্রী এবং স্থানীয় তাজহাট স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা ¯িœগ্ধা সরকার। হত্যাকান্ডে স্ত্রী ¯িœগ্ধাকে সহযোগিতা করেছেন একই স্কুলের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলাম। দীর্ঘ দু’মাস ধরে পরিকল্পনা করার পর ওই রাতে স্বামীর খাবার ও দুধের সঙ্গে খান দশেক ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলেন স্ত্রী ¯িœগ্ধা। এর ফলে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন অ্যাডভোকেট ভৌমিক। সে অবস্থার সুযোগ নিয়েই কামরুলের সহযোগিতায় স্বামীর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে অ্যাডভোকেট ভৌমিককে হত্যা করেন স্ত্রী ¯িœগ্ধা।

পরদিন ভোরে শিক্ষক কামরুল ভাড়ায় একটি ভ্যান গাড়ি আনেন এবং নিহত আইনজীবীর মৃতদেহ স্টিলের আলমারিতে ভরে বাবুপাড়ার বাড়ি থেকে তাজহাট মোল্লাপাড়ার নির্মাণাধীন বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে আগেই নগদ টাকার বিনিময়ে দু’জন কিশোরকে দিয়ে কামরুল গর্ত খুঁড়িয়ে রেখেছিলেন। অ্যাডভোকেট ভৌমিককে ওই গর্তে ঢুকিয়ে মাটি চাপা দেয়া হয়। এ ব্যাপারেও কামরুল আগের দুই কিশোরকে কাজে লাগান। প্রতিটি বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন স্ত্রী ¯িœগ্ধা সরকার। নিহতের ভাই সুশান্ত ভৌমিকের দায়ের করা জিডির সূত্র ধরে তদন্ত করতে গিয়ে স্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল। ওদিকে কথিত অপহরণের প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে গোয়েন্দা ও পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবও তৎপর হয়ে ওঠে। গত মঙ্গলবার স্ত্রী ¯িœগ্ধাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়া হয়। সেখানেই ¯িœগ্ধা সরকার স্কুলের সহকর্মী শিক্ষক কামরুল ইসলামের সঙ্গে নিজের পরকীয়া থেকে হত্যা ও মৃতদেহ গুম করা পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তাজহাটের নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে অ্যাডভোকেট ভৌমিকের অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, নিহতের স্ত্রী ¯িœগ্ধা সরকারের বয়স পঞ্চাশের ওপরে। তার মেয়ে স্কুলে এবং ছেলে কলেজে আইন নিয়ে লেখাপড়া করছে। 

রংপুরের ‘নিখোঁজ’ অ্যাডভোকেট রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের সন্ধান পাওয়ার এবং মৃত অবস্থায় হলেও উদ্ধার করার খবর মর্মান্তিক হলেও জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। এর কারণ, তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তাছাড়া জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও এবং মাজারের খাদেম হত্যা মামলার সরকারি কৌসুলি অ্যাডভোকেট ভৌমিক যে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতাও ছিলেন সে কথাটা প্রথম থেকেই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এমনভাবেই প্রচারণা চালানো হয়েছে, দেশপ্রেমিক সচেতন মহল যার মধ্যে সাম্প্রদায়িক উসকানির উদ্দেশ্য লক্ষ্য না করে পারেননি। 

এই সুযোগে চেতনা ও জাগরণওয়ালারাও তৎপর হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি মিছিল, মানব বন্ধন এবং প্রতিবাদ সমাবেশেই আঙুল ওঠানো হচ্ছিল তথাকথিত স্বাধীনতা বিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির দিকে। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরকে জড়িয়েও প্রচারণা যথেষ্টই চালানো হয়েছে। এরই পাশাপাশি পুলিশের কার্যক্রমও ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, নিরপেক্ষভাবে বিস্তারিত তদন্ত না করেই পুলিশ বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছিল। এর ফলে জনমনে এমন ধারণাই প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছিল যেন অ্যাডভোকেট রথীশ ভৌমিককে অপহরণ করা হয়েছে এবং এর পেছনে প্রধান ভূমিকা রয়েছে বিএনপি-জামায়াতের! 

এভাবে সব মিলিয়েই বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক উসকানির উপলক্ষ বানানোর অপতৎপরতা চালানো হয়েছিল। আমরা এ ধরনের ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানাই এবং মনে করি, অপহরণ ও হত্যাকান্ডের অসহায় শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে অপরাজনীতি কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। কারণ, এর ফলে প্রকৃত ঘাতক-অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ার সুযোগ পায় এবং নিরীহ এমন কিছু মানুষের ওপর দোষারোপের অজুহাত তৈরি করা যায়, যাদের ওই অপরাধের সঙ্গে দূরতম সম্পর্কও ছিল না। 

এর মাধ্যমে আসলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই চরিতার্থ করা হয়। রংপুরের অ্যাডভোকেট রথীশ ভৌমিকের ক্ষেত্রেও তেমন চেষ্টাই করা হয়েছিল। এটা শুধু অগ্রহণযোগ্য ও আপত্তিকরই নয়, সকল বিচারে ঘৃণ্য অপরাধও। কারণ, বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার মতো ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছিল। রংপুরবাসীর পাশাপাশি জাতিরও ভাগ্য ভালো, সুচিন্তিত প্রচারণা ও অপতৎপরতার বেড়াজাল ভেঙে র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশসহ আইন-শৃংখলা বাহিনী সত্য উদ্ঘাটন করেছে। ধরা পড়েছে অ্যাডভোকেট রথীশ ভৌমিকের স্ত্রী ¯িœগ্ধা সরকার এবং তার প্রেমিক কামরুল ইসলামসহ চারজন ঘাতক। শুধু তা-ই নয়, স্ত্রী ¯িœগ্ধা তার পরকীয়ার কথাও স্বীকার করেছেন।  

আমরা ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটন করার এবং নিহত আইনজীবীর স্ত্রী ও তার প্রেমিকসহ খুনের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করার জন্য র‌্যাবসহ আইন-শৃংখলা বাহিনীর প্রতি অভিনন্দন জানাই এবং আশা করি, ভবিষ্যতেও জাতিকে বিভক্ত করার এবং সাম্প্রদায়িক উসকানি দেয়ার সকল অপতৎপরতা থেকে রক্ষার ব্যাপারে তারা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ