ঢাকা, শনিবার 7 April 2018, ২৪ চৈত্র ১৪২৪, ১৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সরকার আর দুদকের টার্গেট বিএনপি?

জিবলু রহমান : কঠিন সময় অতিক্রম করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। পরিবার ও দলসহ তিনি নিজেই মামলা-হামলায় আক্রান্ত। তার নিজের বিরুদ্ধে রয়েছে ১৯টি মামলা। একটিতে সাজা হয়েছে। ছেলে তারেক রহমানও ৩১ মামলা নিয়ে রয়েছেন বিদেশে। অপর ছেলে চলে গেছেন পরপারে। কাছে নেই কোনো নিকটাত্মীয়। রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনদের নির্যাতনের মাধ্যমে বিগত সময় কেটেছে। অনুসারীরা মনে করছেন, নির্বাচন হলেই ক্ষমতায় আসবেন। কিন্তু পরের নির্বাচন কীভাবে হবে তা জানেন না খালেদা জিয়া নিজেও। লাখো মামলা কাঁধে নিয়ে পলাতক থাকা নেতা-কর্মীরা নেত্রীর আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে।

৪ এপ্রিল ২০১৮ জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে আয়োজিত যুব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, কেউ অসুস্থ হলে বা কারো অনুপস্থিতিতে কে কোন দায়িত্ব পালন করবে তা দলের সংবিধানে স্পষ্ট করে লেখা আছে। তাই কেউ অসুস্থ হলে দল অচল হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও তার বিশেষ সহকারী শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসসহ সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে যুব সমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইয়ুথ ফোরাম। এমাজউদ্দীন বলেন, যখনই কোনো সংগঠন তৈরি হয় তখনই সেই দলের কিছু বিধিবিধান তৈরি হয়ে থাকে, যাকে দলের সংবিধান বা গঠনতন্ত্র বলা হয়। বিএনপিরও গঠনতন্ত্র আছে। সেখানে প্রথম থেকে দশম স্থান পর্যন্ত উল্লেখ আছে, কে কোন ভূমিকা পালন করবে। ঢাবির সাবেক এ ভিসি বলেন, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। এ দলের চেয়ারপার্সন একবার-দু’বার নয়, তিন তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। বিএনপি সবসময় দেশের উন্নয়নে কাজ করেছে। তাই এদেশে বিএনপির বিকল্প কোনো দল নেই। খালেদা জিয়ার প্রতি জনগণের যে সহানুভূতি রয়েছে তা দেখে ক্ষমতাসীন দল ভীত। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বেশিদিন টিকবে না। জনগণ দেশের মালিক, জনগণ থেকে যদি কোনো সরকার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে সেই সরকারের স্থায়িত্ব বেশিদিন হয় না। 

এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, রাজনীতির স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনীতির স্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হয় না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বে সরকারকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। এটা আগেই প্রয়োজন। বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেছেন, ‘দুর্নীতির তদন্ত করা নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করতেই কাজ করছে দুদক।’ নোমান আরও বলেন, ‘আজকে কথা বলার অধিকার নাই, কোর্টে বিচার নাই। এ দেশের জনগণ বেগম খালেদা জিয়াকে শুধু বিএনপি নেত্রী মনে করে না, তারা মনে করে গণতন্ত্রের নেত্রী, অধিকারের নেত্রী, জনগণ বেগম জিয়ার দিকে চেয়ে আছে বেগম জিয়াকে জনগণ একদিন মুক্ত করে বাংলাদেশে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী বানাবে।’ বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। তিনি আজ অসুস্থ, তাকে মুক্তি দিয়ে সুচিকিৎসার সুযোগ সরকার দেবে বলে মনে করছি। এই সরকারের কোনো আনুকূল্য আমরা চাই না।’ 

বিশদলীয় জোট নেতারা বক্তব্যে বলেন, আজকে আওয়ামী লীগ ভয়ে আছে, ভয় থেকেই তারা দিশাহারা হয়ে একের পর এক মামলা দিচ্ছে দুদক দিয়ে কল্প-কাহিনি সাজাচ্ছে। সরকার আগামী নির্বাচনকে বাঁচামরার হুমকি হিসেবে নিচ্ছে, সরকার যেভাবে হোক ক্ষমতায় থাকতে চায়, এটা করতেই সরকার এক একটা পাপ ঢাকতে নতুন নতুন পাপ করছে। আওয়ামী লীগ ও সরকারকে মনে রাখতে হবে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে না হলে তাদের শেষ রক্ষা হবে না। জনগণ সরকারের লাগাম টেনে ধরবে একদিন।’ 

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলা মামলার মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা পাঁচটি মামলা চলছে দ্রুতগতিতে। বাকিগুলো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় করা সহিংসতা, নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির পিটিশন মামলা। দুদকের করা পাঁচটি মামলার মধ্যে রয়েছে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, বড়পুকুরিয়া দুর্নীতি মামলা ও নাইকো দুর্নীতি মামলা। এর মধ্যে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের শাস্তি হয়েছে। সহিংস ও নাশকতার অভিযোগের মামলাগুলো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় দায়ের করা। এর মধ্যে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। 

তারেক রহমান ৩১টি মামলা নিয়ে রয়েছেন লন্ডনে। এর ১৭টিতে দেয়া হয়েছে অভিযোগপত্র। ছেলের বউ জোবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে একটি মামলা। অকালে মৃত্যুবরণ করা ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে সাতটি মামলা মাথায় নিয়ে চলে যেতে হয়েছে। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির ১২ নেতার বিরুদ্ধে ২৮৮টি, আট ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১৩১টি, বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাত উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ১২৪টি, সাত যুগ্ম মহাসচিবের বিরুদ্ধে ২৫৪টি এবং চার সিটি মেয়রের বিরুদ্ধে ৩৮টি মামলা রয়েছে। এর বাইরে বিএনপির দাবি, সারা দেশে ২৫ হাজার মামলায় বিএনপির পাঁচ লক্ষাধিক নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এই হিসাব ২০১৬ সালের। (সূত্র : দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)

২৫ মার্চ ২০১৮ খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা কারাগারে গিয়ে দেখা করে এসেছেন। আইনজীবীরা বলছেন, খালেদা জিয়া তাঁদের কাছে জানতে চেয়েছেন কেন তাঁর জামিন হচ্ছে না। সরাসরি এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাঁরা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছেন যে দেশে আইনের শাসন থাকলে তাঁকে (খালেদা জিয়া) কেউ আটকে রাখতে পারবে না। তবে তাঁরা খালেদা জিয়াকে জামিন বিলম্বের কারণ হিসেবে বলেছেন, এই মামলার পেছনে রাজনীতির বিষয়টিও আছে। সরকার এটা রাজনৈতিকভাবেও নিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, ‘আমরা ম্যাডামকে বলেছি, যেভাবে আপনার জামিন আটকে গেছে, তা পাক-ভারত উপমহাদেশে নজিরবিহীন। আমরা বিএনপির চেয়ারপার্সনকে আশ্বস্ত করেছি যে স্বৈরশাসকেরা মামলা দিয়ে আপনাকে আটকে রাখতে পারবে না।’ মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, ‘ম্যাডাম বলেছেন, সামনের নির্বাচনে বিএনপি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের মতো বিজয় লাভ করবে।’ (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ২৬ মার্চ ২০১৮)

সংবাদপত্রে এসেছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা পরিচালনায় খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বেশ কিছু ভুল করেছেন। ওই মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা, যার আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী। ফৌজদারি কার্যবিধিতে অভিযোগ গঠনের সময় আসামিকে অব্যাহতি দেয়ার একটি বিধান রয়েছে। এ জন্য আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে আবেদন করতে হয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা এ বিষয়ে আবেদন করেননি।

এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. মাজেদ আলী (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) সাক্ষ্য দেন। তিনি সাক্ষ্য দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এতিম তহবিলের নথি, যাতে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন তহবিলের অর্থ মেয়াদি জমা (এফডিআির) সংক্রান্ত তথ্য, সোনালী ব্যাংক রমনা শাখার হিসাব সংক্রান্ত কাগজপত্র ও তথ্য, বগুড়া ও বাগেরহাটের এতিমখানা সম্পর্কিত তথ্য রয়েছে তা আদালতে দাখিল করেন। এসব কাগজপত্র স্বাক্ষরবিহীন ও ঘষামাজা বলে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা যুক্তিতর্কের সময় দাবি করেন। তাঁরা বলেন, এসব কাগজপত্র জাল ও সৃজিত। কিন্তু এসব কাগজপত্র যখন আদালতে উপস্থাপন করা হয় তখন খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের বিনা আপত্তিতে তা আদালত গ্রহণ করেন।

 জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের ৫৪৭ পৃষ্ঠায় আদালত উল্লেখ করেন, খালেদা জিয়া বা তাঁর কৌঁসুলিরা কোনো প্রকার আপত্তি করেননি। আইন অনুযায়ী আদালতে দাখিল করা কোনো কাগজপত্র যদি ভুল বা তৈরি বলে কোনো পক্ষ মনে করে তাহলে তাদের আপত্তি জানাতে হয়। এ ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা কোনো ধরনের আপত্তি জানাননি, যা তাঁদের ভুল। এই ভুলের কারণে যুক্তিতর্ক শুনানির সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের বক্তব্য রায়ে বিবেচনা করা হয়নি।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় প্রধানমন্ত্রীর  

 এতিম তহবিল নামে কোনো তহবিল ছিল না মর্মে খালেদা জিয়ার পক্ষে দাবি করা হয়। ওই দাবিতে বলা হয়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠনের জন্যই কুয়েতের আমির টাকাটা অনুদান দিয়েছিলেন। এ জন্য খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা কুয়েত দূতাবাসের একটি সনদ আদালতে দাখিল করেন ২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর। ওই সনদে উল্লেখ আছে, কুয়েত সরকারের পক্ষ থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে টাকা দান করা হয়েছে। কোনো পৃথক ব্যক্তি বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য তা দেয়া হয়নি। আদালতে দাখিল করা কুয়েত দূতাবাসের ওই সনদ একটি ফটোকপি। ওই সনদে প্রেরকের বা সনদ প্রদানকারীর স্বাক্ষর কিংবা পদবির উল্লেখ নেই। নেই স্মারক নম্বরও। কত টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে তারও উল্লেখ নেই। আর সনদটি দেয়া হয়েছে মো. আলী নামের একজন আইনজীবীকে।

আদালত এ প্রসঙ্গে রায়ে বলেন, খালেদা জিয়ার পক্ষে কেন এই চিঠি বা সনদটি দাখিল করা হয়েছে তা বোধগম্য নয়। মূল কপি দাখিল না করে ফটোকপি দাখিল করা হয়েছে। ফটোকপি বিচারিক বিবেচনায় নেওয়ার বিধান নেই। আর ওই ফটোকপি প্রমাণের জন্য কুয়েত দূতাবাসের কাউকে সাফাই সাক্ষী হিসেবে হাজির করা হয়নি। ফটোকপিটির সত্যতা প্রমাণে খালেদা জিয়ার পক্ষে কোনো চেষ্টাও করা হয়নি। যে পত্রটি আদালতে দাখিল করা হয়েছে তাতে স্মারক নম্বর নেই। কে সনদটি দিয়েছেন তাঁর নাম-পদবিও নেই। কত টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে তা-ও নেই। আবার সনদটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে দেয়া হয়নি। পররাষ্ট্র সচিবকেও দেয়া হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছে খালেদা জিয়ার আইনজীবী মোহাম্মদ আলীর ঠিকানা। এটা বস্তবসম্মত নয়। সনদটি জাল বলেও আদালত মন্তব্য করেন। যে সনদ আদালতে দাখিল করা হয়েছে তার সত্যতা প্রমাণ না করা আইনজীবীদের আরেকটি ভুল। আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামি খালেদা জিয়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় বিধান মোতাবেক আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য দেয়ার সময় নিজ জবানিতে স্বীকার করেছেন যে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। ফলে দ-বিধির ৪০৯ ধারা (সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ) ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় তাঁকে শাস্তি দিতে কোনো বাধা নেই।

রায়ে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য উপস্থাপনের সময় (বক্তব্যের ৮৮ পৃষ্ঠায়) তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি।’ খালেদা জিয়ার ওই বক্তব্যের প্রতি পাতায় খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর আছে। এ থেকে প্রমাণ হয়, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে দিয়েছেন। যদিও রায়ে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়া জ্ঞাতসারে হোক আর অজ্ঞাতসারে হোক ক্ষমতার অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন।

খালেদা জিয়ার বক্তব্য আদালতে উপস্থাপনের পর এবং বক্তব্যের প্রতি পাতায় স্বাক্ষর দেয়ার সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের দায়িত্ব ছিল কোনো ভুলত্রুটি আছে কি না তা যাচাই করা। কিন্তু তা করা হয়নি। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আইনজীবীদের এমন উদাসীনতা ঠিক হয়নি।

গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে এমন মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন না নেওয়ার মতো বড় ভুল আর হতে পারে না। এই ভুলের কারণে খালেদা জিয়ার মুক্তি বিলম্বিত হবে। আইনজীবীরা পরামর্শ দিলে তাঁর আত্মসমর্পণ না করার কোনো কারণ ছিল না। এখন আইনজীবীদের ভুলের খেসারত তাঁকে দিতে হচ্ছে।

এ ভুলগুলো কেমন করে হলো তা খতিয়ে দেখা দরকার। একজন দলের চেয়ারপার্সনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়ে আছে, অথচ সেসব মামলায় হাজির হয়ে জামিন নেওয়া হয়নি। যে কারণে এক মামলায় কারাগারে থাকা অবস্থায় অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানোর প্রক্রিয়া চলছে। আর খালেদা জিয়ার মুক্তির দিনক্ষণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এটা তো অবশ্যই বড় ভুল।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেছেন, যেসব মামলায় পরোয়ানা জারি হয়েছিল তাতে আত্মসমর্পণ করে জামিন না নেওয়া বড় ভুল। এই ভুলের খেসারত অনেক দিন ধরে দিতে হবে। আইনজীবীরা খালেদা জিয়াকে পরামর্শ দিয়েছিলেন কি না, তা যাঁরা মামলা পরিচালনা করেন তাঁরা ছাড়া অন্য কেউ জানে না। তবে কাজটি ঠিক হয়নি। এই সুযোগটি সরকার হাতছাড়া করছে না।

তিনি আরো বলেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় খালেদা জিয়া নিজ বক্তব্যে বলবেন যে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে কোথাও ভুল হয়েছে। ওই ভুল শোধরানোর দায়িত্ব ছিল তাঁর আইনজীবীদের। তাঁরা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। (সূত্র : দৈনিক কালের কন্ঠ ১৬ মার্চ ২০১৮)

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়াকে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ করে রাখতে চায় সরকার। ২৫ ফেব্রুয়ারি বেগম জিয়ার জামিন হতে পারতো। জামিন না হওয়ার কোনো কারণ নেই। এখন বলা হচ্ছে ১৫ দিনের মধ্যে নথি পাঠাও। এদিন পাঠাও, সেদিন পাঠাও- এটা নীল নকশারই অংশ। তাকে রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চায়। এই উদ্দেশ্য নিয়েই ক্ষমতাসীনরা মামলাগুলো সাজাচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে বেগম খালেদা জিয়াকে কারান্তরীণ করে রাখা হয়েছে। এই অবস্থায় বিএনপি শুধু হতাশ নয়, ক্ষুব্ধও হয়েছে।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘নিজের আইনজীবীদের ভুলের কারণে খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হয়েছে। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আইনি প্রক্রিয়ায় লড়তে পারতেন। কিন্তু তারা সেটি না করে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে এসে সরকারকে দোষারোপ করা শুরু করেছেন। তাদের ভুলের কারণেই খালেদা জিয়া আজ কারাগারে।

এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, বিএনপি নেত্রীর আইনজীবীর সংখ্যা অত্যাধিক এবং তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। আবার তারা এতিমের টাকা আত্মসাতের কথা শুনলে ক্ষেপে যান। এটা পেশাদারিত্ব নয়। এসবের প্রভাব পড়েছে জামিনের বিষয়ে আদেশে। বিএনপির আইনজীবীরা তাদের ব্যর্থতার দায় রাষ্ট্রপক্ষের ওপর চাপাতে চাইছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ