ঢাকা, শনিবার 7 April 2018, ২৪ চৈত্র ১৪২৪, ১৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সরকারি আমানত সংগ্রহে ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি বাড়বে

এইচ এম আকতার : দেশের ব্যাংকিং খাতে এমনিতেই চলছে অসম প্রতিযোগিতা। তার সাথে সরকারি আমানত সংগ্রহে ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি আরও বাড়বে। সরকারি অর্থের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্তের পর এই আমানত আয়ত্তে নিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। কে কত পরিমাণ নিতে পারবে, কীভাবে নেবে এ নিয়ে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। সরকারি আমানতের ১ লাখ কোটি টাকা নিরাপত্তার বিষয়টিও বিঘ্নিত হতে পারে। দুর্নীতির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাবে ব্যাংকের সুদ হার। যা ব্যাংকিং খাতে আরও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

 জানা গেছে, কোনো কোনো ব্যাংক বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপঢৌকন, বিভিন্ন উপহার ও কমিশন দেয়ার প্রস্তাব নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আমানত সংগ্রহের চেষ্টাও করছে অনেকে। এই অসম প্রতিযোগিতা ঠেকানো না গেলে অর্থনীতিতে আর বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।

জানা গেছে, ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের নৈরাজ্য চলছে। এই নৈরাজ্যকে আরও উচকে দিয়েছে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য। তিনি বলেছেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠতে এখন থেকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখতে হবে।

একই সাথে দৈনন্দিন জমা (সিআরআর) এক শতাংশ কমিয়ে সাড়ে পাঁচ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত দেন তিনি। এতে করে জনগণের আমানত আরও নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিরা।

সম্প্রতি ব্যাংকিং খাতের এমন হ-য-ব-র-ল অবস্থা এবং এ খাতে সংকট উত্তরণে ব্যাংকিং কমিশন গঠনের চিন্তা করছে সরকার। এনিয়ে সরকার কাজও করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আগামী বাজেটের আগে কমিশন গঠন চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা এই আমানত রাখার সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি আর ঋণ অনিয়মের কারণে খেলাপি বাড়লেও অপরাধীদের কোনো বিচার হচ্ছে না। তারল্য সংকট নেই। তারপরও ব্যাংক মালিকদের চাপেই সরকার এমন অনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। দুর্নীতি আরো বাড়বে।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যাংক মালিক ও এমডিদের বৈঠকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর গত সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। আগে সরকারি অর্থের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) টাকা ২০ শতাংশ এবং মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব অর্থের ২৫ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার বিধান ছিল।

ব্যাংক সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আমানত সংগ্রহে মাঠে নেমেছেন সব ব্যাংকের প্রতিনিধি। যাচ্ছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে। সরকারি আমানত বের করে নিতে প্রভাবশালী ব্যাংক মালিকরা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপঢৌকন, উপহার, আমানতের ওপর কমিশন দেয়াসহ বিভিন্ন প্রস্তাব দিচ্ছেন।

এছাড়া লবিংয়ের জন্য যোগাযোগ শুরু হয়েছে বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে। কে কত টাকা ভাগিয়ে নিতে পারবে তা নিয়ে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। ইতিমধ্যে আমানত সংগ্রকারীদের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা। এর ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ১ লাখ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা নিতে পারবে বেসরকারি ব্যাংকগুলো।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি বলেন, সরকারি আমানত সংগ্রহে খুব চেষ্টা করছি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করছি। তবে এখনও কোনো টাকা আসেনি।

সরকারি আমানতের ক্ষেত্রে সুদ হার নির্দিষ্ট করে দেয়া দরকার মন্তব্য করে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকলে ফারমার্স ব্যাংকসহ লুটপাটকারী ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বেশি অর্থ নিয়ে যাবে। সেসব অর্থ আর ফেরত যাবে না সরকরি কোষাগারে।

এই ব্যাংক কর্মকর্তা আরো জানান, ইতিমধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন ব্যাংক কর্মকর্তাদের আমানতের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

সরকারি আমানত সংগ্রহের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ফারমার্স ব্যাংক। ব্যাংকটির এমডি এহসান খসরু  বলেন, এতদিন বেসরকারি ব্যাংকে ২৫ শতাংশ রাখা হতো। এখন সরকারকে বলবো ৫০ শতাংশ রাখার মতো ফারমার্স ব্যাংকের সক্ষমতা রয়েছে। প্রাপ্যতানুযায়ী এই ব্যাংকে অর্থ রাখার অনুরোধ করছি।

সংকটে থাকাবস্থায় সরকারি আমানত রাখতে ফারমার্স ব্যাংক কতটা প্রস্তুত জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুরোপুরি প্রস্তুত। আগের পরিচালনা বোর্ডে সমস্যা থাকলেও এখন নেই। ফারমার্স ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থা ফিরছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে আমানত আসছে। অতএব আমরা সরকারি আমানতও সংগ্রহ করবো। 

তবে সরকারি অর্থ পেতে উপঢৌকন বা অনৈতিক কিছুর মাধ্যমে কোনো ধরনের কর্মকা- কোনোভাবেই উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

তিনি বলেন, এই নিয়ম করায় সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। তবে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই বেসরকারি ব্যাংকে অর্থ আসুক। এটা চাই। কেউ কেউ হয়তো উপঢৌকন বা অন্য কিছু দিয়ে অর্থ সরবরাহের চেষ্টা করছে। এটা উচিত নয়।

মাহবুবুর রহমান বলেন, ভাল অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলোতেই সরকার অর্থ জমা রাখবে। কোন ব্যাংকে কত জমা রাখবে, সেটাও সরকার নির্ধারণ করবে।

যদি কোনো ব্যাংক অন্যায়ের আশ্রয় নিয়ে সরকারি আমানত সংগ্রহের চেষ্টা করে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। আমি মনে করি, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকলে অনিয়ম হবে না।

আমানতের সুদ হারে কোনো তারতম্য হবে না উল্লেখ করে ব্যাংকারদের এই শীর্ষ নেতা বলেন, সরকারি আমানত হলেও আমাদের সুদ হার একই হবে। অর্থাৎ অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে যে হারে সুদ দিয়ে থাকি সেই হারে সুদ দেয়া হবে।

ব্যাংকগুলোর এই প্রতিযোগিতার কারণে আর্থিক খাতে দূর্নীতি আরো বাড়বে বলে মনে করেন দুই অর্থনীতিবিদ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্বনর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ।

এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এর ফলে দুর্নীতির মাত্রা বেড়ে যাবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে আর্থিক বিষয়গুলো যেসব কর্মকর্তারা দেখভাল করেন তাদের সাথে ব্যাংক কর্মকর্তাদের একটা যোগসাজস তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা নিবে। এতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় বাড়বে। তখন আসলে সুদের হার কমবে না।

তিনি বলেন, এই প্রতিযোগিতার কারণে আমানত ও ঋণের সুদ হার বাড়বে। ফলে স্প্রেডও (ঋণ ও আমানতের সুদ হারের ব্যবধান) বেড়ে যাবে।

মূলত তারল্য সংকটের দোহাই দিয়ে ব্যাংকগুলো সরকারি অর্থ সরবরাহের কৌশল নিয়ে সফল হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা বার বার বলেছি, তারল্য সংকট নেই। অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে হয়তো দুই-একটা ব্যাংকে তারল্য সংকট থাকতে পারে।

ইব্রাহীম খালেদ বলেন, এই অনৈতিক ও অশুভ প্রতিযোগিতার ফলে বড় ধরনের দুর্নীতি সৃষ্টি হবে। সেই দুর্নীতির কারণে ব্যাংকগুলোর কস্ট অব ফান্ড (তহবিল ব্যয়) বেড়ে যাবে। এ কারণে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ হার কমানোর বিষয়ে যে আলোচনা হচ্ছে তা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই ডেপুটি গর্বনর বলেন, যদি সঠিকভাবে সঠিক প্রতিষ্ঠানকে যাচাই করে অর্থ দেয়া না হয়, তাহলে সরকারি অর্থের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিঘ্নিত হতে পারে। যেসব ব্যাংকের অবস্থা ভাল সেসব ব্যাংকে অর্থ রাখা উচিত।

রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি অর্থ জমা রাখবে তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওইসব প্রতিষ্ঠানকে ভেবে-চিন্তে অর্থ রাখতে হবে। যাতে বিপদমুক্ত থাকা যায়।

সরকারের এমন সিদ্ধান্তে সমালোচনা করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যেই দুটি সার্কুলার জারি করেছেন। সরকার চিন্তা ভাবনা না করেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে যাচ্ছে। এতে করে ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের অসম প্রতিযোগিতার তৈরি হচ্ছে। ব্যাঙকিং খাতে সুদ হার কমাতে ব্যবসাযীদের পক্ষ থেকে যে দাবি জানানো হয়েছিল তা কোন দিনই বাস্তবায়ন হবে না। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে উল্টো ঋণের সুদ হার আরও বাড়বে। শুধু দুর্নীতিই নয় এ খাতে সুদ ঘুষের পরিমাণও বেড়ে যাবে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকারের অর্থ তার নিজের হাতে থাকলে যে নিরাপত্তা ছিল বেসরকারি খাতে চলে এলে তা আরও নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে। তারপরেও কি কারণে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিলো তা কেউ বলতে পারছে না। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সরকার ব্যাংক মানিকদের কাছে অনেকটা পনবন্দি হয়ে পড়েছে। তাদের ইচ্ছা মতই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। সরকার আমানতের নিরাপত্তা বিবেচনা না করেই বেসরকারি ব্যাংকে ৫০ শতাংশ আমানত রাখা সিদ্ধান্ত নিলো। এতে করে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা নিরাপত্তাহীনতায় পড়লো। এ নিয়ে এখনও সরকারের চিন্তা করার সুযোগ রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ