ঢাকা, শনিবার 7 April 2018, ২৪ চৈত্র ১৪২৪, ১৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হাত নেই বুঝতে পারছে না রাজীব

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : দুই বাসের চাপায় হাত হারানো রাজীব হোসেনের অবস্থা এখনও আশঙ্কামুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. শামসুজ্জামান শাহীন। গতকাল শুক্রবার তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আজ রাজীব ভালোই আছে। মোটামুটি সন্তোষজনক। খুব ভালো, এটা বলা যাবে না। এখনও আশঙ্কামুক্ত নয়। কারণ, হেড ইনজুরি আছে। মাথার সামনের অংশ আঘাতপ্রাপ্ত। মাথার হাড়ে ফাটল আছে। সে সঙ্গে হাতের সমস্যা তো আছেই।’

ডা. শামসুজ্জামান শাহীন বলেন, ‘গতকাল (বৃহস্পতিবার) ড্রেসিং করা হয়েছে। আগামীকাল আবার তার ড্রেসিং করা হবে। গতকালের চেয়ে আজকে একটু ভালো। এই কারণে বলবো যে সে খেতে চাইছে, কথা বলতে পারছে।’

রাজীবের মামা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ওর শারীরিক অবস্থার তেমন উন্নতি দেখছি না। বরং অবনতিই বলা যায়। ও কথা বলছে, কিন্তু ওর কথা আসলে স্বাভাবিক কথা না। ওর নিজের ব্রেনে কথা বলছে। ওর কোন সাধারণ জ্ঞানে কথা বলছে না। আমরা যে আত্মীয়রা আছি আমাদেরও চিনছে না। ওর আচরণ স্বাভাবিক না।’

তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক আমাদের বলেছিলেন, ওর যখন ব্রেন হ্যামারেজ হয়েছে তখন ওর বিহেভ অস্বাভাবিক হতে পারে। যত বার খাওয়াতে গেছি ও আমার ওপর রাগ করছে। চিকিৎসকরা ওর খুবই ভালো সেবা করছে। অবশ্যই আমাদের চিকিৎসকদের ব্যাপারে বলা উচিত যে উনারা আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে সেবা দিচ্ছে। উনারা যথেষ্ট পরিমাণে আন্তরিক আমাদের প্রতি। বারবার ডাকছে আমাদের বলছে, যা পারো যতটুকু পারো ওকে খেতে দাও। আমি বারবার খাবার নিয়ে যাচ্ছি, আবার ফেরত আসছি।’

গত ৩ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারার সামনে দুই বাসের চাপায় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের (২২) হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ৪ এপ্রিল বিকালে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজীবকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়।

‘হাত নেই, বুঝতে পারছে না রাজীব’

রাজীব তার ডান হাত হারানোর বিষয়টি এখনও বুঝতে পারছেন না। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ওই দুর্ঘটনায় তার মাথায়ও আঘাত লেগেছে।এখনই তার মাথায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন না থাকলেও হাতের ক্ষতে আরও কয়েকটি সার্জারি করতে হবে বলে জানিয়েছেন এই শিক্ষার্থীর চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান।

রাজীবের খালা খাদিজা বেগম লিপি গতকাল শুক্রবার বলেন, “রাজীব এখনও বুঝতে পারছে না যে ওর একটা হাত নেই। ও হাসপাতালে আছে নাকি বাসায় সেটাও বুঝতে পারছে না।

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামের রাজীব তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মা এবং অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান। ঢাকার মতিঝিলে খালার বাসায় থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে তিনি ভর্তি হন তিতুমীর কলেজে। বাসে করে কলেজে যাওয়ার পথে মঙ্গলবার দুপুরে সার্ক ফোয়ারার কাছে দুর্ঘটনায় পড়ার পর রাজীবকে প্রথমে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে আইসিইউতে রাখা হয়েছে তাকে।

তার খালা খাদিজা বেগম বলেন, “ওকে যখন রাজীব বলে ডাক দেই, ও শুধু ‘হ্যাঁ’ বলে, আর কোনো কথা বলে না।”

রাজীবের চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শামসুজ্জামান গতকাল শুক্রবার বলেন, রাজীবের মাথার সামনে ও পেছনের হাড় ভেঙে গেছে, ব্রেইনের সামনের দিকেও আঘাত পেয়েছে।”

আপাতত মাথার সার্জারি লাগবে না জানিয়ে তিনি বলেন, “হাতের আঘাতের জায়গায় আরও কয়েকটা সার্জারি করতে হবে।”

খাদিজা বেগম জানান, তিতুমীর কলেজে স্নাতকে ভর্তি হওয়ার পর রাজীব যাত্রাবাড়িতে একটি মেসে থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি কম্পিউটারের দোকানে কাজ নিয়েছিলেন।“কম্পিউটারের দোকানে কাজ করে রাজীব নিজের পড়াশোনা আর ছোট দুই ভাইয়ের খরচ চালাত।”

রাজীবের ছোট দুই ভাই যাত্রাবাড়ীর তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে বলে জানান খাদিজা।

জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ আ স ম ফিরোজ গতকাল শুক্রবার রাজীবকে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। 

নাম ধরে ডাকার পর রাজীব চোখ বন্ধ করে সাড়া দিয়েছে জানিয়ে ফিরোজ সাংবাদিকদের বলেন, “তাকে বলেছি চিন্তা করো না, আমরা তোমার পাশে আছি, প্রধানমন্ত্রী তোমার পাশে আছেন।” রাজীবের চিকিৎসায় মেডিকেল কর্তৃপক্ষ ও সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও বৃহস্পতিবার রাজীবকে হাসপাতালে দেখে এসে চাকরির ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।

আর হাই কোর্ট বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনকে রাজীবের চিকিৎসার ব্যয় বহনের পাশাপাশি কৃত্রিম হাত সংযোজনের খরচ দিতে নির্দেশ দিয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ