ঢাকা, শনিবার 7 April 2018, ২৪ চৈত্র ১৪২৪, ১৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নববর্ষের উৎসব যেন আর কলঙ্কিত না হতে পারে

ডা. মো: মুহিব্বুল্লাহ : গণনাচক্রে আরবিতে যেমন মহররম মাস বছরের প্রথম মাস, ইংরেজিতে জানুয়ারী মাস, তেমনি বাংলা ১২ মাসের মধ্যে বৈশাখ মাসই বছরের প্রথম মাস। এমাসের প্রথম দিনই আমাদের কাছে বাংলা নববর্ষের মর্যাদা পেয়ে আসছে। নিজস্ব সংস্কৃতিতে আমরা এ দিনটিকে উপভোগের মাধ্যমে উৎজাপন করে থাকি। বাংলা নববর্ষ আগমনের বেশ আগের থেকেই আমরা পান্তা-ইলিশের আয়োজনে আনন্দে ব্যস্ততম সময় ও পার করতে থাকি। বাংলা নববর্ষের দিনে আমাদের দেশের শহর নগরে এক প্লেট পান্তা-ইলিশের মূল্য আমরা এক লাখ টাকাও দিয়েছি। এদিনের আনন্দ উপভোগে আমাদের দেশের মুসলমান, খৃস্টান, বুদ্ধ ও হিন্দুদের মধ্যের সকল ধনি, দরিদ্র, কুলি, মুজুর, কামার, কুমার, তাঁতীসহ সকল জাতি ও ধর্মের অবল, বৃদ্ধ, বনিতা সকলেই দৃষ্টান্ত স্থাপনকারি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাথে ঐক্যবদ্ধ আনন্দে মেতে উঠি। বিগত বছরের পাকানো পান্তাভাত আর টাটকা ভাজা ইলিশ মাছ নতুন বছরে খেয়ে, গায়ে বৈশাখি প্রিন্টের পোষাক পড়ে, বাদ্যযন্ত্র সংস্কৃতির মনমাতানো বাজনাগানে হেলেদুলে পরিবারের সকল সদস্য মিলে সারাদিন আনন্দ আসরে অতিবাহিত করি। ১০/১৫ দিন আগের থেকে খাদ্যসামগ্রী জোগাড়ের পাশাপাশি বস্ত্রপন্নের আয়োজনেও আমরা এগিয়ে থাকি। 

অথচ আজ সারাদেশের মানুষ সীমাহীন আতংকে আতংকিত। দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের হাতে স্বধর্মী বিধর্মী, স্বদলীয়, বিরধীদলীয় কারোরই জানমাল ইজ্জতের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছেনা। এমনকি তারা নিজেদের দলীয় সমাবেশগুলোতেও নারীকর্মীদের পর্যন্ত শ্লীলতাহানী ঘটাচ্ছে। স্বামীর হাতে হাত থাকা অবস্থায়ও অনেকে রক্ষা পাচ্ছেনা। বাংলার শ্রেষ্ঠতম বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গীনায় ও আমাদেরকে এমন ন্যাক্কারজনক কুদৃশ্য দেখার দুর্ভাগ্যের ভাগিদারও হতে হয়েছে। ছিছি শুনতে হয়েছে বিশ্ববাসীর মুখ থেকে। এহেন স্মৃতি স্মরণ হতে কেউকে-ই অনেক পিছে ফিরে যেতে হচ্ছে না, গত ৭মার্চ ২০১৮ তে বাংলার রাজধানী শহর ঢাকার বাংলা মটরের আশপাশ এলাকার লজ্জাজনক একাধিক নারী লাঞ্চনার ঘটনা মনে পড়াই যথেষ্ট হচ্ছে। যার প্রমান বিভিন্ন ধরনের সামাজিক প্রচার মাধ্যম ইউটিউব, ফেসবুক এবং পত্রপত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় দেখে সারা বিশ্ব বিস্ময় হতবাক। যেদিন সারা দেশব্যাপি বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ এর ঐতিহাসিক ৭মার্চের ভাষন ও সমাবেশ চলছিল ঠিক তখনি প্রকাশ্য রাজপথে দিবালোকে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতির মধ্যেই নারী লাঞ্ছনা। যেদিনটায় দেশব্যাপী কোন দলের নেতা কর্মীদের পদাচারন ও একক আধিপত্য তা কেউকে-ই বলে বুঝাবার অপেক্ষাও রাখেনা এবং কারা এমন জঘন্যকাজ করার দুঃসাহস রাখে তা কারোর অজানা নয়। এসব ঘটনায় আরো উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে এতো নিকৃষ্ট ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরেও সেসব সমাবেশের প্রধানতমদের বক্তব্য থেকে যখন "সমাবেশ স্থলের বাহিরের কোনো অনাকাংখিত ঘটনারজন্য দল দায়ী না" কথা বের হয়ে দায়ীত্বজ্ঞানহীনতার রূপ ফুটিয়ে তোলে, তখন এমন ভাষন জাতিকে আরো বেশী সংকিত কোরে তোলে। যেসকল অনাকাংখিত ঘটনার প্রত্যাশিত বিচার এবং প্রতিকার ব্যবস্থা না হওয়ায় উল্যাসী এ জনপদের মনের সংকা দিনদিন আরো বেশী ঘনীভূত হচ্ছে। 

এটুকুতেই জনমনে প্রশ্ন জমে গেছে ‘তারা কি এহেন ঘটনা প্রকাশ্য রাজপথে নয় সমাবেশ ময়দানে ঘটাবার প্রত্যাশী?’  আজ জনগনের মনে এমন ব্যথাভরা অগণিত প্রশ্ন। ‘আমাদের স্বাধীনতা কি আনন্দঘন দিবসগুলিকে নিরস করে দিয়ার জন্য? দেশের নারীসম্পদ রাষ্ট্রযন্ত্রে যথেচ্ছাচার কারিদের মনের খোরাকে পরিণত হওয়ার জন্য? আমাদের জান, মাল, ইজ্জত নিয়ে তাদের মনোবাসনা পূরণের জন্যই কি ইতিপূর্বে  তাদেরকে আমরা পছন্দ করেছিলাম? তাদের মধ্যে দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকারী চেহারা দেখতে পাওয়া কি আমাদের জ্ঞানচক্ষুর অসারতা ও অদূরদর্শিতা ছিল?’ এসবই ক্ষমতাসীনদের দুর্দম গতিতে ঘটিয়েচলা অনাকাংখিত দুরাচারের ফলে সৃষ্ট জনতার বুকেচাপা কষ্টবিলাপ। যা সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের মা, বোন, কন্যাদের শ্লীলতাহানীর অদম্যগতিকে প্রতিরোধ করার মত কোন প্রশংসিত পরিকল্পিত পদক্ষেপের প্রদর্শন না থাকায় জাতির হতাশা ক্রমান্বয়ে আরো দ্বিগুন তৃগুন বৃদ্ধি হয়েছে। তাছাড়া কোনো দেশের শাসক ও শাসনব্যবস্থা অক্ষুণœ থাকা অবস্থায় সে দেশে কোনো  অদৃশ্য শক্তির মদতে একদল যুবসম্প্রদায় এভাবে বেপরোয়া কুরুুচি পূর্ণ আচরণের সুযোগে পাঁয়তারা করে বেড়ালে আর তাদেরকে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী দমনের আন্তরিক চেষ্টা না করলে জাতির সংকা কিছুতেই কুমতে পারেনা। বরং তাদের সে তিব্রতর অন্যয় অত্যাচারের গতিরোধ করাও দুনিয়াবি সর্বশক্তিকে টপকে বসে। যা জনমনকে কোনোরকম নিশ্চিন্ত হবার পথ দেখাতে পারে না। যে সংকায় আমাদের বাংলা নববর্ষের এ দিনটা কার কেমন কাটবে তা ২রা বৈশাখের আগে সবার পক্ষে কল্পনাকরাও দারুণ দুরূহ ব্যাপারে পরিনত হয়েছে। কিন্তু আমরা স্বাধীন গনতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও এমন অনিশ্চয়তার ভোগান্তিতে ভুগতে চাইনা। আমরা আমাদের জান, মাল, ইজ্জত আব্রুর নিশ্চিত নিরাপত্তা বিধানকৃত পরিবেশের মধ্যে দিয়ে আমাদের আনন্দমুখর দিবসগুলো অতিবাহিত করতে চাই। 

সেজন্য দেশপরিচালনা ও শাসনব্যবস্থাকে শান্তিময়ভাবে কাজে লাগাতে অযোগ্যদেরকে "না" বলে মৌলিক যোগ্যতা সম্পন্নদের কাছে যেতে হলে জনতাকে প্রয়োজনে শান্তিপূর্ণ পন্থায় সেপথেও নামতে হবে। তারপরেও এদেশের শান্তিপ্রিয় জনতার মনের খোরাক বিশেষ দিবসগুলোতে যেন সকলে মিলে নিশ্চিন্তে নিরাপদে উৎসব পালন করতে পারে সে আয়োজন করতেই হবে। তাই আসুন আমরা বাংলা নববর্ষের মতো নানা উৎসব মুখর দিবসে কুরুচি চরিতার্থকারী ও তাদের মদতদানকারিদেরকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে গনসচতনতা ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কাজে লাগানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সুখ্যাতির মুখে চুনকালি লেপকদেরকে প্রত্যাখ্যান করে এদেশের আনন্দ উল্লাসের শংকামুক্ত নব যৌবন ফিরিয়ে আনার পথে নেমে পড়ি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ