ঢাকা, শনিবার 7 April 2018, ২৪ চৈত্র ১৪২৪, ১৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নববর্ষের সময় নিয়ে যত কথা

আজহার মাহমুদ : জাতির জন্য অসীম আনন্দ আর ভালোবাসার দিন হচ্ছে বাংলা নববর্ষ। বাঙ্গালীর সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে ঘিরে রয়েছে বাংলা নববর্ষ। বাঙ্গালীর জন্য নববর্ষ হলো পহেলা বৈশাখ। বৈশাখের প্রথমদিন বাংলা সনের নতুন বছর শুরু হয় যা বাঙ্গালীর জন্য নতুন বছর। তাই নতুন বছরের আনন্দ আর খুশী সকলের হৃদয়ে ভাসছে। কিন্তু বাঙ্গালীর এই আনন্দে বাধা হয়ে দাঁড়ায় “সময়”। প্রতি বছর বাংলার মানুষ এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকে, কারণ এই দিনে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালী এক হয়ে এক সাথে আনন্দে মেতে উঠবে। কিন্তু সেটা গত কয়েক বছর থেকে আর হয় না। বাঙ্গালীর জন্য এর চাইতে বড় দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে তা আমার জানা নেই। হালখাতাসহ বাঙালীদের নানান ধরনের উৎসব থাকে পহেলা বৈশাখের দিনটিতে। কিন্তু এই আনন্দের দিনে বাংলার মানুষকে সময় বেঁধে দেওয়া বড়ই বেদনাদায়ক এবং কষ্টদায়ক বিষয়। আনন্দ কখনো সময় দেখে করা যায় না। বিকেল পাচঁটার মধ্যে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শেষ করার কথা বলছে প্রশাসন। কিন্তু কেনো আমরা অপশক্তির ভয়ে সুর্যাস্তের আগেই উৎসবের আনন্দ না করে অতৃপ্তি নিয়ে ঘরে ফিরে যাবো। প্রশাসন বলছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে এই সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তার জন্য বাংলার মানুষ তাদের ঐতিহ্যকে ঘরে বসে পালন করবে এটাতো মেনে নেয়া যায়না। ১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও যদি, বাংলার মানুষ এমন কথা শুনে তবে তো সকলেই বলবে আজ যেনো বাংলাদেশ পরাধীনতার মতো আচরণ করছে। আমরা যদি ৭১ সালে নিষ্টুর, ঘাতক পাকবাহিনীকে নির্মূল করতে পারি তবে আজ কোনো বাংলার ঐতিহ্য এবং আনন্দের দিনে আমরা ভয় পাবো। প্রশাসন কি নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ? নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ না হলে এভাবে সময় বেঁধে দেয়ার তো কোনো মানে হয়না। বাংলার ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে কেউ বরণ না করে থাকতে পারবে না। কিন্তু এই বরণে অতৃপ্তি কোনো থাকবে? যতই বাধা আসুক বাংলার মানুষ সেটা প্রতিরোধ করে বর্ষ বরণের আনন্দ তৃপ্তি সহকারে নিতে চায়। এই আনন্দে যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সেটা দেখার কাজ তো সরকার এবং প্রশাসনের।  সোনার বাংলায় যদি বাংলা নববর্ষ পালন করতে না পারে তবে এই সোনার বাংলার কোনো মূল্য থাকবে বলে মনে হয়না । যে সকল দুষ্কৃতিকারী বাংলার এই আনন্দের দিনে আপকর্ম করার চক্রান্ত করেছে তাদের খুঁজে বের করাই হোক প্রশাসনের মূল কাজ। যারা বাংলার মানুষের আনন্দকে নস্যাৎ করার জন্য পয়তারা করছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। যারা বাংলার মানুষের ক্ষতি চায় তাঁরা সময় বেঁধে দিলেও ক্ষতি করার জন্য তৈরী থাকবে। তাদের দমন করার মতো শক্তি বাংলার প্রশাসনের কাছে আছে এটা আমার বিশ্বাস। তাই নববর্ষের সময় বেঁধে না দিয়ে দুষ্কৃতিকারীদের হাত পা বেঁধে দেয়াটাই অধিক ভালো হবে বলে আমি মনে করি। বাংলার মানুষও এটাই চায়। এই সাজানো সোনার বাংলায় যেনো ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলেই সুন্দরভাবে বাংলা নববর্ষ পালন করতে পারে এটাই প্রশাসনের কাছে দাবী। পহেলা বৈশাখ বাংলার গৌরব এবং অহংকার। বিশ্বের অনেক দেশ থেকে বাংলা নববর্ষ দেখতে ছুটে আসে আমাদের বাংলাদেশে। কারণ পৃথিবীর সকল নববর্ষের চেয়ে সেরা এবং সুন্দর নববর্ষ হচ্ছে বাংলা নববর্ষ। বাংলা নববর্ষের চেয়ে আনন্দ অন্য কোনো নববর্ষে পাওয়া যাবে না। অথচ আমাদের এই নববর্ষে আজ কাল্ হয়ে দাঁড়িয়েছে “সময়”। বাংলার মাটি, পানি, আকাশ সবকিছু অপেক্ষা করে এই দিনের জন্য। বাংলার বাতাসে নতুন নতুন হাওয়া বইবে, নানান রঙ্গের কাপড় পরে সকলে ঘর থেকে বের হবে, আনন্দ করবে বাংলার শিশুরা এমন দিনের জন্য  মানুষ দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা করে। একটি স্বাধীন দেশে যদি বর্ষবরণের মতো একটি অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন উৎসবে সময় বেঁধে দেওয়া হয় তবে সেই স্বাধীন দেশের মর্যাদা কতটা অক্ষুন্ন থাকবে সেটা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। স্বাধীন দেশ তখন বলা যায় যখন সেই দেশের মানুষ সব কিছুতেই স্বাধীন থাকবে। কিন্তু আজ দেশের মানুষ অনেক কিছুতেই পরাধীনতার গন্ধ পাচ্ছে। যার অন্যতম একটি বাংলা নববর্ষে সময় বেঁধে দেওয়া। জনগণ কখনোই এটি সমর্থন করেনা। বাংলাদেশের মানুষের কালচার এবং ঐতিহ্য যেদিনটিতে ফুঠে ওঠে সে দিনটিতে যদি সময় বেঁধে দেওয়া হয় তবে বাংলার ঐতিহ্য আর কালচার একদিন সত্যি সত্যি হারিয়ে যাবে। নতুন প্রজন্ম ভুলে যাবে নববর্ষ মানে কী, তারা দেখবে না নববর্ষে বাংলার মানুষ কতটা আনন্দিত আর খুশী হয়। তাই বাংলার ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সর্বপ্রথম বাংলা নববর্ষকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বাংলা নববর্ষ না থাকলে বাঙ্গালীর ঐতিহ্য বলতে আর কিছুই থাকবেনা। এই দিনটিতে সময় বেধে দেওয়া মানে বাংলার ঐতিহ্যকে সময় দিয়ে বেধে দেওয়া। তাই উৎসবে বাধা নয়, চাই অবাধপরিপূর্ণ আনন্দ। এই স্বাধীন দেশে বাংলার মানুষ স্বাধীনভাবে আনন্দ করবে এবং বাংলা নববর্ষ পালন করবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। 

প্রাবন্ধিক ও শিক্ষার্থী 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ