ঢাকা, শনিবার 7 April 2018, ২৪ চৈত্র ১৪২৪, ১৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পহেলা বৈশাখ: সংস্কৃতির নামে অপ-সংস্কৃতির দোলা

আসাদুজ্জামান অাসাদ : উন্নত জীবন, আচার-আচরণ, শ্রেষ্ঠতম কর্মকৌশল, বুদ্ধি জ্ঞান, মননশীল ও সৃজনশীলতা হিসাবে মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষ নিজস্ব চিন্তা, শক্তি দ্বারা সজ্জিত, নন্দিত, সমাদৃত। পরিশীলিত ভাবে নিজেকে উপস্থাপন  করে। যার কারনে মানুষকে বলা হয় সভ্য বা শ্রেষ্ঠ জীব। সু-সভ্য মানুষের জীবন ধারণ বিকশিত হয় সংস্কৃতির মাধ্যমে। সংস্কৃতি একমাত্র মানুষের মাঝে বিদ্যমান রয়েছে। তাই সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের আসল পরিচয় পাওয়া যায়। বৈশাখী উৎসব, বাঙ্গালী জাতির ঐতিহ্যসিক উৎসব। প্রতি বছর এ আনন্দ উল্লাস, হই, হুল্লোলে পালন করি। যে কারনে পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ, বৈশাখী মেলা, নাচ, গান, যাত্রা, সার্কাস, তিতারি শাক, চাল-বুট একত্রে রান্না ইত্যাদি করি। সমাজ জীবনে পহেরা বৈশাখ,সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির দোলা দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসর করছে। ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী গোষ্ঠি সংস্কৃতির নামে সুপরিকল্পিতভাবে এ সব অপসংস্কৃতি মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেস্টা করছে। যার কারনে সন্তানকে নিয়ে অভিভাবকরা বিপাকে পড়ছে। আমরা মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাস করি। সমাজিকভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করি। মুসলিম সং¯কৃতিতে বর্তমানে ভাটা পরেছে। সরবভাবে বাঙ্গালি ও আধুনিক সংস্কৃতি চলছে। আধুনিক সংস্কৃতি মানে হিন্দু বৌদ্ধ সংস্কৃতি। আধুনিক সংস্কৃতি ঢেউয়ে তরুন প্রজন্মের হৃদয়-প্রাণে দোলা লেগেছে। হৃদয়ের অনুভুতিতে অনুকম্পা জেগেছে। বাঙ্গালী বা আধুনিক সংস্কৃতি আলোচনার পুর্বে জানতে হবে ‘সংস্কৃতি’ কি? সংস্কৃতি হচ্ছে-‘সংস্করণ’ ও ‘সংস্কার’ নামক বিশেষ্য পদ থেকে গঠিত একটি শব্দ। সংস্করণ শব্দের অর্থ হচ্ছে-সংযোজন- বিয়োজন। আর সংস্কার শব্দের অর্থ হচ্ছে-শুদ্ধি করন, শাস্ত্রীয় নীতি মালা দ্বারা পবিত্র করন,শোধন করন বা পতিত অবস্থা ইত্যাদি। মোট কথা সংস্কৃত শব্দের অর্থ হচ্ছে, এমন বস্ত বা বিষয় সংস্কার করা,সজ্জিত ও অলংকৃত করা। বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দিন উমর সংস্কৃতির বর্ননা দিতে গিয়ে বলেন, ‘জীবন চর্চাই অন্য নাম সংস্কৃতি, মানুষের জীবিকা, তার আহার বিহার, চলাফেরা, তার শোক-তাপ আনন্দ বেদনার অভিব্যক্তি, তার শিক্ষা, সাহিত্য, ভাষা, তার দিন রাত্রির হাজারো কাজ কর্ম, সব কিছুর মধ্যেই তার সংস্কৃতির পরিচয়’। (সংস্কৃতির সংকট)। এমনি ভাবে ১৯৮২ ইং সালে মেক্্িরকোর ইউনেস্কো সম্মেলনে সংস্কৃতির যে বর্ননা দেয়া হয়েছে তা হলো- ‘ব্যাপকতার অর্থে সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির অথবা সামাজিক গোত্রের বিশিষ্টার্থক আত্মিক, বস্তুগত-বুদ্ধিগত এবং আবেগগত চিন্তা,কর্মধারার প্রকাশ, শিল্প ও সাহিত্যই একমাত্র সংস্কৃতির অন্তৃভুক্ত বস্তু নয়, মানুষের জীবন ধারাও সংস্কৃতির অংগ,মানুষের অধিকার.মুল্যবোধ ঐতিহ্য এবং বিশ^াস ও সংস্কৃতির অংগ’। যে যেভাবেই বর্ননা করুক না কেন,প্রকৃত সংস্কৃতি হচ্ছে প্রতিটি মানুষের আচার আচারন ও স্বাভাবে রুচিশীল পরিবর্তন। বর্তমানে সমাজে সংস্কৃতির নামে চলছে অপ সংস্কৃতি। অপ-সংস্কৃতি কাকে বলে?  অপ-সংস্কৃতি হচ্ছে-সংস্কৃতির বিকৃত রুপ। সংস্কৃতি মানুষের জীবন যাত্রাকে বিকশিত করে,সংস্কার করে, ইতিবাচক পরির্বতন আনতে সক্ষম করে। অপর দিকে অপসংস্কৃতি মানুষের জীবন যাত্রায় বিকৃত আনে, চিত্তে কলুষ ঢালে, মূল্যবোধে ঘাটতি আনে। যে সব কাজ কর্মে,আচার আচরর্নে মানুষের আত্মার অবনতি ঘটে তাকেই অপ সংস্কৃতি বলে। মোট কথা, একটি মানুষ বা জাতির সংস্কৃতিক স্বভাবের বিপরীত আদেশের বিরুদ্ধে বা বিধ্বস্ত করে তাকেই অপসংস্কৃতি বলে। আমার আলোচনার বিষয়, ‘পহেলা বৈশাখ: সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির দোলা’। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ আসে। আমরা সবাই তা আনন্দ উল্লাসে পালন করি। আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠি। বটতলায় পান্তা ইলিশ খাই। 

পান্তা ইলিশ নিয়ে পাড়ার সবাই হৈ চৈ করি। এক প্লেট পান্তা-ইলিশ ৫শ টাকা থেকে হাজার টাকায় কিনি। কয়জন টাকা ওয়ালা বাহাদুর, সেই  পান্তা ইলিশ খেতে পারি। পহেলা বৈশাখ আসার পুর্বেই প্রতি কেজি ইলিশ মূল্য ২ হাজার থেকে ২ হাজার পাচশ’ টাকায় বিক্রি হয়। গরীব, অসহায়দের কথা আলোচনায় নাই বা আনলাম। উচ্চ শ্রেণী ও মধ্যেবিত্ত শ্রেণীর কয়জন মানুষ পান্তা ইলিশ খেতে পারি সেটাই এখন ভাবার বিষয়। আমরা বাঙালী সংস্কৃতির দোলে মেতে উঠি। অপ সংস্কৃতির ভিড়ে প্রকৃত সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলি। 

অপসংস্কৃতির ঢেউয়ে যুবক- যুবতীরা অজানা পথে ভেসে চলেছে। ভেসে উঠেছে মহা আনন্দে। যুবক যুবতিরা নরম হাতের ছোয়ায় হোলি খেলায় হাবুডুবু খাচ্ছে। রং মাখা মাখি করছে। এ সব কাজে তারা বড়ই ক্লান্ত। ধীরে ধীরে চলে ধ্বংস লীলার গভীর থেকে গভীরে। চলে যায় অপ সংস্কৃতির ডাস্টবিনে। এ ছাড়াও বাঙ্গালী সংস্কৃতির নাচ,গান এবং সার্কাস রয়েছে। নাচ, গান মানে নগ্ন, উলঙ্গপনা। নারীর গায়ে কাপড়ের আবরণে থাকার কথা। অথচ নারী চলছে নগ্ন উলঙ্গপনায়। আমরা ভুলে যাই পদ্যার কথা। পরকালের কথা। যে  দিন প্রত্যেক মানুষকে নিজ কর্মের জন্য জবাব দিহিতা করতে হবে। এ দিকে শয়তান মোচে তেল দিয়ে হাসে। কারন সংস্কৃতির  আনন্দ- উল্লাস কে মহৎ কাজ হিসাবে সবার সামনে তুলে ধরার প্রচেস্টা করে। সবাই এটাকে মহৎ কাজ মনে করি। সাত পাচ ভাবি না। নিজে ডুবে দেই সংস্কৃতির অতলে। ধ্বংস করি নিজের ইহকাল ও  পরকালকে। পহেলা বৈশাখে তিতারী শাক, চাল-বুট একত্রে রান্না করে খাওয়া কি শরীয়তের কাজ? এ সব কি সব রোগ জীবানু ঔষধ?

পহেলা বৈশাখ নিয়ে আমাদের দেশে ১৯৬৪ ইং সালে ‘পহেলা বৈশাখ’ নামে বাঙালী সংস্কৃতির পরিচিতি ঘটায়। তিন দশক পূর্বে কামরুল হাসান গ্রামীণ মেলার নামে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প তথা বৈশাখী মেলা শুরু করেন বাংলা একাডেমীর সবুজ চত্বরে। তখন থেকে শুরু হয় ‘পহেলা বৈশাখ’। প্রতিটি বস্তুর বদল বা পরিবর্তন হয়। আমাদের দেশে নষ্টের বদল ও পরিবর্তন হয়েছে। উন্নয়নের বদল ও পরিবর্তন আসে না। বর্তমান সংস্কৃতির নামে যে অপসংস্কৃতি চলছে,তার প্রেক্ষাপট জানার দরকার। সংস্কৃতির আগ্রাসন শুধু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নয়। ব্যক্তি,পরিবার ও পরিবেশের উপর নির্ভর করে। সংস্কৃতি সুগভীর ভাবে অগ্রসর  হচ্ছে। এ দেশে সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে জটিল কিছু সমস্যা অনায়সে দৃষ্টি গোচর হচ্ছে। বেশীর ভাগ মানুষ সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রবোধসহ দেশের গৌরবজ্জল ইতিহাসের প্রতি তরুণ প্রজন্মের চিন্তা শূন্য। এ দেশের বুদ্ধিজীবিরা আর্ন্তজাতিক সাংস্কৃতিক ষড়যন্ত্রকারীদের দোসর। অপসংস্কৃতির ধারক বাহক।  বুদ্ধিজীবীরা বিজাতীয় সংস্কৃতি অনুপ্রবেশে অগ্রনীয় ভুমিকা পালন করেছে। ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে তরুন প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। পহেরা বৈশাখ কনসার্ট ছাড়াও থার্টি ফাষ্ট নাইট, হোলি উৎসব,ভ্যালেন্টাইল ডে, নারী দিবসসহ বিশেষ অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি নামে অপসংস্কৃতি চালিযে যাচ্ছি। এ সব সংস্কৃতি অনুষ্ঠানে যুবক-যুবতিরা কল্যানের চেয়ে ক্ষতির স্বীকার হচ্ছে বেশী। তরুন তরুণীদের নানা আয়োজন অনৈতিক কর্ম কান্ডকে ঘিরে। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এই শ্লোগান টি  সবাইকে উজ্জীবিত, সার্বজনীন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। উচ্ছৃংখল যুবদের হাতে  লাঞ্ছনার স্বীকার যুবতী মেয়েরা। সংস্কৃতি নামে, অপসংস্কৃতিক অনুষ্টানে দেশী সংস্কৃতি ,মুল্যবোধ, সামাজিক নৈতিকতার বিষয়সমূহ নানাভাবে পদদলিত হচ্ছে। ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে সামাজিক, নৈতিক মুল্যবোধের। বিনোদনের নামে বেহুদা অনৈতিক কাজে নষ্ট হচ্ছে তরুণদের চিন্তাশক্তি,মেধা আর শ্রম। হারিয়ে যাচ্ছে পিতা-মাতাকে সেবা ও মান্য করা,শিক্ষককে সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ, বড়দের সম্মান করার মত সামাজিক মুল্যবোধ। পারিবারিক দৃঢ়তা, সত্য ও নৈতিকতাকে ধারণ করা অন্যের প্রতি সহনশীলতার মত মানবিক গুণাবলী দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। আমরা চাই শুদ্ধ সংস্কৃতি। রাজনৈতিক ও ভৌগলিক রূপ রেখায় দেশের কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংস্কৃতিক অবকাঠামো নির্মান সুসংহত করার দরকার। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়া যেমন  কোন দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব না, তেমনি সামাজিক ও সংস্কৃতিক পরধীনতা মেনে নেয়াও সম্ভব না। যার কারনে স্বকীয় সংস্কৃতিক চেতনা ,মুল্যবোধ,সংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষন ও বিকাশ সাধন করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা কোন ক্রমেই সম্ভব না। উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের নিয়ন্ত্রক ও আর্দশ বিশ্বাস। 

বিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ তার গুনাবলীর বিকাশ ঘটায়। মানবীয় গুনাবলীর বিকাশকে  আখ্যায়িত করে সংস্কৃতি। বিশ্বাস ও দৃঢ়তাই সংস্কৃতির শক্তি শালী হাতিয়ার। বিশ্বাসীদের ব্যক্তি জীবন ও সামাজিক জীবন ধর্মের প্রতি  প্রভাবিত হয়। যার কোন অবক্ষয় ও পরিবর্তন নেই। আমাদেরকে অপ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। রুখতে হবে অপসংস্কৃতি। জাগাতে হবে ঘুমন্ত মানুষকে। অপ সংস্কৃতির ঘুম থেকে যখন মানুষ জাগ্রত হবে,তখনই সংস্কৃতির পুর্ণ বিকাশ ঘটবে।  বর্তমানে বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে, অপ সংস্কৃতি রন্দ্রে রন্দ্রে প্রবেশ করেছে। আমাদেরকে ইসলামী ও প্রকৃত সংস্কৃতির বাহক হতে হবে। এটাই হবে সংস্কৃতি জাগরনের প্রকৃত সংগ্রাম। এই হোক সবার প্রত্যাশা। 

 গ্রন্থকার, সাংবাদিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ