ঢাকা, শনিবার 7 April 2018, ২৪ চৈত্র ১৪২৪, ১৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মানসম্মত শিক্ষা : সংকট ও উত্তরণ

ড. মোহাম্মদ ইয়াকুব শরীফ : মানসম্মত শিক্ষা সম্পর্কে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যথেষ্ট কৌতুহল রয়েছে। আর আমার ব্যক্তিগত কৌতুহল আরো বোধহয় বেশী। শিক্ষকতা পেশায় থাকার কারণে নানা রকম অভিজ্ঞতাই তাড়া করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে একটু কথা বলতে বসলাম আজ। কোন মানসম্মত পণ্য তৈরী করতে গেলে মানসম্পন্ন কাচামালের বিকল্প নেই এ ব্যাপারে সবারই একমত হওয়ার কথা। সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোই মানসম্পন্ন পণ্য অর্থাৎ সঠিক অর্থে দক্ষ ও টেকসই জনশক্তি যোগান দেওয়ার প্রত্যয়েই প্রতিষ্ঠিত। 

যখন কোন দেশে কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন তার উদ্দেশ্য থাকে এ প্রতিষ্ঠান এমন জনশক্তি তৈরী করবে যারা শিক্ষাজীবন শেষে সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিকসহ সর্বোপর সকল সেক্টরে অবদান রাখতে পারে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যতিত অন্যকোন প্রতিষ্ঠানের প্রতি রাষ্ট্রের এমন প্রত্যাশা নেই বললেই চলে। আমরা এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদেরকে মানসম্মন্ন পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে উল্লেখ করেছি ইতোপূর্বেই। এখন দেখা যাক সে কাঁচামালের গাঠনিক কাঠামো কী? 

২০১৬ সালের কথা, একজন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী আসলেন ছদ্মনাম রিমা , এসএসসি ফলাফল জিপিএ ৫.+০০, এইচএসসি তে ফলাফল জিপিএ ৫.০০। তার এ কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওয়েভার নিতে চায় সে, আমরা বললাম নিশ্চয়ই তুমি ওয়েভার পাবে। বিভাগ থেকে একটি সাদা কাগজ দেয়া হলো একটি দরখাস্ত লিখতে যথারীতি তিনি কনফিডেন্টলি লিখতে বসলেন। শুরুতে তিনি লিখেছিলেন :Subgekt: Aplikasion for weiaver কারো কারো নিকট বিষয়টি হাস্যকর ও রসিকতারও হতে পারে। কিন্তু ওদিন আমরা অপলোকে তার মূখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কারণ? আমরা মনে করি নবাগতরা শিশু। ক্ষতবিক্ষত হলাম হায়রে... বাচ্চাটাকে কী পরিমাণে ঠকানো হয়েছে আর সে কী পরিমাণে ঠকেছে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার পূর্ববর্তী সময়ে সে ১২টি শ্রেণি অতিক্রম করে এসেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একশ্রেণিতে পাস না করলে পরবর্তী শ্রেণিতে উঠতে পারার কথা নয়, কিন্তু কীভাবে সব শ্রেণীতেই সে সফলতার সাথে পার করে আসলো? এরূপ রীমার সংখ্যাই সর্বত্র বেশী। তবে আমরা যাই বলি এ রীমাকে নিয়েই কিন্তু স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। তবে এটার সুরাহা তো হলো না। আমাদের এরূপ রীমার জন্য দায়ী কে? নিশ্চয়ই কোন বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়ী করার আপাতত সুযোগ থাকছে না। কারণ তাকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন সম্পৃক্ততা নেই। সুতরাং এ কাচামাল দিয়ে কী মানের পণ্য প্রস্তুত সম্ভব? আবার যদি আমরা বহুতল বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণের প্রসঙ্গে কথা বলি তাহলে দেখা যায় আমরা সয়েল টেস্ট করে মাটির ধরন অনুযায়ী ফাউন্ডেশন দিয়ে থাকি এবং সে পরিমাণ লোড দেয়ার চিন্তা করি, কারণ লোড নেয়ার সামর্থ্য যদি ফাউন্ডেশন এর না থাকে তাহলে অনিবার্য পরিণতির জন্য ভবনের মালিকের প্রস্তুত থাকতে হয়। যদিও বিল্ডিংটির বাহ্যিক সৌন্দর্য্য বা কারুকার্য যতই থাক। কিন্তু দুঃখের হলেও সত্য যে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার গুণগতমান একেরারেই ধবংসের দ্বারপ্রান্তে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের প্রয়োজনীয় আসন পূরণের জন্য যে বাছাই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করুক না কেন মানসম্মত শিক্ষার্থী তাদের জুটছে না। সে পরিসংখ্যান আমরা বিগত কয়েক বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে দেখেছি। সুতরাং মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে মানসম্পন্ন কাঁচামাল এর যোগান গুরুত্বপূর্ণ টেকসই জনশক্তি দেশকে সাপ্লাই দিতে হলে শিক্ষার গোড়ায় নজর দিতে হবে। সে নজর দিতে হবে প্রথমে প্রাথমিক শিক্ষায়, এরপর মাধ্যমিক এবং পরবর্তীতে উচ্চ মাধ্যমিকে। একটি বিষয় না বললেই নয় আমরা দেখি জেলা বা কোন কোন উপজেলা আবার ঢাকা এবং বিভাগীয় শহরগুলোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে জানুয়ারি মাসে ভর্তিযুদ্ধ শুরু হয়, সাধারণত তৃতীয় শ্রেণি থেকে বাচ্চাদের ভর্তি করানোর নিরন্তর প্রচেষ্টায় থাকেন অভিভাবকরা। 

কিন্তু দেখা যায় ঐ উচ্চবিদ্যালয় থেকে ৫ মিনিটের দূরত্বে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট! কিন্তু কেন? দুটোই সরকারি বিদ্যালয়, আবার খোদ প্রাথমিক শিক্ষার জন্যই প্রতিষ্ঠিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। অথচ যেখানে প্রাথমিক শিক্ষা দেয়ার কথা নয় সেখানেই হুমরি খাচ্ছেন অভিভাবকরা। 

এর কারণ খুজে বের করতে হবে। প্রাথমিকে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। উন্নত শিক্ষার সকল ইকোলজিকাল সাপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে। শহর পর্যায়ে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা সীমিত; তাই আধা সরকারি ও অসরকারি সকল উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজসমূহকে মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আবার মাদরাসা শিক্ষার মান নিশ্চিত রাখতে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। যদিও আমরা দেখেছি বিগত ১২ বছরের পরিসংখ্যানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম ২০ জনের অধিকাংশই মাদরাসার শিক্ষার্থী। 

কিন্তু এতে উচ্ছাসের কোন সুযোগ নেই। সৎ যোগ্য ও টেকসই জাতি গঠনে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের আরো অগ্রণী ভূমিকায় থাকতে হবে। এ পর্যায়ে যে বিষয়টি নিয়ে কথা না বললেই নয়, তাহলো ‘প্রশ্নফাঁস’ ‘একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করাই যথেষ্ট’। 

এ কথা যদি আমরা বিশ্বাস করি তাহলে স্বীকার করতে হবে আজ আমাদের জাতিসত্বা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। 

প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী, চাকুরীর পরীক্ষাসমূহের প্রশ্নপত্র ফাঁস এর মধ্যদিয়ে আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থায় অন্ধকার নেমে এসেছে। শিশুশ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদেরকে নৈতিকভাবে বিধ্বস্ত করা হচ্ছে। সুতরাং মানসম্মত শিক্ষা বা কোয়ালিটি এডুকেশন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত হবে শিক্ষার্থীর পূর্ববর্তী ১২টি শ্রেণিতে সে কতটুকু কোয়ালিটি অর্জন করেছে তার ওপর; কারণ উচ্চশিক্ষা হলো পূর্ববর্তী শিক্ষার ওপর বিকাশমান কর্মযজ্ঞ; উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী শেখে কম অর্জন করে দক্ষতা।

বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ