ঢাকা, শনিবার 7 April 2018, ২৪ চৈত্র ১৪২৪, ১৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ডিপ্লোমা শিক্ষা হোক টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত

খনরঞ্জন রায় : উৎসব মানবিক আবেগের আনন্দঘন সার্বজনীন বহিঃপ্রকাশ। এক অর্থে সভ্যতা শুরুর সঙ্গে উৎসবের সংযোগ নিবিড়। মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেই উৎসব সম্পর্কিত। শুরুর সময়ে এ উৎসব ছিল ব্যক্তির-তার হৃদয়-অনুভবের আনন্দ-উচ্ছল বর্ণাঢ্য প্রকাশ। মানুষ সঙ্গীত, নৃত্য, বাদ্যযন্ত্র, অভিনয়, দেয়ালচিত্র অঙ্কন ইত্যাদির মাধ্যমে আপন সৃজনশীলতার যে প্রকাশ ঘটিয়েছিল, সেটিই ছিল উৎসবের সূচনা। কালপরিক্রমায় তা ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে প্রসারিত হয়েছে, পরবর্তী সময়ে সমষ্টি থেকে গোত্রে, গোত্র থেকে জাতিতে এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে উঠার পর কোনো কোনো উৎসব হয়ে উঠেছে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সার্বজনীন।

উৎসব মানুষের মিলনমেলা। এখানে অংশগ্রহণ করে মানুষ প্রাত্যাহিক জীবনের দুঃখ-কষ্ট কিংবা গৎবাঁধা জীবনের ঊর্ধ্বে অন্যরকম আস্বাদনের আনন্দ উপভোগ করতে চায়। এ আনন্দ তাকে দেয় ক্ষণিকের স্বস্তি এবং একই সঙ্গে তার চেতনায় সঞ্চারিত করে শুভবোধ ও মঙ্গলচিন্তা। উৎসবের মূল সুর নষ্ট চিন্তার বাইরে সত্য, সুন্দর এবং শুভবোধের মধ্যে আপন চেতনাকে প্রসারিত করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘উৎসব’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘উৎসবের দিনে আমরা যে সত্যের নামে বৃহত্তর লোকে পরিণত হই তাহা আনন্দ, তাহা প্রেম। ... উৎসবের দিন সৌন্দর্যের দিন। এই দিনকে আমরা ফুল-পাতার দ্বারা সজাই, দ্বীপমালার দ্বারা উজ্জ্বল করি, সঙ্গীতের দ্বারা মধুর করিয়া তুলি। এইরূপে মিলনের দ্বারা, প্রাচুর্যের দ্বারা, সৌন্দর্যের দ্বারা আমরা উৎসবের দিকে বছরের সাধারণ দিনগুলির মুকুটমণি স্বরূপ করিয়া তুলি’।

উৎসব বাঙালির জীবনেও মুকুটমণিস্বরূপ। উৎসবকে মোটা দাগে ৪টি বৈশিষ্ট্যে ভাগ করা যায়। সাংস্কৃতিক উৎসব, জাতীয় দিবসের উৎসব এবং ধর্মীয় উৎসব, আন্তর্জাতিক উৎসব। সাংস্কৃতিক উৎসবের মধ্যে পড়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপন এবং দেশজুড়ে অসংখ্য লোকমেলা। জাতীয় দিবসের উৎসবগুলো হলো- শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস প্রভৃতি। ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে আছে- ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, শবেবরাত, মহররম, দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা, বড়দিন, বৈশাখী পূর্ণিমা, বিযু উৎসব এবং ক্ষুদ্র নৃ-তাত্তিক গোষ্ঠীর আরও নানা ধরনের উৎসব। আন্তর্জাতিক উৎসব বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, আন্তর্জাতিক নারী দিবস, মে দিবস, আন্তর্জাতিক নার্স দিবস, বিশ্ব শিশুশ্রম দিবস, বিশ্ব শিক্ষক দিবস, বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস ইত্যাদি। উৎসব তার বিশিষ্টতা ও বহুমুখী চরিত্র অর্জন করেছে নানা কারণে। বিভিন্ন জাতিসত্তা তার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার জন্য নিজস্ব উৎসব পালন করে। সেটা হতে পারে সামাজিক, হতে পারে ধর্মীয় কিংবা আন্তর্জাতিক। বাংলাদেশে সামাজিক-পারিবারিকভাবে আরও নানা ধরনের উৎসব পালিত হয়। উৎসব মানুষের মহামিলনকে মূর্ত করে দেয় মানবিকতার ছোঁয়ায়। উৎসব শুধু আনুষ্ঠানিকতাই নয়; উৎসব আবেগের, উৎসব অনুভূতির, উৎসব পরিচয়ের। বাঙালির জীবন উৎসব শুধু সামাজিকতা কিংবা আনুষ্ঠানিকতা নয়। ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আন্তর্জাতিক ইত্যাদি সব উৎসবই শুভবোধসম্পন্ন শক্তির মিলনক্ষেত্র।

মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান শর্ত ডিপ্লোমা শিক্ষা এবং শিক্ষা অর্জনের প্রাথমিক শর্ত সাক্ষরতা। মানবসম্পদ উন্নয়নের পূর্ব শর্তকে প্রাধান্য দিয়ে দুনিয়াজুড়ে সমগ্র মানবজাতিকে, শিক্ষা জগৎকে উজ্জীবিত করার একটি উৎস ২৫ নভেম্বর বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস। বিশ্ববাসী এখন উন্নয়নের সূচক হিসেবে চিহ্নিত। সুতরাং টেকসই উন্নয়নে ডিপ্লোমা শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আর সবার জন্য ডিপ্লোমা শিক্ষা সামগ্রিক উন্নয়নের প্রাণকথা, মানবসম্পদ উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ। লন্ডনের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (আইইউ) তথ্য মতে, বিশ্বে ৯৭ কোটি শিক্ষিক বেকার তরুণ মানবেতর জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১শ’ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৪৭ জন বেকার। ২০টি সর্বাধিক বেকারত্বের দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বাদশ। এসব তথ্যই পুরনো। সম্প্রতি নতুন করে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা হচ্ছে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষিত বেকার যুক্ত হচ্ছে অর্থনীতিতে। এরা সবাই উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) বা সমমানের শিক্ষায় শিক্ষিত। যারা ১০ বছরের মাধ্যমিক ও দুই বছরের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে লেখাপড়া করেও সমাজে অনুৎপাদনশীল হয়ে দেশের অর্থনীতিতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারছেন না।

প্রতি বছর বিশ্বে ৫ কোটি শিক্ষিত বেকারের অর্থনীতিতে অবদান নেই। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কায়  আছে নারী জাতি। নারীকে বোঝাতে হবে, বিপদে কোনো রাজকুমার বা সুপার হিরো এসে তোমাকে উদ্ধার করবে না। তুমিই তোমার সুপার হিরো। তোমার অপছন্দের কোনো কিছু ঘটলে আম্মু বা আব্বুর অথবা কাছের কেউ না থাকলে তোমাকেই আত্মরক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। এর জন্য ডিপ্লোমা শিক্ষাগ্রহণ করে নিজে সাবলম্বী হতে হবে। বেকারত্বের অভিশাপের পরিণতিতে বর্তমান সময়ে বিশ্বে মাদক এক ভয়ঙ্কর রূপে আর্বিভূত হয়েছে। মাদকের এই ভয়ঙ্কর বিস্তার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় যুবসমাজ, যাদের হাতে রয়েছে স্বয়ম্বর বিশ্ব গড়ার চাবিকাঠি। বিশ্বব্যাপী শিশুদের জন্য এমন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা উচিত, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন স্বনির্ভর হতে সহায়তা করে। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে সেই শিক্ষা যেন কাজে লাগে। অধুনা শিক্ষাকে দুটো পর্যায়ে ফেলা হয়েছে; সাধারণ শিক্ষা ও ডিপ্লোমা শিক্ষা। ডিপ্লোমা শিক্ষা হলো জীবিকা, কর্ম বা পেশা। বৃত্তির সাথে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা ডিপ্লোমা শিক্ষা। যে শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী হাতে-কলমে কোন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে তাকেই বলা হয় ডিপ্লোমা শিক্ষা। শিক্ষা ব্যক্তিকে কোনও না কোনও পেশার উপযোগী করে তোলে। জাতিসংঘ ঘোষিত সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশেষত দারিদ্র্যবিমোচন ও টেকসই শিক্ষা নিশ্চিত করতে ডিপ্লোমা শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে।

টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত দারিদ্র্যবিমোচন, সামাজিত, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত উন্নয়সহ সামগ্রিক উন্নয়ন। অর্জিত উন্নয়নকে ব্যাহত না করে বর্তমান প্রজন্মের প্রযোজন মেটানোই হলো টেকসই উন্নয়ন। বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তিরত করে উন্নয়নের মূল ¯্রােতধারায় সম্পৃক্ত করতে শিক্ষাই একমাত্র মাধ্যম। দরিদ্র ও অনুন্নত দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি জীবনমুখী শিক্ষার মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

আমরা মনে করি, বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবসের ভাবনায় এটি এমন একটি দিবস যেখানে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির জন্য মানবসম্পদ তৈরি করবে। একটি সনাতনী ধারার দিবস হবে না- হবে জাতিসংঘের ঘোষিত টেকসই উন্নয়নে ২০৩০ সালের স্বপ্ন পূরণের          প্রধান অস্ত্র।

আমাদের এই স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জটি বেশ বড়। প্রতি বছর আমাদের অতিরিক্ত ৭ কোটি তরুণকে কর্মসংস্থান দিতে হবে। এজন্যে নতুন করে অন্তত বছরে ৫ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্বের প্রতিটি দেশেরই পল্লীর জনগণ অবহেলিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত। জাতিসংঘ ঘোষিত মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বড় শহরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দুর্গম এলাকার তরুণরা শহরে গিয়ে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারে না। বিশেষ করে   নারী ও প্রতিবন্ধীরা।

প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্ব মানবকল্যাণে আগামী ২৫ নভেম্বর বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস ত্যাগ ও আনুগত্যের বার্তা বহন করে এসেছে। ২০১৭ সালে বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবসের সেস্নাগান নির্ধারণ করা ছিল। পল্লী উন্নয়নে বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড বা (Rural Development Diploma Education Board). আশা করা যাচ্ছে এই প্রতিপাদ্যের ফল হবে স্বাবলম্বী বিশ্ব যুবসমাজ।   জাতিসংঘর ঘোষিত টেকসই   উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ