ঢাকা, শনিবার 7 April 2018, ২৪ চৈত্র ১৪২৪, ১৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পল্লী বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে দুই হাত কাটা সেই সিয়াম এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী

শরীয়তপুর সংবাদদাতা: ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দুপুরে বাড়ি থেকে যোহর নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পল্লী বিদ্যুতের ছিঁড়ে পড়া তারে জড়িয়ে গুরুতর আহত হয় সিয়াম আহাম্মেদ খান (১৭)। পরে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করলে দুই হাতে সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করে কব্জির ওপর থেকে হাত দুটো কেটে ফেলে। পল্লী বিদ্যুতের ছিঁড়ে পড়া তারে জড়িয়ে দুই হাত হারালেও সিয়ামের ইচ্ছাশক্তি প্রকট। এই প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে এ বছর এইচএসসি পরিক্ষা দিচ্ছে সিয়াম। অন্যের ঘাড়ে বোঝা হয়ে না থেকে স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য শুরু করেছে পড়ালেখা। বড় হয়ে প্রশাসনিক অফিসার হতে চায় সিয়াম। দাঁড়াতে চায় প্রতিবন্ধীদের পাশে। আজ সোমবার (২ এপ্রিল) নড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে বাংলা প্রথম পত্র পরিক্ষায় অংশ নেয় সিয়াম। 

সিয়ামের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৬ মে সিয়াম ঢাকা মেডিকেল থেকে রিলিজ হয়। পরে তার পরিবার ঢাকা বাবু বাজারের কাছে ভাড়া বাসা নিয়ে চার মাস চিকিৎসার পর শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বিঝারী নিজ গ্রামে চলে আসে। সিয়ামের বিঝারী গ্রামে থাকার কষ্ট হয় বলে তাকে নিয়ে এখন ভোজেশ্বর ইউনিয়নের মশুরা গ্রামে থাকে তার পরিবার। ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল বুধবার বিকেলে বিঝারী গ্রামে ঝড়ে পল্লী বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের একটি তার মাটিতে পড়ে যায়। শরীয়তপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জেলা কার্যালয়কে স্থানীয়রা মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান। মোবাইল ফোনে জানালেও সঞ্চালন লাইন মেরামত না করে ৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার লাইনটি চালু করেন। দুপুরে বাড়ি থেকে যোহরের নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় বিদ্যুতের ছিঁড়ে পড়া তারে জড়িয়ে গুররুর আহত হয় সিয়াম। পরে স্থানীয়রা আহত অবস্থায় সিয়ামকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক অবস্থা আশংকাজনক দেখে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেন। সেখানে চিকিৎসা হয় সিয়ামের। প্রথমে ১২ এপ্রিল তার বাঁ হাত কবজির ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়। একই কারণে ১৬ এপ্রিল তার ডান হাতেরও কবজির ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয়। এ ছাড়া মেরুদন্ডের হাড় ভেঙে যাওয়ায় সেখানেও অস্ত্রোপচার করাতে হয় তার। এ ঘটনায় গত বছরের ৪ জুলাই সিয়ামকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ৩০ দিনের মধ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে ক্ষতিপূরণ এ অর্থ দিতে বলা হয়। কিন্তু ক্ষতিপূরণ না দিয়ে পূনরায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড হাই কোর্টে আপিল করেন।

সিয়াম আহাম্মেদ খানের মা নাজমা বেগম বলেন, অনেক কষ্ট করে ছেলেকে লেখাপড়া করাতে হচ্ছে। হাত অকেজো হওয়ার কারণে অনেক কষ্ট হয়। আমার ছেলেকে যেন সমাজে অবহেলা না করা হয় সেজন্য যতদূর পারব তাকে লেখাপড়া করাব। সিয়াম আহাম্মেদ খানের বাবা ফারুক আহাম্মেদ খান বলেন, পল্লী বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে গুরুতর আহত হলে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে ডাক্তাররা আমার ছেলের দুই হাতের কবজির ওপর থেকে কেটে ফেলে। আমি একজন গরিব মানুষ। তবুও ধার দেনা করে ওর চিকিৎসা করতে এই পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ করেছি। আমি এখন পথে বসেছি, আর পারছি না। এতো কষ্টের পরেও ছেলেকে পড়ালেখা করাচ্ছি। হাই কোর্ট থেকে পল্লী বিদ্যুৎকে ৫০ লাখ টাকা দিতে বললেও এখনো কোন টাকা পাইনি। 

নড়িয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবদুল খালেক বলেন, সিয়ামের দুর্ঘটনার পর কলেজ ব্যবস্থপনা কমিটি, শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা মিলে ওর চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা সহযোগীতা করা হয়েছে। সিয়াম মেধাবী ছাত্র। ফলে কলেজ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে তাকে। সিয়াম অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করছে। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি প্রকট। এ বছর আমাদের কলেজ থেকে এইচএসসি পরিক্ষা দিচ্ছে সিয়াম। 

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, পড়ালেখার বিষয়ে সিয়াম ও নড়িয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষর সাথে কথা বলেছি। এইচএসসি পরীক্ষায় লেখার সহযোগিতার্থে সিয়ামকে প্রতিটি পরীক্ষায় একজন করে রাইটার দেয়া হয়েছে। ওর পড়ালেখার জন্য ইতিমধ্যে জেলা প্রশাকের সহযোগিতায় সমাজসেবা তহবিল থেকে সিয়ামকে ১০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ