ঢাকা, রোববার 8 April 2018, ২৫ চৈত্র ১৪২৪, ২০ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অন্যদের চেয়ে কিছুটা ভালো করলেন মাবিয়া

কামরুজ্জামান হিরু, গোল্ড কোস্ট, অস্ট্রেলিয়া থেকে : গোল্ড কোস্টের কারারা স্পোর্টস এন্ড লেইজার সেন্টারে যে ক’জন বাংলাদেশী গতকাল উপস্থিত ছিলেন, তাদের সবার চোখে-মুখে ছিলো উত্তেজনা। বলা যায় সবাই যেন ফিরে গিয়েছিলেন দু’বছর আগে। ২০১৬ গৌহাটি-শিলং সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমসের পুরস্কার বিতরণী মঞ্চের সেই দৃশ্য যেন তাদের স্মৃতিপটে ভেসে উঠছিল। এসএ গেমসে নারী ভারোত্তোলনে স্বর্ণ জিত যেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। দেশকে স্বর্ণ এনে দিয়ে তার আনন্দ-উচ্ছ্বাস পরিণত হয়েছিল অশ্রুতে। যে দৃশ্য টিভি স্ক্রিনে দেখে দেশের সবাই কেঁদেছিলেন খুশির কান্না। সেই মাবিয়াকে নিয়ে এবার গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে কিছুটা হলেও স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন বাংলাদেশর কোটি ক্রীড়াপ্রেমী। যদিও এবারের পথটা ছিল বেশ দুর্গম। সেই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মাবিয়া গোল্ড কোস্টে স্বর্ণ জিতে আবারও দেশবাসীকে উপহার দিবেন খুশীর কান্না- এমন নিশ্চয়তা ছিল না ঠিকই, কিন্তু তাকে ঘিরে কিছুটা হলেও আশা ছিল সবার। ভালো করবেন, মাবিয়া গোল্ড কোস্টেও ভালো করবেন। এমন আশাই ছিল সবার। কিছুটা হলেও সেই আশা পূরণ হয়েছে। বাংলাদেশের অন্য অ্যাথলেটদের চেয়ে ভালো করেছেন মাবিয়া। এবারের কমনওয়েলথ গেমসের বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা যেখানে ধারাবাহিক লজ্জা দিচ্ছেন জাতিকে, সেখানে মাবিয়া কিছুটা হলেও ভালো করার চেষ্টা করেছেন। আগের দিন দেশের তিন ভারোত্তোলক ব্যর্থ হওয়ার পর গতকাল মাবিয়া লক্ষ্যের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কারারা স্পোর্টস এন্ড লেজার সেন্টারে মহিলাদের ৬৩ কেজি ওজনশ্রেণীতে তিনি ১৩ জনের মধ্যে ষষ্ঠস্থান পেয়েছেন। আগের দিন যেখানে পুরুষ ভারোত্তোলনের ৬৯ কেজিতে শিমুল কান্তি সিনহা ১৪ জনের মধ্যে ১৩তম এবং মহিলাদের ৫৩ কেজি ওজনশ্রেণীতে ফুলপতি চাকমা ১৪ জনের মধ্যে ১২তম ও ৫৮ কেজিতে শুরুতে ভালো করা ফাহিমা আক্তার ময়না ১৫ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ১৩তম স্থান পান। সেখানে মাবিয়ার ষষ্ঠ হওয়াটা নিশ্চয়ই ভালো কিছুর ইংগিত দেয়। কাল খেলতে নেমে মাবিয়া ¯œ্যাচে ৭৩, ৭৮ ও ৭৭ কেজি ভার তোলেন। ওজন। ক্লিন এন্ড জার্কেও ২বার সফল হন। আর একবার ব্যর্থ। প্রথম দুই দফায় তুলে নেন ৯৮ ও ১০২ কেজি। কিন্তু শেষটায় ১০৩ কেজি তুলতে ব্যর্থ হন। এই ইভেন্টে কানাডার মাউডি ক্যারন (৯৮+১২২) মোট ২২০ কেজি ওজন তুলে স্বর্ণ পদক জয় করেন। ইংল্যান্ডের জো স্মিথ (৯২+১১৫) রৌপ্য ও রাশিয়ার মনা প্রেটরিয়াস (৯১+১১৫) জিতে নেন ব্রোঞ্জপদক। ভারোত্তোলনে বাংলাদেশের শেষ প্রতিযোগী জোহরা খাতুন নিশা আজ পরীক্ষায় নামছেন। তিনি অংশ নেবেন ৭৫ কেজি ওজনশ্রেণীতে। এদিকে কমনওয়েলথ গেমস সাঁতারে গতকাল আরেকটি হতাশার দিন কেটেছে বাংলাদেশের। গোল্ড কোস্টের অপটাস অ্যাকুয়েটিক সেন্টারে দ্বিতীয়বারের মতো পুলে নেমে ফ্রি-স্টাইলের মতো ৫০ মিটার বাটারফ্লাইয়েও যথারীতি ব্যর্থ হন নাজমা খাতুন। হিটে পাঁচজনের মধ্যে চতুর্থস্থান পা তিনি। আর ২৯ জনের মধ্যে পান ২৮তমস্থান। ৩২.৯৬ সেকেন্ডে সাঁতার শেষ করেন লাল-সবুজের এই নারী সাঁতারু। তার চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন একমাত্র টোঙ্গার সাঁতারু চারিসা প্যনুভে। তিনি সময় নেন ৩৩.০৯। আর এই ইভেন্টে ২৫.৮১ সেকেন্ডে সাঁতার শেষ করে এখন পর্যন্ত শীর্ষে আছেন স্বাগতিক অস্ট্রেয়িলার মেডেলাইন গ্রোভেস । আগের দিন নাজমা ৫০ মিটার ফ্রিস্টাল ইভেন্টে তার দুই নম্বর হিটে ছয়জনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে ৫ম হন। সময় নেন ৩১.১০ সেকেন্ড। এ সময় নাজমা শুধুমাত্র পিছনে ফেলেন এন্টিগুয়ার আলিয়া ম্যাগিনলেকে। কমনওয়েলথ গেমস সাঁতারে আজ বাংলাদেশের শেষ দিন। অপটাস অ্যাকুয়েটিক সেন্টারের পুলে নামবেন মাহমুদুন্নবী নাহিদ ও মো: আরিফুল ইসলাম। নাহিদ ১০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে ৪ নম্বর হিটে অংশ নেবেন। আর বাংলাদেশ যুব গেমসের চমক আরিফ ৫০ মিটার ব্রেষ্টস্ট্রোকে পাঁচ নং হিটে সাঁতরাবেন।

  ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডের লড়াই শুরু আজ: যে কোন ক্রীড়া আসরে অ্যাথলেটিক্স হচ্ছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ডিসিপ্লিন। এই খেলাকে ‘মাদার অব গেমস’ বলা হয় বলে এর মর্যাদাও অন্যসব ডিসিপ্লিন থেকে আলাদা। গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসের ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডের লড়াই শুরু হচ্ছে আজ থেকে। চলবে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। গেমসের উদ্বোধনী ভেন্যু গোল্ড কোস্টের কারারা স্টেডিয়ামে অ্যাথলেটিক্সের প্রথমদিনই ট্র্যাকে নামবেন বাংলাদেশের দ্রুততম মানব-মানবী মেজবাহ আহমেদ ও শিরিন আক্তার। দুপুরে শিরিন মহিলা ১০০ মিটার স্প্রিন্টের প্রথম রাউন্ডে ১ নং হিটে দৌড়াবেন। হিট শেষে যোগ্যতা অর্জনকারীরা বিকালে অনুষ্ঠেয় সেমিফাইনালে অংশ নেবেন। এই ইভেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল। ফাইনাল শেষে পাওয়া যাবে গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসের দ্রুততম মানবীকে। ১০০ মিটার শেষে ১০ এপ্রিল শিরিন খেলবেন ২০০ মিটার প্রিন্টেও। এই ইভেন্টের হিট শেষে ১১ এপ্রিল সেমিফাইনাল এবং পরের দিন ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। শিরিন কমনওয়েলথ গেমসের আগের আসরেও এ দুই ইভেন্টে খেলেছিলেন। ২০১৪ সালে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ১০০ মিটার স্প্রিন্টের হিটে শিরিনের টাইমিং ছিল ১২.৮৭ সেকেন্ড। ওই আসওে ২৬.৪১ সেকেন্ড সময় নিয়ে ২০০ মিটার স্প্রিন্টের দৌড় শেষ করেছিলেন বাংলাদেশের দ্রুততম এই মানবী। এবারের কমনওয়েলথ গেমসে ভালো করতে বেশ আশাবাদী শিরিন। ট্র্যাকে নামার আগে গতকাল তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, দেশে প্রস্তুতি ভালো ভাবেই সেরেছেন। তিনি প্রস্তুত ট্র্যাকে নামতে। তবে কমনওয়েলথ গেমসে পদক আশা করা দূরহ ব্যাপার হলেও তার আশা এবারের আসরে তিনি আগের চেয়ে ভালো করবেন। শিরিন দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। শিরিনের ইভেন্টের দিনই মেজবাহ ট্র্যাকে নামবেন নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে। আজ বিকালে একই ভেন্যুতে তিনি পুুরুষ ১০০ মিটার স্প্রিন্টের প্রথম রাউন্ডে ছয় নম্বর হিটে অংশ নেবেন। এদিনই অনুষ্ঠিত হবে এই ইভেন্টের সেমিফাইনাল। আর আগামীকাল হবে ফাইনাল। সেখানেই নির্ধারণ হবে ২১তম কমনওয়েলথ গেমসের দ্রুততম মানব খেতাব কে পাচ্ছেন। তবে জ্যামাইকান গতিদানব উসাইন বোল্ট এবার না থাকায়  ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে নতুন রাজার দেখা পাবে গোল্ড কোস্টবাসী এটা নিশ্চিত। মেজবাহ আগের আসর গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে খেলার দু’বছর পর ২০১৬ সালে ব্রাজিলের রিও অলিম্পিক গেমসেও ১০০ মিটার স্প্রিন্টে খেলেছিলেন। যদিও দেশের সাতবারের দ্রুততম এই মানব ওই দু’আসর থেকে সাফল্য তুলে আনতে পারেননি। তারপরও তাকে ঘিরেই যত আশা বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্সের। গোল্ড কোস্টে ভালো করতে আশাবাদী মেজবাহ নিজেও। কাল তিনি বলেন,‘এবারের কমনওয়েলথ গেমসকে সামনে রেখে কঠোর অনুশীলন করেছি। প্রস্তুতিতে আমি সন্তুষ্ট। তাই আমার আশা গোল্ড কোস্টে নিজের সেরা টাইমিংটা করতে পারবো। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে এবং দেশবাসীর দোয়া নিয়েই আমি ট্র্যাকে নামছি। এবার ভালো কিছু করে দেখাতে চাই।’

আজ নামছে বাংলাদেশ শ্যুটিং দল: সাঁতার বা ভারোত্তোলন থেকে কোনই সুখবর নেই বাংলাদেশের। ব্যর্থতা যেন জেকে বসেছে গোল্ড কোস্টে লাল-সবুজ শিবিরে। সেই ব্যর্থতা কাটাতে আজ রেঞ্জে নামছে বাংলাদেশ শ্যুটিং দল। যে ডিসিপ্লিনটকে ঘিরেই কমনওয়েলথ গেমসে সব আশা ভরসা বাংলাদেশের। কমওয়েলথ গেমসের আগে দেশে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ অলিম্পিক আ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা। তার কথায়,‘আমরা শ্যুটিং থেকে ভালো কছু পাওয়ার জন্যই গোল্ড কোস্ট যাচ্ছি। তবে অন্য ক্রীড়াবিদরা গোল্ডকোস্ট সফরে যাচ্ছে শুধুমাত্র অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। যেটি কাজে লাগবে এসএ গেমসে।’ পরিবেশ ও পরিস্থতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে কমনওলেথ গেমস শুরুর এক সপ্তাহেরও বেশী সময় আগে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ে বাংলাদেশ শ্যুটিং দল। তাই গোল্ড কোস্টে এসে প্রস্তুতিটাও শেষবারের মতো ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগ ছিল তাদের। অনুশীলন শেষে বেলমন্ট শ্যুটিং সেন্টারের রেঞ্জে নামছেন বাংলাদেশের চার শ্যুটার রাব্বি হাসান মুন্না, আবদুল্লাহ হেল বাকী, আরদিনা ফেরদৌস ও আরমিন আশা। এদের মধ্যে পুরুষদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন মুন্না ও বাকী। মেয়েদের ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে লড়বেন আরদিনা ও আশা। লাড়াই শুরুর আগে দল সম্পর্কে গতকাল বাংলাদেশ শ্যুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের মহাসচিব ইন্তেখাবুল হামিদ অপু বলেন,‘শ্যুটাররা মানষিকভাবে চাঙ্গা রয়েছে। প্রস্তুতিও ভাল হয়েছে। তবে ইংল্যান্ড, ভারত ও সিঙ্গাপুরের মত দেশগুলোও জোড়ালো প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। সুতরাং আমাদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়তে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তারপরও আমরা প্রস্তুত। ভালভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন সঠিক দিনে সটিক সময়ে সঠিক কাজটা করতে পারলে পদক নিয়ে দেশে ফিরতে পারব।’ ১৯৯০সালে অনুষ্ঠিত অকল্যান্ড কমনওয়েলথ গেমসে এয়ার পিস্তল থেকে বাংলাদেশকে প্রথমবারের মত স্বর্ন পদক এনে দিয়েছিলেন আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনি। এয়ার পিস্তল থেকে স্বর্ন পদক জিতেছিলেন তারা। এটিই ছিলো এই গেমসে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণ জয়। এ ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্ট থেকে লাল সবুজদের স্বর্ণপদক এনে দেন আসিফ হোসেন খান। ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত গেমসে বাংলাদেশ দলগত ভাবে রৌপ্য এবং ২০১০ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত গেমসে দলগত ব্রোঞ্জ পদক জয় করে। সর্বশেষ ২০১৪ গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্টে  দেশকে রূপা এনে দেন আবদুল্লাহ হেল বাকী। যাকে ঘিরেই এবারো পদক প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ