ঢাকা, রোববার 8 April 2018, ২৫ চৈত্র ১৪২৪, ২০ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পরিবেশ রক্ষা : কোন্্দিকে এগুচ্ছে দেশ?

দেশের পরিবেশ রক্ষার কথা উঠলে সঙ্গতভাবেই সুন্দরবনের কথাও উঠে আসে। বর্তমান সরকারও ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন সময় সুন্দরবন ও দেশের পরিবেশ রক্ষায় নানা অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। কিন্তু পর্যবেক্ষক ও পরিবেশবিদরা ওইসব অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন তেমন লক্ষ্য করছেন না। প্রসঙ্গত এখানে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের অভিমত উল্লেখ করা যায়। ৭ এপ্রিল প্রথম আলো পত্রিকায় মুদ্রিত অভিমতে তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে সত্তর দশক থেকে সুন্দরবনে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার সমস্যা আগে থেকেই ছিল। ফলে সরকারের উচিত ছিল ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যায়। কিন্তু আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার প্রথমবারের মত ক্ষমতায় এসেই ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প করার উদ্যোগ নেয়। সুন্দরবনের চারপাশের জমি ও জলাভূমি রক্ষা না করে উল্টো তা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারাা করে দিতে দেখি।

অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আরো বলেন, সবচয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ধরনের কর্মকা- সুন্দরবন ও দেশের পরিবেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে, সরকার নিজেই তার নেতৃত্ব দিচ্ছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ছাড়াও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুন্দরবনের আধা কিলোমিটারের মধ্যে বড় খাদ্য গুদাম নির্মিত হয়েছে। ওই এলাকায় শিল্পকারখানা হওয়ার সুবিধা করে দিতে সড়ক, বিমান ও নৌচলাচলের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। আর দেশের যেসব বন ও জলাভূমিগ্রাসী গোষ্ঠী দেশে সক্রিয় আছে, তাদের থামানোর বদলে সরকার তাদের সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাদের প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিয়ে আইন সংশোধন করছে। দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এমনিতেই দুর্বল। তার উপর এই আইন সংশোধন করে সরকার এলপিজিও পেট্রোকেমিক্যালের মতো কারখানাকে লাল তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সবুজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে সুন্দরবন ও পরিবেশ বিধ্বংসী হিসেবে নিজেদের ভূমিকাকে আরও স্পষ্ট করলো। এই সংশোধন পরিবেশ ও বনগ্রাসী শক্তিকে আর এক দফা প্রণোদনা ও উৎসাহ দিল। সরকার ইউনেসকোর কাছে গিয়ে অঙ্গীকার করে এসেছে, সুন্দরবন ও তার আশপাশের এলাকার ওপর একটি কৌশলগত, পরিবেশগত সমীক্ষা করার আগে কোনো শিল্পকারখানার অনুমতি দেবে না। কিন্তু দেশে এসে একের পর এক এলপিজি ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ওই এলাকায় কারখানা করার অনুমতি দিচ্ছে। এটা পরিষ্কার ভাবে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে টিকিয়ে রাখার শর্তভঙ্গ। একই সঙ্গে সরকার জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) যে ১৩টি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে এসেছে, সুন্দরবনের পাশে শিল্পকারখানা ও এলপিজি এবং পেট্রোকোমিক্যাল টার্মিনালকে সবুজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে সরকার কমপক্ষে আটটি অঙ্গীকার ভঙ্গ করলো। একই সঙ্গে সরকার প্যারিস চুক্তিতে কার্বন নিঃসরণ কমানো ও পরিবেশ রক্ষায় যে অঙ্গীকার করেছে, এটি তারও বরখেলাপ। এসব তৎপরতা সরকারকে সুন্দরবন বিনাশী ও অপরাধী হিসেবে দেশের ভেতরে-বাইরে পরিচয় করাবে; যা একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।

আমরা জানি, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত আছেন। তিনি এবার সরকারের সুন্দরবন ও পরিবেশ বিধ্বংসী কিছু তৎপরতার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। আমরা আশা করবো, সরকার বিষয়টি বিবেচনায় আনবে, আর আনু মুহাম্মদের বক্তব্যে যদি কোনো ভুল থাকে তাও জাতির সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে। কারণ বিষয়টি জাতীয় বিষয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ