ঢাকা, রোববার 8 April 2018, ২৫ চৈত্র ১৪২৪, ২০ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বেগম জিয়ার জামিন এবং অসুখ নিয়ে সরকার পানি ঘোলা করছে

 

২০ দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিষয়টি ক্রমেই জট পাকিয়ে যাচ্ছে। তার বিষয়টি শুরু থেকেই জটিল এবং রহস্যময় মনে হচ্ছিল। কিন্তু বিএনপি নেতারা বিশেষ করে তার আইনজীবী নেতারা এমন একটি ধারণা দিচ্ছিলেন যে, এইতো নেত্রীর জামিন হয় আর কি। তারও আগে এমন একটি ধারণা দেয়া হচ্ছিল যে, যেহেতু বেগম জিয়া অর্ফানেজ মামলায় নির্দোষ তাই মামলার রায়ে তিনি বেকসুর খালাস পাবেন। কিন্তু তাদের আকাশ কুসুম কল্পনা এবং উচ্চ মার্গের সদিচ্ছাকে মিথ্যা প্রমাণ করে বেগম জিয়াকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। আসল কথা হলো, দুই একজন বাদে বিএনপি নেতারা আওয়ামী লীগ কি চিজ, সেটি বুঝতেই পারেননি। আমাদের মতো মানুষ, যারা কোনো রাজনৈতিক দল করিনা, কিন্তু যারা দীর্ঘকাল থেকে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের রাজনীতিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছি, তারা বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছিলাম যে, সরকার বেগম জিয়াকে জেল খাটিয়ে ছাড়বে। বিএনপির কিছু কিছু নেতা বলেন যে এই মামলা তো আর্থিক অসঙ্গতির কোনো মামলা নয়। এটা শতকরা ১০০ ভাগ রাজনৈতিক মামলা। তাই যদি হয় তাহলে এই মামলার পেছনে নিশ্চয়ই একটি গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লুকানো আছে। আর সেই উদ্দেশ্য হলো আগামী ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে বেগম জিয়া,তারেক রহমান এবং বিএনপিকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা। আর এটাই যদি চূড়ান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হয়, তাহলে বেগম জিয়াকে মুক্ত মানব হিসাবে গরাদের বাইরে রাখা যায় কিভাবে? সুতরাং বেগম জিয়াকে জেলে যেতেই হবে এবং তাকে জেলে যেতেই হলো।

বৃহস্পতিবার ৫ই এপ্রিল একটি খবর দেখে খুব বড় ধরনের খটকা লাগলো। খবরে বলা হয়েছে যে, যেহেতু বেগম জিয়া অসুস্থ তাই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের মামলায় বেগম জিয়ার জামিনের মেয়াদ আগামী ২২ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হলো। এই ২২শে এপ্রিল পর্যন্ত তাকে আর আদালতে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। আর যেহেতু ২২ শে এপ্রিলের আগে কোনো শুনানি হচ্ছে না তাই পুলিশদেরকেও আর কোর্ট কাচারীতে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না।

কিন্তু এখন শুধু বিএনপি নেতারাই নয়, শিক্ষিত সচেতন মানুষও বুঝতে পারছেন যে আওয়ামী লীগ একবার যার পেছন লাগে তাকে বুঝিয়ে দেয় যে কত ধানে কত চাল। তারা দেখছেন যে, বেগম জিয়াকে নিয়ে এমন সব ব্যাপার ঘটছে যেগুলো অতীতে আইন আদালতের ইতিহাসে বলতে গেলে আর ঘটেনি। তা না হলে হাইকোর্ট যেখানে বেগম জিয়াকে জামিন দিয়েছে সেখানে সেই জামিন আবেদনের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে শুনানি হলো না কেন? সেটি না করে শুধুমাত্র জামিনের শুনানির জন্য দেড় মাস সময় নেয়া হলো কেন? জামিনে শুনানির জন্য সাধারণত মূল মামলার নথির প্রয়োজন হয় না। অন্তত এটাই প্র্যাক্টিস। সেখানে সাড়ে ৫ হাজার পৃষ্ঠার নথি পত্র আনা হলো। সেজন্য সময় লাগলো ১৭ দিন। তার পর যদিও বা জামিন হলো তখন আবার বলা হলো যে উচ্চ আদালতে শুনানি হবে ২২ মে। তার পর বিএনপির আবেদন নিবেদন শেষে সেটিকে এগিয়ে নেয়া হয় ৮ মে।

৮ মে কি হবে কেউ জানে না। কিন্তু এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে ৮ মে তে যদি বেগম জিয়ার জামিনের আদেশ হয়ও তাহলেও তিনি জেল থেকে ছাড়া পাবেন না। কারণ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তিনি জামিনে আছেন। সেটিও ২২ এপ্রিল পর্যন্ত। এরপরে যখন ঐ মামলার জামিন বাতিল করা হবে তখন তাকে আবার জেলে যেতে হবে। কিন্তু তিনি তো জেলে আছেনই। তাই তাকে আর দোবারা জেলে নিতে হবে না। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার রায় নি¤œ আদালত যতদিন না দিচ্ছে ততদিন তাকে এই মামলাতেও গ্রেফতার দেখানো হবে। এই মামলাই শেষ মামলা নয়। আছে আরো ৩৩টি মামলা। বেগম জিয়ার মাথার ওপর তরবারির মতো যে মামলাটি ঝুলছে সেটি হলো চৌদ্দগ্রাম অস্ত্র ও বোমাবাজি মামলা। এই মামলাতেও তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। যদি তর্কের ক্ষেত্রে ধরেও নেয়া যায় যে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাতে বেগম জিয়া জামিন পেলেন তাহলে চৌদ্দগ্রাম অস্ত্র মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হবে। সুতরাং কোনো ছাড়াছাড়ি নাই। বেগম জিয়াকে মুক্ত মানব হিসেবে চলাফেরা করার জন্য তাকে জেলে ঢুকানো হয়নি, তাকে জেল খাটানোর জন্যই জেলে ঢুকানো হয়েছে।

॥দুই॥

এর মধ্যে হয়েছে আর একটি ডেভেলপমেন্ট। নি¤œ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে বিএনপি যেমন হাইকোর্টে আপিল করেছে তেমনি সরকার পক্ষও আপিল করেছে। সরকার পক্ষ জামিনের বিরোধিতা করেছে। অন্য দিকে দুদক বেগম জিয়ার আপিলেরই শুধু বিরোধিতা করেনি তারা বেগম জিয়ার সাজার মেয়াদও বৃদ্ধি করার আবেদন জানিয়েছে। বলা হয়েছে যে, একই মামলায় একই অপরাধে তারেক রহমান এবং অন্যান্য অভিযুক্তের ১০ বছরের সাজা হয়েছে। সেখানে বেগম জিয়া হুকুমের আসামী হওয়া সত্ত্বেও তার সাজার মেয়াদ ৫ বছর কমানো হলো কেন? তাই দুদক বেগম জিয়ার সাজার মেয়াদ আরো বৃদ্ধি করার জন্য পাল্টা আবেদন করেছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, জিয়া অরফানেজ মামলায় বেগম জিয়ার ৫ বছরের সাজা হলেও জনগণের কাছে এই সাজার ফলে বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একথা যেমন সত্য, তেমনি একথাও সত্য যে এই মামলার ফলে বিএনপি বিশেষ করে বেগম জিয়া বেশ নাজুক অবস্থায় পড়েছেন। 

প্রশ্ন হলো, শুধু জেল খাটা নয়, বেগম জিয়া আদৌ কি নির্বাচন করতে পারবেন? এই প্রশ্নের দুই তিন রকমের উত্তর আছে। প্রথমটি হলো, ইলেকশনের আগেই যদি ঐ মামলা নিষ্পত্তি হয় এবং বেগম জিয়া যদি বেকসুর খালাস পান, অথবা সাজা কুমিয়ে দু-বছরের কম হয় তাহলে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন। ২য় টি হলো, যদি নির্বাচন পর্যন্ত এই মামলার চূড়ান্ত ফয়সালা না হয় এবং মামলা গড়াতে গড়াতে যদি ইলেকশন পার হয়ে যায় তাহলেও বেগম জিয়া ইলেকশন করতে পারবেন। কিন্তু যদি ইলেকশনের আগেই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয় এবং সেই নিষ্পত্তিতে নি¤œ আদালতের রায় বহাল থাকে, অথবা নি¤œ আদালতের দেয়া শাস্তির মেয়াদ ৫ বছর থেকে কম করা হয়, কিন্তু ২ বছরের বেশি করা হয় তাহলে বেগম জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন না। এখন দেখা যাক, এই তিনটি অপশনের মধ্যে কোনটি ঘটতে পারে।

এখানে উল্লেখ করা ভাল যে, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বলতে আমরা এখানে সুপ্রীম কোর্টের অর্থাৎ আপিল বিভাগের নিষ্পত্তি বা রায়ের কথা বলছি। যে রকেটের গতিতে আদালতের প্রত্যেকটি পর্যায়ে সরকার মামলাটি এগিয়ে নিচ্ছে তার ফলে এটি সম্ভবত খুবই যুক্তিযুক্ত মনে হয় যে ইলেকশনের আগে অর্থাৎ নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই মামলাটির চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। সেক্ষেত্রে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে হবে নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে। সেক্ষেত্রে এখনো ৭ মাস সময় হাতে আছে। এদেশের মানুষ কোনদিন শোনেনি যে, বেগম জিয়ার অসুস্থতার কারণে প্রয়োজন হলে ভিডিও কন্ফারেন্সের মাধ্যমে মামলাটির শুনানি হবে। কত রথি মহারথি হাজার হাজার কোটি টাকা লুন্ঠন করেও বুক চিপিয়ে এই সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অথচ দুদক তাদের টিকিটিও স্পর্শ করছে না। অথচ দুই কোটি টাকার মামলা দুদকের কাছে এতই মহা মূল্যবান হয়ে গেছে যে সেই মামলার নিষ্পত্তির স্পিড বাড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজন হলে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তার শুনানি করতে হবে।

॥তিন॥

সুতরাং ধরে নেয়া যায় যে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই মামলার চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। কিন্তু, যেভাবে মামলা চালানো হচ্ছে, যেভাবে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী এমপি এবং আওয়ামী লীগ নেতারা মামলার চূড়ান্ত রায়ের আগেই নিজেরা রায় দিয়ে দিচ্ছেন, তার ফলে বেগম জিয়ার বেকসুর খালাস পাওয়া অথবা সাজার মেয়াদ দুই বছরের কম হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। ২য় যে অপশনের কথা আমরা বলেছি, সেই অপশনের কোনোই সম্ভাবনা নাই বলে ধরে নেয়া যায়। মামলা চলে সাধারণত শামুকের গতিতে। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে যে দুই-তিন বা চার হর্স পাওয়ারে ছুটছে মামলার চাকা। আমার তো মনে হয় জুন-জুলাই মাসের মধ্যেই এই মামলার চূড়ান্ত ফয়সালা হবে।

তাহলে একমাত্র অবশিষ্ট থাকলো ৩য় অপশন। দুদক সাজা বাড়ানোর জন্য রিভিশন পিটিশন করেছে অর্থাৎ বেগম জিয়ার ৫ বছরের কারাদন্ডে তারা মোটেই খুশি নয়। তারা সেটিকে বাড়িয়ে অন্যদের সম পর্যায়ে আনতে চায়। অর্থাৎ বেগম জিয়ার সাজার মেয়াদও ১০ বছর করা হোক। যদি সেটাই করতে হয় তাহলে বেগম খালেদা জিয়া স্বাভাবিক গতিতে কারাগার থেকে মুক্ত হবেন ৮৩ বছর বয়সে। দুদক কি নিজে থেকেই সাজা বাড়ানোর আবেদন করেছে? যদি নিজ থেকেই এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দুদকের থাকতো তাহলে বেসিক ব্যাংকের বাচ্চু বা জনতা ব্যাংকের আবুল বারাকাত এতদিন মুক্ত মানব হিসেবে বাইরে থাকতেন না। তাদেরকেও কারাগারের ঐসব সেলে ঢুকতে হতো। তাহলে ফারমার্স ব্যাংকের মালিক, প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মখা আলমগীর এতদিন লাল দালানে থাকতেন। বেশ কিছুদিন আগে বিএনপির সাবেক মহাসচিব মরহুম দেলোয়ার হোসেনকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, এই সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে কোত্থেকে। উত্তরে মরহুম দেলোয়ার হোসেন পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, আলো আসে কোত্থেকে? আলো আসে মেইন সুইচ থেকে।

এমন একটি পটভূমিতে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে উঠে আসে বেগম জিয়ার অসুস্থতা। এই অসুস্থতা নিয়েও কম খেলা হলো না। আজ ৭ দিন হয়ে গেল বেগম জিয়া অসুস্থ। অথচ জনগণ জানে না, বেগম জিয়ার অসুখটি কি? প্রথম প্রথম সরকার তো বেগম জিয়ার অসুখকে পাত্তাই দিচ্ছিলেন না। তারপর ধীরে ধীরে সব কথাই বেরিয়ে আসে। তার জ্বর হয়েছিল। এখন পিজি হাসপাতালে এক্সরে করতে হলো, আবার রক্তও পরীক্ষা করতে হলো। এখন আবার বলা হচ্ছে যে তার এমআরআই করতে হবে। যেটিই হোক না কেন, সবকিছু তাড়াতাড়ি করা দরকার। জনগণকে আর টেনশনের মধ্যে এবং ধোঁয়াশার মধ্যে রাখা ঠিক হচ্ছে না। বেগম জিয়া চিরদিন চিকিৎসা নিয়েছেন সৌদি আরবে বা ইংল্যান্ডে। কয়েক বছর আগে সিঙ্গাপুরেও চিকিৎসা নিয়েছেন। তারা ব্যবস্থাপত্রে যে সব ওষুধ লিখে দেন সেগুলোই বেগম জিয়া খান অথবা ঐ সব কম্পোনেন্ট বাংলাদেশের যেসব ওষুধে আছে সেসব ওষুধ খান। একটি মানুষতো আর বছরের ১২ মাসই সৌদি আরব, ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুর যেতে পারেন না। একবার দেশের বাইরে চিকিৎসা নিলে এক বা একাধিক ডাক্তার স্বদেশে সেই অসুখের ফলো আপ করেন। বেগম জিয়াও তাই তার অসুখ দেখাশুনা করার জন্য তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক টিমকে দিয়ে চিকিৎসা করাতে চেয়েছিলেন। শনিবার এই কলাম লেখা পর্যন্ত সরকার সেই অনুমতি দেয়নি। উপরন্তু বেগম জিয়া বিদেশে যাবেন, এমন একটি গুজব খুব জোরেসোরে রটানো হচ্ছে। অথচ জেলখানায় বেগম জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে বাইরে আসার পর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বরং আরো কঠোর অবস্থানে গিয়েছেন। এতদিন তারা বলতেন যে, যে কোন বিষয়ে, যে কোন স্থানে, যে কোন সময় তারা সরকারের সাথে কথা বলতে প্রস্তুত। কিন্তু এখন বলছেন যে, যে কোন রকম আলোচনার পূর্বে ১ নম্বর শর্ত হলো বেগম জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি। সেই মুক্তি দেয়া না হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো জটিল হবে এবং এখনকার মতো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সব সময় বিরাজ নাও করতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ