ঢাকা, রোববার 8 April 2018, ২৫ চৈত্র ১৪২৪, ২০ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সরকার আর দুদকের টার্গেট বিএনপি?

জিবলু রহমান : [দুই] এটর্নি জেনারেল বলেন, খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তাদের ব্যর্থতার দায় আমাদের (রাষ্ট্রপক্ষ) ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন কেন? এটা দুঃখজনক। ‘খালেদা জিয়ার জামিন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে আমি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিইনি। আমি আদালতে আইনি যুক্তিতে কথা বলেছি।’ মাহবুবে আলম বলেন, ‘আমি লক্ষ্য করেছি এ মামলার শুনানির সময় আইনজীবীদের মধ্যে কো-অপারেশনের (সমন্বয়) অভাব ছিল। একটি মামলায় এতো আইনজীবী থাকলে কো-অপারেশনের অভাব হয়।’

‘আদালতে খালেদা জিয়ার জামিন শুনানিতে তাদের আইনজীবীরা বক্তব্য দিয়েছেন, আমরাও বক্তব্য দিয়েছি। এখন আদালত মনে করলে তাকে জামিন দিতেও পারেন। তাদের আইনজীবীরা শুধু শুধু আমাদের দোষারোপ করছেন।’ মাহবুবে আলম বলেন, তিনি আশা করছেন খালেদা জিয়া ও অন্য আসামিদের দ- আপিলেও বহাল থাকবে।

এদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আইনমন্ত্রী এবং এটর্নি জেনারেলের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া আইনজীবীদের ভুলে কারাগারে আছেন’-বলে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রমাণ করে তাকে মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করে সরকার আবারও প্রমাণ করেছে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। সরকারের নির্দেশের বাইরে কিছু চলে না। বিচার প্রহসনে পরিণত হয়েছে। সরকারের নিয়ন্ত্রনে চলছে বিচার।

আইনজীবী সমিতি ভবনের সভাপতির কক্ষে আয়েজিত সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেছেন, এই সরকার খালেদা জিয়াকে সহসাই মুক্ত হতে দেবে না, এটা সরকারের দুরভিসন্ধি। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি নাই। আমরা আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ। আমরা সমন্বিতভাবেই সব কাজ করছি। আমরা চাই খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে তারা (সরকার) কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না।’ তিনি বলেন,খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে সরকার অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমার দৃষ্টিতে এই অপপ্রচারের পেছনে তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, খালেদা জিয়া যেন আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হতে না পারেন; দ্বিতীয়ত, আইনজীবীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা এবং তৃতীয়ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তথা খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করা। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ১ মার্চ ২০১৮)

খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিয়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার কৌশল নিয়েছে সরকার। আগামী নির্বাচন যদি নিরপেক্ষ করতে পদক্ষেপ না নেয়া হয় তাহলে আন্দোলন হবেই, সেখানে খালেদার সরাসরি দিকনির্দেশনা দেয়া বন্ধ করতেই মূলত দুনীতির মামলায় সাজার নামে কারাগারে পাঠানো হলো। 

খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে সরকার হয়তো তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে। এর মাধ্যমে বিএনপির রাজনৈতিক প্রভাব খর্ব করার চেষ্টা করছে সরকার। তবে তাকে গ্রেফতার করে বিএনপি ভাঙ্গার যে স্বপ্ন সরকার দেখেছিল তা ভেস্তে গেছে। বিশ্ব এখন খালেদা জিয়াকে গণতন্ত্রের প্রতীকই মনে করছে। তিনি যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মিথ্যা মামলার শিকার হচ্ছেন তা স্বদেশ-বিদেশ সবাই বুঝে। বিদেশীরা এটাও অনুমান করতে পারছে, বাংলাদেশে বিবদমান দুদলের মধ্যে সমঝোতা হওয়ার কোন লক্ষণ এথনও নেই। এতে অদূর ভবিষ্যতে এখানে বাড়বে অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা। সরকার মাত্রারিক্ত বাড়াবাড়ি করছে।

মনে পড়ছে, ২৯ জানুয়ারি ২০১৫ বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতির তথ্য। বিবৃতিতে রিজভী আহমেদ বলেছিলেন, চলমান আন্দোলন দমনে পুলিশকে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে দায়িত্ব নিবেন বলে যে আদেশ দিয়েছেন  তা, আতঙ্ক ও উদ্বেগজনক। সরকারের মদদে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমানের বাসায় গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে প্রায় ২১ জন নেতা-কর্মীকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করা হচ্ছে। সারা দেশে পনের হাজারের বেশি বিএনপি ও জোটের নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার এবং দেশব্যাপী নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় দেড় লক্ষাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি জোটের নেতা-কর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে যৌথবাহিনীর আক্রমণ এবং কাক্সিক্ষত ব্যক্তিকে না পেয়ে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ নিরীহ লোকজনকে আটক ও জিনিসপত্র লুটপাট করা হচ্ছে। সরকারি এজেন্ট দিয়ে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে নাশকতা সৃষ্টির দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপানোর অপচেষ্টা চলছে। (সূত্র : দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ৩০ জানুয়ারি ২০১৫)

২০১৫ সালের অব্যাহত অবরোধের সময়ও ৩০ জানুয়ারি ২০১৫ গভীর রাতে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ প্রায় ১৮ ঘণ্টা বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। আর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় ফোন, ইন্টারনেট, ফ্যাক্সসহ সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থার। একই সঙ্গে আন্দোলনে সক্রিয় নেতাদের টার্গেট করে গ্রেফতার করা হয়। 

শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, শাসকদলের সিনিয়র নেতারাও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র মন্ত্রী-এমপিরাও প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। ৩১ জানুয়ারি ২০১৫ নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এক অনুষ্ঠানে বলেন, শ্রমিক-কর্মচারীরা কাউকে খাবার নিয়ে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে ঢুকতে দেবে না। খালেদা জিয়াকে তারা খেতে দেবে না। সব পোড়া গাড়ি নিয়ে খালেদা জিয়াকে ঘেরাও করা হবে বলেও জানান তিনি। একইদিন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেন, এসএসসি পরীক্ষার আগে অবরোধ প্রত্যাহার না হলে গুলশানের ওই বাড়ির পানি, গ্যাসসহ সবকিছুর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের শুধু বিদ্যুৎ নয়, সব লাইন কেটে দেয়া হবে। এটা আজকে জনগণের দাবি। (সূত্র : দৈনিক যুগান্তর ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)

পাড়ায়-মহল্লায় বিরোধী জোটকে দমনের জন্য কমিটি ঘোষণার মাত্র একদিনের মাথায় ১৫ জানুয়ারি ২০১৫ খালেদা জিয়াকে হামলার টার্গেট করেছিল সরকারি দল। এর আগে রাজধানীর আলিয়া মাদরাসা মাঠে হাজিরা দিতে গেলে সরকারি দলের ক্যাডাররা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। এবার হামলার টার্গেট নিয়েছে শ্রমজীবী জনতা লীগের নেতা-কর্মীরা। যারা হামলা করতে এসেছিল তাদের গ্রেফতার বা তাদের বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত হয়নি। বরং তাদের প্রায় আধঘণ্টা কার্যালয় থেকে কিছু দূরে বিক্ষোভ করার সুযোগ করে দেয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। (সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম ১৬ জানুয়ারি ২০১৫)

৩১ জানুয়ারি ২০১৫ জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশান (বামসাএ) আয়োজিত ‘আরাফাত রহমান কোকোর স্মরণসভা ও মিলাদ মাহফিলে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের লাইন বন্ধ করে দেয়ার নিন্দা জানিয়ে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপাপ্ত আহ্বায়ক রুহুল আমিন গাজী বলেছিলেন, পৃথিবীর সব আইন লঙ্ঘন করে সরকার এসব করছে। খালেদা জিয়াকে মারার উদ্দেশ্যেই এমন করা হচ্ছে। অতীতের কোন স্বৈরাচারি শাসনামলেও এমন ঘৃণিত কাজ হয়নি।

 সভায় ঢাবির সাবেক প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. আফম ইউসুফ হায়দার বলেন, ‘খালেদা জিয়া দেশের কথা ভাবতে গিয়ে পরিবারের জন্য চিন্তা করতেন না। তাই পরিবারের দিকে নজর ফেরানোর জন্য তার ছেলে কোকোকে ১/১১ সময় অত্যাচার করা হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় কোকোর মৃত্যু হয়েছে।’ গ্যাস, টিভি, ইন্টারনেট লাইন বন্ধ করে খালেদা জিয়াকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ বলেন, ‘সরকার জিয়াউর রহমানের পরিবার ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে। এমনকি এর মধ্য দিয়ে দেশের জাতীয়তাবাদকে ধ্বংসের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন বলেছেন, খালেদা জিয়ার কার্যালয় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দিয়ে এভাবে তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে অন্ধকারে নিরাপত্তহীনতায় রাখা হচ্ছে হত্যার ষড়যন্ত্র। আপাতদৃষ্টিতে তা হত্যার ষড়যন্ত্রই মনে হচ্ছে। ৩১ জানুয়ারি ২০১৫ রাত সাড়ে ৮টার দিকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। তিনি বলেন, দুনিয়ার কোথাও এমন অমানবিক আচরণ দেখা যায়নি। যারা এ আচরণ করেছে আল্লাহ তাদের ছাড়বে না। সরকার গণতন্ত্রের নামে প্রতিহিংসাপরায়ণতা চালাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। (সূত্র : দৈনিক আমার দেশ ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)

প্রায় তিন বছর আগে ২৬ মার্চ ২০১৫ সামরিক খাত, বিমান খাতসহ বিভিন্ন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় গোয়েন্দা জগতে সুপরিচিত বৃটেনের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান আইএইচএস জেন ওয়েবসাইটে বাংলাদেশকে ‘কান্ট্রি রিস্ক’ ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশে সমঝোতা না হলে আরও অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা বাড়বে। এতে বলা হয়েছে, নতুন নির্বাচন দেয়ার দাবিতে মূলত গত ৫ই জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করে বিএনপি। কিন্তু এতে তড়িঘড়ি করে কোন সমাধান আসে নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ