ঢাকা, রোববার 8 April 2018, ২৫ চৈত্র ১৪২৪, ২০ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চুরি হওয়া সিএনজি টাকা দিলেই ফিরে আসে

সংগ্রাম ডেস্ক : লোহার খাঁচায় মোড়ানো সিএনজি বাহন এখন আর নিরাপদ নয়। মধ্যবিত্তের বাহন হিসেবে পরিচিত এই অটোরিকশাগুলো দিন দিন চালকদের জন্য যেমন জীবন হুমকী হচ্ছে, তেমনি যাত্রীদেরও। যাত্রী বেশে বাহনে উঠে সখ্যতা গড়ে চালককে নেশাদ্রব্য খাইয়ে অহরহ অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। 

ঘটনাটি উত্তরায়। গত ১৫ মার্চ রাতে জনৈক সিএনজি চালক একজন যাত্রী তুলেছিলেন। তখন তিনি একবারও ভাবেননি তাকে কত মূল্য চুকাতে হবে। কথাবার্তায় যাত্রীকে খুবই অমায়িক মনে হয় তার। এক পর্যায়ে রাস্তার পাশের দোকানে দাঁড়িয়ে তাকে চা খাওয়ার প্রস্তাব দেন যাত্রী।

চালক বলেন,ওই দোকানে অন্য কেউ ছিল না , ‘এক কাপ চা খেলাম আর আবার কয়েক মিনিটের মাথায় সিএনজি নিয়ে রওনা দিলাম, ঘুম ঘুম লাগতে থাকায় সিএনজি দাঁড় করাতে বাধ্য হলাম। এরপর জেগে উঠে নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় দেখতে পাই।’ ‘আমার কোম্পানির আরেক ড্রাইভার আমাকে জানায় অচেতন অবস্থায় আমাকে দেখতে পেয়ে এখানে নিয়ে এসেছে’,। বাংলা ট্রিবিউন।

আমার অটোরিকশা আর মোবাইলের কোনও খোঁজ নেই। নিজের মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে এক লোক ধরে জানায় তিনি আমার অটোরিকশাটি পেয়েছেন, বলতে থাকেন করিম। তিনি জানান, ওই লোক আমাকে বলেন ৭০ হাজার টাকা দিলে তিনি আমার সিএনজিটি ফেরত দেবেন। সতর্ক করে দিয়ে বলেন পুলিশকে যেন না বলি। আমি প্রথমে পুলিশের কাছেই যেতে চেয়েছিলাম, পরে বুঝলাম এতে শুধু সময়ই নষ্ট হবে।

পরে চোরের সঙ্গে দর কষাকষি করে ৫০ হাজার টাকায় রফা করলে সে একটি জায়গায় যেতে বলে । এসব চোরের অনেকেই দিনের বেলায় বিভিন্ন অফিসে চাকরিবাকরি করে।

আরেক ড্রাইভারের নাম সেলিম (৫৫)। বিমানবন্দর সড়কে মধ্য জানুয়ারিতে তাকেও প্রায় একইভাবে ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে তার সিএনজিটি চুরি করে নেয়। ৬০ হাজার টাকায় রফা করে নিজের সিএনজিটি ফেরত পেয়েছেন তিনি। তিনিও ভেবেছিলেন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনও কাজ হবে না।

পুলিশের গোয়েন্দারা বলছেন, এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন কমপক্ষে একশ’ অপরাধী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি শাখার সিনিয়র অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার রাহুল পাটোয়ারি বলেন, এসব চোরের অনেকেই দিনের বেলায় বিভিন্ন অফিসে চাকরি করে। তারা একটা সিএনজি ভাড়া করে ড্রাইভারকে এটা-সেটা বুঝিয়ে পূর্ব নির্ধারিত কোনও জায়গায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়। তারপর সে বা তার দল ওই ড্রাইভারকে ওষুধ প্রয়োগ করে সিএনজি নিয়ে চম্পট দেয়।

ডিএমপির গোয়েন্দারা বলছেন, ঢাকা শহরে এধরনের অপরাধে ১২-১৫টি চক্র এখন সক্রিয় রয়েছে। প্রত্যেকটি চক্রে পাঁচ থেকে সাতজন যুক্ত রয়েছে।

সিএনজি চুরি সবসময় চুরিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। গত ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে সিএনজি চালক ইস্কান্দার হাওলাদারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চার ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সম্প্রতি তারা অপরাধ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দিয়েছে।

তাদের স্বীকারোক্তি ও ডিবি পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী রাতের বেলা দুই ভাগে ভাগ হয়ে অটোরিকশার সন্ধানে নেমে পড়ে। প্রথম দলে থাকা দুই তিনজন মিলে সিএনজি ভাড়া করে। সেই সময়ে অপর গ্রুপটির তিন চারজন সদস্য পূর্ব নির্ধারিত অন্য একটি জায়গায় অবস্থান নেয়। সেই স্থানে ভাড়া করা সিএনজিটি নিয়ে এলে দুই গ্রুপের সদস্যরা মিলে ড্রাইভারকে ওষুধ প্রয়োগ করে অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায়।

চুরির কয়েক দিন পর চোরেরা এক মধ্যস্থতাকারী দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ওই মধ্যস্থতাকারী ড্রাইভার বা অটোরিকশা মালিককে তা ফিরিয়ে দিতে যোগাযোগ করে।

ধরা পড়া চক্রটির দলনেতা ইলিয়াস ও তার সহযোগী লিটন, জসিম এবং আনোয়ার তাদের স্বীকারোক্তিতে জানায় তারা ইস্কান্দারকে আগারগাঁওয়ের বাণিজ্যমেলার জায়গা থেকে ভাড়া করে। ফার্মগেটে তারা এক বন্ধুকে তোলার কথা বলে সিএনজিটি দাঁড় করায়। সেখানে বন্ধু মিন্টু তাদের চা খাওয়ার প্রস্তাব দেয়। পরে হাতে থাকা ঘুমের ওষুধ চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেয় সে। পরে ইস্কান্দারকে সিএনজিতে তুলে মানিক মিয়া এভিনিউতে ফেলে দেওয়া হয়।

ইলিয়াস থাকে মিরপুরের শাহ আলী মাজার এলাকায়। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, গত দুই-তিন বছর ধরে এই কাজ করছে সে। দিনের বেলায় করে শ্রমিকের কাজ।

চুরি করা এসব সিএনজি ফিরিয়ে দিতে ৫০ থেকে ৮০ হাজার পর্যন্ত দর ঠিক করা হয়। পুরনো সিএনজি কিনতে গেলে বাজারে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা দরকার পড়ে।

ডিএমপির গোয়েন্দারা কয়েকটি চক্রের প্রধানকে শনাক্ত করেছে। ড্রাইভার আর মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা দালালদের নামও পাওয়া গেছে। ইলিয়াসের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চক্রের প্রধান হিসেবে বেশ কয়েকটি নাম পেয়েছে গোয়েন্দা বিভাগ। এরা হলো অলি, মুজিবর, শামীম, জামাল, ছোট জামাল, সেলিম ও নজরুল। ফারুক নামে এক ব্যক্তি সবচেয়ে পরিচিত দালালদের গ্রুপের নেতা। অন্য দুটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন মিরাজ ও আওয়াল। প্রতি সিএনজিতে দালালরা ১৫ থেকে ২০ হাজার করে টাকা পান বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা রাহুল পাটোয়ারী।

একশ চোরের দল গড়েছে ‘কানা শহিদ’ : রাজধানীতে সিএনজি চালকরাই রয়েছেন প্রচ- অস্বস্তিতে। বিশেষ করে রাত হলেই সিএনজিচালকদের অস্বস্তি ও আতঙ্ক বাড়ে। কারণ, প্রায় রাতেই ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে একাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পুলিশ জানিয়েছে, এসব অটোরিকশা চুরি হয় পরিকল্পনা করে, দলবেঁধে। একাধিক চোরচক্র এসব ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। আর প্রতিটি চক্র বা দলের কলকাঠি নাড়ে একজন করে গডফাদার। তেমনই এক গডফাদারের নাম ‘কানা শহিদ’। রাজধানীর পথে পথে রয়েছে তার ছিনতাই দলের সদস্য। ডিএমপি’র প্রতিটি থানায় আছে তার বিরুদ্ধে সিএনজি ছিনতাইয়ের মামলা অথচ তার টিকির দেখাও পায় না পুলিশ!  

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কানা শহিদের অস্বাভাবিক এক উত্থানের গল্প। মাত্র ১০ বছর আগেও ঢাকার রাস্তায় অটোরিকশা চালাতো শহিদ। এরমধ্যে এক দুর্ঘটনায় চোখ হারায় সে। বুঝতে পারেন চালক হিসেবে কাজ হারিয়েছে সে। এ পরিস্থিতিতে সবাই যেখানে নিজের চরম বিপদ দেখতে পান শহিদ সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ায়। অটোরিকশার সঙ্গেই থাকতে চায় সে কিন্তু, ভালো কিছুর বদলে অন্ধকার পথ বেছে নেয় । শুরুতে একা, পরে রীতিমত দল গড়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চুরি করতে থাকে সে। লোকের কাছে সে পরিচিত হয় ‘কানা শহিদ’ নামে।

বর্তমানে সিএনজিচালকদের কাছে আতঙ্কের প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠা এই কানা শহিদকে ঢাকা মহানগর পুলিশ বলছে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ অটোরিকশা চোর। রাজধানীর প্রায় প্রতিটি থানাতেই তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।   

পুলিশ সূত্রগুলো বলছে, রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট ও বহুতল ভবনের মালিক শহিদ। রাজধানীর প্রত্যেক সিএনজি চোর তাকে ‘গুরু ’বলে মানে। তার অধীনে কাজ করে প্রায় একশো চোর। গ্রেফতার হলে তাকে ছাড়িয়ে আনতে রয়েছে আইনজীবী আর দালালও।

শহিদ এখন প্রতিমাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা আয় করে বলে গোয়েন্দা পুলিশের সূত্রগুলোর দাবি। সিএনজিচালিত অটোরিকশা চুরির ক্ষেত্রেও বিশাল জাল বিছিয়ে রেখেছে শহিদ। পুরো শহরকে দশটি অংশে ভাগ করে প্রত্যেক অংশের দায়িত্ব বিশ্বস্ত একেকজনের কাছে দিয়ে রেখেছে সে। আর অংশগুলোতে গড়ে ওঠা চক্রগুলো প্রতিদিন যেসব সিএনজি চুরি করে সেগুলোর বিক্রি বা ফিরিয়ে দেওয়া বাবদ আদায় করা অংশের ভাগ নিয়মিতই পৌঁছে যায় শহিদের কাছে।

পুলিশের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ৪৮ বছর বয়সী কানা শহিদই ঢাকায় সিএনজি চোরচক্রের প্রতিষ্ঠাতা। সে ও তার সহযোগীরা মিলে এ যাবত প্রায় দুই হাজার অটোরিকশা চুরি করেছে রাজধানীতে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বেশ কয়েকবার আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছিল শহিদ। তবে প্রতিবারই জামিনে বের হয়ে এসে আবারও একই অপরাধে জড়িয়েছে সে।

ডিএমপির এডিশনাল কমিশনার (ডিবি) দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, সচেতনতার অভাবেই চোরদের ফাঁদে ধরা দেয় সিএনজি চালকেরা। আমরা নিয়মিতভাবেই এসব চোরকে ধরছি কিন্তু জামিনে বেরিয়ে আবারও নিজের ব্যবসায় ফিরে যাচ্ছে এসব অপরাধীরা।

চুরির কবলে পড়লে চালকদের পুলিশের সাহায্য নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা। এমনকি দালালরা যোগাযোগ করলেও আগে পুলিশের কাছে যাওয়ার কথা বলছেন তারা।

গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রাহুল পাটোয়ারী বলেন, সিএনজিচালকরা সচেতন হতে শুরু করায় এসব চোর এখন ব্যাটারিচালিত ইজি বাইককে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। শহরের নির্দিষ্ট অংশে চলাচলা করা এই ইজি বাইক এখন চোরদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

গত ২৬ মার্চ হাজারীবাগের ইজিবাইক চালক মুসা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। ইজি বাইকটি ছিনিয়ে নিতে মুসার শরীরে মাত্রাতিরিক্ত নেশাজাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করেছিল চোরেরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ