ঢাকা, রোববার 8 April 2018, ২৫ চৈত্র ১৪২৪, ২০ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ধনীর দুলারীরা জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদে!

 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ধনীর দুলারীরা জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদে। সম্প্রতি জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে পুলিশ দেশের একাধিক স্থান থেকে দু'জন নারীকে গ্রেফতারের পর এই দাবি করছে আইনশৃংখলাবাহিনী। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগ বলছে, এদের মধ্যে একজন নব্য জেএমবির নারী শাখার প্রধান। তিনি  উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য এবং একটি নামী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। গ্রেফতার অন্যজন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।

রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর শিক্ষিত বিত্তবান পরিবারের ছেলেরা জঙ্গি কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ার বিষয়টি প্রথমে আইনশৃংখলাবাহিনীর নজরে আসে। ওই ঘটনার পর বিত্তবান পরিবারের ছেলেদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি ধরা পড়লে উদ্বেগ-উৎকন্ঠার শুরু হয়। তার রেশ শেষ হতে না হতেই এখন এই তৎপরতায় উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীরাও জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি ধরা পড়েছে। জঙ্গি হামলার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ হোমায়রা নাবিলা নামের একজন নারীকে বুধবার রাতে সিদ্ধেশ্বরী এলাকা  থেকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি নব্য জেএমবির নারী শাখার প্রধান এবং গত ১৫ অগাস্টে ঢাকার পান্থপথে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে জঙ্গি হামলায় অর্থের জোগান দিয়েছিলেন।

এই হুমায়ারা ওরফে নাবিলা সম্পর্কে এখন বের হয়ে আসছে নানা চমকপ্রদ তথ্য। ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে নাবিলা হুমায়রার বাবা বড় ব্যবসায়ী। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হয় নর্থসাউথ ইউনিভারসিটিতে। সেখানে তাজরীন খানম শুভর সঙ্গে পরিচয় হয় তার। শুভর ভাই আকরাম হোসেন নিলয় নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা। শুভর মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে হুমায়রা ওরফে নাবিলাও। এরপর ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে নব্য জেএমবির সিস্টার উইংয়ের প্রধান। নিজস্ব যোগাযোগ চ্যানেলে তার নাম ছিল ‘ব্যাট উইমেন’। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান দাবি করেছেন, হুমায়রা 'ব্যাট ওমেন' নামে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতেন। ব্যাট-ওমেন নামে সে বিভিন্ন আইডি এবং এনক্রিপ্টেড অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করতো। সংগঠনের সর্বশেষ আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিল যে আকরাম হোসেন নিলয়, তার মাধ্যমে সে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে।" তিনি বলেন, "সংগঠনে আরো যারা নারী সদস্য আছে, তাদের সে নিজের আইডি থেকে উদ্বুদ্ধ করত।" তিনি জানান, হুমায়ারার মাধ্যমেই তার স্বামী তানভীর ইয়াসিন করিম জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হন। এই ব্যক্তি গত নভেম্বরের শুরুতে নিখোঁজ হয়েছিলেন, পরে নভেম্বরের ২০ তারিখে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

পুলিশ বলছে, হুমায়রা নিয়মিত জঙ্গি তৎপরতায় অর্থায়ন করতেন। হুমায়রা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে মালয়েশিয়ায় পড়ালেখা করেছেন। হুমায়রার বাবা একজন ব্যবসায়ী।

অন্যদিকে, নব্য জেএমবির তামিম গ্রুপের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী গ্রেপ্তার হয়েছেন উত্তরাঞ্চলীয় জেলা লালমনিরহাট থেকে। লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযোগ পাবার পর তাকে বেশ কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখার পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।" কয়েক মাস আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটা মামলার সূত্রে আমরা তাকে কয়েকমাস নজরে রাখি। এরপর নিশ্চিত হয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছ। সে নিজে সম্পৃক্ত এবং অন্যদেরকে ও এই জঙ্গি তৎপরতায় উদ্বুদ্ধ করতো। দেশের অন্য জায়গাতেও তার কানেকশন আছে।"

বাংলাদেশে ২০১৬ সালের জুলাইতে গুলশানের হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর দেখা গিয়েছিল, শিক্ষিত বিত্তবান পরিবারের ছেলেরা জঙ্গি কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। এখন কি সেই একই ধারায় নারীরাও যুক্ত হচ্ছেন জঙ্গিবাদে?

এমন প্রশ্নের জবাবে কাউন্টার টেররিজমের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান  বলেন, জঙ্গি কর্মকান্ডে মেয়েদের সম্পৃক্ত হবার হার এখনো কম হলেও, এ সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু আগে যেখানে শুধুমাত্র পরিবারের প্রভাবে জড়িয়ে যেত মেয়েরা, এখন তেমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই জড়িত হচ্ছে জঙ্গি কাজে।" গত বছর খানেক আগেও আমরা কয়েকজন নারীকে এই অভিযোগে গ্রেফতার করেছিলাম। দেখা গেছে তারা পরিবারের অর্থাৎ বাবা, স্বামী বা ভাই এমন কারো সূত্রে জঙ্গি তৎপরতার সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে শুধু পরিবারের প্রভাবেই তারা জড়িত হয়ে পড়ছে না। হুমায়রা যুক্ত হয়েছেন, তার বান্ধবীর ভাই নিলয়, তার সংস্পর্শে এসে, নিজে নিজেই।"

বিত্তবান ও শিক্ষিত পরিবারের ছেলেমেয়েদের  জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেছেন, সমাজে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেকারণে ছেলেমেয়েরা সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে বেড়ে উঠছে। আর হতাশা থেকেই ভিন্ন ধরণের কিছু করার আকাক্সক্ষা নিয়ে অনেকে জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গি কর্মকান্ডে। তিনি বলেন, "আমাদের সমাজ খন্ডিত হয়ে গেছে, আমরা সহমর্মিতা হারিয়েছি, একসাথে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারি না আমরা। সেখান থেকে একাকীত্ব আসে, এর মধ্যে তরুণরা পথ খুঁজে বেড়ায় যে কিভাবে নিজেদের এই শূন্যতা দূর করতে পারবে।" "তাছাড়া, মানুষের মনস্তত্ত্ব খুবই জটিল। কেউ হয়ত বিবিএ পড়তে চায় না, আর্টস পড়তে চায়। কিন্তু পরিবার সেটা চায় না। তখন তাকে জোর করা হয়, এ থেকেও হতাশা আসে মানুষের।"

গ্রেফতার হওয়া ওই দুই নারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। এর মধ্যে লালমনিরহাটে নাশকতার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ইতিমধ্যেই রিমান্ড চাওয়া হয়েছে ঐ ছাত্রীর। আর ঢাকায় গ্রেফতার হওয়া হুমায়রা দু‘দিনের রিমান্ডে। তাকে জিজ্ঞাসাবকাদ করা হচ্ছে।

যেভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে হুমায়ারা

বুধবার রাতে সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে হুমায়রা ওরফে নাবিলাকে। পুলিশের দাবি, গত বছর জাতীয় শোক দিবসে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে মন্ত্রী-এমপিসহ শতাধিক মানুষকে হত্যার যে ছক কষেছিল জঙ্গিরা, সেই পরিকল্পনা এবং অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত ছিল হুমায়রা। অবশ্য হামলার আগেই সিটিটিসির অভিযানে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হয় হামলার প্রস্তুতি নেওয়া সেই জঙ্গি। হুমায়ারাকে এই মামলায় গ্রেফতারের পর বৃহস্পতিবার দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট- সিটিটিসির উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘নিলয় এবং তার বোনের মাধ্যমে হুমায়ারা জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে। একসময় সে নব্য জেএমবির সিস্টার উইংয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। নব্য জেএমবিকে সংগঠিত করতে বিভিন্ন সময়ে অর্থও দিয়েছে হুমায়ারা।’ 

সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার পর হুমায়ারা নব্য জেএমবির সিক্রেট যোগাযোগ অ্যাপসে অন্তর্ভুক্ত হয়। সেখানে হুমায়রা নিজের আইডি খুলেছিল ‘ব্যাট উইমেন’ নামে। ফলে ‘ব্যাট উইমেন’ নামেই সংগঠনের অন্য সদস্যরা তাকে চিনত। হুমায়রার সঙ্গে আরও অন্তত ১০-১২ জন নারী নব্য জেএমবির সিস্টার উইংয়ে কাজ করতো বলে সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন। রিমান্ডে নিয়ে হুমায়ারাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের নাম ঠিকানা জানার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তারা।

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, হুমায়রা ওরফে নাবিলার স্বামী তানভীর ইয়াসিন করিমকে গ্রেফতার করা হয় গত বছরের ১৯ নভেম্বর। তানভীরও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। আগে থেকেই দু’জন পরিচিত হওয়ায় তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দুজনই জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন একসঙ্গে। যদিও গ্রেফতারের পর হুমায়ারার স্বামী তানভীর ইয়াসিন করিম জিজ্ঞাসাবাদে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তাদের কাছে বলেছেন- স্ত্রী হুমায়ারার প্রভাবেই জঙ্গিবাদে জড়ানো ও সাংগঠনিক কাজে অর্থ সংগ্রহ ও সরবরাহ করতেন তিনি। জঙ্গিবাদি কার্যক্রমের বাইরে তিনি ইসলামি বই প্রকাশনার কাজ করতেন। তার একাধিক প্রকাশনা সংস্থা রয়েছে।

হুমায়রাকে পান্থপথের বিস্ফোরণের যে মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে, সেই মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, হুমায়ারা এবং তার স্বামী দুজনই বিভিন্ন হামলার পরিকল্পনার বাস্তকবায়নের জন্য প্রচুর অর্থ দিয়েছেন। সর্বশেষ গত বছরের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে যে হামলার পরিকল্পনা করা হয় এর অর্থ যোগানেও অংশ ছিল হুমায়রার। এমনকি হামলার পুরো বিষয়টিও তার জানা ছিল।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, হুমায়রার স্বামী তানভীরকে গ্রেফতারের সময় হুমায়ারা অন্তঃসত্ত্বা ছিল। একারণে সেসময় তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। তবে তাকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছিল।

জানা যায়, ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হুমায়রা ওরফে নাবিলার বাবা জাকির হোসেন রাজধানীর হাতিরপুলের মোতালেব প্লাজার মালিক। দুই ভাইবোনের মধ্যে হুমায়রা ওরফে নাবিলা ছোট। স্বামী তানভির ইয়াসিম করিম গ্রেফতার হওয়ার পর গুলশানের বাসা থেকে সিদ্ধেশ্বরীতে বাবার বাসায় চলে আসেন হুমায়রা। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকতেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ