ঢাকা, সোমবার 9 April 2018, ২৬ চৈত্র ১৪২৪, ২১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দারিদ্র্র্য বিমোচন ও কিছু প্রস্তাবনা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥ সমকালীন বিশ্বে আমরা এ দৃশ্য লক্ষ্য করছি। নিজের অধিকারে সামান্য যা কিছু জীবনোপকরণ আছে তাতেই যে সৎ প্রকৃতির দরিদ্র সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ্ তাআলা তাকে সবচেয়ে ভালবাসেন। আবুদ্দারদা রা. বলেছেন- “পার্থিব ধন-সম্পদের উন্নতি দেখিয়া যে ব্যক্তি সন্তুষ্ট ও আনন্দিত হয় এবং প্রতি মুহুর্তে আয়ু ক্ষয় হইয়া যাইতেছে দেখিয়া চিন্তিত না হয়, তাহার বুদ্ধি বিকৃত হইয়াছে বলিতে হইবে। ইহার মধ্যে কি মঙ্গল থাকিতে পারে যে, পার্থিব ধন-সম্পদ তো বৃদ্ধি পাইতেছে এবং আয়ু প্রতি মুহুর্তে ক্ষয়প্রাপ্ত হইতেছে।” 

ইয়াহইয়া ইবনে মুআয বলেছেন- “মানুষ দরিদ্রতা ও অভাবকে যেমন ভয় করে, যদি দোযখকে তাহারা তেমন ভয় করিত, তবে দারিদ্র্যতা এবং দোজখ উভয় হইতেই তাহারা নির্ভয় হইতে পারিত। আর তাহারা দুনিয়া পাওয়ার জন্য যেরূপ কঠোর পরিশ্রম করিয়া থাকে, যদি বেহেশ্ত প্রাপ্তির জন্য তদ্রুপ পরিশ্রম করিত, তবে তাহারা দুনিয়া ও বেহেশ্ত উভয়ই লাভ করিত”। এতে বুঝা যায়, পাপ-পুণ্য, দু:খ-দারিদ্র্য, অভাব-অনটন এবং বেহেশ্ত-দোযখ প্রাপ্তি সবই মানুষের কর্মফল-এ সব মানুষের নিয়তি নয়। “দারিদ্র্য কারোও নিয়তি বা বিধিলিপি আল-কুরআন এই ধরণের মতবাদ স্বীকার করে না। উপরন্ত ইসলামে আলস্য ও সন্ন্যাসবাদেরও কোন স্থান নেই”। মহান আল্লাহ্ বলেন- “উহা এই যে, কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করিবে না, আর এই যে, মানুষ তাহাই পায় যাহা সে করে, আর এই যে, তাহার কর্ম অচিরেই দেখান হইবে- অতপর তাহাকে দেওয়া হইবে পূর্ণ প্রতিদান। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে মানুষ ইহকাল এবং পরকালে তার কর্মফলই ভোগ করে।

ইসলাম দারিদ্র্যকে অপছন্দ করে : উপরের আলোচনা থেকে এই কথা মনে করার কোন কারণ নেই যে, ইসলাম দারিদ্র্যকে আদর্শায়িত করেছে বা ধন উপার্জনকে নিরুৎসাহিত করেছে। শরীয়তের বিধিমতে ধন উপার্জন এবং ব্যয়ের উপর ইসলাম গুরুত্ব আরোপ করে। যেমন, আমরা উপরে উল্লেখ করেছি। আল্লাহ্ বলেন- “আল্লাহ্ যাহা তোমাকে দিয়াছেন তদ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া হইতে তোমার অংশ ভুলিও না; তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিতে চাহিও না। আল্লাহ্ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না”। আল্লাহ্ আরো বরেন: “আর সন্ন্যাসবাদ-ইহা তো উহারা নিজেরাই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রবর্তন করেছিল। আমি উহাদের ইহার বিধান দেই নাই”। 

আল্লাহ্ তাআলা বলেন: ‘শয়তান তোমাদিগকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ্ তোমাদিগকে তাঁহার ক্ষমা এবং অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ”। “যদি তোমরা দারিদ্র্যের আশংকা কর তবে আল্লাহ্ ইচ্ছা করিলে তাঁহার নিজ করুণায় তোমাদিগকে অভাবমুক্ত করিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়”। তাই আল্লাহ্ বলেন, “সালাত সমাপ্ত হইলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়িবে এবং আল্লাহ্র অনুগ্রহ সন্ধান করিবে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করিবে যাহাতে তোমরা সফলকাম হও”। সুতরাং তোমরা জীবনোপকরণ কামনা কর আল্লাহ্র নিকট এবং তাঁহারই ইবাদত কর ও তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তোমরা তাঁহারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হইবে”। আল্লাহর নিকট এই প্রত্যাবর্তিত হওয়ার সাবধান বাণীর মধ্যেই লুক্কায়িত আছে ধন উপার্জন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান মেনে চলার নির্দেশ।

যে বিষয় মানুষকে আল্লাহ্ তাআলার স্মরণ ও ভালবাসা থেকে বিরত রাখে তা মন্দ ও জঘন্য। কোন কোন সময় দারিদ্র্য কারো কারো পক্ষে এতটাই অসহনীয় হয়ে পড়ে যে, সে আল্লাহর প্রতি বিমুখ হয়ে পড়ে, যেমনটা অনেকের পক্ষে ধন-দৌলতের আধিক্যের কারণেও হয়। সুতরাং অভাব মোচনের পরিমাণ ধন একেবারে ধন শূণ্যতা থেকে ভাল। “এ কারণেই রসূলুল্লাহ স. আল্লাহ্ তাআলার কাছে দু’আ করতেন: “ইয়া আল্লাহ্! আমার বংশধর এবং উম্মতদিগকে অভাব মোচনের পরিমাণ অন্ন-বস্ত্র দান করিও”। নবী করীম স. এরূপ প্রার্থনার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন: “দারিদ্র্য মানুষকে কুফরী পর্যন্ত নিয়ে যায়”। তিনি আরো বরেন, “হে আল্লাহ্! আমাকে দরিদ্রের জীবন দান কর। দরিদ্রের মতোই মৃত্যুবরণ করতে দাও এবং কিয়ামতে দরিদ্রের সাথেই পুনরুজ্জীবিত করো” (তিরমিযী), তিনি নিজের জন্য এ-ও প্রার্থনা করতেন “হে আল্লাহ্! আমি দারিদ্র্য, অভাব ও লাঞ্জনা হতে তোমার পানাহ চাই” (বুখারী)। এর থেকে এই প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম দারিদ্র্যকে অপছন্দ করে ঠিকই কিন্তু দরিদ্রকে ভালবাসে।

ইসলামের দৃষ্টিতে দারিদ্র্যের কারণ : উপরে পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের কারণ সম্পর্কে সাক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে আল-কুরআনের আলোকে মুসলিম সমাজে ধন বৈষম্য ও দারিদ্র্যের কারণ সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করবো। এ প্রসঙ্গে দারিদ্র্যের যে কারণগুলোকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি, তার মধ্যে প্রধানত: ক. আল্লাহ্র বিধান থেকে বিচ্যুতি, খ. মানব সৃষ্ট সমস্যা, গ. সম্পদশালীদের দায়িত্বহীনতা, ঘ. সম্পদের বৈষম্যমূলক বণ্টন ব্যবস্থা, ঙ. ধনীক শ্রেণীর মানসিকতা, চ. দরিদ্র শ্রেণীর মানসিকতা, ছ. ক্ষমতার কেন্দ্রায়ণ ও সংহতকরণ, জ. রিবা ও ঝ. দুর্নীতির প্রভাব। আল্লাহ্র বিধান থেকে বিচ্যুতি: আল্লাহ্ বলেন: “তুমি কি দেখিয়াছ তাহাকে, যে দীনকে অস্বীকার করে? সে তো সে-ই, যে ইয়াতীমকে রূঢ়ভাবে তাড়াইয়া দেয় এবং সে অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদানে উৎসাহ দেয় না। সুতরাং দুর্ভোগ সেই সালাত আদায়কারীদের, যাহারা তাহাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন, যাহারা লোক দেখানোর জন্য উহা করে এবং গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট-খাট সাহায্যদানে বিরত থাকে”। 

বর্তমান মুসলিম সমাজে আল্লাহ্র এ বাণীর যথার্থতা আমরা লক্ষ্য করে থাকি। লোক দেখানো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা যেমন, নামায, রোযা, হজ্জ ইত্যাদি অনেকেই পালন করে কিন্তু অর্থনৈতিক বিধিবিধানের পরিপূর্ণ আমল যা আল্লাহ্র ইবাদতেরই অঙ্গ তা তারা করে না। ফলে অভাবগ্রস্ত লোকেরা শরীয়ত মাফিক নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কোন প্রকার সামাজিক সহায়তা পায় না। যার ফালে দারিদ্র্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এর প্রতিকার আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে আল্লাহর দেয়া অর্থনৈতিক শিক্ষা, যেমন উত্তরাধিকার আইন ও যাকাত ব্যবস্থার মত শরয়ী বিধানাবলীর যথাযথ বাস্তবায়ন করা। পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বলতে কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন বুঝায় না, ব্যক্তি, আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যাবতীয় ইসলামী বিধি-বিধানের পরিপূর্ণ আমলও জরুরি।

মানব সৃষ্ট সমস্যা : আল্লাহ্ বলেন-“আল্লাহ্ই তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করিয়াছেন বাসপোযোগী এবং আকাশকে করিয়াছেন ছাদ এবং তিনি তোমাদের আকৃতি গঠন করিয়াছেন এবং তোমাদের আকৃতি করিয়াছেন সুন্দর এবং তোমাদিগকে দান করিয়াছেন উৎকৃষ্ট রিয্ক; তিনিই আল্লাহ্, তোমাদের প্রতিপালক। জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্ কত মহান”। আল্লাহ্ আরো বলেন: “আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত কিছু নিজ অনুগ্রহে, চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য ইহাতে তো রহিয়াছে নিদর্শন”। 

আল্লাহ্ পৃথিবীতে প্রত্যেকেরই রিয্ক ও পার্থিব-পারলৌকিক কল্যাণ অর্জনের ব্যবস্থা করেছেন, কিন্তু মানুষ আল্লাহ্র বিধান লঙ্ঘন করে যাবতীয় পার্থিব সমস্যার সৃষ্টি করে ও পারলৌকিক কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত হয়। যেমন আল্লাহ্ বলেন: “হে মুমিনগণ! প-িত এবং সংসারবিরাগীদের মধ্যে অনেকেই লোকের ধন অন্যায়ভাবে ভোগ করিয়া থাকে এবং লোককে আল্লাহ্র পথ হইতে নিবৃত্ত করে। আর যাহারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না উহাদিগকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে উহা উত্তপ্ত করা হইবে এবং উহা দ্বারা তাহাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হইবে। সেদিন বলা হইবে, ইহাই উহা যাহা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভুত করিতে। সুতরাং তোমরা যাহা পুঞ্জীভূত করিয়াছিলে তাহা আস্বাদন কর”। সর্বসাধারণের জন্য মহান আল্লাহ্ প্রদত্ত সম্পদ মুষ্টিমেয় লোক কুক্ষিগত করার মাধ্যমে সৃষ্ট এহেন পার্থিব সমস্যা ইহকাল এবং পরকাল, উভয় কালের জন্যই মানুষের জন্য অকল্যাণকর।

সম্পদশালীদের দায়িত্বহীনতা : আল্লাহ্ সম্পদশালীদের দায়িত্বহীনতার ব্যাপারে বলেন: “সে মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল না এবং অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করিত না, অতএব এই দিন সেথায় তাহার কোন সৃহৃদ থাকিবে না এবং কোন খাদ্য থাকিবে না ক্ষত নিঃসৃত স্রাব ব্যতীত, যাহা অপরাধী ব্যতীত কেহ খাইবে না”। অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করা অর্থে এখানে বুঝানো হয়েছে, বিত্তশালীদের সম্পদ এমন ভাবে ব্যবহার করা যাতে কর্মহীন অভাবগ্রস্তরা কাজ করে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানসহ যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ পায়। অর্থনীতির ভাষায় বিত্তশালীরা তাদের সম্পদ অনুৎপাদনশীল কাজে বা ভোগ-বিলাসে ব্যয় না করে উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী কাজে বিনিয়োগ করবে এবং অভাবগ্রস্তরা সেখানে জীবন যাপনের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। এ না করলে সম্পদশালীদের জন্য পরকালে মর্মান্তিক শাস্তির বিধান রয়েছে; কারণ সম্পদশালীর সম্পদ জনহিতকর কাজে ব্যবহার করা ইবাদত্ তুল্য।

সম্পদের বৈষম্যমূলক বণ্টন ব্যবস্থা: আল্লাহ্ বলেন: “আল্লাহ্ জনপদবাসীদের নিকট হইতে তাঁহার রাসূলকে যাহা দিয়াছেন তাহা আল্লাহর, তাঁহার রাসূলের “এখানে রাসূল বলতে রাষ্ট্রকে বুঝানো হয়েছে। দেখুন,  Pickthall, Mohammed Marmaduke. ‘The Meaning of The Glorious Koran’, London: published by the New American Library, New Your and Toranto,, রাসুলের স্বজনগণের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের, যাহাতে তোমাদের মধ্যে যাহারা বিত্তবান কেবল তাহাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে। রাসূল তোমাদিগকে যাহা দেন তাহা তোমরা গ্রহণ কর এবং যাহা হইতে তোমাদিগকে নিষেধ করেন তাহা হইতে বিরত থাক এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ্ তো শাস্তি দানে কঠোর” আল্লাহ্ভীতি আল্লাহ্ প্রদত্ত সম্পদ ব্যক্তি বিশেষের ন্যায়সঙ্গত ভোগ, ব্যয় ও জনসাধারণের মধ্যে ন্যায়ভিত্তিক সমবণ্টনের ও বিতরণের প্রধান নিয়ামক। কিন্তু সচরাচর লক্ষ্য করা যায় মানুষ- এমনকি মুসলিম সমাজও সম্পদ আহরণ, ভোগ, ব্যয় ও বণ্টনের ক্ষেত্রে আল্-কুরআন ও হাদিসের নিয়মাবলী সঠিকভাবে অনুসরণ করে না। এর ফলে সমাজে ও রাষ্ট্রে সম্পদের আয় ও বণ্টন ব্যবস্থায় বৈষম্য দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে মুসলিম সমাজে ও রাষ্ট্রে সম্পদের আয়, ব্যয় ও বণ্টনের সুষম ও ন্যায্য বণ্টনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রায় সকল রাষ্ট্রই, মুসলিম রাষ্ট্রসহ, এ ব্যাপারে উদাসীন। ফলে এ ধরণের শরীয়ত বিরোধী বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থায় যারা বিত্তবান কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন করে।

ধনী শ্রেণীর মানসিকতা: আল্লাহ্ বলেন: “যখন বিপদ তাহাকে স্পর্শ করে সে হয় হা-হুতাশকারী। আর যখন কল্যাণ তাহাকে স্পর্শ করে সে হয় অতি কৃপণ”। সম্পদশালীদের এই কৃপণতা তাদের সমাজ বিচ্ছিন্নতা ও সমাজ বিমুখতারই ফল। সম্পদ তারা না কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উৎপাদনশীল বিনিয়োগের কাজে ব্যবহার করে, না বিত্তশালীদের উপর শরীয়া মোতাবেক সমাজের কোন দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত জনগণের কল্যাণের ও হক্ আদায়ের কাজে ব্যবহার করে। এর শাস্তি যে ভয়ঙ্কর তা আল্লাহ্ বলেছেন: “জাহান্নাম সেই ব্যক্তিকে ডাকিবে, যে সত্যের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিয়াছিল ও মুখ ফিরাইয়া লইয়া ছিল। সে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করিয়া রাখিয়াছিল”। ধনীক শ্রেণীর এ মানসিকতার শরীয়ামুখী পরিবর্তন না হলে তাদের জন্য যে ভয়াবহ পরিণতি রয়েছে সে ব্যাপারেও আল্লাহ্ সতর্ক করেছেন: “দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে, যে অর্থ জমায় ও উহা বার বার গণনা করে; সে ধারণা করে যে, তাহার অর্থ তাহাকে অমর করিয়া রাখিবে; কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হইবে হুতাশায়; তুমি কি জান হুতামা কী? ইহা আল্লাহর প্রজ্বলিত হুতাশন, যাহা হৃদয়কে গ্রাস করিবে; নিশ্চয় ইহা উহাদিগকে পরিবেষ্টন করিয়া রাখিবে দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে”। ইসলাম জনগণের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণে শরীয়া-সমাজমুখী মানসিকতায় বিশ্বাসী।

দরিদ্র শ্রেণীর মানসিকতা: আল্লাহ বলেন: “আর এই যে, মানুষ তাহাই পায় যাহা সে করে, আর এই যে, তাহার কর্ম অচিরেই দেখান হইবে-অতঃপর তাহাকে দেওয়া হইবে পূর্ণ প্রতিদান।” আল্লাহ্ আরো বলেন: “এবং তোমরা কর্ম করিতে থাক; আল্লাহ্ তো তোমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করিবেন এবং তাঁহার রাসূল ও মুমিনগণও করিবে”। আলস্য ও কর্মবিমুখতা দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলাম তাই মানুষকে পরিশ্রমের মাধ্যমে পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ সাধণের চেষ্টা করে যাওয়ার তাগিদ দেয়। পরিশ্রম বিনা ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ভাগ্য বিনির্মাণে অলসভাবে শুধু আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতার শিক্ষা ইসলাম দেয় না। আল্লাহ্ বলেন: “এবং আল্লাহ্ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না উহারা নিজ অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে”। সুতরাং দারিদ্র্য হতে আত্মরক্ষার জন্য বান্দার নিজ চেষ্টা ও কর্মের বিকল্প নেই। অবশ্য কর্মক্ষম অভাবী লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা সমাজ ও রাষ্ট্রকে যেমন করতে হবে, যেমনটি করেছিলেন নবী করীম স. এক ভিক্ষুককে একটি কুঠার কেনার ব্যবস্থা করে দিয়ে তার জীবনধারণের জন্য বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করে তা বাজারে বিক্রি করতে। “এ উদাহরণটি এখানে জনগণের জীবন ধারণের জন্য সরকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায়িত্ব পালনের রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে।” তেমনি দরিদ্রলোককে আলস্য ও কর্মবিমুখতার মানসিকতাও ত্যাগ করতে হবে। আল্লাহ্ বলেন: “তুমি ধৈর্য ধারণ কর, কারণ নিশ্চয় আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।” আর তাই হাত পা গুটিয়ে বসে কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করে থাকার মানসিকতা ত্যাগ করে হালাল কর্মের মাধ্যমে নিজ দারিদ্র্য মোচনের চেষ্টায় ধৈর্য্য ধারণ করলে আল্লাহ্ সহায় হন।

ক্ষমতার কেন্দ্রায়ণ ও সংহতকরণ: আল্লাহ্ বলেন: “বল, হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ্! তুমি যাহাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান কর এবং যাহার নিকট হইতে ইচ্ছা ক্ষমতা কাড়িয়া লও; যাহাকে ইচ্ছা তুমি পরাক্রমশালী কর, আর যাহাকে ইচ্ছা তুমি হীন কর। কল্যাণ তোমার হাতেই। নিশ্চয় তুমি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান”। সুতরাং সার্বভৌম ক্ষমতা কেবল আল্লাহর হাতেই কেন্দ্রীভূত এবং সংহত, মানুষের হাতে নয়। কিন্তু আমরা যা দেখি তা হলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা জনগণের নামে মুষ্টিমেয় ক্ষমতাশালী লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত এবং সংহত হয়, যাদের আর্থ-সামাজিক সিদ্ধান্ত প্রায়শ: দরিদ্রজনগণের স্বার্থের পরিপন্থী। আল্লাহ্র বক্তব্য হচ্ছে: “যাহারা তাহাদের প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের কর্ম সম্পাদন করে এবং তাহাদিগকে আমি যে রিযক দিয়াছি তাহা হইতে ব্যয় করে”। তারাই সফলকাম হয়। এখানে উত্তরাধিকার” ও যাকাতের শরীয়তি বিধান মেনে সম্পদের ন্যায্য ব্যয় ও বণ্টনের মাধ্যমে দরিদ্রদের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে, যা বিত্তশালীরা এড়িয়ে চলে। আল্লাহ্ ন্যায়বিচারক, তাই তিনি বলেন: “তিনিই তোমাদিগকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করিয়াছেন। সুতরাং কেহ কুফরী করিলে তাহার কুফরীর জন্য সে নিজেই দায়ী হইবে। কাফিরদের কুফরী কেবল উহাদের প্রতিপালকের ক্রোধই বৃদ্ধি করে এবং কাফিরদের কুফরী উহাদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে”। একমাত্র আল্লাহ্ ও তাঁর দেয়া বিধানকে সকল ক্ষমতার উৎস ও কেন্দ্র বিবেচনা করে দরিদ্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে সমাজ ও রাষ্ট্রকে ক্ষমতা ও বিত্তের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। কেননা আল্লাহ্ বলেন: “তোমার প্রতিপালক এইরূপ নহেন যে, তিনি অন্যায়ভাবে জনপদ ধ্বংস করিবেন অথচ উহার অধিবাসীরা পুণ্যবান”। অতএব, দারিদ্র্যমুক্ত পুণ্যবান জাতি হিসেবে ইহলোকে ও পরলোকে আত্মরক্ষা ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে ইসলামের আলোকে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের কল্যাণে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া জরুরি।

রিবা : আল্লাহ্ বলেন: “মানুষের ধনে বৃদ্ধি পাইবে বলিয়া তোমরা যে সুদ দিয়া থাক, আল্লাহ্র দৃষ্টিতে তাহা ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যে যাকাত তোমরা দিয়া থাক তাহাই বৃদ্ধি পায়; উহারাই সমৃদ্ধিশালী” আল্লাহ আরো বলেন: “ভাল ভাল যাহা ইয়াহুদীদের জন্য বৈধ ছিল আমি তাহা উহাদের জন্য অবৈধ করিয়াছি তাহাদের সীমালংঘনের জন্য এবং আল্লাহ্র পথে অনেককে বাধা দেওয়ার জন্য, এবং তাহাদের সুদ গ্রহণের জন্য, যদিও উহা তাহাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হইয়াছিল; এবং অন্যায়ভাবে লোকের ধন-সম্পদ গ্রাস করার জন্য”। “আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন”। এর অর্থ এই যে, জনগণের দারিদ্র্য মোচনের ক্ষেত্রে সূদ কোন কাজেই আসে না বরং এর মাধ্যমে দরিদ্রের ধন-সম্পদ সুকৌশলে আত্মসাৎ ও গ্রাস করে কতিপয় বিত্তশালী আরো ধনী হয় আর জনগণের দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ্ বলেন: “হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করিও না।” তাই ইহকাল ও পরকালে সফলতা অর্জনের জন্য আল্লাহ্ বিত্তশালীদেরকে সূদে দরিদ্রদের ঋণ দেয়ার বদলে দান করার কাজে উৎসাহিত করেন। আল্লাহ্ সূদকে নিরুৎসাহিত করে উপদেশ দেন: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং সূদের যাহা বকেয়া আছে তাহা ছাড়িয়া দাও যদি তোমরা মুমিন হও”। যুগে যুগে প্রমাণিত হয়েছে সূদী ব্যবসা ব্যাপক জনগণের দারিদ্র্যের মূল; মুষ্টিমেয় লোক এতে উপকৃত হয় এবং সমাজে দারিদ্র্য, পাপ ও বৈষম্য বাড়ে। “Khaled, Sarwar Md. Saifullah, Flaws of the Prevailing Micro-credit Financing System and Search for an Islamic Alternative, Dhaka, Thoughts on Economics, Islamic Economics Reasearch Bureau, Vol. 21, No. 02, April-June 2011, Pp, 27-50.”.”

দুর্নীতির প্রভাব : আল্লাহ্ বলেন: “তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করিও না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিয়দংশ জানিয়া শুনিয়া অন্যায়রূপে গ্রাস করিবার উদ্দেশ্যে উহা বিচারকগণের নিকট পেশ করিও না”। সমাজের প্রভাবশালীদের অনেকেরই আল্লাহর এ নির্দেশ উপেক্ষা করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং দরিদ্র শ্রেণীর লোকদের অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করার হীন প্রচেষ্টা প্রায়শ: আমাদের চোখে পড়ে। এ জাতীয় দুর্নীতির প্রভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দরিদ্র আরো দরিদ্র এবং ক্ষেত্র বিশেষে নি:স্ব হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও ঘুষ, প্রতারণা, জুয়া, মাদক, বাজারে পণ্যাদির ব্যাপারে ভূয়া প্রচারণা ও ওজনে কম দেয়া ইত্যাদি দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে মহল বিশেষ অন্যায়ভাবে নিরীহ ও দরিদ্র শ্রেণীর লোকদের ঠকিয়ে থাকে। আল্লাহ্ বলেন: “হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা উহা বর্জন কর যাহাতে তোমরা সফলকাম হইতে পার”। আল্লাহ্ আরো বলেন: “তোমরা মাপ ও ওজন ঠিকভাবে দিবে, লোকদিগকে তাহাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিবে না এবং দুনিয়ায় শান্তিস্থাপনের পর বিপর্যয় ঘটাইবে না; তোমরা মুমিন হইলে তোমাদের জন্য ইহা কল্যাণকর”। শ্রমিকের পারিশ্রমিক নির্ধারণের ক্ষেত্রেও দেখা যায় ধনীক শ্রেণী শ্রমিককে পূর্ণমাত্রায় খাটিয়েও তার পারিশ্রমিক ন্যায্য ও সঠিক পরিমাণে নিয়মিত দেয় না, এবং প্রভাবশালীরা লোকদের নিকট থেকে তাদের প্রাপ্য পুর্ণমাত্রায় আদায় করে কিন্তু অপরের প্রাপ্য সঠিকভাবে পরিশোধ করে না। এ বিষয়ে আল্লাহ্ বলেন: “দুর্ভোগ তাহাদের জন্য যাহারা মাপে কম দেয়, যাহারা লোকের নিকট হইতে মাপিয়া লইবার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাহাদের জন্য মাপিয়া অথবা ওজন করিয়া দেয়, তখন কম দেয়। উহারা কি চিন্তা করে না যে, উহারা পুনরুত্থিত হইবে মহাদিবসে”? মহাপ্রভু সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ মানুষের ইহকাল ও পরকালের কল্যাণে ন্যায়ের পক্ষে এবং যাবতীয় দুর্নীতির বিপক্ষে।

উপসংহার : এ দুনিয়ায় ধনী দরিদ্রের বৈষম্য মানুষেরই সৃষ্টি। এ পৃথিবীর যাবতীয় নেয়ামত আল্লাহ্ তাআলা সকল মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন। এর মধ্যে কিছু নেক বান্দা আছেন যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য অতি সাধারণ ও পার্থিব লোভ-লালসাহীন সৎ জীবন যাপন করতে ভালবাসেন এবং তাতেই অভ্যস্ত ও সন্তুষ্ট। আপাত দৃষ্টিতে বৈষয়িক লোকের কাছে তাঁদের দরিদ্র মনে হলেও প্রকৃত অর্থে আধ্যাত্মিক বিবেচনায় তাঁরা এতটাই উন্নত ও সমৃদ্ধ যে, এ পৃথিবীর ধন-দৌলতের প্রতি তাঁদের কোন লোভ বা মোহ নেই। এ লক্ষ্যে তাঁরা নিজের বিপুল অর্থ-সম্পদও নির্দ্বিধায় অভাবী জনগণের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে নিজের জন্য তেমন কিছুই রাখেন না। তাঁদের পার্থিব দৃষ্টিভঙ্গি আল্লাহভীতি এবং ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ নির্ভর। সাধারণ সংসারাসক্ত লোকের কাছে তাঁদের বৈষয়িক আচরণ বোধগম্য না হলেও তাঁরা আল্লাহকে বুঝেন এবং আল্লাহ্ও তাঁদের বুঝেন। এতেই তাঁরা সন্তুষ্ট। ইসলামী পরিভাষায় এঁদের যাহিদ বলা হয়েছে।

এ থেকে এমন অনুমান করার কোন সুযোগ নেই যে, ইসলাম সংসার ধর্ম বর্জনকে আদর্শায়িত করে। এ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব নবী করীম স. সংসার জীবন যাপন, রাষ্ট্র পরিচালন, যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং ধর্ম প্রচার-সবই করেছেন। তবে যেটা মনে রাখা দরকার তা হলো এ সবই তিনি করেছেন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য। তিনি আদর্শ মানুষ ছিলেন, আদর্শ স্বামী ছিলেন এবং সমগ্র মানব জাতির সামনে তাঁর জীবন সর্বকারীন আদর্শ এবং অনুকরণীয়। তিনি দারিদ্র্যকে অপছন্দ করতেন ঠিকই কিন্তু দরিদ্রদের ভালবাসতেন বলে দরিদ্র্যের মতো জীবন যাপন করতেন। তাঁর সাহাবীরাও তাই করতেন। আল্লাহ্ বলেন: “যে কেহ পার্থিব জীবন ও উহার শোভা কামনা করে, দুনিয়াতে আমি উহাদের কর্মের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেথায় তাহাদিগকে কম দেওয়া হইবে না। উহাদের জন্য আখিরাতে অগ্নি ব্যতীত অন্য কিছুই নাই এবং উহারা যাহা করে আখিরাতে তাহা নিষ্ফল হইবে এবং উহারা যাহা করিয়া থাকে তাহা নিরর্থক”। আর তাই আল্লাহ্ বলেন: “যাহারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাহাদিগকে দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে আল্লাহ্ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখিবেন এবং যাহারা যালিম আল্লাহ্ উহাদিগকে বিভ্রান্তিতে রাখিবেন। আল্লাহ্ যাহা ইচ্ছা করেন”। আমরা উপরে উল্লেখ করেছি দুনিয়াতে পার্থিব আয় বণ্টনের ব্যাপারে ইসলাম শরীয়াভিত্তি ন্যায্য সমবণ্টনে বিশ্বাসী। তাই আল্লাহ্ মানবজাতিকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন: “জীবনমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে। কিয়ামতের দিন তোমাদিগকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হইবে। যাহাকে অগ্নি হইতে দূরে রাখা হইবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হইবে সে-ই সফলকাম এবং পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়। তোমাদিগকে নিশ্চয় তোমাদের ধনৈশ্বর্য ও জীবন সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হইবে”। পার্থিব জীবনে যাবতীয় ভোগ-বিলাস-ব্যসন, দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচার, ব্যভিচার হতে মুখ ফিরিয়ে আল্লাহ্ নির্দেশিত পথে সংযমী জীবন যাপন করে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই মানব জীবনের লক্ষ্য বলে ইসলাম বিবেচনা করে।

আজ কাল কেউ কেউ মনে করেন, “কুরআনের সামাজিক বিষয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর মধ্যে অবশ্যই একটি পার্থক্য নিরূপণ করতে হবে। প্রথমটি যেহেতু সপ্তম শতকের আরবের সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রদত্ত হয়েছে, সেহেতু বর্তমান যুগ-সমস্যার প্রেক্ষিতে তা অসঙ্গতিপূর্ণ; অতএব তা পরিত্যাজ্য এবং কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক অনুশাসনগুলোই চিরন্তন সত্য রূপে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। তাঁরা এ বিষয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। তাঁরা এটাও ভুলে যান যে, পাশ্চাত্যজগত এ যাবত যত অবদান পেশ করেছে, ইসলামের সৌন্দর্য ও অবদান সে তুলনায় অপরিসীম ও অতুলনীয়”। ইসলামী বিধি-বিধানের এ জাতীয় পছন্দ ও সুবিধা মাফিক ব্যবহার আল্লাহ্ পছন্দ করেন না এবং তিনি বলেন, “যাহারা আল্লাহকে অস্বীকার করে ও তাঁহার রাসূলদিগকেও এবং আল্লাহে ও তাঁহার রাসূলের মধ্যে ঈমানের ব্যাপারে তারতম্য করিতে চাহে এবং বলে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি ও কতককে অবিশ্বাস করি আর তাহারা মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করিতে চাহে, ইহারাই প্রকৃত কাফির এবং কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রাখিয়াছি”। এ কথা মনে রাখা দরকার যে, ইসলামকে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনে প্রসাধন হিসেবে ব্যবহার করার কোন সুযোগ নেই, গ্রহণ করতে হবে পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল জীবন বিধান হিসেবে। (সমাপ্ত)

লেখক : মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান, পাঠান পাড়া, (খান বাড়ী) কদমতলী, সদর, সিলেট-৩১১১।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ