ঢাকা, সোমবার 9 April 2018, ২৬ চৈত্র ১৪২৪, ২১ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিবিএস’র পরিসংখ্যান নিয়ে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন

এইচ এম আতকার : অর্থনীতির সুফল আর কুফল নিয়ে কোন তর্ক না থাকলেও বিতর্ক চলছে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নিয়ে। বিতর্ক চলছে এই প্রবৃদ্ধির আকার বা অঙ্ক নিয়েও। চলতি অর্থ বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ রয়েছে। চূড়ান্ত হিসাবে তা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছে সরকার। একই সাথে মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৫২ ডলার। সরকারের এমন বক্তব্যের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

জিডিপি নিয়ে এই বিতর্ক নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই এই বিতর্ক চলছে। প্রতি বছরই কিছুটা হলেও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু এতে জনগণ কোন সুফল পাচ্ছে না। সরকার বলছে প্রবৃদ্ধি হবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। 

আর বিশ^ ব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগী বা দাতাগোষ্ঠীরা সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করছে। তাহলে কার বক্তব্য সত্য। আর এতে জনগণের কি লাভ রয়েছে। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে বলে ধারণা করছে বিশ্ব ব্যাংক, যা তাদের আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। চূড়ান্ত হিসাবে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৮% এবং মাথা পিছু আয় ১৬১০ ডলার হতে পারে।

আন্তর্জাতিক এই ঋণদাতা সংস্থাটি গত মাসে তাদের ষান্মাষিক প্রতিবেদন গ্লোবাল ইকোনোমিক প্রসপেক্টাসে এই পূর্বাভাস দিয়েছে। আর সরকার আশা করছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই হারকে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে নিয়ে যেতে পারবে বাংলাদেশ। কিন্তু সরকার এবং বিশ্ব ব্যাংকের সব ধরনের হিসাব নিকাশ পিছনে ফেলে চলতি অর্থ বছরের ৯ মাসে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এবং মাথা পিছু আয় হয়েছে ১৭৫২ ডলার। প্রশ্ন হলো এমন কিএ উন্নতি হলো হঠাৎ করে প্রবৃদ্ধি বেড়ে গেলো। মাথাপিছু আয় সরকারের পরিকল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। চূড়ান্ত হিসাবে নাকি আরও বাড়তে পারে।

এর আগে জুনে একটি প্রতিবেদনে বিশ্ব ব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পেতে পারে। এবারের প্রতিবেদনে তা বাড়িয়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে।

গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক সরকারের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে এলেও বরাবরের মতোই শেষ পর্যন্ত সরকারের হিসাবই হয়তো গ্রহণ করেছে তারা।

সরকার মঙ্গলবার ঘোষণা দিয়েছে যে চলতি অর্থবছরের আর্থিক ঘাটতি ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অর্থনীতিবিদরা বলেছিলেন সরকার প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে দাবি করেছে বর্তমান হারের সাথে গ্রহণযোগ্য নয়।

পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল ঘোষণা দিয়েছেন যে, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ অতিক্রম করে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। কারণ উচ্চতর বিনিয়োগে সহায়তা করে রেমিট্যান্স শিল্প খাত, রপ্তানি ও প্রবাহের ভাল পারফরম্যান্স করেছে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উৎপাদন বৃদ্ধির ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ এবং শিল্প প্রবৃদ্ধির ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। যেমনগুলো বিনিয়োগ এবং চাকরি সৃষ্টির তথ্য দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। দেশে দিন দিন বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে অর্থ পাচারও। তাহলে কিভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি এত বাড়ে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন যে, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশের মত বিনিয়োগ হয়নি। ২০১১ সালের পর থেকে ১ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনে জিডিপির ৩৪ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন।

মির্জা আজিজ বলেন, রপ্তানি পরিকল্পনা ও ইন-ফ্লো রেমিটেন্সের পরিকল্পনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক উপাদানগুলো চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, কিন্তু গত বছরের তুলনায় এটি খুবই ক্ষীণ ও নেতিবাচক বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৭ সালের জুনে সংসদে জাতীয় বাজেট উপস্থাপনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্টের প্রবৃদ্ধির চেয়ে আরও বেশি। ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ৭ শতাংশের নিচে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ড.জাহিদ হোসেন বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবটি ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশ করা একই এজেন্সি দ্বারা ২ দশমিক ৩ শতাংশ কর্মসংস্থানের তথ্য সরবরাহ করে। কিন্তু এ চিত্র অনেকটা ভিন্ন। দেশে বেকার বাড়ছে দৃশ্যমান বিনিয়োগও অনেক কম। ব্যাংকে তারল্য সংকট রয়েছে। একইভাবে ব্যাংক ঋণের সুদ হারও অনেক বেশি। তাহলে কিভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি এত বাড়ে।

যে হারে শিল্পে উৎপাদন বেড়েছে সেহারে যুব সমাজের কর্মসংস্থান হয়নি। তাহলে শিল্প খাতে কিভাবে এত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। সরকার গত ৭ বছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সমালোচনার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

 পরিসংখ্যানের বিবরণে বলা হয়েছে, উৎপাদন খাত থেকে ১৩ দশমিক ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ, ২০১৫-১৬ সালে ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং ২০১৬-১৭ সালে ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

জাহিদ হোসেন উল্লেখ করে বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে এবং ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থান এবং বেসরকারী খাতের বিনিয়োগের বিপরীতে ধারাবাহিকভাবে দ্বিগুণ বৃদ্ধির হার হতাশাজনক।

গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ের প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমেছে ১ দশমিক ১০ শতাংশ। তাহলে শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ে কি করে। বিনিয়োগ আর উৎপাদন না বাড়লে এখাতে প্রবৃদ্ধি হয় কি করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্বনর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, জিডিপি’র মতো সমালোচনামূলক বিষয়গুলোর পরিসংখ্যানের পরিসংখ্যানে আরও নিখুত হওয়া উচিত। চলতি অর্থবছরে দেশে কৃষি খাতের ৩ দশমিক ০৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে যা গত বছরের ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ ছিল। অথচ চলতি অর্থ বছরে বন্যার কারণে ফসলের হানি হয়েছে। তাহলে কি করে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হলো? 

অবশ্য রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে মন্দা এবং বন্যায় ফসলহানির বিবেচনায় গত অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অর্থনীতির গবেষকদের কারও কারও মধ্যে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলছেন, যে যুক্তি দেখিয়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে তাতে ‘ফাঁক রয়েছে’।

তিনি বলেন, সাময়িক হিসাব প্রাক্কলনে বিশ্ব ব্যাংকের নিজস্ব সূচক থাকলেও চূড়ান্ত হিসাবে কোনো দেশের নিজস্ব পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করা ছাড়া তাদের উপায় থাকে না। এ কারণে চূড়ান্ত হিসাবে কিছুটা কন্ট্রাডিকশন থাকেই। তারপরও তাদের প্রাক্কলন অনেকটা সঙ্গতিপূর্ণ।

কিন্তু বিবিএস যেসব সূচকের ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি হিসাব করছে তাতে ‘অসঙ্গতি’ রয়েছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনোমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম।

তিনি বলেন, রপ্তানি আয়, রেমিটেন্স, কৃষি খাত, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতে প্রবাহ বিবেচনায় নিলে সরকারের হিসাবের সঙ্গে ‘ম্যাচ করাটা একটু কঠিন’ হয়ে যায়।

সাতের উপরে যেভাবে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেটা কীভাবে হচ্ছে?... বলা হচ্ছে যে, ম্যানুফেকচারিং খাতে ১০ পার্সেন্ট গ্রোথ হয়েছে। এর বড় অংশ হচ্ছে রেডিমেট গার্মেন্ট। কিন্তু রপ্তানি খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবার ২ পার্সেন্টের নিচে। তাহলে গার্মেন্টে বাদে অন্য খাতগুলোতে বিশাল বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ধরতে হবে। সেটা কিন্তু দেখা যাচ্ছে না।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় হয়েছে আগের বছরের চেয়ে ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ কম। আর পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭২ শতাংশ। তারপরও বিবিএসসের হিসাবে সেবা খাতের রপ্তানি আয় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।

সেলিম রায়হান বলেন, গত অর্থবছরে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা অনেকটাই গতি হারিয়েছে। ঋণ বিতরণেও প্রবৃদ্ধি কমেছে। রেমিটেন্স কমার প্রভাব দেখা যাচ্ছে জমির দাম কমার মধ্যে।

এই সময়ে শিল্প খাতের ৮ থেকে ৯ লাখের মতে শ্রমিক কাজ হারিয়েছে- এটা সরকারি তথ্য। তাদের বড় অংশই গ্রাম থেকে আসা। আবার কর্মসংস্থানও সেভাবে সৃষ্টি হয়নি। অথচ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। তাই এ প্রবৃদ্ধির গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

শ্রমিক কাজ হারালে এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি প্রবৃদ্ধিতে পড়ার কথা। কিন্তু সেখানেও হিসাব মেলাতে পারছেন না এই গবেষক।

এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কা এবং বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে বাংলাদেশে আগামী দিনের অর্থনীতির ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে বিশ্ব ব্যাংক সতর্ক করেছে।

প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও গত অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পেছনে যে যুক্তি দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে অনেকটাই একমত সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জিডিপির বিস্তারিত হিসাব কেবল বিবিএসই করে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সেই হিসাবের ওপরই নির্ভর করে। প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনে বিশ্ব ব্যাংক নিজস্ব ‘মডেল’ প্রয়োগ করলেও চূড়ান্ত হিসাবের ক্ষেত্রে বিবিএসের পরিসংখ্যানের উপর নির্ভর করে তারা।

গবেষণা পদ্ধতি, ভিত্তি বর্ষ ও নমুনা বাছাইয়ের মানোন্নয়নে বিবিএসের নানা পদক্ষেপ তুলে ধরে অর্থনীতির এই গবেষক বলেন, এসবের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি বা বিশ্বাসযোগ্য করার চ্যালেঞ্জ বিবিএসের সামনে থাকছেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ