ঢাকা, মঙ্গলবার 10 April 2018, ২৭ চৈত্র ১৪২৪, ২২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পহেলা বৈশাখ, শেকড়ের টানে কোথায় ছুটেছি?

তাহনিয়া তরিক : গত কয়েকবছর থেকে যেভাবে মহাসমারোহে পহেলা বৈশাখ উদযাপন হচ্ছে আগে এমনটি দেখা যেত না। পহেলা বৈশাখ’কে বাঙালির জাতীয় জীবনের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত করতে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করা হয়েছে চার/পাঁচ বছর ধরে। 

বর্তমানে বাংলা সনের প্রথমদিন আসবে মানেই লাল-সাদা পোশাকে সাজাতে হবে নিজেকে, পান্তাভাতের সাথে ইলিশ মিশিয়ে মেতে যেতে হবে অযৌক্তিক এক রসনা বিলাসে-এমন চিত্রই ধরা পড়ছে সবার চোখে। আর এসবের পিছনে কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা, ঐতিহ্য রক্ষা, দেশের প্রতি ভালবাসা ইত্যাদি।

ইদানীং বুদ্ধিজীবীদের কাছে যে ভাষাটা শোনা যাচ্ছে তা হলো-ভুলে যাওয়া শেকড়ের কাছে বাঙালি জাতিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতেই দেশজুড়ে পহেলা বৈশাখের মহাআয়োজন। 

০০ হিন্দু ধর্মমতে, পহেলা বৈশাখ তাদের একটি পূজা পালনের উৎসব যা ৩০শে চৈত্র, চৈত্র সংক্রান্তি থেকে শুরু হয়। এ পূজা উৎসবে তাদের পোশাক থাকে শাঁখা-সিঁদুরের রঙের এবং এ পূজার প্রসাদ হয় ইলিশ মাছ আর পান্তাভাত। বছরের প্রথমদিন থেকেই সমস্ত অকল্যাণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এদিন অকল্যাণের প্রতীক পেঁচার প্রতিকৃতি নিয়ে শোভাযাত্রায় বের হয় সমগ্র হিন্দু জাতি। সনাতন ধর্মের যুগ যুগের রীতি এটি।

০০ কিন্তু ৯০% মুসলমানের বাংলাদেশে আমরা ইলিশ পান্তার নামে, নববর্ষের নামে কোন্ সংস্কৃতির চর্চা করছি?

০০ এটা বাঙালি সংস্কৃতি, নাকি হিন্দুয়ানী পৌত্তলিক সংস্কৃতি? 

০০ আমরা দেশীয় ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করছি? নাকি অন্য জাতির ঐতিহ্য চর্চা করে তাদের সংস্কৃতিকে উচ্চে তুলে ধরছি?

০০ দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং গৌরবে উদ্বেলিত হয়ে দেশপ্রেম দেখাচ্ছি? নাকি অন্যজাতির কাছে নিজেদের স্বাতন্ত্র্যবোধকে নিঃশেষে বিসর্জন দিচ্ছি?

০০ এ প্রশ্নগুলো একবার চিন্তাভাবনা করে দেখা দরকার। আমাদের শেকড়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নামে সারাদেশে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে। 

তাই আমাদের জানা প্রয়োজন, কোন্ শেকড়ের সন্ধানে পাগলপাড়া হয়ে মাঠে নেমেছে বাঙালি সন্তানরা? আর সেই শিকড়ে ফিরে যাওয়া আমাদের জন্য কতটুকু কল্যাণকর?

০০ ইতিহাসের আয়নায় চোখ রাখলে দেখি, যে শেকড়ে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার এত প্রয়াস (!) সে শেকড়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রক্তপিপাসু আর্য জাতির পৌত্তলিকতার দুর্গন্ধ। তাহলে এক আল্লাহর তাওহীদে বিশ্বাসী কোন ব্যক্তির পক্ষে কিভাবে সম্ভব সেই শেকড়ের সন্ধানী হওয়া? আর্য সমাজের অসাড়, অযৌক্তিক কর্মকান্ড কেন এতবছর পরে চর্চা করার হিড়িক পড়ে গেল, তা আমাদের বোধগম্য হয় না। 

০০ বর্তমান সমাজে যারা চৌদ্দশত বছর পূর্বের-মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সা:) প্রচারিত দ্বীনের-অনুসারী; যারা ইসলামের মূলে ফিরে যেতে চায় তাদের ‘ব্যাকডেটেড’, মৌলবাদী’ বলে ঠাট্টার হিড়িক পড়ে যায়। মৌলবাদীদের প্রত্যেক ক্ষেত্রেই হেস্তনেস্তও হতে হয়। তাহলে যারা এরচেয়েও পেছনে, খ্রিস্টপূর্ব সময়ে ফিরে যেয়ে শেকড়প্রীতি দেখাতে চাচ্ছেন তারা কি আরও বেশিমাত্রায় ব্যাক্ডেটেড্ নন? তাদেরকি শেকড়বাদী’ বলা হবে না?

ি আসলে একটি ধর্মপ্রাণ জাতিকে ধর্মহীন, সেক্যুলার, অসাড, অযৌক্তিক কর্মকান্ডে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলার উদ্দেশ্যেই এত ভিত্তিহীন আয়োজন। একদম শিশু বয়স থেকেই মনে-মননে, চেতনায়-বিশ্বাসে পুরোপুরি বিজাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক বাহক হিসাবে গড়ে তোলার জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে।

০০ একটি ছোট্ট শিশুও মিডিয়ার কল্যাণে লাল-সাদা’ পোশাকের বায়না ধরে, ইলিশ-পান্তা খাওয়ার আবদার করে, শোভাযাত্রায় অংশ নেয়, গালে-হাতে উল্কি আকিয়ে নেয়, অথচ সে জানে না এসবের হেতু কি? শিশুটিকে বাঙালী ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি শিখাতে চাচ্ছি অথচ বাংলা বর্ণমালাই হয়তো বা তার কাছে অপরিচিত।

০০ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশপ্রেম ও স্বাতন্ত্র্যবোধে উদ্দীপ্ত হচ্ছে অথচ এয়ারফোনে, কনসাটে বাজাচ্ছে হিন্দী গান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় পার করছে হিন্দী মুভি দেখে। একদিনের দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে বাঙালীয়ানা দেখাচ্ছে, অথচ বছরের বাকীদিনগুলোতে পাশ্চাত্য অথচা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির স্রোতে গা ভাসাচ্ছে। কি মানে এই দেশপ্রেমের?

০০ লাল-সাদা পোশাক পড়ে হৈ-হুল্লোড়, নারীর হাতে পান্তা-ইলিশ ভোজন, রাখি পরিধান, উল্কি অংকন, রাক্ষস-খোক্কস ও পেঁচার প্রতিকৃতি নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা-এসবের মধ্যে  ঐতিহ্যবোধ সংরক্ষণ হচ্ছে’ নাকি শেরকের চর্চা হচ্ছে? কেননাএসব মুখোশ আর প্রতিকৃতি অমঙ্গল দূর করার ক্ষমতা রাখে না। এ ক্ষমতা কেবল আল্লাহর।

০০ দেশপ্রেমের নামে এই শেকড়চর্চা’ এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাম্য হতে পারে না। হযরত শাহজালাল (র.), হযরত খানজাহান (র.), শাহ মাখদুম (র.)সহ অসংখ্য অলি-আউলিয়া এদেশের মাটিতে তাওহীদের বীজ বুনেছেন। তিতুমীরের রক্তের দামে এদেশ বিজাতীয় আগ্রাসন মুক্ত হয়েছে। এদেশের মিনারে মিনারে দিনে পাঁচবার মহান আল্লাহ্র একত্ববাদের ধ্বনি ঘোষিত হয়। এদেশের একজন কৃষক পর্যন্ত কাজের ফাঁকে ক্ষেতের আলে মাথা নুইয়ে দেয় মহান আল্লাহ্র প্রতি সিজদায়। তাই এদেশের প্রতি ভালবাসা পোষণকারী, এক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী, কোন মুসলমান ব্যক্তি পৌত্তলিক সংস্কৃতি ও কার্যকলাপের অনুকরণ করতে পারে না। 

০০ হিন্দুয়ানী অনুষ্ঠানাদিকে তার ঐতিহ্যের অংশ মনে করতে পারে না। 

০০ হিন্দু সনাতন ধর্মের পূজা পালনের দিনটি আমাদের কাছে এত উৎসবের এত আনন্দের হতে পারে না। 

০০ ভয়াবহ এ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে, অপসংস্কৃতির সয়লাব থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করা ঈমানের দাবি।

খ্রিস্টীয় ১২০৩ সালে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর হাত দিয়ে এদেশে মুসলিম শাসনের শক্ত শোকড় প্রোথিত হয়। 

এদেশের মাটিতে শক্ত আসন গেড়ে বসে এক আল্লাহর সুমহান আদর্শ।

বাংলার মানুষের ঐতিহ্য, স্বাতন্ত্র্য, মূল্যবোধ সেই সময় থেকেই এক অনন্য ধারায় সংরক্ষতি হতে থাকে।

সেই অনন্য মূল্যবোধ এবং চেতনায় বিশ্বাসী হয়েই এ জাতি পৌত্তলিক ভারতের সঙ্গ ছেড়ে ৪৭শে জন্ম দেয় মুসলিম জাতীয়তাবোধে বিশ্বাসী এক স্বাধীন রাষ্ট্রের।

তাই এদেশের মানুষের শেকড় পৌত্তলিকতার অতলে প্রোথিত নয়; এদেশের মাটিতে, আকাশে, বাতাসে সর্বত্র তাওহীদের  ইতিকথা সংরক্ষিত আছে।প্রাচীন আর্য জাতির কাছে মাটির টানে ফিরে যাওয়া মুসলিম ঐতিহ্যবোধে বিশ্বাসী এ জাতির জন্য দুঃখজনক ছাড়া কিছুই নয়।

আজ বিজয়ী মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ভিত্তিহীন, প্রাচীন, অসাড় সংস্কৃতির মাধ্যমে ভুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে।

তাওহীদবাদী একটি জাতিকে সেক্যুলার জাতিতে রূপান্তরিত করার ষড়যন্ত্র চলছে।

তারই একটি অন্যতম অংশ পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ উৎসব। 

ঐদিনটিকে মুসলমানদের ঈদের আসনে বসানোর জন্য কত প্রচেষ্টা!

 এই ভিত্তিহীন উৎসবে মেতে যেয়ে নয় একে অপসংস্কৃতি এবং ঈমান বিধ্বংসী মনে করেই বাঙালী মুসলমানদের এ থেকে বিরত থাকতে হবে। মহলবিশেষের ষড়যন্ত্র এবং অপচেষ্টা এভাবেই নস্যাৎ করা সম্ভব।

মহান আল্লাহ আমাদের দেশ ও জাতিকে সত্যকে বুঝবার শক্তি দিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ