ঢাকা, মঙ্গলবার 10 April 2018, ২৭ চৈত্র ১৪২৪, ২২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নারী নির্যাতন এখন রাজনৈতিক পীড়নের হাতিয়ার

আখতার হামিদ খান : ঘটনার শুরু মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, ‘কিছুটা বানোয়াট, কিছুটা অতিরঞ্জিত, কিছুটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ভাবে। তাই কোথাও কোন লাগসই ঘটনা ঘটলেই লোকজন ভাষায় বলতে গেলে ফাল মেরে হাজির হওয়ার পারদর্শী (যেমন আত্মহননকারী সিমি কিংবা নওশিনের বাসায়) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমরা তখন ধর্ষিত পূর্ণিমার ধারে কাছে যেতে দেখিনি। স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই অমিয়বাণীতে আমরা গর্দভ ‘সচেতন, নিরীহ ও নিরপেক্ষ’ জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম। অবশ্য আমাদের বিভ্রান্ত করার জন্য দেশের তথাকথিত নিরপেক্ষতার ভানধরা কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার গোয়েবলীয় নীরবতাও ছিল স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর মতই জুড়িহীন। কিন্তু দিন যত গেছে, ততই ধর্ষণের ঘটনা রাজনৈতিক প্রপঞ্চে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে উদগত এই ধর্ষণষ্ণের ধর্ষক হল জাতীয়তাবাদী কিংবা রাজাকার আল-বদরদের আদর্শানুসারী। আর ধর্ষিত হলো নির্বাচনে ধানের শীর্ষ ও দাঁড়িপাল্লার বিরোধী পক্ষীয় নেতা-কর্মীদের মেয়ে বা আত্মীয়া। রাজশাহীর পুঠিয়ায় ধর্ষক জাতীয়তাবাদের ঝা-াবাহী সৈনিকরা ধর্ষণযজ্ঞের আলোকচিত্র লোকজনকে দেখানোর পর ধর্ষিত মহিমা গত ফেব্রুয়ারি মাসে আত্মহত্যা করে। তখন ‘চোখ ধাঁধানো মেকআপে সমৃদ্ধ নিরপেক্ষতার’ ধ্বজাধারী কতিপয় দৈনিক অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয় এ সত্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে। নির্বাচনের আগে ও পরে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও নারী ধর্ষণের খবর চেপে রাখার অপচেষ্টা চালিয়ে একসময় ব্যর্থ হতে হয়েছিল এসব দৈনিককে। ঠিক তেমনি আরও এক ব্যর্থতার গ্লানিতে তাদের ঢেকে দেয় মহিমার আত্মহনন। অপ্রিয় সত্য আড়ালকারী পত্রিকাগুলো বলতে বাধ্য হয়, হ্যাঁ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ধর্ষণযজ্ঞ চালানো হচ্ছে বাংলাদেশের অনেক স্থানে। অথচ এ রকম হওয়ার কথা নয়। সাধারণ মানুষ এখনও বিশ্বাস করে, এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাধারণ সমর্থকরাও মনে করেন বলে বিশ্বাস আমাদের, নির্বাচনী ফলাফলের সঙ্গে ধর্ষণের মত কুৎসিত ঘটনার কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না (মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ, আমরা কি ভুলতে পারি এই দৈববাণীর মতো রাবীন্দ্রিক সত্য?)। যে ধর্ষণের ঘটনার ইয়াসমিনের লাশ সামনে রেখে দিনাজপুরের পাশাপাশি সারা দেশ জ্বলে উঠেছিল, শততম সেঞ্চুরি পালনের ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে বিগত সরকারের প্রতি ধিক্কার ছুঁড়ে দিয়েছিল সেই ধর্ষণের ঘটনা নির্বাচনের পর ফিরে আসবে নতুন  আঙ্গিক নিয়ে, কেউই তা প্রত্যাশা করেনি। দিন আনি দিন খাই মানুষ থেকে শুরু করে টাকার পাহাড়ে শুয়ে ক্ষুধামন্দা রোগে আক্রান্ত ধনী, কেউই তা চাইতে পারে না।  

নারী নির্যাতন আগেও ছিল, আগেও এ ধরনের ঘটনার ক্রমবৃদ্ধি দেখে উদ্বিগ্ন হয়েছি আমরা সবাই। গত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলেও আমরা আমাদের ক্ষোভ চাপা দিয়ে রাখতে পারিনি নারী নির্যাতন ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায়। যে কোন দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় কিংবা উপসম্পাদকীয় পাতা খুললেই এ সত্যের প্রমাণ পাওয়া যাবে। কিন্তু চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর সংঘটিত নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সেসবের এক মৌলিক তফাত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিগত সরকারের সময় নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ ছিল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম প্রধান সূচক। এখন নারী নির্যাতন মানে কেবল ওইটুকু নয়। এখন নারী নির্যাতন হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রতিশোধের অস্ত্র। নারী এখন রাজনৈতিক নিপীড়নের এক নতুন শিকার। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যেসব কৌশলে নির্যাতন, হয়রানি, অপদস্ত, সন্ত্রস্ত ও লাঞ্ছিত করা যায়, সেসবের তালিকায় স্বাধীন বাংলাদেশে একাত্তরের পর ধর্ষণযজ্ঞ এ সময়ের মতো আর কখনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। রাজনৈতিক হত্যা ও নিপীড়নের ঘটনা একাত্তরের পর থেকে প্রতিটি সরকারের আমলেই আমাদের হৃদয়কে কোন না কোনভাবে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু সেই হত্যা ও নিপীড়নের সঙ্গে ধর্ষণের কোন যোগ ছিল না। বিএনপি ও জামাত পরিচালিত এই জোট সরকারের অদ্যাবধি একমাত্র কৃতিত্ব বোধকরি যৌনসন্ত্রাস বা নারী নির্যাতনকে রাজনৈতিক অর্থে সংঘটিত করা।

ধর্ষণযজ্ঞ।। দূর অতীতে

এসব রাজনৈতিক ঘটনা আমাদের মুখোমুখি করে এই প্রশ্নের, তাহলে কি মানবসভ্যতার কোন উৎক্রমণ হয়নি কোটি কোটি বছর পরেও? নৃ-তাত্ত্বিকরা মনে করেন মানুষকে আদিম বন্য-কিংবা বর্বর বলার সঙ্গে ন্যায়-অন্যায় মূল্যবোধ স্থাপনের চেষ্টা করা উচিত নয়। কেননা  এগুলো সাক্ষ্য দেয় উৎপাদনের উপায়, প্রক্রিয়া এবং ব্যবস্থার, সাক্ষ্য দেয় সংস্কৃতির। এই সত্য মেনে নিয়েও আমরা মানুষকে বর্বর বলি, বলি আদিম। তর কারণ হয়ত এই, লাঠি-ফালা আর ইটপাথর নিয়ে মারামারি করা এ উৎপাদনপর্বের মানুষের পক্ষে শোভা পায় না। এ পর্বের মানুষের নৃশংসতা প্রকাশের যোগ্য পন্থা হল বোমা মেরে লাখ লাখ মানুষ হত্যা করা, পারমাণবিক তেজষ্ক্রিয়তায় কিংবা জীবাণুর অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে মানুষের শরীরকে অস্বাভাবিক ও যন্ত্রণাময় করে তোলা। যখন আমরা বলি, মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে তখন তো আসলে বোঝানোর চেষ্টা করি, মানুষের হাত-পায়ের রগ কেটে ফেলে রাখার প্রথা যে উৎপাদনপর্বে ছিল তা আমরা অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছি। অতএব উৎপাদন প্রক্রিয়ার এই পর্বে এসে প্রতিপক্ষ দমনের জন্য ওইসব কৌশল প্রয়োগ করা এখন আর শোভা পায় না। আধুনিক পন্থা হল কাউকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে শক দিয়ে যন্ত্রণা দেয়া, হানড্রেড ওয়াট পাওয়ার কিংবা জিরো পাওয়ার বাল্বের নীচে একটানা বসিয়ে রাখা। 

এই কুৎসিত রাজনৈতিক যৌনসন্ত্রাসের পরিণতি কী? আমাদের জানা নেই। কিন্তু আমরা গ্রীক পুরাণের এক কাহিনী মনে করতে পারি, যদিও হুবহু মিলবে না। ইডিপাস নিজের চোখ নিজেই উপড়ে ফেলেছিলেন। কেন? এ কাহিনী সবারই জানা। যদিও ইডিপাস এক অর্থে ইনোসেন্টই ছিল, তবুও  আত্মপীড়ন ইডিপাসকে বাধ্য করেছিল নিজের চোখকে নিজেই উপড়ে ফেলে দিতে। ইতোমধ্যেই যৌনসন্ত্রাসের প্রতিবাদের একটি ধরন সুস্পষ্ট রূপ নিয়ে সমাজে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রতিবাদ হিসেবে অনেক মেয়েই আত্মহননের পথ বেচে নিচ্ছেন। এইসব আত্মহনন যেমন নিপীড়িন নারীকে আরও নতুন নতুন আত্মহননের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তেমিন নির্যাতিত পরিবারগুলোর নিভৃত হৃদয়ে রেখে যাচ্ছে বেদনার নীলাভ জিঘাংসা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ