ঢাকা, মঙ্গলবার 10 April 2018, ২৭ চৈত্র ১৪২৪, ২২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নারী শিক্ষা জাগরণের আন্দোলনে বেগম রোকেয়ার পূর্বসুরিরা

 

মো: জোবায়ের আলী জুয়েল : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥ ৬। খায়রুন্নেসা খাতুন (১৮৭৪-১৯১০ খ্রি.) : খায়রুন্নেসা খাতুন সিরাজগঞ্জ জেলার হোসেনপুর গ্রামে ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ একজন ইসলাম প্রচারক ও সুলেখক ছিলেন। লেখিকার একমাত্র গ্রন্থ “সতীর পতিভক্তি” ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে (১৩১৮ বঙ্গাব্দ) সিরাজগঞ্জ থেকে মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ কর্তৃক প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি গদ্যে-পদ্যে লিখিত নারীদের প্রতি উপদেশমূলক। গ্রন্থে প্রথমে কয়েকটি কবিতা স্থান পেয়েছে। গ্রন্থটি স্বামী ভক্তিমূলক, ভাব ও ভাষা গতানুগতিক। গ্রন্থের শেষে একটি দীর্ঘ কবিতা রয়েছে “ললনা শিক্ষা” নামে। এ কবিতায় নারীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য লেখিকা আহবান জানিয়েছেন। গ্রন্থের গদ্যাংশে পতিভক্তি নারীর উদাহরণ হিসেবে কয়েকজন সতী নারীর জীবন গল্পাকারে বর্ণিত হয়েছে।

“মুসলিম সমাজের মহিলা এমন সুন্দর প্রবন্ধ ও কবিতা লিখতে পারেন” পূর্বে কারও ধারণা ছিলনা। খায়রুন্নেসার একমাত্র বই “সতীর পতিভক্তি” সম্পর্কে দেবী প্রসাদ রায় চৌধূরী সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা “নব্য ভারত” পত্রিকায় এ মন্তব্য করা হয়। বয়সে তিনি ছিলেন বেগম রোকেয়ার চেয়ে সামান্য বড়। বেগম রোকেয়া কাজ করেছেন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজে এবং কোলকাতায়। খায়রুন্নেসার কর্মক্ষেত্র ছিল পল্লিতে ও নিম্ন বিত্তদের মধ্যে।

১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে হোসেনপুর বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এর প্রধান শিক্ষিকা নির্বাচিত হন খায়রুন্নেসা। তাঁর স্বামীর ছিল বদলীর চাকরী। কিন্তু খায়রুন্নেসা বেশিরভাগ সময় বিদ্যালয়ের কারণে থাকতেন সিরাজগঞ্জে। অজ পাড়াগায়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে একটি বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখতে তাঁকে পোহাতে হয় অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। এমন ও শোনা গেছে স্কুলের খরচ জোগানোর জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুষ্টি চাল জোগাড় করতেন খায়রুন্নেসা। উনিশ শতকের শেষ দশকে এই মুষ্টি চাল তুলেই তিনি হোসেনপুর গ্রামে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। তাঁর স্বামী যে বেতন পেতেন তার একটা বড় অংশই চলে যেতো স্কুলের খরচ যোগাতে। তিনি ছিলেন কংগ্রেসের একজন সক্রিয় কর্মী। খায়রুন্নেসা অসামান্য অসাম্প্রদায়িক মহিলা ছিলেন। স্বশিক্ষিতা হলেও তাঁর সাহিত্য কর্ম ছিল যথেষ্ট মননশীল। তিনি তাঁর এক লেখায় “প্রত্যেক নগরে, প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক পাড়ায়” বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছিলেন।

অসামান্য প্রগতিশীল খায়রুন্নেসা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের আগে মহাত্মা গান্ধীর বিদেশী পণ্য বর্জনের আন্দোলনের বহুপূর্বে এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন -

“ভগ্নিগণ আইস আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়া বিদেশী শাড়ি পরিত্যাগ করি। বিলাতি বডিজ [ব্রা] সেমিজ ও মোজা ঘৃণার চক্ষে দেখি, লেভেন্ডারের পরিবর্তে আতর ও গোলাপ ব্যবহার করিতে শিখি, লেড-সু পায়ে দিয়া হুচট খাওয়ার দায় হইতে নিস্কৃতি পাই। তবেই আমরা স্বদেশের অনেক উপকার করিতে পারিব। আমরা নির্বোধ না’ হইলে সাত সমুদ্র পার হইতে বণিকগণ আমাদিগকে সামান্য জার্মান সিলভারের গহণা ও বেলোয়ারি চুরির দ্বারা প্রতারিত করিয়া জাহাজ ভরিয়া ভারতের ধন ও ধান্য লইয়া যাইতেছে আর আমরা মনে করিতেছি যে বহুমূল্য দ্রব্য লাভ করিলাম [স্বদেশানুরাগ]”। তিনি তাঁর রচিত “সতীর পতিভক্তি” নামক বইটিতে নিজেকে বিদ্যাবুদ্ধিহীন এক মুসলিম মহিলা বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু গৃহধর্ম প্রতিপালন সম্পর্কে এই গ্রন্থে তাঁর বুদ্ধির এবং অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়। নিম্নে তা’ তুলে ধরা হলো -

১) স্ত্রী লোকের হীনাবস্থাই সমাজের অধঃপতনের মূল, ২) যে পরিবারে স্ত্রী লোকেরা দুঃখ পায় সেই পরিবার ত্বরায় উৎসন্ন যায়, ৩) স্ত্রীলোক কেবল সন্তানের প্রসূতি নহেন, সকল সৎকার্যের প্রসূতি, ৪) যে পরিবারের স্বামী স্ত্রীর প্রতি নিত্য সন্তুষ্ট সে পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত, ৫) স্বামীকে গৌরবজনক বিবিধ মহৎকার্যে অনুপ্রাণিত করতে মর্যাদাবতী স্ত্রীদের গৌরব প্রকাশ পায়।

স্কুলের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতে গিয়ে তাঁর শরীর ভেঙ্গে পড়ে। যে কারণে অল্প বয়সেই তাঁকে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হয়। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে লেখিকা মারা যান। স্বনামে ও বেনামে ইয়াকুব আলী চৌধূরীর “নবনূর” পত্রিকায় তাঁর বেশ কিছু গঠনমূলক লেখা প্রকাশ পায়।

সত্য কথা বলতে কী বেগম রোকেয়ার এই সব পূর্বসুরীদের অক্লান্ত চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলেই বাংলাদেশের নারীদের আজকের শিক্ষা ও সাহিত্য চর্চায় অবদান রাখার পেছনে রয়েছে এই সব মহীয়সী নারীদের অক্লান্ত আতœত্যাগ ও অবদান। 

তবু রোকেয়ার ভূমিকা এঁদের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছে। পরবর্তীতে নারী জাগরণের আন্দোলনে বেগম রোকেয়া যে যথার্থই অসাধারণ নারী ছিলেন এবং বঙ্গদেশের নারী মুক্তি আন্দোলনের এই শতাব্দীর সূচনায় তিনি যে বিশেষ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন এ কথা অনস্বীকার্য। বাঙালি মুসলিম নারী মুক্তির অগ্রদূত হিসেবে বেগম রোকেয়ার নাম বাংলার ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশ শতকের বাংলার নারী আন্দোলনের তিনি একটা নতুন যুগের সূচনা করেন। (সমাপ্ত)

তথ্য সূত্র :

১) রাস সুন্দরী থেকে রোকেয়া : গোলাম মুরশেদ, অগ্রহায়ণ (নারী প্রগতির একশ’ বছর) ১৪০৭ বঙ্গাব্দ, নভেম্বর ২০০০ খ্রি.

২) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত : মুহম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান

৩) সাহিত্যে নারী: স্রষ্টী ও সৃষ্টি : শ্রী মতি অনুরূপা দেবী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৯ খ্রি.

৪) বাঙালি নারী : সাহিত্যে ও সমাজে : আনিসুজ্জামান, ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ ২০০০ খ্রি.

৫) আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা, ১ম খ- : কাজী আব্দুল মান্নান (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬১ খ্রি.)

৬) বাংলা মহিলা কবি (১৮৫০-১৯৫০ খ্রি.): রেনুকা ভট্টাচার্য, কলিকাতা : কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অপ্রকাশিত থিসিস

৭) কৈলাস বাসিনী দেবী হিন্দু মহিলাদের হীনাবস্থা : দূর্গাচরণ গুপ্ত, ১৭৮৫ শকাব্দ কলকাতা

৮) নওয়াব ফয়জুন্নেসা ও পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ : রওশন আরা (ঢাকা ; বাংলা একাডেমী ১৯১৩ খ্রি.)

৯) বঙ্গের মহিলা কবি (২য় সংস্করণ) কলকাতা : এ মুখার্জী এন্ড কোং লি:

১০) নারী জাগৃতি ও বাংলা সাহিত্য : জ্ঞানেশ মৈত্র(কলকাতা ; ন্যাশনাল পাবলিশার্স, ১ সংস্করণ, ১৯৮৭ খ্রি.)

১১) বাংলার নারী আন্দোলন : মালেকা বেগম (ঢাকা: ইউনিভার্সিটি প্রেস লি: ১৯৮৯ খ্রি.)

১২) ঞযব ড়িৎষফ ড়ভ গঁংষরস ড়িসবহ রহ : ঝড়হরধ ঘরংযধঃ অসরহ ঈড়ষড়ৎরধষ ইবহমধষ ১৮৭৬-১৯৩৯  (ঘবি ণড়ৎশ ; ঊ.ঔ. ইজওখখ, ১৯৯৬)

লেখক : সাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ, 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ