ঢাকা, মঙ্গলবার 10 April 2018, ২৭ চৈত্র ১৪২৪, ২২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইসলামী ব্যাংককে টিকিয়ে রাখুন

গত ৬ এপ্রিল বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এক খবরে প্রকাশ ইসলামী ব্যাংকের পাঁচ শীর্ষ কর্মকর্তাকে অপসারণ করা হয়েছে। ভাবলাম ব্যাংকটির অতীত সুনাম এবং অভ্যন্তরীণ সুশাসন অব্যাহত রাখার জন্য হয়তো শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপ নিয়ে থাকবেন, কিন্তু তা নয়। সংবাদটির বিস্তারিত বর্ণনায় দেখা যায় যে, এতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন যে, এদের সবাই পদত্যাগ করেছেন। অপসারিত বা পদত্যাগকারী কর্মকর্তারা হচ্ছেন : অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব শামসুজ্জামান, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব হাবিবুর রহমান ভূইয়া এফসিএ, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব আবদুস সাদেক ভূইয়া, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক  জনাব মোহাম্মদ মোহন মিয়া এবং সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট জনাব আমিরুল ইসলাম। এদের মধ্যে প্রথম ও শেষোক্ত কর্মকর্তাদ্বয় ৪ এপ্রিল এবং বাকী কর্মকর্তারা ৫ এপ্রিল পদত্যাগ করেছেন। ওয়াকিবহাল সূত্র জানিয়েছে যে, ব্যাংকটির শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় ১১ জন কর্মকর্তা ছিলেন। পাঁচ জনের  পদত্যাগের পরে অবশিষ্ট আছেন  ছয়জন। সূত্র অনুযায়ী অপসারণ বা চাপের মুখে পদত্যাগের ঘটনা আরো বাড়তে পারে। এ কারণে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বোর্ড চাপ সৃষ্টি করে মেয়াদ শেষ হবার আগেই পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন। বলা বাহুল্য, সরকারি নির্দেশনায় গত ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধন করা হয়। ব্যাংকটির বোর্ড সভায় পরিবর্তন আনা হয়। ঐদিন রাজধানীর একটি পাঁচতারা হোটেলে বোর্ডসভার নামে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে বোর্ডের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করে তাদের পদে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হয়। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অপসারণ ও নিয়োগে ব্যাংকিং কোম্পানি আইন, ইসলামী ব্যাংকের সংঘবিধি অথবা দেশের প্রচলিত আইনের কোনোটিই অনুসরণ করা হয়নি। দুর্নীতি, নাস্তিক্যবাদ ও প্রতিহিংসার পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন স্বাভিহিত (ঝবষভ ংঃুষবফ) অর্থনীতিবিদ কর্তৃক প্রণীত তথাকথিত মৌলবাদের অর্থনীতির সমাজতান্ত্রিক মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত একটি গোষ্ঠীর প্ররোচনায় এই মহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানটিতে একটি বৈরী পরিবর্তন নিয়ে আসা হলো। এর সবকিছুই করা হয়েছে গায়ের জোরে। ব্যাংকটির শীর্ষ পর্যায়ের ৫ জন কর্মকর্তাকে অপসারণের বর্তমান পদক্ষেপটিও একই ধরনের বলে মনে হয়। তাদের অপসারণ করা হয়েছে, তারা পদত্যাগ করেননি। তারা পদত্যাগ করেছেন বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে মিথ্যাচার ছড়াচ্ছেন, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। পাঁচজন সিনিয়র কর্মকর্তা যারা সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতা দিয়ে ব্যাংকটিকে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সহায়তা করেছেন, তারা বিনা কারণে হঠাৎ করে একযোগে পদত্যাগ করবেন এটা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। দেশের ব্যাংকিং খাত প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অধিকাংশই পুঁজি হারিয়ে ফেলেছে এবং লাখ লাখ কোটি টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের বোঝা নিয়ে এগুতে পারছে না। এই খাতের আত্মসাতের পরিমাণও সর্বকালের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। এই অবস্থায় অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেয়া যেখানে জরুরি ছিল সেখানে একটি মহল কর্তৃক এই খাতের ভালো ব্যাংকগুলোকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে সৎ, যোগ্য, নিষ্ঠাবান ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের অপসারণের অশুভ কর্মসূচি কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা ব্যাংকটির সমৃদ্ধি এনেছেন, পুরস্কারের পরিবর্তে তাদের তিরস্কৃত করা অমানবিক।

 সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, জনতা, কৃষি ও কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এগুলোর সবই সরকারি ব্যাংক। এদের মধ্যে এমন একটি ব্যাংকের কি নাম বলা যাবে, যেটি  কেলেঙ্কারি মুক্ত? সরকারি ব্যাংক, সরকারি লোক নিয়েই এদের ব্যবস্থাপানা কমিটি, বেসরকারি আমানত ছাড়াও সরকারি তহবিলের পর্যাপ্ততা নিয়েই তাদের বলন-চলন। তারা যখন মূলধন হারিয়ে ফেলে সাধারণ মানুষ তখন তাদের আমানত নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে পারে না। সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে তাদের আঁতাত, ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ, আত্মসাৎকৃত অর্থের ভাগ-বাটোয়ারা ও বিদেশে পাচার প্রভৃতি তৎপরতা ব্যাংকগুলোকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। স্বয়ং কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হওয়ায় ব্যাংকগুলো তার নির্দেশও শুনছে না। এ ধরনের অস্বস্তিকর অবস্থা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও পরিষ্ঠানকে দুর্নীতির জন্য দায়ী বলে প্রকাশ্য বক্তব্য দিলেও তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো নজির নেই। ফলে তিনি বাকোয়াস নামে অভিহিত হয়ে পড়েছেন।

এইতো সেদিন ৪ এপ্রিল পত্রপত্রিকায় জনতা ব্যাংকের অর্থ কেলেঙ্কারির আরেকটি ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত খবরানুযায়ী এবার রফতানি পণ্যের বিল জালিয়াতি করে বেসরকারি খাতের ৫টি প্রতিষ্ঠান জনতা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখা থেকে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নাই বললেই চলে। অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, জনতা ব্যাংকের কতিপয় কর্মকর্তার সাথে ব্যবসায়ীদের যোগসাজশের মাধ্যমে এই ঘটনা ঘটেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এর সাথে ব্যাংকটির একজন উপব্যবস্থাপনা  পরিচালক জড়িত রয়েছেন।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে হাজারীবাগের ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড ৪৯৯.৭০ কোটি টাকা রূপালী কম্পোজিট লেদারওয়ারস ৪১১.৬৯ কোটি টাকা, ক্রিসেন্ট টেনারিজ লি. ১৫.৮৪ কোটি টাকা, সাভারের বিমেক্স ফুটওয়ার ৫১৯.৪০ কোটি টাকা এবং লেক্সকো লিমিটেড ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার বিল জনতা ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে সমপরিমাণ টাকা তুলে নিয়ে যায়। বিদেশী ২১টি বায়ার হাউজের কাছে এসব পণ্য রফতানি করা হয়। সূত্র প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী জালিয়াতির বিষয়টি প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষ তদন্তে ধরা পড়ে। এরপর জনতা ব্যাংকের তরফ থেকে বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য  চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তদন্ত শেষে রিপোর্ট পেশ করে। কিন্তু এই রিপোর্টে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণ এবং তদারকীতে ব্যর্থতার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর  কেলেঙ্কারিটির অধিকতর তদন্তে মাঠে নেমেছে বলে জানা গেছে।

জনতা ব্যাংকের নিজস্ব তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, গ্রাহক প্রতিষ্ঠানগুলো ও শাখা ব্যবস্থাপনার পারস্পরিক যোগসাজশে ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর ব্যাংকের উপরোক্ত টাকা বের করে নেয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখা এসব রফতানি বিল ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিদেশী ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সন্তোষজনক ক্রেডিট রিপোর্ট না নেয়া, জাহাজীকরণ প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট নয় এমন ফ্রেইট এন্ড ফরওয়াডিং প্রতিষ্ঠানের ঋ. ঈ. ঊ গ্রহণ, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারিকৃত বিদেশী লেনদেনের নির্দেশনাবলী লংঘন, রফতানি বিলের স্বীকৃতি ছাড়া বিল ক্রয় প্রভৃতির জন্য ব্যাংকটির ইমামগঞ্জ শাখাকে দায়ী করা হয়। এই রিপোর্টের পর শাখাটির তৎকালীন ম্যানেজার ও একজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত ছাড়া সংশ্লিষ্ট অন্য কারুর বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

কাস্টমারের সাথে আঁতাত করে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ লোপাটের এই ঘটনা শুধুমাত্র জনতা ব্যাংকের একক ঘটনা নয়। বর্তমান সরকারের আমলে সরকারি/বেসরকারি অধিকাংশ ব্যাংকের এটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ লক্ষাধিক টাকার হদিস নিন, কত টাকা টিকে দেখুন। প্রকৃত তথ্য গোপন করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঊর্ধ্বতনদের ধোঁকা দেয়ার একটি অশুভ প্রবণতা প্রায় সকল ব্যাংককেই পেয়ে বসেছে। লাখো কোটি টাকার মধ্যে আপাত তথ্যানুযায়ী শ্রেণি বিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ ৬৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রকৃত অবস্থা আরো খাবাপ। একদিকে টাকা আটকে পড়েছে আরেকদিকে ব্যাংকের লিকুইডটি সমস্যা দূর করার জন্য সরকারিভাবে নগদ টাকা পুশ করা হচ্ছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের কৃত্রিম পদ্ধতি বেশিদিন স্থায়ী হয় না। এই খাতটি অচিরেই ধসে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রতিকারের ব্যবস্থা না নিলে দেশের কি অবস্থা হবে ভেবে দেখুন।

ইসলামী ব্যাংক একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি তার কর্মীদের বদৌলতে দেশের শ্রেষ্ঠ ও অন্যতম বৃহত্তম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। দেশের উন্নয়নে তার ভূমিকা অপরিসীম। এই ব্যাংকটিকে ধ্বংস না করে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে তা স্বমহিমা ও বৈশিষ্ট্যে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালানো উচিত। প্রতিষ্ঠানটি কখনো কোনো দলের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করেনি। বর্তমানে তাকে কোনো দলের বা গোষ্ঠীর ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহার করতে গেলে তার বৈশিষ্ট্য ও বিশ্বস্ততা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং মানুষ ব্যাংকটির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। এ অবস্থা কাম্য হতে পারে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ