ঢাকা, মঙ্গলবার 10 April 2018, ২৭ চৈত্র ১৪২৪, ২২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চাকুরীতে কোটা সংস্কারের দাবিতে উত্তাল সারাদেশ

 

স্টাফ রিপোর্টার : সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে সারাদেশ উত্তাল হয়ে উঠেছে। সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শুরু করে সব স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে এই আন্দোলন। সরকারের পক্ষ থেকে নানা আশ্বাস দেয়া হলেও মাঠ ছাড়েনি আন্দোলনকারীরা। গতকাল সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয় আন্দোলনকারী প্রতিনিধিদের। সেখানে ৭ মে পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে  সাধারণ শিক্ষার্থীরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। 

গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নতুন করে হাজারো শিক্ষার্থীরা জড়ো হওয়া শুরু করে।  সাধারণ শিক্ষার্থী বলছেন, কৌশলে আন্দোলন বন্ধ করার কোনো চক্রান্ত তারা মেনে নেবে না। এর আগে গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে সরকারের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন শিক্ষার্থীদের ১৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। বৈঠকে মে মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করার সিন্ধান্ত হয়। তবে সচিবালয় থেকে আন্দোলনকারী প্রতিনিধি দলটি ক্যাম্পাসে ফিরে এসে সিদ্ধান্ত জানালে তা মানতে অস্বীকৃতি জানায় আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঘোষণার পর পরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীরা। তারা এই কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি তুলেন।

সন্ধ্যায় পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ফের ফুসে উঠে। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন হল থেকে নতুন করে জড়ো হতে শুরু করেন। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়কে লাঠি-সোটা নিয়ে মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনস্থলে হ্যান্ড মাইকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ঘোষণা দিয়ে সবাইকে যার যার অবস্থানে থাকতে বলা হয়। আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্ত ‘মানিনা- মানবো না’ মুহুর্মূহু স্লোগানে পুরো ক্যাম্পাস মুখর হয়ে উঠে।

ঢাবির রাষ্ট্র বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সবুজ মাহমুদ বলেন, সত্যিকার অর্থে সরকারের কোনো ইচ্ছে নেই কোটা সংস্কার করার। তাদের যদি সত্যি ইচ্ছে থাকতো কোটা সংস্কার করার, তাহলে তারা আজকেই ফাইনাল ঘোষণা করতো। একমাসের সময় তারা নিতো না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্রী সুমাইয়া রাহমান বলেন, সরকার আমাদের সঙ্গে টালবাহানা শুরু করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারই যদি সব সরকারি চাকরি পেয়ে যায়, তাহলে এই দেশে আমাদের জন্ম নেয়াই সবচেয়ে বড় ভুল। একমাস পর কিছুই হবে না। তখন তারা এই বিষয় ভুলে যাবে।’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন জোবায়ের আলী। তিনি বলেন, আমরা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের (ওবায়দুল কাদের) কথা মানি না। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা বিশ্বাস করি। তিনি যদি নিজে ঘোষণা দেন তাহলে আমরা আমাদের আন্দোলন স্থগিত করব। এর আগে আমরা রাস্তা ছেড়ে যাব না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থী বলেন, দু’দিন ধরে টিয়ারশেল খেয়ে এই অস্পষ্ট আশ্বাস মানি না। আজকের মধ্যেই দাবি মেনে না নিলে আন্দোলন চলতে থাকবে। আরেক আন্দোলনকারী বলেন, আজ যদি তাদের (সরকার) আশ্বাসে আমরা চলে যাই, কাল থেকেই আমাদের মামলা দিয়ে হয়রানি করবে। আমরা তাদের ভুয়া আশ্বাস মানি না।

গতকাল রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা  শাহবাগ থেকে টিএসসি, দোয়েল চত্বর ও নীলক্ষেতের রাস্তা অবরোধ করে রেখেছেন। ক্যাম্পাসজুড়ে খ- খন্ড মিছিল চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তারা শাহবাগ থেকে রাজু ভাস্কর্য পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখান। ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের’ ব্যানারে এই আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজু ভাস্কর্যের অবস্থান থেকে মাইকে বলেন, সব শিক্ষার্থী আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নয়। এ কারণে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যতক্ষণ পর্যন্ত কোটা সংস্কারের তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না আসছে বা প্রজ্ঞাপন জারি না হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। আন্দোলনকারীরা অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে তাদের নতুন করে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।

আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে : সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একত্মতা প্রকাশ করে দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন। সারাদেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক বন্ধ করে দিয়েছেন তারা। আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একডেমিক কার্যক্রম মূলত অকেজো হয়ে পড়েছে।

কোথাও স্লোগান দিয়ে মিছিল বের করছেন তারা। কোথাও আবার শিক্ষার্থীরা সমবেত হয়ে ব্যানার ফেস্টুন বানাচ্ছেন। আবার কোথাও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে মহাসড়কে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের দাবি কোটা বাতিল নয় বরং যৌক্তিক সংস্কার। এ দাবির প্রেক্ষিতে সরকারি তরফে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না এলে আন্দোলনের দাবানল দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে বলে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।

রবিবারের ধারাবাহিকতায় সোমবার সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফের আন্দোলন শুররুহয়। আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেশের বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ করেছে শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক আন্দোলন ও পুলিশের হামলার পর সোমবার ভোর থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকেন। দুপুর থেকে তারা রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান নেন। রাজু ভাস্কর্যের সন্নিকটে পুলিশের সতর্ক অবস্থান থাকলেও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে দোয়েল চত্ত্বরের দিকে সরিয়ে দেয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : কোটা সংস্কারে দাবিতে এবং শাহবাগে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা। সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শতাধিক শিক্ষার্থী পুরান ঢাকার রাই সাহেব বাজার মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন।

জাবিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ, প্রক্টরসহ আহত ৫০ : ক্লাস বর্জন করে সোমবার সকাল পৌনে ১০টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী থেকে মিছিল নিয়ে গিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তাদেরকে রাস্তা থেকে সরাতে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এঘটনায় বেশ কমপক্ষে ৫০ শিক্ষার্থী আহত হন বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : ক্লাস বর্জন করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি নগরীর ষোলশহর এলাকায় ট্রেন অবরোধ করে বিক্ষোভও করেছেন তারা। সকালে বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে ষোলমহর থেকে চারটি ট্রেন ছেড়ে গেলেও তাতে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অন্য দিনের তুলনায় কম ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগেও ছিল শিক্ষার্থী শূন্য শ্রেনীকক্ষও। কেউ কেউ ক্লাস করতে এলেও, সহপাঠীদের দেখাদেখি তারাও ক্লাস বর্জন করছেন। তবে ক্লাস বর্জন হলেও বিভিন্ন বিভাগের পূর্ব নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে পরীক্ষা জানা গেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। সোমবার সকাল ১০টায় তারা সড়ক অবরোধ করে সেখানে অবস্থান নেন। কোনো বিভাগে ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়নি বলে জানা গেছে। এর আগে রোববার বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৮টা এবং রাত দেড় টায় দুই দফায় মহসড়ক অবরোধ করেন রাবির বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় : সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও (ইবি) ক্লাস বর্জন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আন্দোলনকারীরা মীর মশাররফ হোসেন একাডেমিক ভবন থেকে মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রধান সড়কে উঠতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি বাধা দেয়। এ সময় তারা মিছিল নিয়ে আবারও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষদ প্রদক্ষিণ করতে থাকেন।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় : চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা জানিয়ে এবং ঢাকায় বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে দিনব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট ডেকেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের বাধা দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় : বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিক্ষার্থীরাও সকাল থেকে ক্লাস বর্জন করেছেন। সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চত্বরে জমা হতে থাকেন তারা। এ সময় বিভিন্ন প্লের্কাড ও ফেস্টুন হাতে তারা কোটা সংস্কারের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা। সোমবার সকাল ৮টা থেকে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আয়োজনে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের এ অবস্থান কর্মসূচি চলছে।

বঙ্গবন্ধু  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : বিদ্যমান কোটাব্যবস্থা সংস্কার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হামলার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) ক্যাম্পাস সংলগ্ন ঘোনাপাড়া মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থীরা। সোমবার সকাল ১০টা থেকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে ১ কি.মি. দূরে  ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে অবস্থান নেন। হাসড়কে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারীরা ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই’, ‘পিতা তুমি ফিরে এসো, বৈষম্য দূর করো’সহ নানা স্লোগান দেন। বর্তমানে এই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে মহাসড়কের দুই পাশে কয়েক কিলোমিটার অংশে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থী মাহফুজ রিয়াদ বলেন, ‘কোটা সংস্কার এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। এই দাবিতে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আমরা মহাসড়ক অবরোধ করেছি। সংসদে কোটা সংস্কারের আলোচনা না ওঠা পর্যন্ত আমরা রাস্তা ছাড়ব না’। এছাড়া অপর শিক্ষার্থী আবিদা সুলতানা বলেন, এটি কোন রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, এটি শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির আন্দোলন। আমাদের দাবি, এই কোটাব্যবস্থা সংস্কার করা হোক। কেননা এই কোটার কারণে সরকারি চাকরিতে যোগ্য ও মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে। এসময় বিভিন্ন বিভাগের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়াও দেশের উল্লেখযোগ্য বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাবি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আন্দোলন করছেন।

আন্দোলনকারীদের ৫ দফা দাবি হলো- সরকারি নিয়োগে কোটার পরিমাণ ৫৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা, কোটার যোগ্য প্রার্থী না পেলে শূন্যপদে মেধায় নিয়োগ, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা না নেয়া, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে অভিন্ন বয়সসীমা, নিয়োগপরীক্ষায় একাধিকবার কোটার সুবিধা ব্যবহার না করা। 

সিদ্ধান্ত না মানলে সরে যাওয়ার ঘোষণা পরিষদের আহবায়কের : কোটাব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলন আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত স্থগিতের সিদ্ধান্ত মানছেন না সাধারণ আন্দোলনকারীরা। সচিবালয়ে সোমবার বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বৈঠকে আন্দোলন স্থগিতের এই সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে সচিবালয় থেকে পরিষদের ১৯ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজু ভাস্কর্যের সামনে আসেন। এসময় সেখানে সাধারণ আন্দোলনকারীরা জড়ো হন। পরিষদের পক্ষ থেকে আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানানোর সঙ্গে সঙ্গে মানি না মানি না স্লোগান দিয়ে উঠেন সাধারণ আন্দোলনকারীরা। এসময় পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, আপনারা যদি আমাদের সিদ্ধান্ত না মানেন তাহলে আমরা কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে সরে যাব।’ সোমবার যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কনফারেন্স রুমে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে এ বৈঠক শুরু হয়। শেষ হয় ৬টা ১৮ মিনিটে।

বৈঠক শেষে হাসান আল মামুন বলেন, কোটাব্যবস্থা সংস্কারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যৌক্তিক সংস্কার করার জন্য জনপ্রশাসন সচিবকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। এ সংস্কার আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ছাত্র-ছাত্রীদের জানিয়ে দেয়া হবে। তাই আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এ আন্দোলন স্থগিত করা হলো। কোটা সংস্কারের বিষয়টি আমলে নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। আটক ও আহতদের সম্পর্কে তিনি বলেন এখন পর্যন্ত আমার যে ভাই-বোনেরা গ্রেফতার হয়েছেন সকলকে নিশর্তভাবে মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি যারা আহত হয়েছেন তদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।

সাভার সংবাদদাতা : সরকারি চাকরিতে বিদ্যামান কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও জলকামান মেরে ঢাকা- আরিচা মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ ও শিক্ষার্থীসহ অর্ধশতাধীক আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদেরকে বিশ^বিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫ জনকে এনাম মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর সিকদার মো. জুলকারনাইনও আহত হয়েছেন। এ সময় মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। প্রায় ২ ঘণ্টার সংঘর্ষ শেষে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। জাবি ক্যাম্পাসের বাইরে পুলিশ ও শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থান নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বলার পরেও অবরোধ প্রত্যাহার না করলে শিক্ষার্থীদের উপর কাঁদানি গ্যাস ছোড়ে পুলিশ।

এর আগে সোমাবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় হাজার খানেক বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। প্রায় দুই ঘন্টা অবরোধে মহাসড়কের উভয় পাশে ২০ কি. মি যানযট লেগে যায়। এতে ঢাকার সাথে উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের সকল জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর আগে সকাল থেকেই ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ বিশ^বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রান্তিক গেইটে সাজোয়া যান নিয়ে অবস্থান নিয়েছিল। তবে আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আলোচনার আশ^াস দেওয়ায় একঘন্টা অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আলোচনা না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাদের অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে আসছিল।

পুলিশ জানায়, কোটা পদ্ধতির সংস্কার দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সকাল ১০ টা থেকে ঢাকা আরিচা মহাসড়কের ডেইরি গেট অবরোধ করে বিক্ষোভ করে।  দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে পুলিশ শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক থেকে ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভিতরে গিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ শিক্ষার্থীদের উপর কাদানে গ্যাস ও গুলী ছুঁড়ে ও জলকামান নিক্ষেপ করে। এ বিষয়ে ঢাকা জেলা অতিরিক্তি পুলিশ সুপার সাইদুর রহমান বলেন, এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে।

এর আগে এ হামলার প্রতিবাদে সোমবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে সকল প্রকার ক্লাস- পরীক্ষা বর্জনের  সিদ্ধান্ত হয়। সকাল থেকে কোন বিভাগেই ক্লাস- পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সকাল সাড়ে নয়টায় বিশ^বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে সবাই উপস্থিত হয়ে মিছিল নিয়ে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে এবং সকল অনুষদেও প্রদক্ষিণ করে। তবে পূর্ব নিধারিত ফাইনাল পরীক্ষা এর আওতামুক্ত রাখা হয়।

  রোববার মধ্যরাতেও জাবি ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। মিছিলে মুহুর্মুহু শ্লোগানে পুরো ক্যাম্পাসের ঘুম ভেঙ্গে যায়। মিছিলটি বটতলা থেকে শুরু হয়ে শহীদ মিনার, সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, ছাত্রীদের হল, চৌরঙ্গী মোড়, পরিবহন চত্বর হয়ে বটতলায় এসে শেষ হয়। মিছিল- সমাবেশে প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

খুলনা অফিস ঃ কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ও ঢাকার শাহবাগে আন্দোলনকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের প্রতিবাদে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। গতকাল সোমবার দুপুরে ক্যাম্পাস থেকে মিছিল বের করে বিশ্ববদ্যিালয়ের সামনের খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক প্রায় আধাঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা।  এসময় মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে তারা খুবির হাদিচচত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে।

এদিকে, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের খুলনা জেলা শাখার উদ্যোগে বিকাল ৪টায় খুবির সামনে থেকে জিরোপয়েন্ট পর্যন্ত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করে শিক্ষার্থীরা।

উল্লেখ্য, কোটা পদ্ধতির সংস্কারসহ পাঁচ দফা দাবিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও জেলা পর্যায়ে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছে চাকরি প্রত্যাশীরা।

রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ৮টা থেকে মহানগরীর জিরোপয়েন্টে সড়ক অবরোধ করে রাখে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের খুলনা জেলা শাখা। 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট), সরকারি বিএল কলেজসহ সরকারি-বেসরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ গ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীরা হঠাৎ সড়ক অবরোধ করলে খুলনা-ঢাকা, খুলনা-সাতক্ষীরা, খুলনা-যশোর, খুলনা-বাগেরহাট, খুলনা-মংলা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কোটা পদ্ধতির সংস্কারসহ পাঁচ দফা দাবিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও জেলা পর্যায়ে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছে চাকরি প্রত্যাশীরা। তারই অংশ হিসেবে রোববার বিকেলে ঢাকার শাহবাগ মোড়ে অবরোধ শুরু করে 'বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’। সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে আন্দোলনকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। এ সময় বেশ কয়েকজনকে আটক করে।

কুমিল্লা অফিস : সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সংস্কারের দাবিতে ও বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশী হামলার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে কুমিল্লার  শিক্ষার্থীরা। গতকাল সোমবার কুমিল্লা  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে নগরীর পূবালী চত্বরে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন।

পাঁচ দফা দাবিতে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সদস্যরা কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারক লিপি প্রদান করেন। পরে দুপুর ১২টা থেকে শিক্ষার্থীরা কুমিল্লা নগরীর পূবালী চত্বরে অবস্থান নিয়ে দাবি আদায়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। এ সময় আন্দোলনকারীরা ঢাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার বিচার দাবি করেন।

এসময় তাদের সাথে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ,কুমিল্লা সরকারি কলেজ, কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজসহ নগরীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা।

এদিকে, কোটা সংস্কার আন্দোলনে একাত্মতা পোষণ করে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা প্রায় সবকটি বিভাগে তাদের ক্লাস বর্জন করে। কোটা সংস্কার আন্দোলন কুমিল্লা অঞ্চলের আহ্বায়ক ও কুবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মাজহারুল ইসলাম হানিফ তাদের কর্মসূচি প্রসঙ্গে বলেন, ‘ দেশব্যাপী চলমান আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। আমাদের অংশ নিয়েছে কুমিল্লার বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষাথীরা। শাহবাগে গতকালের হামলার ঘটনার পর গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যথারীতি ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।’ 

আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ  কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের  প্রতœতত্ত্ব বিভাগের ৮ম ব্যাচের জাহিদ জানান, ‘কোটা নামক একটা অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ক্লাসে ফিরবনা’।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু হানিফ, ফয়সাল, তানজিনা ও রনি জানান, দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একাত্বতা পোষণ করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সকল বিভাগের ক্লাস বর্জন করেছে। তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ড. কাজী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জনের বিষয়ে আমরা জানিনা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যথা সময়েই এসেছে এবং শিক্ষার্থীরা ক্লাসে থাকলে আমরা অবশ্যই ক্লাশ নিব’।

এদিকে দুপুর আড়াইটার দিকে কড়া পুলিশ প্রহারায়  আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করে পুনরায় পূবালী চত্বরে এসে বিক্ষোভ  মিছিল করে।

সিলেট ব্যুরো : কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী ওপর ঢাকায় পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে দিনব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করলেও ছাত্রলীগের বাধার মুখে তা পালন করতে পারেনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রুযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তবে ধর্মঘট পালন না করতে পারলেও শাবির প্রধান ফটকে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। ছাত্রলীগও সেখানে অবস্থান নেয়।

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার সকাল সাতটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নেয়ার কথা ছিলো আন্দোলনকারীদের। তবে ভোর ছয়টা থেকেই শাহপরান হল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সামনে শাখা ছাত্রলীগ নেতারা অবস্থান নেন। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের উদ্দেশ্যে যাতায়াতকারী প্রত্যেককে তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে ব্যনারও কেড়ে নেন ছাত্রলীগ নেতারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সিলেট বিভাগীয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক নাসির উদ্দিনকে হল থেকে বেরুতে দেননি শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এক পর্যায়ে তার ফোনও কেড়ে নেয় তারা। হলে থাকা কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সমর্থন করেন এমন শিক্ষার্থীদেরকেও জোর করে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রধান ফটকে আসতে বাধা দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রধান ফটকে অবস্থান নিলে তাদেরকে ফটক থেকে উঠিয়ে দেন শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মুস্তাকিম আহমেদ মোস্তাক, তারিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান। পরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমিন এসে তার আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষার্থী, বিশেষ করে তার বিভাগের শিক্ষার্থীদেরকে সেখান থেকে চলে যেতে বলেন।

আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থী এনএইচ খন্দকার জানান, তারা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে চাইলেও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অনবরত তাদেরকে হুমকি ধমকি দিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন। শাখা ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ করে আন্দোলন করার অধিকার কারো নেই। তাই আমরা তাদেরকে সরিয়ে দিয়েছি। এদিকে, আগের দিন ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়ায় সকাল দশটা পর্যন্ত বেশীরভাগ বিভাগেরই পূর্বঘোষিত ক্লাস ও টার্ম পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো : কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরীর ষোলশহরে কোটা সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করছে আন্দোলনকারীরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটল ট্রেন বন্ধ করে দেয়। তবে আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের কোন অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটেনি।

চবি সূত্রের খবর, গতকাল সোমবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ করেছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে  তারা এ কর্মসূচী পালন করে। সোমবার সকাল ১০টার দিকে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রথম ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নেমে পড়ে। পরে প্রত্যেক বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা একাত্মতা জানিয়ে তাদের সাথে শরিক হন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. আরজু বলেন, 'কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আমরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছি। সকাল থেকে প্রত্যেক বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করেছে। আমাদের সঙ্গে অনেক শিক্ষকও যোগ দিয়েছেন।' এদিকে  ষোলশহর স্টেশন সূত্রের খবর, সোমবার সকালে  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন ষোলশহরে  আটকে দেয় বিক্ষোভরত  শিক্ষার্থীরা। এরপর থেকে নগরীর সাথে চবির শাটল ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এসময় সেখানে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও শিক্ষার্থীদের সাথে তাদের কোনো বিরোধ হয়নি। এদিকে  নগরীর প্রবর্তক মোড়ে দুপুরে বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও কোটা সংস্কারের দাবিতে মানববন্ধন করে ।

এদিকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর সোমবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম চেরাগী পাহাড় চত্বরে কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলনরত মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপর ঢাকার শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশী হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। মানববন্ধনে চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর ছাত্রসেনার সভাপতি ছাত্রনেতা মুহাম্মদ মাছুমুর রশিদ কাদেরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ছাত্রনেতা মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ শফিউল আলম। তিনি বলেন, দেশের সকল সাধারণ শিক্ষার্থী ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করছে কোটা সংষ্কারের জন্য। ১% মানুষের জন্য ৫৬% কোটা আর ৯৯% সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ৪৪%  কোটা। এটা অন্যায় ও চরম বৈষম্য। কোটা সংস্কারের আন্দোলন যৌক্তিক আন্দোলন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে অধিকার রক্ষার আন্দোলন। তিনি আরো বলেন, অবিলম্বে অদ্ভুত কোটা প্রথা বাতিল করুন না হয় সংস্কার করুন এবং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী চাকরিতে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করুন। বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ ইসলামী যুবসেনা চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর সাধারণ সম্পাদক যুবনেতা হাবিবুল মোস্তফা সিদ্দিকী বলেন, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপর হামলা রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ। জোর জুলুমের রাজত্ব কায়েম করতেই তারা মেধাবীদের আন্দোলন দমন করতে চাচ্ছে। 

প্রধান বক্তা   বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা কেন্দ্রীয় পর্ষদ এর সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯ (১), ২৯ (১) ও ২৯ (২) অনুচ্ছেদ সমূহে চাকরির ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সমান সুযোগের কথা বলা হয়েছে। আমরা সাংবিধানিক অধিকার চাই। কিন্তু বর্তমানে ৫৬ শতাংশ  কোটা ব্যবস্থার কারণে সাধারণ  মেধাবীরা চাকরিতে স্থান পাচ্ছে না। ফলে  বেকার বাড়ছে। মানসিক হতাশাগ্রস্ত যুবকরা খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে।  তাই এ মুহূর্তে বৈষম্যমূলক কোটা প্রথার সংস্কার করা দরকার। আশা করি, সরকার এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে কোটা প্রথার সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। 

মানববন্ধনে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি   মুহাম্মদ ইদ্রিস, চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর সহ সভাপতি ছাত্রনেতা আবদুল্লাহ আল মাসুম, ছাত্রনেতা মুহাম্মদ শাহজালাল, সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, অর্থ সম্পাদক মুহাম্মদ রিদুয়ান হোসেন তালুকদার পাপ্পু। 

সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রনেতা মাছুমুর রশিদ বলেন, কোটা সংস্কার বিরোধীরা স্বার্থান্ধ ও বিকারগ্রস্ত। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন শুধু নিজেরাই ভালো থাকতে নয় বরং দেশের মানুষকে বৈষম্য থেকে মুক্ত করে স্বাধীন ও স্বচ্ছল জীবন দিতে। আজ মুক্তিযুদ্ধের দোহাই দিয়ে যারা কোটা সংস্কারের বিরোধিতা করছে তারা প্রকারান্তে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অস্বীকার করছে। 

মানববন্ধনে বক্তারা গতকাল ঢাকার শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত সাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশী নগ্ন হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। হামলায় অংশ নেয়া অতি উৎসাহী আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী জানান। পাশাপাশি হামলায় আহত মেধাবী শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার ব্যয়ভার সরকারি তহবিল থেকে পরিচালনার জোর দাবি জানান। মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে চেরাগী পাহাড় চত্বরে এসে শেষ হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ